ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান। পিএইচডি করেছেন জনবিজ্ঞান বিষয়ে চীনের পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এবং পোস্টডক্টরেট করেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য বিষয়ে কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। জনবিজ্ঞান পাঠ ও গবেষণায় কৃতিত্বপূর্ণ ফলের জন্য ‘ফার্স্ট প্রাইজ অব একাডেমিক এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আর গ্লোবাল হেলথ কাউন্সিল (ইউএসএ) কর্তৃক তিনি ‘নিক সাইমন্স স্কলার’ নির্বাচিত হয়েছিলেন জনস্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণার জন্য। জেন-জি জেনারেশন ও গণ-অভ্যুত্থান, চাকরিতে কোটার বণ্টন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের করণীয় প্রসঙ্গে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবরিনা স্বর্ণা

গণ-অভ্যুত্থানের কেন্দ্রে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের নেতৃত্বে ছিল জেনারেশন জেড যারা জেন-জি নামে সুপরিচিত। এতদিন যাদের একটি অজ্ঞ, প্রযুক্তি আসক্ত এবং বাস্তবতাবিবর্জিত প্রজন্ম বলা হতো। তবে বর্তমানে এ ধারণা পরিবর্তিত হয়েছে। এ জেনারেশন নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী?

আপনি যে পরিবর্তনের কথা বলেছেন সেটি কোনো সাধারণ পরিবর্তন নয়, এটি একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক—এক অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থান। এ গণ-অভ্যুত্থানের মূলে রয়েছে আমাদের তরুণ প্রজন্ম, যাদেরকে আমরা জেনারেশন জেড বা জেন-জি বলে অভিহিত করছি। এ জেনারেশনকে আসলে বোঝার ব্যাপার রয়েছে যে এরা আসলে কারা? বয়সের হিসাবে যারা ৯-২৪ বছরের মধ্যে বা যাদের জন্ম হয়েছে ১৯৯৭-২০১২ সাল পর্যন্ত, ধরে নেয়া হয় তারাই জেন-জি। প্রতিটি জেনারেশনকেই চিহ্নিত করার কতগুলো বৈশিষ্ট্যগত মাত্রা থাকে, যেমন থাকে সংখ্যা বা পরিমাণগত তেমনি থাকে গুণগত। গুণগত দৃষ্টিতে এ জেনারেশনের তিনটি বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়।

প্রথমত, এরা সৃজনশীল বা নতুনের প্রতি আকৃষ্ট; নতুন পথ তৈরি করতে চায়। আর এটি করতে গেলে নতুন চিন্তা, ভাবনা, ধারণা ও পরিবর্তনের বাহক হওয়া লাগে। এ জেনারেশনের প্রাথমিক ও গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো তারা সৃজনশীল ও পরিবর্তনকামী। দ্বিতীয়ত, এ প্রজন্ম উন্মুক্ত মননের অধিকারী। বর্তমানে যে পরিবর্তিত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আমরা বিরাজ করছি সেক্ষেত্রে এ বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে আমাদের এ তরুণরাও তাল মিলিয়ে চলছে। ফলে, তাদের মনের বিস্তৃতির ওপর ভিত্তি করে তারা ভালোকে গ্রহণ করছে আবার মন্দকে বর্জন করছে। সুতরাং এ প্রজন্মের মধ্যে ভালোমন্দেরও একটা বিচারবোধ আছে। তৃতীয়ত, এ প্রজন্ম বেশ সংবেদনশীল। ঘটে যাওয়া গণ-অভ্যুত্থানই এর উৎকৃষ্ট নজির। যেখানে বিগত সরকারের দায়িত্বশীল উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ থেকে উচ্চারিত কিছু শব্দচয়ন তাদের সংবেদনশীলতার জায়গাগুলোয় আঘাত করলে প্রতিক্রিয়ায় পুরো আন্দোলনটি অধিকতর ও দ্রুত বেগবান হয়ে উঠেছিল। এখানে বিগত সরকার এ তরুণ প্রজন্মের অনুভূতির গুরুত্ব বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল বা বোঝার মতো সক্ষমতা না থাকার ফলেই তাদের পতন ত্বরান্বিত হয়েছে বলে আমি মনে করি।

আমি এ জেন-জি জেনারেশন নিয়ে বেশ আশাবাদী। মোটাদাগে এ সব গুণগত বৈশিষ্ট্যকে বিবেচনায় নিয়ে এ তরুণ-যুবা জনগোষ্ঠীর উপযোগী একটি ভবিষ্যৎ রূপকল্প তৈরি করলে তা ফলপ্রসূ হবে বলে মনে করি। 

কেমন হতে পারে সেই রূপকল্প?

এজন্য শুরুতেই জনমিতিক রূপান্তর মডেলের আলোকে তাদের সংখ্যাগত পরিমাণও লক্ষ্য করতে হবে। দেশে জনসংখ্যার কাঠামোতে তরুণ-যুবা জনসংখ্যার আকার কেমন, কর্মক্ষম জনসংখ্যার আকার কেমন—এ রকম জনসংখ্যার উপাদানগুলোর আনুপাতিক বন্টনে দৃষ্টিপাত করা যেতে পারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ১০ বছর থেকে ২৪ বছর বয়স গোষ্ঠীকে বিবেচনায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জনশুমারি ও গৃহগণনা-২০২২-এর উপাত্তের ভিত্তিতে প্রায় পাঁচ কোটির মতো জনসংখ্যা রয়েছে যারা এ বয়সী বা জেন-জি জেনারেশনের অন্তর্ভুক্ত। আবার বিবিএসের শ্রম জরিপে ‘যুবা’ বলতে ১৫-২৯ বছর বয়সীদের বিবেচনা করা হয়। ফলে আমরা যদি ১০-২৯ বছর বয়স বিবেচনা করি তাহলে ছয় কোটিরও বেশি মানুষ রয়েছে। জনবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এ জেন-জি প্রজন্ম আমাদের দেশে একটি বড় সংখ্যা। পৃথিবীতে এমন অনেক দেশ রয়েছে যাদের মোট জনগোষ্ঠীর পরিমাণও এত নয়। এরা বেশ সম্ভাবনাময় একটি প্রজন্ম। সেই সম্ভাবনার স্ফুরণে তারা একটি গণবিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছে। ফলে দেশ কাঙ্ক্ষিত দেশ রূপান্তরের এ রূপকল্পে তাদের আশা-চাহিদার প্রতিফলন রূপকল্পে থাকতে হবে। এক্ষেত্রে তাদের কর্মসংস্থান জোগানকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিতে হবে। সব ক্ষেত্রে প্রতিটি নাগরিকের সুরক্ষা, সাম্য ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। সঠিক নীতি-পরিকল্পনা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে মেরামত করতে হবে। তরুণ-যুবাদের সঠিক ব্যবহারে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অর্জনের সর্বোচ্চ সুবিধাকে কাজে লাগাতে হবে। তবে এ বিশাল জেন-জি জনগোষ্ঠীর সঠিক ব্যবহার একটি বড় চ্যালেঞ্জও বটে।

কী সেই চ্যালেঞ্জ? 

বাংলাদেশ এখন জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর মানে এটি নয় যে আমরা এ সুবিধা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারছি। এক্ষেত্রে আমরা এখন একটি অনুকূল পরিবেশের মধ্যে রয়েছি। এক্ষেত্রে চিন্তার বিষয় হলো অনুকূল পরিবেশে থাকা তরুণ-যুবা প্রজন্মটিকে আমরা কীভাবে ব্যবহার করছি এবং কীভাবে করব? কারণ তাদের যথার্থ উপায়ে ব্যবহারের ওপরই নির্ভর করছে জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের বিষয়টি। এ কথা বলার কারণ হলো দেশে ১৫-২৯ বছর বয়সী যুবারা মোট জনসংখ্যার ২৮ শতাংশ। এদের মধ্যে শিক্ষা, কাজ বা প্রশিক্ষণ—এর কোনোটিতেই নেই তা প্রায় ৪০ শতাংশ যা বিবিএসেরই পরিসংখ্যানেই লক্ষণীয়। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার সবচেয়ে নিষ্ক্রিয় অংশটি  যুবা সম্প্রদায়েরই বৃহৎ একটি অংশ। ফলে এ তরুণ প্রজন্মের মানুষগুলো যদি যথাযথ শিক্ষা না পায়, কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, সঠিক প্রশিক্ষণ না পায় তাহলে জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জন করা আমাদের জন্য দুরূহ হয়ে দাঁড়াবে। শ্রমশক্তি জরিপের সর্বশেষ (২০২২) তথ্যানুযায়ী আমাদের মোট বেকারত্বের হার কমলেও যুব বেকারত্বের হার দিন দিন বেড়েই চলেছে যা এখন দেশের মোট বেকারত্ব হারের দ্বিগুণেরও বেশি। আবার যদি আমরা ১০-২৪ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে লক্ষ্য করি তাহলে দেখা যাচ্ছে যে ১০ শতাংশেরও বেশি মানুষ এক্ষেত্রে বেকার। তার মানে দেশে মোট বেকারত্বের হার কমলেও যুব বেকারত্বের হার বাড়ছে এবং সেটির সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশে আমরা কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারছি না।

তীব্র আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকার পতনের আগে কোটার পুনর্বণ্টন করেছে। তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বিবেচনায় কি মনে হয় ওই বণ্টন যথাযথ হয়েছে? 

আগের কোটা বণ্টন ব্যবস্থা কোনোভাবেই যথাযথ ছিল না। প্রতিনিধিত্বশীল জনসংখ্যার অনুপাতে ও প্রতিনিধিত্বে বণ্টন ও সমতা রক্ষিত হয়নি। কোটাভিত্তিক ও কোটাবিহীন অনুপাতের মধ্যে যে বিভাজন সেটা কোনোভাবেই যৌক্তিক ও ন্যায়সংগত ছিল না। এর পেছনে অনেক কারণ রয়েছে, যেমন—আমাদের দেশে কর্মক্ষম জনসংখ্যার যে আকার অনেক বড় কিন্তু কাজের সুযোগ কম। সুতরাং সে অনুপাত বজায় রেখে সীমিত পরিসরে কোটার ব্যবস্থা রাখা উচিত ছিল এবং ওই দায়িত্বটি একটি কমিশনের অধীনে রাখা উচিত ছিল যে কমিশন প্রতি পাঁচ বা ১০ বছর পরপর কোটার বিষয়টিকে মূল্যায়ন ও পরিবীক্ষণ করবে। কারণ জনসংখ্যার কাঠামো পরিবর্তন ঘটে।  একাত্তরে আমাদের যে জনসংখ্যা ছিল তা ক্রমান্বয়ে বেড়েছে জনসংখ্যার কাঠামো ও উপাদানে তাৎপর্যময়  পরিবর্তন ঘটে গেছে। মুক্তিযোদ্ধার কোটাসহ সব মিলিয়ে যত ধরনের কোটা ছিল সবই পুনর্বণ্টন করার প্রয়োজন ছিল। সেটি বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনও করতে পারত, প্রয়োজনে একটি আলাদা কমিশনও গঠন করা যেত। সেখানে প্রতিনিধিত্বশীল বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আলোচনা করার দরকার ছিল, অংশীদার বিভিন্ন পক্ষের মতামত নিতে পারত। সে রকম কোনো কিছুরই উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি। ফলে বৈষম্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও দুর্নীতির মতো ভয়াবহ ব্যাপারগুলো। এ সবকিছুই সংবেদনশীল তরুণ প্রজন্মকে আহত করেছে। যে কারণে তারা আন্দোলনে এসেছে, যৌক্তিক সংস্কার চেয়েছে। এক্ষেত্রে আমি মনে করি যৌক্তিকতা হল প্রতিনিধিত্বশীল জনসংখ্যার অনুপাতের ভিত্তিতে নিয়োগ। যাই হোক, শেখ হাসিনা সরকার আদালতের নির্দেশনায় যে বণ্টন করেছিল, সেটি এখনো পুনঃপর্যালোচনা করার সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি।  

যদিও যে সংস্কারটি হয়েছে সেটিকে সাধুবাদ জানাই এবং এটি প্রশংসার দাবিদারও বটে। তবে এটিকে আরো প্রতিনিধিত্বশীল করার জন্য কোনো সুরক্ষাহীন জনগোষ্ঠী যেন বাদ না যায় বা যথাযথ হয় সেদিকেও দৃষ্টি দিতে হবে। নারী, প্রতিবন্ধী ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে জনসংখ্যার পরিমাণগত ও গুণগত উপাত্তের ভিত্তির ওপর নির্ভর করে তা পুনর্বণ্টন হওয়া দরকার। 

নারী কোটা নিয়ে দুই ধরনের মতামত বিদ্যমান, কেউ বলছেন নারীরা অনেক এগিয়েছে তাই এ কোটার প্রয়োজন নেই। আবার কেউ কেউ বলছেন, বিবেচনা করার প্রয়োজন রয়েছে। আপনি কোন পক্ষে মত দেবেন?

বর্তমানে নারীরা শিক্ষায় অনেক এগিয়েছে এটি ইতিবাচক হলেও শ্রমবাজারের চিত্রটি আলাদা। সরকারের সর্বশেষ (২০২২) শ্রমশক্তি জরিপটি যদি দেখি, শুরুর দিকে যে তরুণ জনগোষ্ঠী নিয়ে আলোচনা করেছি, যারা শিক্ষা, কর্ম ও প্রশিক্ষণ থেকে বঞ্চিত তাদের সিংহভাগই কিন্তু নারী। মোট বঞ্চিত তরুণদের ৬০ শতাংশই নারী জনগোষ্ঠী। আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারেও পুরুষের তুলনায় নারীর অংশগ্রহণের পরিমাণ এখনো অনেক কম, এমনকি সামগ্রিক শ্রমবাজারের চিত্রেও নারীরা পুরুষের অর্ধেকের মতো। এর পেছনে আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক বা কাঠামোগত বিষয় জড়িত রয়েছে। কারণ নারীদের জন্য শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে পারিবারিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিষয় ছাড়াও আরো অনেক বিষয়ও প্রাসঙ্গিক। এখানো আমাদের সমাজ পুরোপরি অনুকূল হয়ে ওঠেনি নারীর জন্য। যদিও শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে বলা হচ্ছে কিন্তু দেখা যাচ্ছে শ্রম-অংশীদারত্বের নানা পরিমাপক ও সূচকে তারা এখনো কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছতে পারেনি। সেজন্য আমি মনে করি না এখনই নারীকে পুরোপুরি নারী কোটা থেকে বাদ দেয়া সমীচীন হয়েছে।

আদিবাসী কোটা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে? 

আদিবাসী মানুষের আনুপাতিক হার কত, আগে কত ছিল, এখন কত আছে এবং তা সঠিক পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে কিনা সেসব অনুসন্ধানের প্রয়োজন আছে। সর্বশেষ জনশুমারি (২০২২) অনুযায়ী ৫০টি নৃগোষ্ঠী তালিকাভুক্ত রয়েছে। এদের মধ্যে কারা বেশি এগিয়ে এবং কারা বেশি পিছিয়ে আছে তা জানতে হবে। এসব পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করতে হবে। আমি মনে করি বিদ্যমান কোটা বণ্টন বা সংস্কার পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ রয়েছে এবং সেটি জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্বশীলতাকে কেন্দ্র করে করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে আনুপাতিক সমতা রক্ষা করা সম্ভব হবে। 

কৌশলটি গ্রহণ করার ক্ষেত্রে নতুন সরকার কোন কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে?

বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আদালত থেকে কোটা সংক্রান্ত রায় বিবেচনায় নিয়ে পুনরায় পর্যালোচনা করতে এবং আগেও বলেছি বিভিন্ন অংশীজনের মতামত বিবেচনায় নিতে পারে। আবার যেহেতু এ সরকারের সময়কাল কতদিন সেটি নিশ্চিত না, তাদের উচিত একটি কমিশন গঠন ও এর রূপরেখা তৈরি করে যাওয়া। এক্ষেত্রে প্রতি পাঁচ বা ১০ বছর পর পর সেই কমিশন কোটা পর্যালোচনা ও পরিবীক্ষণ করে জনমিতিক আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংগতি স্থাপন করতে পারে।  কমিশন এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সুপারিশও করতে পারে যা পরবর্তী সময়ে সরকারগুলো অনুসরণ করবে। নির্বাচিত সরকারের এক ধরনের দায়বদ্ধতা রয়েছে। ফলে তারা পারবেন আইন তৈরি বা সংশোধন করতে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এক্ষেত্রে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারে। আর যারা নির্বাচিত হয়ে আসবেন তারা তো দেশের মঙ্গলের জন্যই কাজ করবেন। সেক্ষেত্রে তাদের সামনে যদি ভালো কোনো উদাহরণ থাকে সেক্ষেত্রে তাদের কাজটাও সহজ হয়ে যাবে। আমি মনে করি যেকোনো যোগ্য নেতৃত্বের উচিত হবে এটিকে উৎসাহিত করা। 

বর্তমানে বেশি আলোচিত বিষয় রাষ্ট্র সংস্কার। যদিও দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ এটি তবুও স্বল্প সময়ের ভিত্তিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কোন বিষয়গুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সংস্কার করা উচিত?

এক্ষেত্রে দুটি পক্ষের কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে যারা সরকার গঠন করেছেন এবং যারা গঠিত সরকারে সরাসরি অংশগ্রহণ না করেও এ সরকারের অংশীজন হিসেবে রয়েছেন। অংশীজনদের দিক থেকে অগ্রাধিকারমূলক জায়গাগুলোয় কাজ করার জন্য সরকারকে চাপ দিতে হবে। সরকারের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই সংস্কার আনতে হবে। বিদ্যমান জননীতি ও পরিকল্পনাগুলোকে যুগোপযোগী এবং হালনাগাদ করতে হবে। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমি বলব বর্তমানে আর্থিক খাত বেশ প্রতিকূল সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং দায়িত্বশীল জায়গাগুলোয় সৎ, যোগ্য ও দেশের প্রতি দায়বদ্ধ মানুষকে আনতে হবে। অতীতে আমরা দেখেছি দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সবসময়ই তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে যে কারণে বর্তমানে এমন একটি পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতি একটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ চাকা, সেজন্য আর্থিক খাতগুলোয় সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও স্বচ্ছতার সঙ্গে নীতিমালা প্রণয়ন এবং পরিচালিত করা উচিত। দ্বিতীয়ত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে গভীর সংস্কার প্রয়োজন এবং এ খাত দুটিতে বিশেষ সংস্কারের জন্যও আমাদের যোগ্য নেতৃত্বের প্রয়োজন। সরকারের বিনিয়োগ  বাড়াতে হবে। দেখা যায়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে সাধারণত প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ করা হয় না বা বিদ্যমান বাজেটের যথাযথ বাস্তবায়ন হয় না। গবেষণা, শিক্ষা সরঞ্জাম উন্নয়নে কিংবা মানবসম্পদ উন্নয়নে কোনো সরকারই তেমন বিনিয়োগ করেনি অথচ দেশ জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের সময়কাল পার করে যাচ্ছে। একই কথা স্বাস্থ্য খাতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। একটি দেশে মানব পুঁজি তৈরির জন্য এ দুই খাত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তৃতীয়ত, সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও কমিশনকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনয়ন ও পরিকল্পনার সঠিক বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার প্রদান। এক্ষেত্রে গুণগত উপাত্তের অপরিহার্যটা অনস্বীকার্য যেখানে আমি বেশ ঘাটতি লক্ষ্য করি। 

এছাড়া বর্তমান সরকারের কাজ হবে ন্যায় ও সততাভিত্তিক সমাজ তৈরি ও সুশাসন নিশ্চিত করা। দায়িত্বশীল সঠিক ভূমিকা যারা পালন করবে—এমন মানুষ খুঁজে বের করে নেতৃত্বে বসানো। কারণ নেতৃত্বে যদি সঠিক মানুষ আসতে পারে আর তারা যদি সৎ থাকে ও দায়িত্ব পালনে সদা অবিচল থাকে তাহলে ভেঙে পড়া  প্রতিষ্ঠানগুলো ভালোভাবে কার্যকর হবে। সততার সংস্কৃতি তৈরি হবে। পাশাপাশি অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে জনগুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোয় বিদ্যমান জনবল ঘাটতি পূরণ করতে হবে। নয়তো জনগণ যথাযথ সেবা পাবে না। তার মানে এ নয় এখনই সব ঠিক হয়ে যাবে, অন্তত এভাবে সূচনাটা করা যায়। তবে শুধু সরকারের ওপর একপাক্ষিক দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে চলবে না। সরকারকে পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। মনে রাখতে হবে আমরা এমন একটি ক্রান্তিকালে রয়েছি সরকারকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করতে হবে। তারা আমাদের মঙ্গলের জন্য এসেছেন। আমরা আর কোনো নৈরাজ্য দেখতে চাই না। উত্তরণের পথে অগ্রসর হতে হবে।  এ দেশে আর যেন স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামোর উদ্ভব না হয় সেজন্য সুশাসিত রাজনৈতিক বন্দোবস্ত থাকতে হবে, যে ব্যবস্থাপনায় আমরা সবাই থাকব অংশীদার এবং দায়বদ্ধ। জীবনের গুণগত উন্নয়নই হবে আমাদের মূল লক্ষ্য। ফলে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে জনসংখ্যা, মানুষের অধিকার ও পছন্দ। আমি মনে করি, এ অভ্যুত্থান থেকে প্রাপ্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা এটিই হতে পারে।