গত বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ দিন সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ২৯৯টি আসনে ভোটাররা ভোট দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্য অনুযায়ী, এ নির্বাচনে মোট ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ ভোট পড়েছে। এতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। আর নতুন বাংলাদেশের রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে আয়োজিত গণভোটে মোট ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। এর মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ এবং ‘না’ ভোট পড়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭। অর্থাৎ গণভোটে বড় জয় পেয়েছে সংস্কার ‘হ্যাঁ’ পক্ষ।

এদিকে গতকাল ২৯৭ আসনের চূড়ান্ত ফলাফল জানা গেলেও তার গেজেট প্রকাশ করা হয়নি। আশাকরি শিগগিরই গেজেট প্রকাশ করবে নির্বাচন কমিশন। তারপর শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর ও দ্রুত সংসদ কার্যকর হওয়ার অপেক্ষায় পুরো দেশ।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে গঠন করা অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম গুরুদায়িত্ব ছিল একটি নির্বাচন আয়োজনের। জাতিকে একটি সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সরকার ও ইসি উভয়ই প্রশংসার দাবিদার। বিচ্ছিন্ন কয়েকটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ছাড়া ভোটগ্রহণকালে কোনো বড় ধরনের সহিংস ঘটনা দেখা যায়নি। এক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয় উপস্থিতি বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কেন্দ্রে গিয়েছেন এবং ভোট দিয়েছেন। এখন প্রয়োজন দ্রুত নির্বাচিতদের শপথ পাঠ করিয়ে তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে প্রায় দেড় বছর ধরে অকার্যকর পড়ে থাকা সংসদকের কার্যক্রম চালু করা।

দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর সবসময়ই এক ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। নির্বাচন শেষ হওয়ার পর পরই রাষ্ট্র পরিচালনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, প্রশাসনিক শূন্যতা দূর করা এবং জনগণের প্রত্যাশাকে সম্মান করা—এ তিন বিষয়ের ওপরই নির্ভর করে একটি নতুন সরকারের গ্রহণযোগ্যতা ও ভবিষ্যৎ পথচলা। এ বাস্তবতায় শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত করা এবং অনতিবিলম্বে সংসদ কার্যকর হওয়া বর্তমানে সবচেয়ে বেশি জরুরি দাবি। এছাড়া এবারের নির্বাচনে জনগণ কেবল প্রতিনিধি নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার ভবিষ্যৎ কাঠামোও নির্ধারণ করেছে। তারা গণভোটের পক্ষে রায় দিয়েছেন। সংসদ কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথেও দেশ এক ধাপ এগিয়ে যাবে।

শান্তিপূর্ণ ও স্বতঃস্ফূর্ত পরিবেশে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হলেও নির্বাচন চলাকালে কিছু সহিংসতার সৃষ্টি হয়েছিল। ক্ষমতা হস্তান্তর ঘিরে যেন এ ধরনের কোনো ঘটনা না ঘটে সে বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সজাগ থাকতে হবে। এরই মধ্যে দেশের বেশ কয়েকটি জেলায় নির্বাচন-পরবর্তী সংঘর্ষে অন্তত অর্ধশত ব্যক্তি আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। সুতরাং অবশ্যই নির্বাচিতদের শপথ পাঠ ও সংসদ কার্যকর হওয়া পর্যন্ত আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অন্তর্বর্তী সরকার ও ইসিকে সচেষ্ট থাকতে হবে। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক দলের নেতৃস্থানীয়দেরও এক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। নিজস্ব দলের মধ্যে যেন সহনশীল পরিবেশ বজায় থাকে তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে দেখা গেছে, নির্বাচন-পরবর্তী সময়টিই সবচেয়ে সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। পক্ষ ও প্রতিপক্ষ, সমর্থক গোষ্ঠীদের মধ্যে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় এবং তারা একে অন্যের প্রতি সহিংস হয়ে ওঠে, যা মোটেও কাম্য না। এমন ধারা অব্যাহত থাকলে তার রেশ পরবর্তী সময়েও থাকার শঙ্কা রয়েছে। এতে রাজনৈতিক, আর্থসামাজিক অস্থিতিশীলতা আরো বাড়বে বৈ কমবে না। নবনির্বাচিত সরকারের জন্যও এটি চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।

নির্বাচনে এক পক্ষ জয়ী হবে, অন্য পক্ষ পরাজিত হবে এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। জয়-পরাজয় মেনে নেয়া গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। মনে রাখা প্রয়োজন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে জনগণ রাজপথে নেমেছিল দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে। সেই প্রক্রিয়া আর কোনোভাবেই ব্যাহত হতে দেয়া যাবে না।

আর নির্বাচনে পরাজিত হওয়াই শেষ কথা নয়। বরং সংসদ কার্যকর হলে সেখানে বিরোধী দলেরও ভূমিকা থাকবে। একটি শক্তিশালী ও কার্যকর বিরোধী দল ছাড়া সংসদ পূর্ণতা পাবে না। সংসদের ভেতরে প্রশ্ন, আলোচনা ও সমালোচনার সুযোগ থাকলেই রাজপথের রাজনীতি সঠিক ধারায় চলে। এ প্রেক্ষাপট বিরোধী দলকে স্মরণে রেখে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর ও কার্যকর সংসদ একে অন্যের পরিপূরক। প্রথমটি রাজনৈতিক সৌজন্য ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিপক্বতার পরীক্ষা, দ্বিতীয়টি গণতান্ত্রিক চর্চার পথ। নতুন সরকার যদি শুরু থেকেই এ দুই বিষয়ে দৃঢ় অবস্থান নেয়, তবে তা দেশ-বিদেশে একটি ইতিবাচক বার্তা পাঠাবে—বাংলাদেশ গণতন্ত্রের পথে ফিরতে চায় এবং সে পথে হাঁটার সক্ষমতাও তার আছে।

তাই সরকারের পাশাপাশি বিজয়ী ও পরাজিত—উভয় পক্ষেরই দায়িত্ব আছে ফলাফল মেনে নেয়া, আইনি ও সাংবিধানিক পথে আপত্তি উত্থাপন করা এবং সহিংসতা পরিহার করা। গণতন্ত্র মানেই সবসময় জয় নয়; কখনো কখনো পরাজয় মেনে নেয়ার মধ্য দিয়েই গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়। একই সঙ্গে নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোরও ভূমিকা রয়েছে—তারা যেন শান্তিপূর্ণ রূপান্তরের পক্ষে জনমত গড়ে তোলে এবং অযাচিত উত্তেজনা ছড়ানো থেকে বিরত থাকে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, এ মুহূর্তে দেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। এর ভিত্তি হলো শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর এবং দ্রুত কার্যকর সংসদ। এ দুইয়ের ব্যর্থতা অতীতে দেশকে বারবার সংকটে ঠেলে দিয়েছে। নতুন করে সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি কাম্য নয়।