দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার বলরামপুর গ্রামের ‘সাহাপাড়া’ খাল পুনঃখননের মাধ্যমে এ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বর্তমান সরকার আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-নালা, খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনা নিয়েছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, কৃষি অর্থনীতির ধরন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব বিবেচনায় নদী ও জলাশয় খননের এ উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।

ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে তিন দিকে উঁচু স্থান ঘেরা ভারত ও মায়ানমারের সীমানা ঘেষে এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত নিচু সমতল ভূমির ভূখণ্ডটি এ বাংলাদেশ। সীমান্তবর্তী অঞ্চল দিয়ে ৫৭টি নদী দেশে প্রবেশ করে ছোট-বড় অসংখ্য নদ-নদীর জন্ম দিয়েছে। এসব নদীর বয়ে যাওয়া পানির শেষ গন্তব্য বঙ্গোপসাগরের নোনা জল। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি এসব নদ-নদী আমাদের জাতীয় অর্থনীতি ও বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের যাপিত জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু যত সময় যাচ্ছে ততই আমাদের সুপেয় পানির সংকট তীব্র হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টি ও প্রবল বন্যার কারণে দেশের অনেক অঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। কিন্তু এ পানি সুপেয় নয়। এর বিপরীতে শুকনো মৌসুমে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে গেছে এবং নদীতে পানির প্রবাহও কমে গেছে। এছাড়া আন্তঃসীমানা নদীগুলো থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়ার বিষয়টিও ভোগাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বা গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণেও জলাশয় বা নদ-নদীর পানি কমে যাচ্ছে।

আন্তঃসীমান্ত নদীগুলো দেশজুড়ে বিস্তৃত নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাধারের এক জটিল নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করেছে। এ প্রাকৃতিক জলাধার একদিকে দেশের কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের ভিত্তি। আবার অন্যদিকে এগুলো মৌসুমভিত্তিক চরম বৈপরীত্যও সৃষ্টি করে। হিমালয়ের পাদদেশ থেকে উৎপন্ন হয়ে বাংলাদেশের নিচু সমতল ভূমির দিকে ছুটে আসা নদীগুলো বিপুল পরিমাণ পলি বয়ে আনে। বছরে এর পরিমাণ প্রায় ১১০ কোটি টন। নদীর স্রোতে বয়ে আনা পলির সিংহভাগ বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়লেও বছরে প্রায় ৪০ কোটি টন পলি দেশের নদ-নদী, খাল, বিল ও প্লাবন ভূমিতে জমা হয়। প্রকৃতির এ কঠিন বাস্তবতা ছাড়াও নদী-খাল-জলাশয় দখল, ভরাট ও ময়লা আবর্জনা ডাম্পিংয়ের ফলে পানি প্রবাহ বা পানি সংরক্ষণ ক্ষমতা কমে যায়। ফলে বর্ষাকালে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হয়ে বন্যা ও জলাবদ্ধতা হচ্ছে। আর শুকনো মৌসুমে পানির স্বল্পতায় সৃষ্টি হচ্ছে নাব্য সংকট। তাতে কৃষিকাজের জন্য প্রয়োজনীয় সেচের পানির অভাব ও পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে।

ওয়ার্ল্ড মিটিওরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউএমও) ২০২৫ সালের জলবায়ু প্রতিবেদনে পৃথিবীর গত ২০ বছরের তাপমাত্রা বাড়ার হারের তথ্য দেয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ১৯৬০-২০১০-এর তুলনায় ২০ বছরে (২০০৫-২৫) গড় তাপমাত্রা বাড়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এর মধ্যে ২০১৫-২৫ সাল পর্যন্ত টানা ১১ বছরকে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণতম বছর হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, গত ১৩ বছরে (২০১২-২৫) সমুদ্রপৃষ্ঠে পানির উচ্চতা বাড়ার হার ছিল বছরে ৪ দশমিক ৭৫ মিলিমিটার। তার পূর্ববর্তী ১৮ বছরে (১৯৯৩-২০১১) এ হার ছিল বছরে ২ দশমিক ৬৫ মিলিমিটার। এসব তথ্য বিবেচনা করে আমাদের অতিসত্বর পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে।

কৃষিতে সেচকাজের জন্য পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, বর্ষাকালে বৃষ্টি ও বন্যার পানি নিষ্কাশন করা, বর্ষার পানি খালে সংরক্ষণ করে শুকনো মৌসুমে সেচসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা এবং পরিবেশের ভারসাম্যসহ জীববৈচিত্র্য রক্ষা করার জন্য নদী-নালা-খালগুলো খনন বা পুনঃখননের উদ্যোগ একটি চলমান প্রক্রিয়া হওয়া উচিত। বর্ষাকালে ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য শহরে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় নগরবাসীর ভোগান্তির চিত্র প্রতি বছরেই দেখা যায়। এর একটি অন্যতম প্রধান কারণ শহর এলাকার খাল দখল ও ভরাট করে অপরিকল্পিতভাবে স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। খালগুলো পলি ও ময়লা-আবর্জনায় পরিপূর্ণ বিধায় পানি নিষ্কাশন হচ্ছে না। শহরের খালগুলো দখলমুক্ত করে পুনঃখননের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশনের প্রবাহ নিশ্চিত করা গেলে বর্ষাকালে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন অনেকাংশে সম্ভব হবে। আর এজন্যই খাল সংরক্ষণ এবং পুনঃখননের মাধ্যমে এর গতিময়তা বয়ে রাখার বিষয়টিকে জোর দিতে হবে। এক্ষেত্রে খাল খনন প্রকল্পটির দীর্ঘমেয়াদি সফলতা একটি বড় ভূমিকা রাখতে পারে। খাল খনন প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি সফলতার জন্য এ মুহূর্তে সমন্বিত পরিকল্পনা এবং যথাযথ কারিগরি পদক্ষেপ বাস্তবায়ন অপরিহার্য। অপরিকল্পিতভাবে খাল খনন করলে তা টেকসই হবে না, বরং অর্থের অপচয় হবে। এজন্যই কারিগরি আঙ্গিকগুলোকে গুরুত্ব দেয়া জরুরি। সেক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া যেতে পারে।

প্রথমত, জরুরি বৈজ্ঞানিক জরিপ, সমন্বিত পরিকল্পনা ও কারিগরি ডিজাইন। যেকোনো খাল খননের আগে সেটির অববাহিকা, মাটির ধরন, পানির প্রবাহের দিক ইত্যাদি বিষয় আমলে নিয়ে কারিগরি ডিজাইন (নকশা) প্রণয়ন করতে হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড, পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা, স্থানীয় সরকার বিভাগ, কৃষি বিভাগ, বন বিভাগ, মৎস্য বিভাগ, সিটি করপোরেশন, পরিবেশ অধিদপ্তর তো বটেই স্থানীয় জনগণকেও এক্ষেত্রে সম্পৃক্ত করতে হবে। এ জরিপের ভিত্তিতে খালের প্রস্থচ্ছেদ ও গভীরতা এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে যেন বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন করতে পারে এবং শুষ্ক মৌসুমেও পানি সংরক্ষণ সম্ভব হয়। খালে নৌযান চলাচলের সম্ভাবনা থাকলে নাব্য বিবেচনায় নিতে হবে। খাল খনন শুরু করলে মাটি পাড়ে রাখা ঠিক হবে না। বরং তা অন্যত্র সরিয়ে ফেলতে হবে। এভাবে বৃষ্টির মৌসুমে বা বন্যার সময় মাটি আবার জলাশয়ে গিয়ে পড়বে না। খালগুলো যেন মূল নদী বা জলাধারের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। পানি নিষ্কাশন বা সংরক্ষণের জন্য খাল ও নদীর সংযোগ স্থলে হাইড্রোলিক স্ট্রাকচার (স্লুইসগেট, রেগুলেটর) এবং পাম্পিং স্টেশন প্রয়োজন হলে তা পরিকল্পনাকালীন সময়েই ডিজাইনে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

খাল খনন পরিকল্পনাকে স্থানীয়ভিত্তিক না করে পুরো অববাহিকা বা অঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করলে নীতি পরিকল্পনা নেয়া অনেক সহজ হবে। ক্ষেত্রবিশেষে খাল খননের প্রয়োজন কতটুকু অথবা খাল খনন করলে কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কিনা সেটিও পরিকল্পনাকালে স্টাডি করতে হবে। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে হাইড্রোলজিক্যাল মডেলিংয়ের সহযোগিতায় পরিকল্পনা ও ডিজাইন প্রণয়ন করতে হবে। ডিজাইন অনুযায়ী খাল খননকাজ নিশ্চিত করতে প্রকল্পগুলোতে যেন ঠিকাদার নিয়োগ ও প্রকৌশলীদের কাজে কোনো ধরনের অনিয়ম না হয়, সেজন্য কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। খাল খননের আগেই অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে খালের সীমানা নির্ধারণ করতে হবে। খালের দুই পাড়ে রাস্তা নির্মাণ (পর্যাপ্ত জায়গা না থাকলে কমপক্ষে হাঁটার রাস্তা) ও সবুজায়ন করলে খাল দখল রোধ ও খালে ময়লা-আবর্জনা ফেলা নিয়ন্ত্রণ করা অনেকাংশে সম্ভব হবে। শুধু খাল দখলমুক্ত বা খনন করলেই হবে না, প্রতি বছর বা নির্দিষ্ট সময় পরপর পুনঃখনন বা রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিং করে পানি প্রবাহের ডিজাইন প্রস্থচ্ছেদ নিশ্চিত করতে হবে।

দেশের পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনাকে এখন আর বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। এজন্য চাই সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। এ প্রেক্ষাপটে নদী-নালা, খাল ও জলাধার খনন বা পুনঃখনন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সমন্বিত পরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিক নকশা এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে এটি কৃষিতে সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, বর্ষার পানি দ্রুত নিষ্কাশন, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে নগর এলাকায় খাল দখল, ভরাট ও দূষণের কারণে যে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়, তা নিরসনে খাল পুনরুদ্ধার কার্যকর সমাধান হতে পারে। পরিকল্পনামাফিক খাল খনন কর্মসূচি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এটি কেবল একটি অবকাঠামোগত উদ্যোগ নয়; বরং দেশের টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণের একটি অপরিহার্য বিনিয়োগ।

ড. মো. আতাউর রহমান: অধ্যাপক, পানিসম্পদ কৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)