দেশে ক্রীড়া অর্থনীতির বিকাশ ও তৃণমূল পর্যায়ে খেলাধুলাকে উৎসাহ দিতে এ ধরনের অবকাঠামো জরুরি। তবে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সাম্প্রতিক নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে প্রকল্প বাস্তবায়নের হতাশাজনক চিত্র উঠে এসেছে। আইএমইডির নিরীক্ষণ পর্যালোচনায় এ প্রশ্ন উঠেছে, হাজার কোটি টাকার এ বিনিয়োগ আদৌ লক্ষ্য পূরণ করতে পারবে কিনা।

বণিক বার্তার বরাতে আইএমইডির প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, দুই দফা মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানোর পর চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি মাত্র ২৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এখন পর্যন্ত ৪০টি স্টেডিয়াম নির্মাণ শেষ হয়েছে আর ৪০টির কাজ চলমান। বাকি ৯০টির ভূমি অধিগ্রহণ শেষ হয়নি। এর মধ্যে ১০টির ক্ষেত্রে বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে জমি অধিগ্রহণের অভিযোগ মিলেছে। জেলা পরিষদ থেকে জমি না পাওয়ায় প্রকল্পের গতি শ্লথ।

সমস্যাটি কেবল ভূমি অধিগ্রহণে সীমাবদ্ধ নয়। আইএমইডির পরিদর্শনে ধরা পড়েছে নির্মাণকাজের মানও প্রশ্নবিদ্ধ। কয়েকটি স্টেডিয়াম বিদ্যমান আইনের লঙ্ঘন করে পুকুর বা জলাশয়ের জমিতে করা হয়েছে। ফলে অনেক মাঠে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। অনেক স্টেডিয়ামের অবস্থান এমন স্থানে যেখানে যাতায়াত সুবিধা সীমিত। সব মিলিয়ে প্রকল্পটি স্থানীয় পর্যায়ে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রক্ষণাবেক্ষণের অভাব। স্টেডিয়াম নির্মাণ হলেও সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির জন্য জনবল ও তহবিল বরাদ্দ নেই। গত পাঁচ বছরে প্রকল্পটিতে ব্যয় হয়েছে ৮২০ কোটি টাকা। কিন্তু ব্যয়ের অনুপাতে বাস্তব অগ্রগতি নেই বললেই চলে। ফলে প্রকল্পটি ভূমি ও জনগণের করের অর্থের অপচয়ই হয়ে উঠেছে।

এদিকে সরকারের নির্বাচনী ইশতাহারে খেলাধুলাকে পেশা ও জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ সুবিধা সম্প্রসারণের অঙ্গীকার রয়েছে। এর মধ্যে ৪৫০টি উপজেলায় মানসম্পন্ন ইনডোর স্টেডিয়াম নির্মাণ, প্রতিটি উপজেলায় ক্রীড়া কর্মকর্তা ও ক্রীড়া শিক্ষক নিয়োগ এবং ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিভাবান কিশোর-কিশোরীদের বৃত্তি দেয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। এ লক্ষ্যের সঙ্গে এরই মধ্যে বিদ্যমান ২০১টি মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পকে যুক্ত না করাটা হবে সম্পদের অপব্যবহার। নতুন অবকাঠামো নির্মাণে হাত দেয়ার আগে যে অবকাঠামো এরই মধ্যে নির্মিত বা নির্মাণাধীন, তার সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করাই যুক্তিসংগত। অন্যথায় একদিকে পুরনো প্রকল্পের অর্থ অলসভাবে পড়ে থাকবে, অন্যদিকে নতুন প্রকল্পে বরাদ্দ বাড়িয়ে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।

তবে বিদ্যমান প্রকল্পের গতিকে আঁকড়ে ধরে এটিকে জারি রাখাও হবে ভুল। সেজন্য প্রকল্প বাস্তবায়নে পরিবর্তন আনতে হবে। যেসব স্টেডিয়ামের ভূমি অধিগ্রহণ এখনো বাকি সেগুলোর জন্য জেলা প্রশাসন, ভূমি মন্ত্রণালয় ও জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সমন্বয়ে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিতে হবে। ভূমি-সংক্রান্ত জটিলতা কোথাও দীর্ঘ হলে বিকল্প খাসজমি চিহ্নিত করে প্রকল্প এলাকা সমন্বয় করা যেতে পারে। স্থান নির্বাচনের আগে স্বাধীন প্রাক-নির্মাণ সমীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এভাবে পুকুর-জলাশয়ের জমি কিংবা উপজেলা সদর থেকে দুর্গম দূরত্বের জায়গা এড়ানো যাবে। জলাবদ্ধতাপ্রবণ জমির ক্ষেত্রে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। আবার ঠিকাদার নিয়োগের পর ঘন ঘন নকশা পরিবর্তনের সুযোগ সীমিত করতে হবে।

শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না তা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জনবল নিয়োগ ও বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ তহবিলের ব্যবস্থা করতে হবে। সীমানাপ্রাচীর নির্মাণকে প্রকল্পের অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিবেচনা করা দরকার। সরকারের ক্রীড়া-পেশাদারীকরণ পরিকল্পনার সঙ্গে সংগতি রেখে এ মিনি স্টেডিয়ামগুলোকে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ ও ট্যালেন্ট হান্ট কর্মসূচির স্থানীয় কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রতিটি উপজেলায় ক্রীড়া কর্মকর্তা নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির জনবল সংকটও অনেকাংশে দূর হবে। বিএনপির ইশতাহারে উল্লিখিত ব্যাংক ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিলকে রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশিক্ষণ উপকরণ সরবরাহে যুক্ত করার সুযোগ খতিয়ে দেখা যেতে পারে। এভাবে এ প্রকল্পের সরকারি বরাদ্দের ওপর একচেটিয়া নির্ভরতা কমানো যেতে পারে।

ক্রীড়া খাতে সরকারের লক্ষ্যমাত্রাই বলছে, ক্রীড়া অবকাঠামো নির্মাণ বিচ্ছিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নয়। তরুণ প্রজন্মের সুস্থ বিকাশ, মাদক ও অপরাধপ্রবণতা থেকে দূরে রাখা এবং জাতীয় পর্যায়ে ক্রীড়া প্রতিভা তৈরির ভিত্তি এগুলো। কিন্তু ২ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্পে যখন অর্ধেকের বেশি উপজেলায় জমিই অধিগ্রহণ হয় না, নির্মিত স্টেডিয়াম যখন পশুর চারণভূমিতে পরিণত হয়, তখন তা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, সম্ভাবনার অপচয়ও। ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার সরকার করেছে, তার বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করবে বিদ্যমান প্রকল্পগুলোর সংস্কার ও যথাযথ বাস্তবায়নের ওপরই। নতুন প্রতিশ্রুতির আগে পুরনো বিনিয়োগের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।