বাংলাদেশের মানুষ এমন এক জাতি যার জীবন চলে যুদ্ধ করে। যুদ্ধ করতে হয় প্রকৃতির সঙ্গে। যুদ্ধ চলে রোগ, শোক আর চিরশত্রু মানবতাবিবর্জিত মানুষের সঙ্গে। যুদ্ধের তীব্রতায় অটল বিশ্বাস নিয়েই চলে আমাদের বিজয়ের পথে অদম্য যাত্রা। বাংলাদেশের মানুষের শিরা-উপশিরায় অকারণ ভয়, দুর্বলতা আর নির্বোধতার স্থান নেই। নেই কোনো অধীনতার পরম গ্লানি। প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমির জন্য নিজেকে অতি সহজেই উৎসর্গ করার স্পৃহাই যেন আমাদের এত মহৎ করেছে। তবে কিছু যে বিশ্বাসঘাতক মীর-জাফর রয়েছে তারা সর্বদাই সত্যের সঙ্গে লড়াইয়ে গ্লানিযুক্ত পরাজয় বরণ করেছে।

একবার চোখ বন্ধ করে মনের দৃষ্টিপটে ভাসিয়ে তুলুন ১৯৫২ সালের দিনগুলো। নিজের জন্মগত কথা বলার অধিকার আদায়ে এ বীরের জাতি কত সোচ্চার ছিল। হার মানার কোনো চিন্তাই এদের রক্তে নেই। অন্যায়ের প্রতিরোধ করতে নিজের জীবনকে তুচ্ছজ্ঞান করা মহৎ প্রাণই হলো এ বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ। কত সম্ভাবনাময় প্রাণই না ছিল সালাম, রফিক, জব্বার, বরকতসহ অসংখ্য বীর সেনানীর। ব্যক্তিগত কোনো আকাঙ্ক্ষার লোভ তাদের আবদ্ধ করতে পারেনি। রাষ্ট্রের সঙ্গে তারা কত বেশি সচেতন ও সোচ্চার ছিল। ছিলেন দুর্গম ও উজ্জ্বল আস্ফালনে আচ্ছন্ন এবং আসল পৌরষে দীপ্ত বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদে ভরপুর অপরাজেয়।

১৯৭১ সালে বিশাল অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত বাহিনীর বিপরীতে এক নিরস্ত্র, নিরীহ জাতি অকুতোভয়ে উদ্দীপ্ত হয়ে জীবন বিলিয়ে দিয়ে প্রিয় মাতৃভূমিকে স্বাধীন করেছে। ১৯৯০ সালেও জীবন দিয়ে স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছে। ২০২৪ সালে জেড জেনারেশন যেন তা আরো কয়েক ধাপ এগিয়ে। দীর্ঘদিনের এক চরম স্বৈরাচার ফ্যাসিস্ট রেজিম যেভাবে বাংলাদেশের মানুষের বুকের ওপর চেপে বসেছিল তার মূলোৎপাটন যেভাবে করেছে তা সত্যিই অপরাজেয়।

এ প্রজন্ম প্রমাণ করেছে দুর্গম অভেদ্য অন্যায়ের প্রাচীর কীভাবে সততা, নৈতিকতা আর সাহসিকতার সঙ্গে ভেঙে ফেলতে হয়। তারা প্রমাণ করেছে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই বিখ্যাত চরণ ‘চির-নির্ভয় পরাজয় তার জয়ের স্বর্গ সিঁড়ি।’ সত্যিই এদের রক্তে টগবগ করছে চরম জাতীয়তাবোধে উদ্দীপ্ত বীরত্বের বিজয়গাথা চিরঞ্জীব বীরের রক্ত। মানুষকে যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে অভিযানে পথপ্রদর্শন করেন। পর্বতসম বাধা অতিক্রম করার অকুতোভয় সেনানী আমাদের দামাল ছেলেরা দেখিয়ে দিয়েছে অন্যায্য আর অন্যায়কারীর শক্তি ও দাম্ভিকতা যত বড়ই হোক, তা ন্যায়, সত্য ও সাহসিকতার কাছে পরাজয় মানতে বাধ্য।

ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে যে অমোঘ সত্য লুকিয়ে আছে তা বাস্তবে প্রয়োগ করেছে এই জেনজি; নির্মম বাস্তবতায় অটল বিশ্বাসী আর সাহসিকতার সঙ্গে বুকে বুলেট ধারণ করেছেন তারা। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আবু সাঈদ জানতেন বুলেটের আঘাতে নিশ্চিত মৃত্যু। তার পরও দেশমাতৃকার জন্য বুক উঁচু করে বুলেটকে প্রতিহত করেছেন। নিজের প্রাণ দিয়েছেন। শহীদ হয়েছেন। অন্যায় অবিচার আর ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে অকুতোভয় সেনানী হিসেবে বিশ্বের সব দেশপ্রেমিক মানুষের মনে অমরত্ব লাভ করেছেন। একইভাবে আন্দোলনরত সবাইকে পানি বিতরণ করেছেন নিজ অর্থ আর পরম মমত্ববোধ নিয়ে আমাদের প্রিয় মুগ্ধ যার প্রতিটি উচ্চারণ আমাদের মনে চিরস্থায়ী স্থান করে নিয়েছে। উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে এমন শত শত শহীদ আবু সাঈদ ও মুগ্ধর অকৃত্রিম দেশপ্রেম আর সাহসিকতার। জন্ম একটাই, মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। যে অবস্থায়ই থাকি, মৃত্যু কখনই এড়ানো যাবে না। তবে এ মৃত্যু কখনো সম্মানের, কখনো অসম্মানের হতে পারে।

দেশপ্রেমিক দামাল ছেলেদের মৃত্যু সম্মানের উচ্চাসনে ভূষিত। আর যারা এ মাতৃভূমির প্রতিটি অঙ্গকে নিজের ইচ্ছামতো ব্যবহার করেছে। নিজের অন্যায় অবৈধ ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে সব অনৈতিকতা লালন করেছে। তারাই পরাজিত হয়েছে ন্যায় আর সত্যের কাছে। তাদের পরাজয়, তাদের মৃত্যু অনেক অনেক লাঞ্ছনার। অনেক জিল্লতির। অবৈধ ক্ষমতার দাপটেই কখনই মানুষের হৃদয়ে স্থান পাওয়া যায় না। স্থান হয় আঁস্তাকুড়ে। বাংলাদেশের মানুষের কষ্টার্জিত টাকায় যারা অবৈধ ক্ষমতা আর অপকৌশলে বিদেশে বেগমপাড়া বানিয়েছে, বিচারের নামে প্রহসন করে শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের মতো যারা দেশ ও মানুষের প্রতি চরম অন্যায় আর অবিচার করেছেন তাদের এ অন্যায়ের জবাব অবশ্যই আইন দিয়েই দেবে এ দেশের মানুষ। সৃষ্টিকর্তা কখনই এক চোখে তার সৃষ্টিকে দেখেন না। প্রতিটি প্রাণীই তার সৃষ্টি। তাই বিচারও অতি সাম্যের।

বাংলাদেশের মানুষ যখন প্রাণ দিতে শিখেছে তখন কোনো অশুভ শক্তিই তাদের রুখতে পারবে না। ব্রিটিশ ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানি পারেনি। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ব্যর্থ হয়েছে। বৃহত্তের কাছে ক্ষুদ্রের পরাজয় নিশ্চিত। অর্থাৎ যারা দুর্বার অদম্য সত্যের ফেরিওয়ালা তারা সর্বদাই বৃহৎ। তাদের মন আকাশের মতো উদার। তাদের অন্তর স্বর্গের শান্তিতে পরিপূর্ণ। তাদের মনে থাকে অন্যের বিরুদ্ধে ন্যায়ের আগ্নেয়গিরির উদ্‌গিরণ। এরা সত্যের দ্বারে আতিথ্য গ্রহণ করে সব অশুভকে দূর করে জগতের প্রকৃত কল্যাণ সাধন করে। এদের জীবনে কখনই ডাবল-ডেথ বা দ্বিতীয় মৃত্যু হয় না। অর্থাৎ এদের প্রাণটাই শুধু দেহ ত্যাগ করে আর বাকিটা সব মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে রয়। অন্যদিকে সব অন্যায়কারী জুলুমবাজ ফ্যাসিস্টরা দুই-দুইবার মৃত্যু বরণ করে। একবার মৃত্যু হয় তাদের শারীরিক এবং দ্বিতীয়বার মৃত্যু হয় সব মানুষের মন ও হৃদয় থেকে। মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে মুছে যায় মানুষের মন থেকে তাদের প্রতি ভালোবাসা। তারা নিক্ষিপ্ত হয় ঘৃণা আর অভিশাপের এক অনাকাঙ্ক্ষিত আঁস্তাকুড়ে।

আজ যারা ব্যাংক লুটপাটকারী ফ্যাসিস্ট রেজিমের অংশ তাদের মানুষ মন থেকে কত অভিশাপ আর ঘৃণা করেছে তা কখনই হিসাব করা যাবে না। এদেরই বলা হয়, এরা মানব ধর্মত্যাগ করে অন্যায় ও অভিশপ্ত ধর্ম গ্রহণ করেছে। মানবসেবার মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্য তাদের জন্য নয়। তাদের ভাগ্যে শুধুই লাঞ্ছনা আর অভিশাপ। এরা মানবিক গুণাবলির পরিস্ফুটন না করে ক্ষমতা আর অর্থের দাপটকেই পূজা করেছে। আর এদের এ লেলিহান লোলুপকে যারা মূলোৎপাটন করেছেন, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিশ্বাস ও আশা’ কবিতায় তাদের এভাবেই তুলে ধরেছেন।

‘নিরানন্দের মাঝে আল্লাহর আনন্দ সেই আনে,

চাঁদের মত তার প্রেম জনগণ-সমুদ্রে টানে।

অসম সাহস আসে বুকে তার অভয় সঙ্গ করে,

নিত্যজয়ের পথে চলে সেই পথিকের হাত ধরে।’

সামনে যত বড় বাধাবিঘ্ন-বিপত্তি আর সংকটেরই আবির্ভাব হোক তারা সর্বদা বিজয়ের পথেই চলে। মাথা নিচু করে অন্যায় মেনে নেয়ার ভীরুতা আর কাপুরুষতা তাদের কাছেই ঘেঁষতে পারে না। ২০২৪ সালে ৫ আগস্ট বিজয় অর্জনের পর পরই কৃত্রিম বন্যার এক জঘন্য ও চরম বাধার মুখে এ প্রিয় দামাল ছেলেদের অর্জিত স্বাধীনতা। তার ওপর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বাহিনীর দাবি-দাওয়ার নামে অরাজকতা। সব কিছুই অবসান হবে ইনশাল্লাহ। তিমির রাত্রের ঘনতামাশা কাটিয়ে দেখা দেবে এক হাস্যোজ্জ্বল আলোকরেখা। উজ্জীবিত হবে প্রকৃতি ও সব প্রাণিকুল। এ এক মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায়।

অধ্যাপক ড. মো. গোলাম ছারোয়ার: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, কীটতত্ত্ব¡ বিভাগ, জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান (নিপসম)