জুলাই অভ্যুত্থানের পর প্রায় ১০ মাস পেরিয়ে গেছে। শহীদ ও আহতদের পুনর্বাসন নিয়ে কতটা অগ্রগতি হয়েছে বলে মনে হয়?

জুলাই অভ্যুত্থানের পর শহীদ ও আহতদের পুনর্বাসন নিয়ে নানা সমস্যার কথা শোনা যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, তালিকা এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। যদি পুরো তালিকা তৈরি হয়ে সবার কাছে পৌঁছে যেত, তাহলে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো সহজেই সাহায্য করতে পারত। সরকারও তালিকাটি সম্পূর্ণভাবে তৈরি করতে পারেনি। সরকার ৫৯৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। জুলাই ফাউন্ডেশন আহতদের কিছু সংখ্যককে টাকা দিতে পেরেছে। আহতদের অধিকাংশই প্রথম ধাপের টাকা পাননি। আর যারা পেয়েছেন, তাদের দ্বিতীয় ধাপের টাকা পেতেও অসুবিধা হচ্ছে। জুলাই ফাউন্ডেশনের ক্যাটাগরি বিভাজন পুরো প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে। আবার মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় থেকে আলাদাভাবে আহতদের কিছু সুবিধা দেয়া হচ্ছে। সেটাও বেশ সময়সাপেক্ষ একটি প্রক্রিয়া বলে মনে হচ্ছে। আহতদের পুনর্বাসন নিয়ে অন্যভাবে ভাবতে হবে। সবাইকে এক নিয়মে সাহায্য করা সম্ভব নয়। সরকার চাইলে জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও অন্যান্য সংস্থার মাধ্যমে দ্রুত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে। এতে আহতদের পরিবারের জীবনযাত্রা সহজ হবে, তারা সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারবেন। সরকার বলছে, তারা পরিকল্পনা করে কাজ করবে, কিন্তু সবচেয়ে জরুরি হলো তাৎক্ষণিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করা। আহতরা যেন নিজেদের আয়ে বেঁচে থাকতে পারেন, সেটাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের তালিকা তৈরিতে বিলম্বের কারণ কী?

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে প্রথমেই আমরা বলেছিলাম, শহীদ ও আহতদের পুনর্বাসনের জন্য সঠিক তালিকা তৈরি করতে। কিন্তু এখনো তা সম্পূর্ণ হয়নি। ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে আগস্টে একটি তালিকা দেয়া হয়েছিল, যা সরকার ভিন্নভাবে ব্যবহার করতে পারত। কিন্তু সরকার জুলাই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে দীর্ঘ যাচাই প্রক্রিয়ায় নিয়ে গেছে, ফলে অনেক মানুষ তালিকার বাইরে রয়ে গেছে। সরকারের প্রশাসনিক দুর্বলতা ও যোগাযোগের অভাব পুনর্বাসন প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে। স্থানীয় প্রশাসন ও জেলা পর্যায়ের সংস্থাগুলো যদি সঠিক নির্দেশনা পেত, তাহলে পুনর্বাসন দ্রুত ও কার্যকরভাবে করা সম্ভব হতো। আহতদের সহায়তায় অনেক সংগঠন কাজ করেছে, কিন্তু সরকারি সহযোগিতা না পাওয়ায় অনেক সংগঠন অকার্যকর হয়ে গেছে। সরকার যদি এ সংগঠনগুলোর সঙ্গে নেটওয়ার্ক তৈরি করত, তাহলে পুনর্বাসন আরো সহজ ও দ্রুত করা যেত। সরকারের উচিত আহতদের সংগঠনগুলোর সঙ্গে বসে একটি কার্যকর পরিকল্পনা করা, যাতে শহীদ ও আহতদের পরিবার দ্রুত সহায়তা পায়।

আপনি বলছেন, অনেকগুলো সংগঠন অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ প্লাটফর্মটির বর্তমান অবস্থা কী? এটি কি কার্যকর নাকি অকার্যকর হয়ে পড়েছে?

সংগঠন হিসেবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কার্যকর। এখনো জেলা পর্যায়ের কমিটিগুলোর কার্যক্রম চলছে। তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্লাটফর্মে অনেক ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে। যখন একটি নতুন দল ও ছাত্রসংগঠন গঠনের আলোচনা হয় তখন আমাদের মধ্যে একটি প্রশ্ন আসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্লাটফর্মের কী হবে? যেহেতু একটি দল হচ্ছে—বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্লাটফর্মের একটি সুরাহা করার আহ্বান জানিয়েছিলাম নেতাদের কাছে। নতুন দল ঘোষণা করার বিশাল কর্মযজ্ঞের কারণে তারা অনেক ব্যস্ত ছিল। যেহেতু দল ঘোষণা হয়ে গেছে তাই এ প্লাটফর্ম নিয়ে এখন কাজ করা উচিত। তখন আমরা লক্ষ করলাম, এ প্লাটফর্ম নিয়ে কারো কোনো আগ্রহ নেই। দল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে এ প্লাটফর্মের প্রতি আগ্রহ নষ্ট হয়ে গেল। সম্প্রতি শুনেছিলাম একটি কাউন্সিল হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেটিও আটকে আছে। আমার দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে বলছি, জেলা পর্যায়ে যে কমিটিগুলো গঠন হয়েছে, সেসব কমিটিতে প্রচুর ভালো ও অ্যাকটিভ ছেলে রয়েছে। প্লাটফর্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। জেলা পর্যায়ের অনেক ছাত্র এখন দ্বিধায়—তারা কি দলভুক্ত হবে, নাকি নিরপেক্ষ প্লাটফর্মে থাকবে? এতে মানসিক চাপ ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। যারা দল ঘোষণা করেছে তারা ভেবেছিল জেলা পর্যায়ের কমিটিতে যারা আছে তারা দলে যুক্ত হবে। ছাত্রদের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত নেয়া জরুরি, যাতে তারা আশাহত না হয়। এখন প্রশ্ন হলো, এ প্লাটফর্ম কি টিকে থাকবে, নাকি নতুন দলই মূল সংগঠন হয়ে যাবে?

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা পর্যায়ে কিছু অভিযোগ উঠছে। আপনি বলছেন, মুখপাত্র হিসেবে আপনার কাছে সব তথ্য নেই। এ পরিস্থিতিতে আপনার অবস্থান কী এবং এ প্লাটফর্মের ভবিষ্যৎ কীভাবে দেখছেন?

সরাসরি প্লাটফর্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে মন্তব্য করতে চাই না, তবে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে পারি। আমি মনে করি, জুলাই অভ্যুত্থানের দলিলপত্র তৈরি করা ছাত্রদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু "জুলাই প্রোগ্রাম বাতিল হওয়ায় আমাদের বড় ধাক্কা সামলাতে হয়েছে। নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের পর প্লাটফর্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, ছাত্রদের আকাঙ্ক্ষা ও সংগঠিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা এখনো আছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পুনর্গঠন হওয়া জরুরি। জুলাই নিয়ে যেসব কাজ এখনো হয়নি সেগুলো সম্পন্ন করতে হবে। যারা পদপদবি নিয়ে বেশি ভাবেন, যারা রাষ্ট্রের স্বার্থ চিন্তা করে না, তাদের জন্যই প্লাটফর্মের এ দশা হয়। জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে মানুষের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, সেগুলোকে বাস্তবায়নের জন্য আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। জুলাই অভ্যুত্থান আমাদের সক্ষমতার বাইরে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি সক্ষমতা ছিল, কিন্তু সেটি সঠিকভাবে ব্যবহার হয়নি। তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মতো নতুনভাবে মানুষকে একত্রিত করতে পারব বলে আমি আশাবাদী।

অনেকে মনে করছেন, ছাত্র সংসদ নির্বাচন জরুরি। কিন্তু ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও কেন এ নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়নি? বিশেষত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন কোন দিকে এগোচ্ছে?

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে স্বার্থের দ্বন্দ্বের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন হচ্ছে না। শুধু ডাকসুই নয়, কোনো ছাত্র সংসদ নির্বাচনই হচ্ছে না। সবাই ব্যক্তিস্বার্থকে গুরুত্ব দেয়। বৃহত্তর স্বার্থ গুরুত্ব পায় না। জুলাই আগস্ট অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে বিরাট ঐকবদ্ধ হয়ে গড়ে উঠেছিল। তখন সব ছাত্র সংগঠন একসঙ্গে কাজ করলে এটি গেম চেঞ্জার হতো। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সেই ভূমিকা পালন করতে পারেনি। তবে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হয়। এখন প্রশ্ন হলো, ছাত্র সংগঠনগুলো কি ঐক্যবদ্ধ হয়ে নির্বাচন এগিয়ে নিতে পারবে, নাকি রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে এটি আরো পিছিয়ে যাবে? সরকারের পক্ষ থেকে নির্বাচনের বিষয়ে মৌন সম্মতি দেয়া হয়েছে এবং প্রশাসনও নির্বাচন আয়োজনের চেষ্টা চালাচ্ছে।

তবে রাজনৈতিক চাপ এখানে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি চাই না, শুধু কোনো রাজনৈতিক দলকে খুশি করার জন্য ছাত্র সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে বিলম্বিত করা হোক। যদি রাজনৈতিক চাপের কারণে নির্বাচন পিছিয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে ডাকসু বা অন্যান্য ছাত্র সংসদ আদৌ কার্যকর থাকবে কিনা—এটি নিয়ে বড় আশঙ্কা তৈরি হবে।

অভ্যুত্থানের নারীদের ভূমিকা অবিস্মরণীয়। অভ্যুত্থানের পর দেখা যাচ্ছে নারীরা ঘরে ফিরে যাচ্ছে। আপনিসহ অসংখ্য নারী নেত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রলের মাধ্যমে হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। এটি কেন ঘটছে এবং কীভাবে তা মোকাবেলা করছেন?

জুলাই অভ্যুত্থানে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সব সময় দেখেছি, নারীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ নিয়ে নানা বাধা তৈরি করা হয়। যেসব নারী রাজনীতিতে আসেন তাদেরকে নানা ফ্রেমওয়ার্কে বেঁধে ফেলা হয়। বলা হয়, নারীরা রাজনীতি বোঝেন না, তাদের শুধু ঘর-সংসার নিয়েই ভাবতে হবে। কিন্তু জুলাই আন্দোলন নারীদের প্রতিটি বাধা বা ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে। কোটাবিরোধী আন্দোলনে হাজার হাজার নারী সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন, এমনকি সংখ্যায় ছেলেদের থেকেও বেশি। এটি নির্দেশ করে যে মেয়েদের নিজস্ব একটি রাজনৈতিক ভাবনা আছে। কিন্তু এর প্রতিনিধিত্ব নেই। যখনই নারীদের অধিকারের কথা ভাবব, নারী-সম্পর্কিত কিছু অধিকারের কথা চলে আসে। তারা যে রাজনীতি কিংবা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে ভাবতে পারে বা দেশের রাজনীতি নিয়ে ভাবতে পারে—এ বিষয়গুলো রাজনীতির মূল ধারায় প্রাধান্য পায়নি। যখন কোনো নারী নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলে তখন তাকে নারীবাদী ট্যাগ দেয়া হয়, আবার যখন দেশের রাজনীতি কথা বলে তখন তাকে বেশি কথা বলার ট্যাগ দেয়া হয়। সমাজে অনেক ধরনের স্তর আছে। তাই এসব ট্যাগ দেয়ার মানসিকতা থাকবেই। এসব বিষয় আমাদের মোকাবেলা করেই রাজনীতি করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাইবার বুলিংকে পাত্তা দেয়া যাবে না। সাইবার বুলিং ও হ্যারাসমেন্টের বিরুদ্ধে সরকারের উচিত কঠোর আইন তৈরি করা। বর্তমানে সাইবার নিরাপত্তা আইনবিরোধী মত দমনে বেশি ব্যবহৃত হয়, কিন্তু নারীদের সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এটি কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে না। পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদি বিষয়। তবে ধীরে ধীরে নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ আরো বিস্তৃত ও শক্তিশালী হবে।

আমরা যদি সঠিক আইন ও সামাজিক সমর্থন নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে নারীরা আরো বেশি সামনে আসতে পারবেন এবং রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন। এটাই আমাদের পরবর্তী লক্ষ্য হওয়া উচিত।

অন্তর্বর্তী সরকারে তিনজন ছাত্র প্রতিনিধি উপদেষ্টা হয়েছেন। অনেকেই এ প্রশ্ন এখনো করছেন, কোনো নারী শিক্ষার্থী প্রতিনিধিত্ব নেই কেন?

মেয়েদের মধ্য থেকে উপদেষ্টা হতেই হবে—এ রকম কোনো আগ্রহ ছিল না। উপদেষ্টা হওয়ার মধ্য দিয়ে মেয়েদের গুরুত্ব বাড়াতে হবে সেটি আমার কাছে বোধগম্য নয়। ছাত্রদের মধ্য থেকে যে তিনজন উপদেষ্টা হয়েছেন তাদের আন্দোলনে ভালো ভূমিকা ছিল। সবাই তাদের ভূমিকা সম্পর্কে অবগত। নারী-পুরুষের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে বিভাজন তৈরি করা জরুরি নয়। অভ্যুত্থানের পর নারীদের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে অনেকে জায়গায় ঘাটতি দেখেছি। সরকার ও ছাত্র নেতৃত্বের কাছে নারী বিষয়টি ডিল হওয়া জরুরি। আমি কোথায় প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছি সেটি অপ্রয়োজনীয়। একজন নারী সামনে গেলে বাকি নারীদের সমস্যার সমাধান হয় না। নারীরা রাস্তাঘাটে উত্ত্যক্ত হচ্ছে কিংবা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। সাইবার বুলিং বা ধর্ষণের শিকার কিংবা উত্ত্যক্তর বিষয়গুলোয় সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ দরকার। সঠিক নীতি ও পরিকল্পনার মাধ্যমে নারীদের প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণ আরো বিস্তৃত হবে।