মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের এ সংঘাত পরিস্থিতিকে আপনি কীভাবে দেখছেন? এ হামলার উদ্দেশ্য কী ছিল বলে আপনার ধারণা?

উদ্দেশ্যটা বোঝা কঠিন না। আসলে ইরানের ক্ষমতা কাঠামোকে উপড়ে ফেলার চেষ্টা হয়েছে। ৩০ বছর ধরে ইসরায়েল রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা এ স্বপ্নই দেখে আসছেন। এক্ষেত্রে বরাবরই যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ক্ষমতা ও ওয়াশিংটনের প্রভাব খাটানোর প্রবণতা ছিল। নানা কারণেই ইসরায়েল এ কাজটি করতে পেরেছে। আর এ লক্ষ্য সাধনের জন্য মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ভয়াবহ অনেকগুলো সংঘাত তৈরি করেছে তারা। লিবিয়া, সুদান, সোমালিয়া, গাজা, পশ্চিম তীর, লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন এসব দেশে যুদ্ধ হয়েছেই। তবে ইরান সবসময়ই ছিল তাদের বড় লক্ষ্য। এসবই ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ। ওরা যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে আঞ্চলিক সামরিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে সবসময়। আরব ভূখণ্ডকে নানাভাবে দমন করে ইসরায়েলের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ছিল। এভাবে কার্যত রাশিয়া ও চীনের মতো ভৌগোলিক শক্তিকে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার করা থেকে ঠেকানোর চেষ্টাও ভাবনায় আছে। তাই ইরানের ওপর সাম্প্রতিক হামলাটিকে ভূরাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। এখন এটা অবশ্যই ইরানকে পুরোপুরি ধুলোয় মিশিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। কিন্তু এসবই বড় প্রেক্ষাপটের অংশ। সন্দেহ নেই, যুক্তরাষ্ট্র এখনো বৈশ্বিক আধিপত্যবাদী লড়াই চালাচ্ছে। বলা হচ্ছে বিশ্ব বহু মেরুকরণের অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু তার পরও যুক্তরাষ্ট্র তার আধিপত্য ধরে রাখতে চাচ্ছে। অন্তত সার্বিক পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, এগুলো বিশ্বযুদ্ধের অংশ। এ যুদ্ধে লড়াই করছে যুক্তরাষ্ট্র। এমন যুদ্ধ ভেনিজুয়েলায় হয়েছে। কিউবাতেও হয়তো সামনে দেখা যাবে বা এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। এমন চরম সহিংসতা, বেপরোয়া আচরণ, মিথ্যা ও বিভ্রম যদি থাকে তাহলে এর ফল হবে ভয়াবহ। আমার বিশ্বাস, এটি ভালোভাবে শেষ হবে না।

হামলার পর দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতারও মৃত্যু হয়েছে। এরপর ইরানিদের তীব্র প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে। পুরো বিষয়টিকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

এমনিতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর হামলা করার পরও কিন্তু ওমানের মধ্যস্থতায় আলোচনা চলছিল। বলা যায়, অনেকটা নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় এ আলোচনা এগিয়ে গেছে। তার পরও রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল। এ অস্থিরতা একা ইরানের না। গোটা বিশ্বের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাই জটিল। এখানে মেরুকরণে থাকা বিশ্বের দিকে তাকানো যাক। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে এক অসাংবিধানিক শাসন ব্যবস্থায় চলছে—ট্রাম্প ও তার ছোট একটি গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত। কংগ্রেসের কোনো অনুমোদন নেই। কোনো আইনি ভিত্তিও নেই। ইসরায়েল নিজেও গৃহযুদ্ধসদৃশ অবস্থার কাছাকাছি। আরব রাষ্ট্রগুলো অজনপ্রিয়। ইউরোপীয় সরকারগুলোর জনপ্রিয়তাও পড়তির দিকে। এমন এক সময়ে শুরু হলো যুদ্ধ। এ হামলা বা সংঘাত আসলে ভূরাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের উদ্দেশ্যে করা। এটাকে পারমাণবিক হুমকি ভাবলে ভুল হবে। এ হামলা ইরানিদের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকির কারণ হয়নি। উল্টোটা বলতে হয়। সে আঙ্গিকে তাদের প্রতিক্রিয়া ভুল নয়। আমি প্রায়ই ইরানিদের পক্ষে কথা বলি। ভূরাজনৈতিক জটিলতা নিরসনে তারা সবসময়ই প্রস্তুত ছিল। দশ বছর আগে শুধু আলোচনাই নয়, ওরা চুক্তি করতেও রাজি ছিল।

ইরানে টেকসই মার্কিনপন্থী শাসন চাপিয়ে দেয়া অসম্ভব। ১৯৫৩ সালে এমআই৬ ও সিআইএ তা করেছিল, পুলিশি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিল। এখন তা সম্ভব নয়। ইরান ১০ কোটির দেশ, পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাস। দূর থেকে হামলা চালিয়ে দেশ চালানো যায় না। হয়তো কয়েক দিনে বহু মানুষ নিহত হবে, সাফল্যের ঘোষণা আসবে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত সাফল্যের সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। ট্রাম্প নিজেও অত্যন্ত অজনপ্রিয় ও বিভাজন সৃষ্টিকারী নেতা। সামনে নির্বাচন। অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বাড়বে। ট্রাম্প একটি স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়েছেন, যার প্রতিক্রিয়া বহু বছর চলবে। এটি দ্রুত সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে শেষ হবে—এমন ধারণা কল্পনা ছাড়া কিছু নয়। ইরানে পুতুল সরকার বসাতে সফল হবে না ট্রাম্প প্রশাসন।

ইরানে হামলার পর ট্রাম্পের কণ্ঠে কিন্তু ভিন্ন সুর দেখা গেছে। এটিকে অনেকে প্রোপাগান্ডা বলছে। আপনি কীভাবে দেখেন?

প্রোপাগান্ডা অবশ্যই। আর এ বিষয়টা সত্যিই বিস্ময়কর। অনেকটা বিখ্যাত উইজার্ড অব অজ সিনেমার মতো। ফিল্মটার শেষ দৃশ্যে দেখা যায় মহান জাদুকর অজ আসলে এক বৃদ্ধ। পর্দার আড়ালে মাইক্রোফোন হাতে কথা বলছেন। তবে ওই ফিল্মের অন্তিম দৃশ্যের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের প্রচারণার পার্থক্য আছে। এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের সামনে কোনো পর্দা নেই। সেটা সরে গেছে। এই তো কদিন আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান নীতিলক্ষ্য ছিল ইরানের অর্থনীতিকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা এবং ইরানিদের জীবন বিপর্যস্ত করে তোলা। আর এসব নীতিসিদ্ধান্তের পরিকল্পনা প্রয়োগের বিষয়টি তিনি ধাপে ধাপে ব্যাখ্যাও করেছিলেন। গত বছর মার্চে ট্রাম্প ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নির্দেশ দেন। লক্ষ্য ছিল মুদ্রার মান কমানো। ডিসেম্বর নাগাদ তা কার্যকর হয়। ইরানের ব্যাংক কাঠামো ভেঙে পড়ে, ডলার সংকট তৈরি হয়, মুদ্রার পতন ঘটে। অনেক মানুষের জীবনে দুর্ভোগ তৈরি হয় এবং অনেকে সড়কে নেমে প্রতিবাদ শুরু করেন। রুবিও বলেছিলেন, সবকিছু ইতিবাচক দিকে এগোচ্ছে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতিবাদ নয় বরং ইরানের সরকারকে নামানোর পরিকল্পনায় মত্ত ছিল।

tehran_gwGgWo3

তেহরানে বিধ্বস্ত ভবনগুলোর পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক নারী ছবি- রয়টার্স

তারা প্রকাশ্যেই প্রোপাগান্ডা ছড়ায়। আর এতটাই প্রকাশ্যে করে যে বিশ্বাসযোগ্যতার বালাই রাখে না। একটা বয়ান তৈরি করাটাই তাদের কাছে যথেষ্ট। ইরানের সঙ্গে সমঝোতার আলোচনা আসলে ভণিতা। গত বছর আর চলতি বছর, যখনই আলোচনা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র হামলা করেছে। এগুলো পরিকল্পিত আগ্রাসন। আর হামলার যে যুক্তি ট্রাম্প দিয়েছেন, সবই খেলো যুক্তি। যখনই যুক্তরাষ্ট্র এমন সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়ায়, তখন তারা এমন ভাণ করে যে আসলে ঘটনার সঙ্গে জড়িত না। কিন্তু তারা গোপনে সরকার পরিবর্তনের মিশনে নামে। প্রতিবার এমনই হয়। এবার একটু আলাদা। এবার তারা প্রকাশ্যেই আগ্রাসন চালাচ্ছে। সমালোচনাকে তারা পাত্তাই দেয়নি। হয়তো এটি ট্রাম্পের ব্যক্তিগত মানসিকতার বিষয়, হয়তো আধিপত্য পুনঃস্থাপনের তাড়না—কিন্তু এটি গোপন নয়। তার প্রতিটি ব্যাখ্যাই স্বচ্ছ মিথ্যা।

মধ্যপ্রাচ্যে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবিও বলেছিলেন, ইরানের পুরো অঞ্চল ইসরায়েলের নেয়ার অধিকার ঈশ্বর দিয়েছেন। এমনটি আরব বিশ্বের জন্য কেমন হবে?

আরব বিশ্ব অত্যন্ত দুঃখজনক অবস্থায় রয়েছে। ১৫১৭ সাল থেকে অর্থাৎ অটোমান সাম্রাজ্যের সময় থেকেই তারা কার্যত সাম্রাজ্যবাদী শাসনের অধীন। একাধারে অটোমান, ব্রিটিশ এবং বর্তমানে মার্কিন ও ইসরায়েলি প্রভাব এ ভূখণ্ডের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা। তাদের ভূখণ্ডে মার্কিন ঘাঁটি ছড়িয়ে আছে। তারা প্রতিবাদ করতেও সাহস পায় না। এটি বিপজ্জনক ও বেদনাদায়ক বাস্তবতা। এখন গোটা বিশ্বের নিয়ন্ত্রণ মাত্র ৪ শতাংশ লোকের হাতে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল আর পশ্চিমা বিশ্বের একাংশ। মনে রাখা জরুরি, এ ৪ শতাংশ দিয়ে আসলে গোটা বিশ্ব পরিচালনা বা শাসন সম্ভব নয়। একসময় এমন দাবি ব্রিটিশ সাম্রাজ্য করেছিল। এমন দাবির ৫০ বছর পর সে দাপট ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও তাই হবে। এটি শেষ অধ্যায়। অহংকার একই রকম। এটি কার্যত বিশ্বযুদ্ধে রূপ নিতে পারে। পারমাণবিক পর্যায়ে গেলে সেটিই হবে পৃথিবীর সমাপ্তি। এরই মধ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে আন্তঃসংযুক্ত যুদ্ধ চলছে। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব শাসনের সক্ষমতা রাখে না—অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত বা সামরিক কোনো দিক থেকেই নয়। বিশ্বের বাকি অংশও যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে থাকতে চায় না।

সংঘাত থামার ব্যাপারে কোনো আশাবাদের জায়গা দেখছেন কি?

পরিণতির ক্ষেত্রে আশার কথা আসে। ট্রাম্প বা নেতানিয়াহুকে ঘিরে আশা নেই। তবে বিশ্বের অন্য শক্তিগুলোর প্রতি প্রত্যাশা আছে। জাতিসংঘ সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অন্য সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর সামরিক বা অন্য যেকোনো ধরনের বলপ্রয়োগ অবৈধ। ১৯৪৫ সালে এ নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যেন আবারো বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ বাস্তবতা দেখতে না হয়। অধিকাংশ রাষ্ট্র যদি অন্তত এ বিষয়টা অনুধাবন করে একত্র হয় এবং প্রতিবাদ করে, তাহলে আমরা আশা করতেই পারি। ভাবতে পারি যুদ্ধ থামবে। তবে সে আশা ক্ষীণ। তাও প্রত্যাশা রাখতে দোষ নেই। তবে ইউরোপের কাছে কোনো প্রত্যাশা রেখে লাভ নেই। তারা মেরুদণ্ডহীনতার চূড়ান্ত দেখিয়ে ছেড়েছে। এমন কাপুরুষতা আমি আর দেখিনি। কানাডা কিছুটা স্বাধীনতা দেখালেও সার্বিকভাবে তারাও আসলে কার্যকর উদ্যোগ দেখায়নি। অর্থাৎ প্রতিবাদ তীব্র হয়নি। এ সুযোগই নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তারা বেপরোয়াভাবে কর্তৃত্ববাদী আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে। তবে ইরানকে দমিয়ে ফেলা এতটা সহজ হবে না।