যদিও এ বৈঠকে শুল্ক, তাইওয়ান বা ইরান যুদ্ধের মতো চলমান ভূরাজনৈতিক সংঘাত নিয়ে কোনো বড় অগ্রগতির দেখা মেলেনি। ফলে বৈঠকটিকে গুরুত্বহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন পর্যবেক্ষকদের অনেকেই। তবে বৈঠকের সংযত ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ একটি নতুন ও অধিকতর বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে, যেখানে পরোক্ষভাবে দুই দেশের গভীর অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরশীলতা প্রকাশ পেয়েছে। উভয় প্রেসিডেন্টই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বাইরে গিয়েও চিন্তা করেছেন।

চীনকে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া কোনো দুর্বলতা নয়, বরং বাস্তবতাকে মেনে নেয়া। বছরের পর বছর ধরে চীনের উত্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যে বিতর্ক রয়েছে সেটি মোটাদাগে একটা ধারাতেই চলেছে। সেটি হলো অস্বীকার, ক্ষোভ এবং শেষ পর্যন্ত মেনে নেয়া। চীন যখন দুই অংকের প্রবৃদ্ধিতে প্রবেশ করে, সে সময় অনেক মার্কিন বিশ্লেষক চীনের জাতীয় পরিসংখ্যানকে অবিশ্বস্ত বা অতিরঞ্জিত বলে খারিজ করেছিলেন। কিন্তু চীনের অর্থনৈতিক রূপান্তর উপেক্ষা করা কঠিন হয়ে উঠলে দেশটির সাফল্যকে প্রায় শিল্পনীতি অনুকরণ এবং অন্যায্য চর্চার ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। এমনকি এ ধরনের ব্যাখ্যায় মেধাস্বত্ব চুরি ও মুদ্রা কারসাজির অভিযোগকেও জুড়ে দেয়া হয়।

কিন্তু এখন এসব বয়ান প্রচলিত রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ চীন কয়েকটি কৌশলগত শিল্পে প্রযুক্তি ব্যবহারে সামনের সারিতে পৌঁছে গেছে। আরো উল্লেখযোগ্য হলো, চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতারা এখন বৈশ্বিক বাজারের বিভিন্ন স্তরে বড় প্রতিযোগী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে—স্বল্পমূল্যের মডেল থেকে শুরু করে ক্রমেই উন্নত প্রিমিয়াম ব্র্যান্ড পর্যন্ত নির্মাণ করছেন তারা। ওষুধ শিল্পে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো অনুকরণকারী থেকে উদ্ভাবক হয়ে উঠেছে এবং পুরনো ‘ফ্রি রাইডার’ তকমা ঝেড়ে ফেলেছে। সেমিকন্ডাক্টর খাতে চীন উন্নত চিপ উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে, যদিও তারা এখনো টিএসএমসির মতো বৃহত্তম চিপ উৎপাদন প্রতিষ্ঠান থেকে পিছিয়ে রয়েছে।

চীনের এসব ক্ষেত্রের অগ্রগতি কোনো একক নীতি বা শিল্পকৌশল থেকে আসেনি। বরং এটি একটি ব্যাপক রূপান্তরের ফলাফল। তাই চীনের প্রযুক্তিগত উন্নয়নের গতি হ্রাসে মনোযোগ না দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত হবে এটা মেনে নেয়া যে চীনা প্রতিযোগিতা টিকে থাকবে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক সহাবস্থান ও সীমিত সহযোগিতামূলক কাঠামো তৈরিতে মনোনিবেশ করা।

এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হতে পারে চীনা বাজারে মার্কিন প্রতিষ্ঠানের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বেইজিং সফরে যাওয়া প্রভাবশালী মার্কিন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী নেতারা এ বার্তাই দিয়েছেন যে গভীর অর্থনৈতিক সংযোগের যুগ হয়তো শেষের দিকে, কিন্তু সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতাও বাস্তবসম্মত নয়, কাম্যও নয়। এর চেয়ে বেশি বাস্তবসম্মত পথ হলো সুনির্দিষ্টভাবে কিছু ক্ষেত্রে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এবং যেসব খাত উভয় দেশের জন্য লাভজনক, সেগুলোয় সম্পৃক্ততা বজায় রাখা।

অন্যদিকে শি জিনপিং যুক্তরাষ্ট্র-চীনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’ বা ‘থুসিডাইডিস ফাঁদ’-এর কথা উল্লেখ করেছেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গ্রাহাম অ্যালিসন শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেছিলেন এমন পরিস্থিতি বোঝাতে, যখন একটি উদীয়মান শক্তি (থুসিডাইডিস ঘটনায় এথেন্স) প্রতিষ্ঠিত শক্তিকে (স্পার্টা) হটিয়ে দেয়ার মতো ঝুঁকি তৈরি করে এবং প্রায়ই এর পরিণতি হয়ে দাঁড়ায় যুদ্ধ।

তবে এ তুলনা পুরোপুরি যথাযথ নয়। যুক্তরাষ্ট্র নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, যেগুলোর অধিকাংশের উৎপত্তি দেশটির নিজেদের সিদ্ধান্ত থেকে। তবু এখনই যুক্তরাষ্ট্রকে ক্রমেই পরাভূত শক্তি বলা সমীচীন হবে না। এ দেশ এখনো বিশ্বের প্রধান উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা কেন্দ্র, যেখানে গত শতাব্দীর বহু রূপান্তরমূলক প্রযুক্তির উদ্ভাবন হয়েছে—কম্পিউটিং, ইন্টারনেট, স্মার্টফোন থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পর্যন্ত। মেধা সর্বত্রই থাকতে পারে, কিন্তু বৈজ্ঞানিক নেতৃত্ব, গভীর পুঁজিবাজার, উদ্যোক্তাবান্ধব সংস্কৃতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক নমনীয়তার এমন সমন্বয় আর কোনো দেশের নেই। কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগকারী ওয়ারেন বাফেট যেমন বলেছিলেন, ‘১৭৭৬ সালের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে বাজি ধরে কেউ কখনো সফল হয়নি।’

তাছাড়া চীনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এ বাস্তবতাকে আড়াল করতে পারে না যে মাথাপিছু আয়ের বিচারে দেশটি এখনো মধ্যম আয়ের দেশ। বিশাল অর্থনৈতিক পরিসর থাকা সত্ত্বেও গড় জীবনমান এখনো উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় অনেক নিচে। দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার চেষ্টায় দেশটিকে শক্তিশালী কাঠামোগত ও জনমিতিক চাপেরও মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

তার পরও এথেন্স-স্পার্টা তুলনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়, কারণ পেলোপনেশীয় যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষকেই দুর্বল করেছিল। আজকের যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার পরিণতিও এমন হবে না, যদি দুই পরাশক্তি উত্তেজনাকর পরিস্থিতি এড়িয়ে চলে এবং যেসব ক্ষেত্রে পারস্পরিক স্বার্থ রয়েছে সেখানে সহযোগিতার পথ খোলা রাখে।

যুক্তরাষ্ট্র-চীনের সহযোগিতামূলক সম্পর্ক অনেকের কাছে অবাস্তব মনে হতে পারে। কিন্তু ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে যেখানে একসময়ের প্রতিদ্বন্দ্বীরা শেষ পর্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছেছে। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে কেউ যদি বলত এথেন্স ও স্পার্টা একদিন শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করবে, তবে সেটিকে হয়তো সরলতা বা কল্পনা বলে উড়িয়ে দেয়া হতো। কিন্তু প্রাচীন গ্রিসকে বিভক্ত করা সেই তিক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন একটি অভিন্ন জাতীয় ইতিহাসের অংশ। একইভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর খুব কম মানুষই কল্পনা করতে পেরেছিল যে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধ্বংসাত্মক সংঘাতের পর পশ্চিম ইউরোপ এত গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংহতি অর্জন করবে।

সার কথা হলো, বৈশ্বিক ব্যবস্থার শীর্ষে কোনো দেশের অবস্থান এটি বর্তমানে অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নাগরিকদের কল্যাণ কতটা উন্নত করছে এটিই তাৎপর্যপূর্ণ। এ দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন একই ধরনের কিছু অভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে—ক্রমপরিবর্তনশীল প্রযুক্তি সামাল দেয়া, শ্রমবাজার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আলোকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা, আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, সামাজিক সংহতিকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে এমন বৈষম্য দূর করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব রোধে কাজ করা। এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জনের জন্য বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে আরো বেশি সহযোগিতা প্রয়োজন হবে। শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে এসপার-ওসপার প্রতিযোগিতার সামর্থ্য কোনো পক্ষেরই থাকে না।

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ২০২৬]

পিনেলোপি কুজিয়ানু গোল্ডবার্গ: বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ এবং আমেরিকান ইকোনমিক রিভিউর সাবেক সম্পাদক। তিনি বর্তমানে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক।