রূপরেখায় বলা হয়েছে, ঢাকায় বসবাসরত জনগোষ্ঠীর চাহিদার আলোকে বড় মাঠসহ আরো ৬২৭ ভালো স্কুল প্রয়োজন। এ ভালো স্কুল এবং তার অভ্যন্তরীণ কাঠামোগুলো কীভাবে সাজানো হবে সে ধারণাও ড্যাপে সুস্পষ্টভাবে দেয়া হয়েছে। ড্যাপ প্রণয়নের পর রাজধানীতে উপযুক্ত শিক্ষা অবকাঠামোর ঘাটতি আবারো নতুন করে আলোচনায়। রাজধানীতে ভালো স্কুলগুলো সুষমভাবে অবস্থিত নয়। মানসম্পন্ন স্কুলগুলো নগরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে অবস্থিত। নতুন গড়ে ওঠা স্কুলগুলোর অবকাঠামো নানা জটিলতার কারণে বড় ক্যাম্পাসের স্কুলগুলোর তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। ড্যাপের সুপারিশ অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকায় যেসব প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে সেগুলোকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত উন্নীত করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোও স্কুলের অনুমোদন নেয়ার সময় ড্যাপের সুপারিশগুলো অনুসরণ করতে হবে। আমরা মনে করি, ড্যাপের এ পরিকল্পনা যুগোপযোগী এবং আমাদের বাসযোগ্য নগরীর অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজনা।

প্রতিটি অভিভাবকই চান তার সন্তান যেন উপযুক্ত শিক্ষা এবং বিকাশের পরিপূর্ণ সহযোগিতা পান। আর এ সহযোগিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তারা বিদ্যালয়ের ওপরই বেশি আস্থাবান। তাই বছরের শুরু আর শেষের দিকে অনেক অভিভাবককেই হন্যে হয়ে ভালো অবকাঠামোসম্পন্ন বিদ্যালয় এবং সেখানকার সুযোগ-সুবিধা খুঁজতে দেখা যায়। কিন্তু তা যেন এক বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ ঢাকার সবখানে উপযুক্ত অবকাঠামোর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অপ্রতুল। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের একাধিক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকার সব এলাকায় আধুনিক ও টেকসই অবকাঠামো রয়েছে এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিদ্যালয়গুলো শহরের আধুনিক কিংবা জনপ্রিয় এলাকাগুলোতে অবস্থিত। ড্যাপের তথ্য বলছে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় অবস্থিত কয়েক হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অর্ধেকের বেশির নিজস্ব মাঠ নেই। কিছু বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ম অনুসরণ না করে আবাসিক ভবনে শুধু ‘পাঠদান’ পরিচালনা করে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অবকাঠামোগত এসব সংকটের নেতিবাচক প্রভাব শিক্ষার্থী ছাড়াও অভিভাবকদের জীবনেও পড়ছে। সন্তানকে ভালো ও শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ রয়েছে এমন বিদ্যালয়ে ভর্তি করতে গিয়ে অনেক অভিভাবককে দৈনিক দীর্ঘ দূরত্ব যাতায়াত করতে হচ্ছে। তাতে দৈনিক কর্মঘণ্টার অপচয়ের পাশাপাশি যুক্ত হচ্ছে যাতায়াতের ক্লান্তি। অনেকে যাতায়াতের ভোগান্তি নিরসনে নিজ এলাকা ছেড়ে দূরবর্তী স্থানে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এভাবে যাপিত জীবনের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোও প্রভাবিত হচ্ছে।

রাজধানীসহ বড় শহরে বিদ্যালয়ের সংজ্ঞা অনেকাংশে পাল্টে গেছে। বহুতল ভবন কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে কয়েকটি ফ্ল্যাট নিয়েই যত্রতত্র গড়ে উঠছে বিদ্যালয়। ‘খাঁচাবন্দি’ অবস্থায় শিশুর শিক্ষা ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ বিকাশ এভাবেই ব্যাহত হচ্ছে। বিশ্বের অনেক দেশে শিক্ষা অবকাঠামো শুধু ইমারত বা ইটের ভবন নয়। এটি লার্নিং ল্যান্ডস্কেপ বা শেখার উন্মুক্ত প্রাঙ্গণও বটে। শিক্ষা অবকাঠামোর বিষয়ে যে পরিকল্পনা দর্শন থাকা জরুরি, তা থেকে যেন আমরা ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছি। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার আবাসন চাহিদা মেটাতে গিয়ে বাড়ছে বহুতল ভবন। কিন্তু ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বাসযোগ্যতা কিংবা বিকাশের যে সম্ভাবনা থাকা জরুরি তার কিছুই নিশ্চিত হচ্ছে না। এসবের প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক জীবনের বিকাশে। এক্ষেত্রে শিক্ষা অবকাঠামোর ঘাটতি বেশি চোখে পড়ে। জাতীয় শিক্ষানীতি ও সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য অন্তত ৮ শতাংশ এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জন্য ১২ শতাংশ জমি থাকা বাধ্যতামূলক। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কিছু প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট তদারকি প্রতিষ্ঠানের অসাধুদের সঙ্গে যোগসাজশে নিয়মনীতিকে এড়িয়ে যত্রতত্র স্কুল গড়ে তুলছে। এক্ষেত্রে তদারকি প্রতিষ্ঠানে সুশাসন ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই।

দেশে শহরাঞ্চলে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা খুব বেশি নয়। এমন একটি ধারণা সমাজের মধ্যে প্রচলিত হয়ে গেছে, যে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করে সে বিদ্যালয়গুলোই ভালো। কিন্তু বাস্তব সত্য হচ্ছে, এ ধরনের শিক্ষা দর্শন আমাদের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা ও ন্যায্য নগরের দুর্বলতাই স্পষ্ট করে তোলে। আমরা মনে করি, ড্যাপে যে বিষয়গুলো আলোচনায় এসেছে সেগুলোকে গুরুত্ব দেয়া জরুরি। ঘাটতির জায়গাগুলো যেহেতু চিহ্নিত হয়েছে, সেহেতু অবকাঠামোগত পরিকল্পনা ঢেলে সাজানোর বিষয়ে মনোযোগী হতে হবে।

সুষ্ঠু শিক্ষা অবকাঠামো না থাকার নেতিবাচক প্রভাব কম নয়। পর্যাপ্ত খেলার মাঠ না থাকায় শিশুদের মধ্যে খেলাধুলার চর্চা কমে গেছে। ফলে অল্পবয়সে ডায়াবেটিস, স্থূলতা, হাড়ের দুর্বলতা এমনকি ফুসফুস সংক্রমণের মতো জটিল ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, শিক্ষার পরিবেশ এবং স্বাস্থ্যসম্মত ওয়াশরুম জরুরি। এছাড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্রাম কেন্দ্র, ক্যান্টিন, পাঠাগার, বিনোদন কেন্দ্র, লাইব্রেরি এমনকি আবাসন সুবিধার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। যখন একটি বড় ক্যাম্পাস থাকে তখন এসব সুবিধা নিশ্চিত করা সহজ হয়। শিশুরা তাদের শিক্ষা কার্যক্রমে নানা কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত থাকতে পারে। কিন্তু সংকীর্ণ আবাসিক ভবনে স্কুল গড়ে তোলায় এবং সেখানে উপযুক্ত লাইব্রেরি বা হল না থাকায় শিশুদের স্কুল বিরতির বড় একটি অংশ কাটছে সিঁড়ি বা করিডোরে। এভাবে চারদেয়ালে আটকে থাকায় তাদের মধ্যে ‘ইনডোর সিন্ড্রোমের’ মতো মানসিক জটিলতা তৈরি হচ্ছে। শিশুদের মধ্যে অকারণে সামাজিক ভীতি তৈরি হচ্ছে এবং প্রায়ই তাদের মেজাজ খিটখিটে হচ্ছে। শুধু শারীরিক ও মানসিক সংকটই অবকাঠামোগত দুর্বলতার মূল নেতিবাচক প্রভাব নয়। সংকীর্ণ বিদ্যায়তনে যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা দুর্ঘটনা ব্যবস্থাপনা জটিল এবং ক্ষেত্রবিশেষে ঝুঁকিপূর্ণ। দুর্যোগ বা দুর্ঘটনায় পর্যাপ্ত অ্যাসেম্বলি পয়েন্ট না থাকলে যেকোনো সময় ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা একেবারে অমূলক নয়। তাই যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার সময়ে উপযুক্ত অবকাঠামো নিশ্চিত করার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিতে হবে। নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনুমোদনের ক্ষেত্রে ভূমির শর্তাবলি কোনোভাবেই শিথিল করা চলবে না। যদি স্কুলের সংখ্যা বাড়াতে গিয়ে আমাদের এ শর্তে কাটসাঁট করতে হয়, তাহলে সে পথ অনুসরণ না করাই শ্রেয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে উপযুক্ত অবকাঠামো রয়েছে এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়ানোর বিষয়ে ড্যাপের পরামর্শগুলোকে অনুসরণ করার জোর তাগাদা দিই আমরা।

এবারই প্রথম রাজধানী নগর পরিকল্পনায় স্কুল জোনিং করা হয়েছে। এ বিষয়টিও ইতিবাচক। অর্থাৎ নতুন যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তৈরি হবে সেগুলো যেন এ পরিকল্পনার নিয়মগুলো মেনেই করা হয় সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। আবার বিদ্যমান স্কুলগুলোকেও যথাসম্ভব সংস্কারের চেষ্টা করতে হবে। উন্নত বিশ্বে জাপান, ফিনল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের শিক্ষা অবকাঠামোকে উপস্থাপন করে আমরা প্রায়ই নিজেদের হতাশা প্রকাশ করি। শুধু তুলনা করলে সমাধান হবে না। আমাদের চিহ্নিত সমস্যাগুলোকে সমাধানের বিষয়ে বাড়তি মনোযোগ দিতে হবে। শিশুদের জন্য উপযুক্ত শিক্ষা অবকাঠামো গড়া না গেলে আগামীর প্রজন্ম কেবল মেধাবী রোবট হবে, সুস্থ মানুষ হবে না। তাই অনতিবিলম্বে ড্যাপের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকেই মনোযোগী হতে হবে। এক্ষেত্রে উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে।