এভিয়েশন শিল্পের দেশের অর্থনীতি, পর্যটন ও বৈদেশিক বিনিয়োগের গভীর সংযোগ রয়েছে। আমাদের এভিয়েশন খাতকে অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রাখার মতো জায়গায় নেয়া সম্ভব। আমাদের দেশে এভিয়েশন খাতের বর্তমান অবস্থা কেমন?

দেশে এয়ারলাইনস পরিচালনার সংস্কৃতি উত্তরোত্তর বেড়েছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ছোট পরিসরে বিমান এয়ারলাইনস বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার যাত্রা শুরু হয়। সেটি আজ অনেক বড় এক বিমান সংস্থায় পরিণত হয়েছে। এয়ারলাইনস পরিচালনাকে তো আমরা এভিয়েশন খাত বলতে পারি না, বরং এটি এভিয়েশন খাতের একটি উপাদান। সিঙ্গাপুরের দিকেই তাকান। ওদের জনসংখ্যা ৬০-৭০ লাখ। আর সংযুক্ত আরব আমিরাতের জনসংখ্যা এক কোটির মতো। কাতারের উদাহরণও এক্ষেত্রে প্রযোজ্য। শুধু এভিয়েশন খাতকে অবলম্বন করেই এ দেশগুলো অনেক দূর এগিয়েছে। এভিয়েশন খাত জাতীয় অর্থনীতিতে কীভাবে অবদান রাখে? যারা এ দেশে বিনিয়োগ করতে আসবেন তারা যদি যাতায়াতের আরামদায়ক মাধ্যম পান, যাতায়াতের নানা বিকল্প পান এবং এ সেবার জন্য যাত্রীবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা যায় তাহলে বিনিয়োগও বাড়বে। এজন্য এভিয়েশন খাতের জন্য বাজেট ক্যারিয়ার পলিসি প্রণয়ন করা গেলে ভালো হয়। একাধিক এয়ারলাইনসকে বাংলাদেশে কাজ করার সুযোগ দিয়ে একটা ভারসাম্য আনতে পারলে বাংলাদেশের সঙ্গে আরব আমিরাতের মধ্যে বেশি পার্থক্য থাকবে না। আরব আমিরাত থেকে প্রতি সপ্তাহে ১৪২টি ফ্লাইট বাংলাদেশে আসে। আর আমাদের তরফ থেকে ৩৫টি ফ্লাইট ওখানে যায়। দুটোর মধ্যে পার্থক্য অনেক বড়। এদিকে বিদেশী এয়ারলাইনসের কাছে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার চলে যাচ্ছে।

এখানে মূল বিষয় হলো, এ খাতের জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শিল্প সংযুক্ত পরিকল্পনা দরকার। একটা ভালো পথনকশা থাকতে হবে। এ পথনকশা এমনভাবে করতে হবে যাতে অবকাঠামো গড়া যায়। দেশে রাষ্ট্রীয় বিমান সংখ্যা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মাত্র ১৯টি উড়োজাহাজ আছে। বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোর মোট ৩৫টি উড়োজাহাজ রয়েছে। অর্থাৎ সব মিলিয়ে দেশে ৫৪টি উড়োজাহাজ আছে। এত অল্প উড়োজাহাজ দিয়ে কিছু করা যাবে না। বাংলাদেশের জনসংখ্যা বিবেচনায় এ খাতে ১ কোটি ২০ লাখের মতো বিজনেস ট্রাফিক রয়েছে। এজন্য কম করে হলেও অন্তত ১০০টি উড়োজাহাজ দিয়ে এ খাতের অবকাঠামো গড়তে হবে। সেক্ষেত্রে আমরা এ খাতের জন্য একটা নতুন সম্ভাবনার পথ খুলতে পারব। এজন্য আসলে কী কী প্রয়োজন? শুধু উড়োজাহাজ দিয়েও তো হবে না। এভিয়েশন ইনস্টিটিউশন লাগবে যাতে দক্ষ টেকনিশিয়ান, প্রকৌশলী, কেবিন ক্রু, পাইলট—সবকিছুই লাগবে। পর্যাপ্ত সুবিধার অভাবে বর্তমানে বিমানের প্রত্যেক ক্যাপ্টেনকে বিদেশে সিমুলেশনের জন্য যেতে হচ্ছে। এ প্রশিক্ষণে বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হচ্ছে। দেশে এখনো এমন কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেনি যেখানে চালকরা সিমুলেটর প্রশিক্ষণ নিতে পারেন। এছাড়া প্রতিটি খাতেই গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। অপারেটরদেরও নেই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এখানে চালকরা সহকারী হিসেবে যোগদান করেন এবং ধীরে ধীরে তিনি দক্ষ চালক হন। এভিয়েশন খাতের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সম্ভাবনা অনেক। কক্সবাজার ও চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে বিশ্বমানের এভিয়েশন খাত গড়া সম্ভব। এর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ যাত্রী চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রফতানি বহুমুখী করা যাবে। ২০৩৫ সাল নাগাদ গোটা বিশ্বে প্রায় ৭০ লাখের মতো কেবিন ক্রুর চাহিদা থাকবে। এখন এভিয়েশন খাতকে উন্নত করতে হলে কিছু সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে।

এ খাতের উন্নতির জন্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর ক্ষেত্রে কোনগুলো অগ্রাধিকার পেতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

প্রথমত যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। দেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে বিদেশে সিমুলেটরের জন্য যেতে হবে না। এখানেই প্রশিক্ষণ ও সনদের ব্যবস্থা থাকবে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এর অনেক চাহিদা। প্রশিক্ষণ সুবিধা থাকলে ভারত, নেপাল কিংবা পাকিস্তানের অনেকেও এখানে আসতে পারেন। এমনকি পূর্ব আফ্রিকা ও মধ্য এশিয়ার অনেকেও সহজলভ্য প্রশিক্ষণের জন্য এখানে আসতে পারেন। যেমন দুবাইয়ের একাডেমির কথাই ধরা যাক। সেখানে বিভিন্ন দেশের পাইলট ও ক্রুরা প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকেন। তারপর আসবে রক্ষণাবেক্ষণ। সিঙ্গাপুরের হ্যাঙ্গার তাদের উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণের প্রধান জায়গা। কিছুদিন আগে তারা বিদেশে কতগুলো উড়োজাহাজ যাচ্ছে তা নিরীক্ষণের জন্যই ১৬০ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। বৈদেশিক আয়ের অর্ধেকই তারা রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশিক্ষণে ব্যয় করছে। এজন্য রক্ষণাবেক্ষণ হাব অত্যাবশকীয়। সিঙ্গাপুর ও হংকংয়ের মতো দেশগুলোর আয়ের প্রধান উৎস এ খাত। এজন্য দুই-তিনটা এয়ারলাইনসই করতে হবে এমন নয়। বিমানের হ্যাঙ্গার আছে, সেটার রক্ষণাবেক্ষণের জন্যই আলাদা কোম্পানি করা যেতে পারে। বিদেশ থেকে কৌশলগত অংশীদার আনা হোক। তারা ১৫-২০ লাইনের হ্যাঙ্গার করে দিক। তখন আশপাশের দেশ থেকে রক্ষণাবেক্ষণের অর্ডার আসবে আর আমরা বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারব। এজন্য আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশনও নিতে হবে।

এভিয়েশন খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ক্যাটারিং ও লন্ড্রি সার্ভিস। আমাদের এ পরিষেবাগুলোর মান কি সন্তোষজনক?

এয়ারলাইনস পরিচালনায় যাত্রীদের কমফোর্টের (স্বস্তি) জন্য অনেক পণ্য লাগে। সে পণ্য সরবরাহের সক্ষমতা বেসরকারি খাতকে দিতে হবে। সেটা ক্যাটারিং হোক বা লন্ড্রি সার্ভিস। যেমন বিদেশী এয়ারক্রাফটগুলো যে তোয়ালে আনে তা আবার নিয়ে যায়। তারাই এটি সাফসুতরো করার ব্যবস্থা করে। আমাদের এখানে যদি সে সুবিধা থাকত তাহলে তারা একটা নিয়ে যেত আরেকটা রেখে যেত। কারণ তাতে বহনের চাপটা কমাতে পারে এয়ারক্রাফট।

বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনায় আমাদের আর কোন কোন দিকে ফোকাস করতে হবে?

ঢাকায় থার্ড টার্মিনালের নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয়েছে এটিকে সফল করতে হলে হাব হিসেবে ঘোষণা দিতে হবে। এসবের জন্য আমাদের একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পথনকশা লাগবে। একটা এভিয়েশন ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হবে। এখানে সবকিছুই থাকতে হবে। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং এখানে অনেক জরুরি। ঢাকায় যাত্রী আসবে বিদেশ থেকে, দেশের চেহারা বলে দেয় কিন্তু এয়ারপোর্ট। এয়ারপোর্টে ঢোকার পর আশপাশ দেখেই সে বিবেচনা করবে বাংলাদেশ কি নিরাপদ বা উন্নত? কিন্তু তার যদি এয়ারপোর্টেই ভোগান্তির শিকার হতে হয় তাহলে তাদের মনে এ ছাপ থেকে যাবে। পৃথিবীর কোনো এয়ারপোর্টেই সচরাচর লাগেজ ট্যাগ সংগ্রহ করা হয় না। পদ্ধতিটা এখন আর ম্যানুয়ালি হ্যান্ডেল করছে না আধুনিক বিমান বন্দরগুলো। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে আমাদের ধরা যাক ৪০০ লোক আছে। এ অল্প কজনের জন্য পুরো দেশের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এখানে ইউরোপিয়ান এয়ারলাইনস কেন আসে না? তারা নিরাপত্তা ও সেবার মান নিয়ে চিন্তিত। এভিয়েশন খাতের বিস্তারে বাজেট ক্যারিয়ার গুরুত্বপূর্ণ। রায়ান এয়ার, এয়ার এশিয়া, ইজি জেটের দিকে দেখা যাক, শত শত প্লেন ওদের মালিকানায়। এ বাজেট ক্যারিয়ারের জন্য দেশে একটা নীতিমালা করতে হবে। যেহেতু আমাদের নতুন টার্মিনালের উদ্বোধন হচ্ছে সেহেতু পুরনোটিকে বাজেট ক্যারিয়ার টার্মিনাল ঘোষণা করে নীতিমালার অনুমোদন দেয়া উচিত। এ খাত উন্নত হলে বিনিয়োগ বাড়বে আর শুধু এ খাতের সেবা দিয়েই এমিরেটসের মতো নিজেদের বৈশ্বিক ব্র্যান্ড করা সম্ভব।

আমাদের এখানে করপোরেট সংস্কৃতি বিকাশে নেসলে ও ইউনিলিভারের মতো বহুজাতিক কোম্পানির ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু আমাদের এয়ারলাইনস খাতের সংস্কৃতি বলতে শুধু বাংলাদেশ বিমান বুঝায়। বাংলাদেশ বিমান সফল হলে পৃথিবীর এভিয়েশন মার্কেটে আমাদের সম্মানজনক অবস্থান থাকত। এয়ারলাইনস শিল্প ঘুরে দাঁড়াতে হলে এ খাতে বিদ্যমান সংস্কৃতি ও চর্চায় পরিবর্তন আনতে হবে। আমরা কৌশলগত অংশীদার নিতে পারি। বিদেশী হ্যান্ডলারদের এনে অপারেশন চালানোর জন্য একটি বাণিজ্যিক চুক্তি করা যেতে পারে। মালিকানা, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং থেকে শুরু করে সব বাংলাদেশ বিমানের থাকুক কিন্তু অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা ও পরিষেবা যেন পরীক্ষিত ও সফল বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের দ্বারা পরিচালিত হয়। এতে এয়ারলাইনস শিল্পে একটা কর্মসংস্কৃতি তৈরি হতো। কিন্তু আমরা বিগত ৫০ বছরেও তা করতে পারিনি।

দুবাই বা সিঙ্গাপুর যে রকম একটা ট্রানজিট হাব হয়েছে, ঢাকা বা বাংলাদেশ কেন ট্রানজিট হাব হতে পারছে না? ঢাকায় ওয়াইড-বডিড এয়ারক্রাফট (প্রশস্ত বা বড় উড়োজাহাজ) অবতরণ করতে পারে না বলে কেউ কেউ অভিযোগ করেন। এটাও কি একটা কারণ ট্রানজিট হাব না হয়ে ওঠার পেছনে?

সমস্যা হলো আমাদের এ বিষয়ে মানসিকতা ঠিক নেই। এখানে তো বোয়িং ৭৭৭ এয়ারক্রাফট অবতরণ করে। শুধু এয়ারবাস এ৩৮০ অবতরণ করতে পারে না। এখন তো এ৩৮০ পৃথিবীর সব দেশে যায় না। এভিয়েশন বাজারে তাদের বড় অংশীদারত্ব নেই। এর মধ্যে বোয়িং সিরিজের ৭৩৭, ৭৭৭, ৭৮৭ হচ্ছে প্রধান স্টেকহোল্ডার। ওইদিকে এয়ারবাস ৩৫০ ও ৩৩০ বাংলাদেশে অবতরণ করতে পারে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় এটি বিশ্বের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের সেরা জায়গা। মধ্যপ্রাচ্য বা মধ্য এশিয়া থেকে কেউ ভারতে যেতে হলে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে যেতে হবে। এতদিন নানা কারণে আমরা ট্রানজিট হাব করতে পারিনি। কারণ ট্রানজিট প্যাসেঞ্জার নামলে তাদের কোথায় রাখা হবে? কারণ যাত্রীদের বসার জায়গার অভাব ছিল, কানেক্টিং ফ্লাইট কম এবং নিরাপত্তাও একটি বড় সমস্যা ছিল। থার্ড টার্মিনালের কারণে আমরা বড় জায়গা পাচ্ছি। সে সুবিধাও আসছে। এখন এটাকে ট্রানজিট হাব করতে হলে এয়ার ও এভিয়েশন নিয়ম-কানুনে কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। এর মধ্যে উন্মুক্ত আকাশ নীতিমালা একটি। যে বিদেশী এয়ারলাইনসগুলো এখানে আসতে চায় তাদের আসতে দিতে হবে। ফ্রিকোয়েন্সি বাড়াতে হবে। তবে যেহেতু আমাদের সক্ষমতা কম তাই বাংলাদেশ বিমান নিজের বাণিজ্য ঠিক রাখার জন্য অন্যদের ওপর সীমা আরোপ করে। কিন্তু তাতে তো দেশের যাত্রী কমছে না। কিন্তু উন্মুক্ত আকাশ নীতিমালা নিলে বিদেশী এয়ারলাইনস আসবে। তখন প্রতিযোগিতা বাড়লে ভাড়াও সহনশীল পর্যায়ে আসবে। যেমন কাতার এয়ারলাইনস। তারা এখন ঢাকায় দুইটা ফ্লাইট পরিচালনা করে। উন্মুক্ত আকাশ হলে হয়তো চারটা চালাবে। তখন কানেক্টিভিটি বাড়বে। এক্ষেত্রে অনেকে ভয় পান এ নীতিমালা করলে অভ্যন্তরীণ এয়ারলাইনসগুলোর ব্যবসা ঝুঁকিতে পড়বে। কিন্তু এখানে তো অভ্যন্তরীণ যাত্রীদের নিয়ে প্রতিযোগিতা না। আপনাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা বাড়াতে হচ্ছে। এর খুব বেশি প্রভাব অভ্যন্তরীণ বাজারে পড়বে না। এজন্যই উন্মুক্ত আকাশ নীতিমালাটা ট্রানজিট হাব করার প্রাথমিক শর্ত। যখন বিদেশ থেকে আসা এয়ারলাইনসকে ট্রানজিট সুবিধা দেয়া হবে তখন ভালো অ্যাম্বিয়েন্স তৈরি হবে। ধরা যাক প্রতিটা এয়ারক্রাফটে ৩০ শতাংশ ট্রানজিট প্যাসেঞ্জার নেয়ার সিদ্ধান্ত হলো। এভাবে ঢাকা-সিঙ্গাপুর, ঢাকা-ব্যাংকক, ঢাকা- কুয়ালালামপুর ওয়াইড-বডিড উড়োজাহাজ দিয়ে কানেক্টিভিটি করলে যাত্রীরা ৩-৪ ঘণ্টার মধ্যে গন্তব্যে যেতে পারলেই কিন্তু এখানে ট্রানজিট হাব হয়ে গেল। আমরা এখনো পয়েন্ট টু পয়েন্ট ট্রাফিক করছি। এটা এ খাতের সমস্যার সমাধান না। এজন্য এ শহরকেও হাবে রূপ দিতে হবে। যখনই কোনো ট্রানজিট প্যাসেঞ্জার এখানে নামছেন তাকে খরচ করতে হচ্ছে। এয়ারপোর্টের ভেতর বিশাল এক ইকোসিস্টেম। ট্রানজিট লাউঞ্জে অপ্রত্যক্ষভাবেই অনেক আয়ের সুযোগ আছে।

এক্ষেত্রে দ্বিতীয় সংকট হলো জ্বালানির দাম। দেশে জেট ফুয়েলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে অনেক বেশি। এখানে ৩০-৪০ শতাংশ দাম বেশি রাখা হয়। এমনটি হলে বিদেশী এয়ারলাইনস এখানে অবতরণ করে জ্বালানি কিনবে না। সিঙ্গাপুর বা দুবাইয়ের জ্বালানির দাম অনেক প্রতিযোগিতামূলক। এখানে এ খাতের জন্য জ্বালানির কর বা অন্যান্য চার্জ কমিয়ে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সমন্বয় করা যেতে পারে। তাহলে বিদেশী এয়ারলাইনসগুলোও অবতরণে আগ্রহী হবে। জ্বালানির দামও যদি নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, ট্রানজিট হাব করা অনেক কঠিন।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এভিয়েশন খাতের জন্য সেখানে ইতিবাচক কী পেলেন বা এ খাতের উন্নয়নে আপনাদের কী প্রত্যাশা?

বাজেটে এভিয়েশন খাতের দুটো ক্ষেত্রে সারচার্জ কমানো হয়েছে। বিনিয়োগেরও কিছু সুবিধা রাখা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে বিষয়টাকে প্রশংসা করতে হয়। বিশেষত সারচার্জ ও জ্বালানির বিষয়টিকে তারা গুরুত্ব দিয়েছেন। বিলম্বে টাকা দিলে এখন ৭২ শতাংশ সারচার্জ। এমন হলে তো কেউ টাকা দিতে পারবে না। সরকারের সদিচ্ছা না থাকলে এসব বিষয় বাজেটে ধরা হতো না। তবে সরকারকে যদি এ বিষয়ে একটা অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিকল্পনা সবাই মিলে দিতে পারলে আগামী বাজেটে আরো অনেক বিষয়ে তারা মনোযোগ দিতে পারবেন।

আমরা যদি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে এভিয়েশন শিল্পকে এগিয়ে নিতে চাই তাহলে স্বল্পমেয়াদে কী কী পদক্ষেপ নেয়া দরকার?

শুধু এভিয়েশন খাতের জন্য যেসব প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা লাগে সেগুলোর জন্য দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে হবে। কিন্তু তার আগে প্ল্যান অব অ্যাকশনটা (কর্মপরিকল্পনা) জরুরি। আগামী ৩০ বছরে আমরা কোথায় যেতে চাই তা প্রাক্কলন করা দরকার। এজন্য ১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। কারণ এভিয়েশন শিল্পে পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা কোনো বিষয় না। গোটা পরিকল্পনা শুধু এয়ারলাইনসকেন্দ্রিক করলে হবে না। এ খাতের জন্য সব সুযোগ-সুবিধা ও আইনমালার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুর ব্যবস্থা একসঙ্গে করতে হবে।

বর্তমানে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল ১ আর ২ মিলিয়ে বার্ষিক যাত্রী ধারণক্ষমতা ৮০ লাখ বা ৮ মিলিয়ন। আর থার্ড টার্মিনালের যাত্রী ধারণক্ষমতা বার্ষিক ১ কোটি ৮০ লাখ। সব মিলিয়ে ২ কোটি ৪০ লাখ বা ২৪ মিলিয়ন যাত্রী ধারণ ও পরিচালনা সক্ষমতা অর্জন হতে চলেছে, যা বাংলাদেশকে এভিয়েশন হাব হতে যথেষ্ট সক্ষমতা দিয়েছে। পাশাপাশি বর্তমানে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিশ্বের সর্বাধুনিক রাডার ব্যবসা সংযোজিত হয়েছে ফলে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এ দেশকে, এভিয়েশন খাত থেকে বিশাল আয়ের সম্ভাবনার দূয়ার খুলে দিয়েছে। এখন শুধু প্রয়োজন বাস্তবমুখী ও কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে এভিয়েশন সেক্টর থেকেই বিশাল রাজস্ব আয়, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অনেক বড় ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

এমনটি হলে দেশের অভ্যন্তরেও বাণিজ্য প্রসারিত হবে। দেশের ভেতরেই অনেকে বাস-ট্রেনে যাতায়াত না করে প্লেনে যাবে। এজন্য বাড়তি অর্থ খরচ করলেও তার সময় বাঁচবে। আবার অন্যান্য কিছু খরচও কমাতে পারবে। এজন্যই ইকোসিস্টেম গড়তে হবে। মাত্র ১০ বছর আগেও ঢাকা-কুয়ালামপুরে সপ্তাহে তিনটা ফ্লাইট ছিল। ওদের তিনটা, আমাদের তিনটা। এখন প্রতিদিন নয়টা ফ্লাইট অপারেট হয়। হাব, কানেক্টিভিটি অ্যান্ড কালচার—এ তিনটাকে দিয়েই সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। এ খাত একটি রাষ্ট্রের অর্থনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। যেমন তৈরি পোশাক খাতের অনেক ক্রেতা এখানকার ব্যবসায়ীদের ডেকে নেয় ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর বা অন্য কোথাও। তারা এখানে আসতে চায় না কারণ এখানকার এয়ারপোর্ট ও যাতায়াত অভিজ্ঞতা তাদের জন্য সুখকর নয়।

এজন্যই আমাদের শুধু প্লেন বাড়ালে হবে না। একটা সুনির্দিষ্ট পথনকশা লাগবে। যেমন কার্গো বিল ব্যবস্থাপনার হাবটা বিমানের কাছে রাখার কী দরকার? এখান থেকে তারা মুনাফা করছে না। তাহলে ওটাই আলাদা কোম্পানি হোক। পুঁজিবাজারে এটিকে নেয়া হোক। এজন্য সরকারকে নীতিগত সহায়তা দিতে হবে। সরকার নিজে অপারেটরের কাজ না করে সে কাজ বণ্টন করে দিতে পারে। তারা বাণিজ্যকে সহযোগিতা করবে। বিনিয়োগ আকর্ষণের কাজ করবে। বিমানের ওপর শুল্ক নেই। কিন্তু বেসরকারি এয়ারলাইনসের সে সুবিধা নেই। অথচ এরাই বিদেশী মুদ্রা আয় করছে। তাই তাদের শুল্কমুক্ত ওয়্যারহাউজের সুবিধা দেয়া যেতে পারে। এ খাতের সব সমস্যাকে একসঙ্গে দেখতে হবে। ২০৩৫ সাল নাগাদ দেশে এয়ারলাইনসে এয়ারক্রাফট দরকার ৩০০টি। এখন আছে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ৫৪টি। এমন সুবিধা তৈরি করতে গেলে আগে তৈরি করতে হবে। গোটা দেশে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। না হলে ক্ষতিই হবে। এখন পর্যন্ত ছয়টা এয়ারলাইনস হয়েছে, ৪টিই বন্ধ হয়ে গেছে। এজন্যই টেকসই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।