ড. মাহবুব উল্লাহ্, অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির অন্তর্বর্তী কমিটির আহ্বায়ক। ১৯৭৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতা দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করেন। সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ছিলেন রাজস্ব সংস্কার কমিশনের সদস্য ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপ-উপাচার্য। ২০০৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগে অধ্যাপনা দিয়ে পেশাজীবন শেষ করেন। বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় রচিত তার ১৩টি গ্রন্থ প্রকাশ হয়েছে। এছাড়া দেশ-বিদেশে তার গবেষণা প্রবন্ধগুলো প্রকাশ হয়েছে। সম্প্রতি দেশের অর্থনীতি, রাজনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তায়।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম

অনেকেই বলছেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রেসক্রিপশনে দেশের অর্থনীতি পরিচালিত হচ্ছে। অভ্যুত্থানের পরও অভ্যুত্থানের চেতনা ও জনগণের আকাঙ্ক্ষার পরিবর্তে আইএমএফের শর্তগুলো বেশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?

রেডিক্যাল অর্থনীতিবিদরা ‘ত্রয়ী স্পর্শ’র কথা বলেন। বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থাকে যেসব শক্তি শাসন করছে, সেসব শক্তি মূলত তিনটি প্রতিষ্ঠানকে—বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) ব্যবহার করে তাদের নীতিগুলো বাস্তবায়ন করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রেটন উডস ব্যবস্থার মাধ্যমে এ কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর পরামর্শ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সবসময় ভালো হবে সেটি ভাবার কারণ নেই। বরং অনেক সময় তাদের পরামর্শ বিপজ্জনক হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে আইএমএফ মনিটারি নীতিতে বিশ্বাস করে। ফলে তাদের যত প্রেসক্রিপশন সেগুলো মনিটারি সিস্টেমভিত্তিক মতাদর্শ। তারা মনে করে, সুদের হার বাড়িয়ে দিলেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবতা হলো বাংলাদেশের মতো দেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য শুধু সুদের হার বৃদ্ধি করা সঠিক কোনো পদক্ষেপ নয়। সরকার সুদের হার বাড়িয়েছে, তার ফল কী হলো? এখন আবার বলা হচ্ছে, সুদের হার আরো একবার বাড়ানো হতে পারে। এর ফল ভালো হবে না। বরং এর বিরূপ প্রভাব উৎপাদনশীল খাতে পড়বে। কারণ ঋণের খরচ বেড়ে যাবে এবং বিনিয়োগ কমে যাবে। যেখানে দেশে বেকারত্ব অনেক বেশি, সেখানে বিনিয়োগ কমে গেলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। ফলে এটি দেশের অর্থনীতির জন্য কোনো ইতিবাচক দিক বয়ে আনবে না। আইএমএফের কাছ থেকে আমরা যে আর্থিক সহায়তা পেয়েছি, সেটিও পর্যায়ক্রমে কিস্তিতে দেয়া হচ্ছে। এটি আমাদের প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগণ্য। আমাদের অর্থনীতির কাঠামোগত সমস্যাগুলো ঠিকমতো চিহ্নিত করতে না পারি, তাহলে এ ঋণ কোনো স্থায়ী সমাধান দিতে পারবে না। তদুপরি, আইএমএফের ঋণের শুধু সুদের হার বেশি তা নয়, এর সঙ্গে নীতিগত কিছু শর্তও জুড়ে দেয়া হয়, যা আমাদের জন্য আর্থিক চাপ তৈরি করছে। তারা এক ধরনের নীতি মেনে নিতে বাধ্য করছে এবং আমরাও মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছি। ফলে আইএমএফের টাকার জন্য শুধু সুদ দিতে হচ্ছে তা কিন্তু নয়, তাদের অর্থ পেতে আমাদের এমন কিছু নীতি গ্রহণ করতে হচ্ছে, সেটি আমাদের জন্য সুখকর না হয়ে বেদনাদায়ক হওয়ার যথেষ্ট কারণও যুক্ত রয়েছে।

দেশে দারিদ্র্য কমাতে করণীয় কী?

দারিদ্র্য সম্পর্কে বিবিএস যে তথ্য দিয়েছে তা উদ্বেগজনক। তারা একটি দারিদ্র্যের ম্যাপিং করেছে। সেই ম্যাপিংয়ে দেখা যাচ্ছে, মাদারীপুর জেলায় বাংলাদেশের সর্বাধিক দারিদ্র্য, সেখানে ৫৩ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। এ রকম আরো অনেক জেলা রয়েছে যেখানে দারিদ্র্যের হার বড়। দেখা যাচ্ছে, আমাদের দেশে দারিদ্র্য একটি বড় সমস্যা। দারিদ্র্য সমস্যা সমাধানের জন্য ভাতা প্রদান কোনো সমাধান হতে পারে না। তবে এ ধরনের ভাতা মানুষকে বেঁচে থাকার ন্যূনতম সহায়তা দিতে পারে, কিন্তু টেকসই সমাধান নয়। আমাদের টেকসই সমাধানের পথ খুঁজতে হবে, আমাদের জাতীয় সঞ্চয় বাড়াতে হবে। তার ওপর ভিত্তি করে জাতীয় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সেই বিনিয়োগের ওপর ভিত্তি করে কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। কর্মসংস্থান বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের হাতে ক্রয়ক্ষমতা দেয়ার বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ধরনের উদ্যোগ যত দ্রুত নেই বা উপলব্ধি করি তত ভালো।

দেশের ব্যাংক খাত কীভাবে গতিশীল করা যায়?

ব্যাংক ব্যবস্থার মাধ্যমেই সঞ্চয় গড়ে ওঠে। এ সঞ্চয়ই শিল্পসহ অন্যান্য উৎপাদনশীল খাতে ঋণ হিসেবে ব্যবহার হয়। কিন্তু বর্তমানে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর মানুষের অনাস্থা তৈরি হয়েছে। যারা ব্যাংকে স্থায়ী আমানত করেছিলেন তারা স্থায়ী আমানতের মেয়াদ শেষ হলেও নির্দিষ্ট সময়ে টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। গ্রাহকরা নানা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বিগত সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা ব্যাংক ব্যবস্থাকে চরম ধসে ফেলে গেছেন। ফলে ব্যাংকের মাধ্যমে সঞ্চয়ের যে স্বাভাবিক প্রবাহ থাকা উচিত, সেটি ব্যাহত হচ্ছে। এক সময় পোস্ট অফিস সঞ্চয় ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতির একটি অংশ সঞ্চয়ের আওতায় আনা হতো। কিন্তু বর্তমানে এটি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত এবং বেসরকারি ব্যাংকগুলোরও বিপুলসংখ্যক শাখা রয়েছে, কিন্তু অর্থনীতিতে যে উদ্দেশ্যে ব্যাংক থাকে বা পরিচালিত হয়, সেটি বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ফলে অর্থনীতির কাঠামোগত সমস্যাগুলোর দিকে নজর দেয়া জরুরি, নতুবা শুধু আইএমএফের প্রেসক্রিপশন দিয়ে এ সংকট থেকে বের হওয়া সম্ভব হবে না।

অর্থনীতিতে অনেক দুর্বল ব্যাংক রয়েছে সেগুলোকে টিকিয়ে রাখা সমাধান? ঋণখেলাপির পরিমাণও অনেক বেশি। এ ব্যাংক খাত কীভাবে সঠিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব বলে আপনি মনে করেন?

এটি আমার পক্ষে বলা খুব কঠিন। যেকোনো ব্যক্তির পক্ষেই এককভাবে এ সমস্যার সমাধান দেয়া কঠিন। প্রথমত, যেসব দুর্বল ব্যাংকের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে অন্তত ১০টি ব্যাংককে ‘‌রেড লাইন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এখন যদি সরকার এ ব্যাংকগুলোকে সহায়তা করতে চায়, তাহলে তাদের টিকিয়ে রাখতে সরকারকে অর্থ দিতে হবে। এরই মধ্যে সরকার এ পদক্ষেপ নিয়েছে এবং টাকা ছাপিয়ে এ ব্যাংকগুলোকে দেয়া হয়েছে। টাকা ছাপিয়ে ব্যাংক বাঁচানোর যে প্রয়াস মূল্যস্ফীতি আরো বাড়িয়ে দেবে। অর্থনীতিতে টাকা ছাপানোকে ‘‌পাম্প প্রাইমিং’ বলা হয়। টাকা ছাপিয়ে কোনো সমস্যার সমাধানকে সম্ভাব্য নিম্নমানের সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি আসলে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়, বরং অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এর ফলে বাজারে মুদ্রার সরবরাহ বেড়ে যায় এবং মূল্যস্ফীতির চাপ আরো বাড়ে। টাকা ছাপানোও মূল্যস্ফীতি না কমার অন্যতম কারণ।

ঋণখেলাপিদের ঋণ আদায়ের জন্য শক্ত পদক্ষেপ দরকার। সব ঋণ আদায় করা যাবে সেটিও আশা করা যায় না। খেলাপি ঋণ অসৎ ব্যবসায়ীর হাতে চলে গিয়েছে। এর প্রধান কারণ সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই না করেই রাজনৈতিক চাপে অনেক ক্ষেত্রে ঋণ দেয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বা সরকারঘনিষ্ঠদের ঋণ দেয়া সর্বাগ্রে বন্ধ করতে হবে। সৎ ঋণগ্রতাদের ঋণ দিতে হবে এবং ঋণখেলাপিদের ঋণ দেয়া বন্ধ করতে হবে। এর বাইরে আর কোনো সমাধান নেই। যারা ঋণখেলাপি হয়েছে তাদের কীভাবে আইনের আওতায় আনা যায় সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। ঋণখেলাপিদের লাল তালিকা করতে হবে, যাতে তারা ভবিষ্যতে আর কোনো ঋণ না পায়।

বড় বড় ঋণখেলাপির মালিকানায় শিল্প-কারখানা রয়েছে এবং এসব প্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করছেন। যদি কেবল ঋণখেলাপির কারণে এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায় তাহলে অনেক শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বেন, যা নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করতে পারে। যেমন সাম্প্রতিক সময়ে একজন বড় ঋণখেলাপির কারণে প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক বেকার হয়েছেন। এসব শ্রমিককে আন্দোলনের জন্য উসকানি দিচ্ছেন। এসব ক্ষেত্রে নীতি গ্রহণ খুবই কঠিন বিষয়।

এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্র খুবই দুর্বল। এসব শিল্প-প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণে নিয়ে পরিচালনা করতে পারে। দক্ষ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে হস্তান্তর করতে পারে। তবে এটি কতটা কার্যকর হবে, সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কারণ রাষ্ট্রের সামর্থ্য ও দক্ষতা এখানে বড় প্রশ্ন।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম দাবি ছিল কর্মসংস্থানে সমতা আনা। বর্তমানে বেকারত্ব বাংলাদেশের জন্য বড় উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশের কোম্পানিগুলো বলছে, তারা বিনিয়োগ আগ্রহ পাচ্ছে না বা নিরাপদ বোধ করছে না। বিদেশী বিনিয়োগও আসছে না। বাংলাদেশকে বিনিয়োগবান্ধব দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে কী ধরনের নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন?

এটি কোনো অর্থনৈতিক সমস্যা নয় বরং এটি একটি রাজনৈতিক সমস্যা। যদি কেউ এটিকে শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা মনে করেন, তিনি ভুল করবেন—বিশেষ করে আমাদের মতো দেশে। এখানে বিনিয়োগ একেবারে হচ্ছে না কিংবা বিনিয়োগ করার মতো অর্থ নেই তা কিন্তু নয়। অনেকে ব্যাংকে টাকা রাখেন না, অন্য কোনো জায়গায় রাখেন। এমনকি অনেকের বাড়িতে বস্তায় বস্তায় টাকাও পাওয়া যায়। এর অর্থ এখানে প্রচুর কালো টাকা বা অনিয়মিত আয়ের অর্থ রয়েছে। যদি এ অর্থ বিনিয়োগ হতো, তাহলে দেশের জন্য ভালো হতো। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। এর মূল কারণ দুটি—প্রথমটি উপযুক্ত নীতির অভাব এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে রাজনৈতিক অস্থিরতা।

অনেকেই মনে করেছিলেন, গত সাড়ে ১৫ বছরে শেখ হাসিনার সরকার অত্যন্ত স্থিতিশীল ছিল এবং অপরিবর্তনীয়। কিন্তু সেই স্থিতিশীলতার মধ্যেই নিহিত ছিল প্রচণ্ড অস্থিতিশীলতার বীজ। এ কারণে সেসময়ও বিনিয়োগ তেমন বাড়েনি। বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থানও বাড়বে না। বর্তমান পরিস্থিতিও একইরকম। সরকারের ছয় মাস পার হলেও এখনো স্থিতিশীল হয়নি। বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি ফিরে আসেনি। এর অন্যতম কারণ হলো দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা এবং পতিত সরকারের বাইরে থেকে চক্রান্ত ও উসকানি দিয়ে অস্থিরতা তৈরি করছে। বাংলাদেশ থেকেও আমরা খুব প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছি। সবকিছু মিলিয়ে দেশে প্রচণ্ড অস্থির অবস্থা দেশে বিরাজ করছে। এ অস্থির অবস্থায় নতুন কেউ ব্যবসা-বাণিজ্য করার জন্য বা বিনিয়োগ করার জন্য এগিয়ে আসবে সেটি বেশ কঠিন।

বিগত সরকারের শাসনামলে ১০০টি ইপিজেড বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এসব ইপিজেডে কি সত্যিই উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ এসেছে? একটি আদর্শ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে হলে জমি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহন ব্যবস্থা এবং আইন-শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সেখানে বিনিয়োগকারীরা নিরবচ্ছিন্ন সুবিধা পাবেন। কিন্তু বাস্তবে গত ১৫ বছরের শাসনে এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে তেমন কিছুই লক্ষ করলাম না।

বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের স্থান নির্বাচনসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিতর্ক আছে। মিরসরাইসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চল নিয়ে বিতর্ক আছে। বিদেশী বিনিয়োগ কীভাবে আসবে? এখানে দেশীয় বিনিয়োগ না হলে বিদেশী বিনিয়োগও হবে না। বাংলাদেশের জন্য কিছু সুযোগও রয়েছে। যেমন চীন থেকে অনেক শিল্প-কারখানা স্থানান্তর হতে পারে। অন্যান্য দেশেও শ্রম খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় গন্তব্য হতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো আমরা সেই পরিবেশ গড়ে তুলতে পারি না। দেশীয় উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আগ্রহ না দেখালে বিদেশীরাও বিনিয়োগে এগিয়ে আসবেন না। কারণ বিদেশীরা প্রথমে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের রিটার্ন দেখে হিসাব কষে সিদ্ধান্ত নেন।

আপনি কালো টাকার কথা বলেছেন। অনেকের বাসায় কোটি কোটি টাকা আছে। তারা ব্যাংকে টাকা রাখছেন না। ফলে অনেক ব্যাংকে টাকা নেই। অভ্যুত্থানের পর কেউ কেউ ডিমনিটাইজেশনের (মুদ্রা প্রত্যাহার) কথা বলছেন। ১ হাজার টাকার নোট বাতিল করলে কোনো ফল পাওয়া যেত বলে মনে করছেন অনেকেই। আপনি বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

আমাদের ডিমনিটাইজেশনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। শেখ মুজিবের বাকশাল সরকারের প্রথম দিকে ১০০ টাকার নোট বাতিল করা হয়েছিল। তখন এটি মোটামুটি কার্যকর ছিল। তখন দেখা গিয়েছিল, কালো টাকার মালিকরা ব্যাংকে টাকা জমা না দিয়ে খালে-বিলে ফেলে দিচ্ছিলেন। কারণ তারা ভেবেছিলেন টাকাটা দিলে তাদের জবাবদিহি করতে হবে বা জেলে যেতে হতে পারে।

বর্তমানে অনেকেই ১০০০ টাকার নোটকে ডিমনিটাইজেশনের কথা বলছেন। এটি কালো টাকা উদ্ধারের জন্য এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে। আমি মনে করি, কালো টাকা উদ্ধারের চেয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য এটি করা যেতে পারে এবং এর মাধ্যমে কিছু ভালো ফলাফলও আসতে পারে। তবে বর্তমান অর্থনীতি ১৯৭৫ সালের অর্থনীতি নয়। এখন অর্থনীতির পরিধি ব্যাপকভাবে বেড়েছে এবং এটি আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক—দুই খাতেই স্ফীত হয়েছে।

বর্তমানে মানুষের যাতায়াত ও ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। ব্যবসায়িক কারণেই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে মানুষের যাতায়াত বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় হঠাৎ করে ১ হাজার টাকার নোট বাতিল করা হলে অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা (শক এফেক্ট) আসবে। এ ধরনের বড় ধাক্কা আমাদের অর্থনীতি কতটা সহ্য করতে পারবে, তা বিবেচনা করা জরুরি।

এটি করার আগে অবশ্যই সরকারকে দেখতে হবে যে, এখন পর্যন্ত কতগুলো ১০০০ টাকার নোট ইস্যু করা হয়েছে এবং তার মধ্যে কতগুলো সক্রিয়ভাবে প্রচলনে আছে আর কতগুলো অপ্রচলিত অবস্থায় পড়ে আছে। একটি বিস্তারিত গবেষণা ও পরিকল্পনা ছাড়া এ ধরনের পদক্ষেপ অর্থনীতিকে আরো স্থবির করে ফেলতে পারে। এক্ষেত্রে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার প্রয়োজন। ভারতেও নরেন্দ্র মোদি সরকার এটি করেছিল, কিন্তু তেমন সুফল পায়নি। তাই এটি সবসময় ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে, সেটাও বলা যায় না। আমি এ বিষয়ে দ্বিধান্বিত—ভালোও হতে পারে, খারাপও হতে পারে, দুটোই সম্ভব।

আমাদের জনসংখ্যা একটি বড় ধরনের সমস্যা। আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠী সাত-আট কোটি, যাদের গড় বয়স ২৬ বছর। এ তরুণ জনগোষ্ঠীকে মানবসম্পদে রূপান্তরের কথা বলা হচ্ছে। তরুণ জনগোষ্ঠীকে মানবসম্পদে রূপান্তরের জন্য আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কি যথেষ্ট যুগোপযোগী কিনা বা বাজার উপযোগী কিনা?

‘‌বাজার উপযোগী’ শব্দটি ব্যবহার না করে ‘‌জীবন উপযোগী’ বলতে চাই। বেঁচে থাকা, সুস্থ থাকা, কর্মক্ষম থাকা, সৃজনশীল হওয়া ও উৎপাদনশীল হওয়া—এসব কিছুই এ জীবনের মধ্যে আছে। বাজারের গুরুত্ব অবশ্যই আছে। বাংলাদেশে বাজার ব্যবস্থা এখন দেশের আনাচ-কানাচে প্রবেশ করেছে, এমনকি পার্বত্য অঞ্চলগুলোয় পৌঁছে গেছে। সেদিক থেকে বাজার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ফলে বাজারের চাহিদা বিবেচনা করা জরুরি।

কিন্তু দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অবস্থা কী? শিক্ষা ব্যবস্থা আছে বলেই তো মনে হয় না। যারা এমএ পাস করছে, তাদের মধ্যে খুব অল্পসংখ্যকই প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করছে। অধিকাংশ শিক্ষার্থী শুধু সার্টিফিকেট পাচ্ছে, কিন্তু বাস্তব কোনো দক্ষতা অর্জন করছে না। আমার নিজের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, শিক্ষার্থীদের লার্নিং স্কিল অত্যন্ত দুর্বল। তারা এমন কোনো জ্ঞান অর্জন করছে না, যা তাদের মানবসম্পদে পরিণত করবে।

আমাদের শিক্ষায় একটি খারাপ আরেকটি খারাপের জন্ম দিচ্ছে। সেই খারাপ আরো খারাপের জন্ম দিচ্ছে। প্রাথমিকের শিক্ষকের মান অতীতের তুলনায় অনেক হ্রাস পেয়েছে। ব্রিটিশ আমলে যারা প্রাথমিকের শিক্ষক ছিলেন তারা শিক্ষার প্রতি আন্তরিক ছিলেন। তারা প্রকৃতপক্ষে গুরু ছিলেন। আর যারা শিক্ষকতা পেশায় আসেন তাদের এ পেশাকে ব্রত হিসেবে নিতে হয়। কিন্তু শিক্ষকতা পেশাকে ব্রত হিসেবে কেউ নিচ্ছে না। বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষা দুর্বল। তার মানও খারাপ। এর প্রভাব পড়ছে মাধ্যমিকে। আর মাধ্যমিক শিক্ষা খারাপ। মাধ্যমিকের প্রভাব পড়ছে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষায়। উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা খারাপ হওয়ায় এর প্রভাব পড়ছে উচ্চশিক্ষায়। সমস্যা কোথায়? কোনো ছাত্রের মান যদি ভালো হয়, তাহলে কোনো শিক্ষককে ধারাবাহিকভাবে নিজের মানোন্নয়নের জন্য পড়াশোনা করতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এটি একটি চাপ হিসেবে কাজ করে। কিন্তু ছাত্ররা যদি সে রকম চ্যালেঞ্জিং না হয় তাহলে শিক্ষকের মানও উন্নত হবে না। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ভালো শিক্ষকের অভাব রয়েছে। বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি অনেক বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে প্রকৃতপক্ষে যোগ্য শিক্ষক কতজন আছেন? কতজন যোগ্য অধ্যাপক কতজন আছেন?—এটি একটি বড় প্রশ্ন।

আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে ব্যর্থ?

শিক্ষক ছাড়া শিক্ষা হতে পারে না। এরপর ভালো গ্রন্থাগার ও ভালো গবেষণাগার দরকার। অন্যান্য আধুনিক শিক্ষা সহায়ক উপকরণগুলো দরকার। কম্পিউটার ল্যাব দরকার। এগুলো কোনোটিই আমাদের দেশে নেই। এ কারণে গুণগত শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষাককে এখন বাণিজ্যিকীকরণ করা হচ্ছে। শিক্ষা বাজারমুখী হয়েছে। কিন্তু বিকৃত বাজারমুখী হয়েছে। কোচিং সেন্টার, গাইড বই ও পরীক্ষায় নকলের প্রতি প্রবণতা বাড়ছে। এখন শিক্ষার্থীদের মধ্যে যেকোনো ডিগ্রি নেয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এটিকে বলা হয় ডিপ্লোমা ডিজিজ। এই ডিপ্লোমা ডিজিজ যতদিন থাকবে ততদিন সঠিক ডিপ্লোমা ডিগ্রি হবে না। হচ্ছেও না। এ ডিপ্লোমা ডিগ্রি বিয়ের বাজারে কাজে লাগবে। কিন্তু সত্যিকার দেশের কাজে লাগা এবং নিজের জীবনে লাগা— সেটাও সম্ভব হচ্ছে না।

কোনো দেশ মানবসম্পদকে উন্নত না করে কোনো কিছুই অর্জন করতে পারে না। দারিদ্র্য ও অসমতা কমাতে মানবসম্পদ উন্নয়নের বিকল্প নেই। কারণ শিক্ষা মানুষের মধ্যে একটি সুযোগ সৃষ্টি করে। সেই শিক্ষা মানুষ পাচ্ছে না যে শিক্ষা দিয়ে নিজে সুযোগ সৃষ্টি করতে পারেন এবং সম্ভাব্য সুযোগকে কাজে লাগাতে পারেন। এসব কারণে বাস্তবে শিক্ষায় যে বিনিয়োগ হচ্ছে তা কোনো কাজে আসছে না।

বর্তমানে শিক্ষায় সরকারের ব্যয় জিডিপির ২ শতাংশের নিচে। কিন্তু অনেকেই বলেন, শিক্ষায় ব্যয় যদি জিডিপির ৪-৫ শতাংশ করা যায় তাহলে শিক্ষার মান কিছুটা বাড়তে পারে। যারা মানবসম্পদের উন্নয়ন ঘটায় তারা প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন।

শুধু বাজেট বাড়ালেই হবে না বরং একটি সমন্বিত পরিকল্পনা জরুরি। ভালো শিক্ষক তৈরিতে কাজ করতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষা, মাধ্যমিক শিক্ষা, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা ও উচ্চ শিক্ষার মানোন্নয়নে কাজ করতে হবে। পাঠ্যক্রম উন্নয়ন এবং শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে।

আমাদের সরবরাহ চেইনে সমস্যা রয়েছে। চাঁদাবাজি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে কৃষক ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। অথচ ভোক্তাকে উচ্চমূল্যে পণ্য কিনতে হচ্ছে, যা মূল্যস্ফীতি বাড়াচ্ছে। সরবরাহ চেইনের সংকটের জটিলতাগুলো কাটাতে পারছি না কেন?

সোজা কথা, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং বাস্তবতার মুখোমুখি হতে চান না কেউ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে চান না। সত্যিই যদি সরকার চায় সড়কে চাঁদাবাজি যেভাবেই হোক উচ্ছেদ করবে তাহলে তা সম্ভব। প্রচুর নজরদারি বাড়াতে হবে। সরকারের কর্তাব্যক্তিদের মাঠে নামতে হবে। পুলিশ বা অন্যান্য জায়গায় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কীভাবে কাজ করছে, হাট-বাজারগুলোর পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে হয়তো কিছুটা এ অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। কিন্তু চাঁদাবাজি এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয়। ব্যবসায়ীরাও অনেকটাই মেনে নিয়েছেন। তাদের হিসাবের মধ্যে, ক্যালকুলেশনের মধ্যে এ ব্যয়টি যোগ করে তারা তাদের পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করেন। ফলে চাঁদাবাজির খরচ শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। এটা অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতি এবং এখান থেকে বেরিয়ে আসা বেশ কঠিন।

এ সংকট সমাধানের জন্য কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং মানুষকে একত্রিত করা—যাতে কেউ এ অন্যায় ব্যবস্থায় অংশ না হয়। যখন সব জায়গা থেকে চাপ আসবে, তখন ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ একসঙ্গে প্রতিবাদ করতে পারবে।

রাজনৈতিক ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। এক্ষেত্রে শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে, যারা সারা বাংলাদেশে বিভিন্ন কি-পয়েন্টসে ঘুরে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে। তারা হঠাৎ করে নির্দিষ্ট স্থানে ভিজিট করবে, যাতে কেউ আগেভাগে জানতে না পারে। যদি এ কার্যক্রম ছয়-নয় মাস ধারাবাহিকভাবে চালানো যায়, তাহলে চাঁদাবাজ চক্র দুর্বল হয়ে পড়বে। এ টাস্কফোর্সের পেছনে যে খরচ হবে, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া যাবে।

গত দেড় যুগের শাসন ব্যবস্থাকে কেউ অলিগার্ক-তোষণমূলক ব্যবস্থা বলছেন। সামনের দিনগুলোয় নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্ত আশা করতে পারি?

একটি বন্দোবস্ত হলো একটি কার্যকর সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে। বিদ্যমান সংবিধানে অনেক অগণতান্ত্রিক ধারা রয়েছে, সেগুলো থেকে আমাদের মুক্ত হতে হবে।

অনেকে ১৯৭২ সালের সংবিধানকে অপরিবর্তিত রাখার কথা বলেন। আমরা দেখেছি কীভাবে সেটা একজন বিশেষ ব্যক্তিকে সামনে রেখে প্রণয়ন করা হয়েছিল। এ ধরনের সংবিধান থেকেই স্বৈরতন্ত্রের উত্থান ঘটেছে। ফলে ১৯৭২-এর সংবিধানকে নিখুঁত বা আদর্শ দলিল বলা যায় না। একাধিক সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানকে জটিল ও ভারাক্রান্ত করা হয়েছে।

আমাদের প্রয়োজন একটি সর্বসম্মত জাতীয় সনদ বা জাতীয় চার্টার, যা সব রাজনৈতিক পক্ষের সম্মতিতে প্রণীত হবে। এটিকে নতুন বন্দোবস্ত না বলে একটি সামাজিক চুক্তি বলা যেতে পারে। অবশ্যই ১৮ কোটি মানুষ সরাসরি এ সিদ্ধান্তে আসতে পারবে না। তবে তাদের প্রতিনিধিরা জনগণের প্রত্যাশা ও চাহিদার ভিত্তিতে একটি ন্যায্য দলিল তৈরি করতে পারেন। এ সামাজিক চুক্তি যতটা সম্ভব সংক্ষিপ্ত, স্পষ্ট এবং দ্ব্যর্থহীন ভাষায় লেখা উচিত, যাতে সবাই সহজে বুঝতে পারে। এটি সর্বোচ্চসংখ্যক মানুষের সম্মতিতে গৃহীত হওয়া উচিত।

গণতন্ত্রের অনেক অংশীজন—শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত, পেশাজীবী, আমলাতন্ত্র, পুলিশ, সামরিক বাহিনীসহ সবাই। এখানে দেখা যাচ্ছে কিছু লোকের প্রবল শক্তি আছে, আবার কিছু লোক পুরোপুরি শক্তিহীন। নতুন সামাজিক চুক্তির লক্ষ্য হবে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করা। বর্তমানে ক্ষমতা ভারসাম্যহীন এবং একপেশে হওয়ায় প্রকৃত গণতন্ত্রের উপস্থিতি খুবই ক্ষীণ। সাম্যের নীতি অর্জনও কঠিন হয়ে পড়েছে। ক্রমান্বয়ে দেশ অসাম্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ক্রোনি ক্যাপিটালিজম বা অলিগার্কি সৃষ্টি করে অসাম্যকে বহুগুণে বৃদ্ধি করা হয়েছে। পরিসংখ্যান থেকে যে অসাম্যের কথা জানি, বাস্তবে অসাম্য বহুগুণে বেশি।

এ অবস্থায় কেনিথ গলব্রেইথ বলেছেন, সমাজে ক্ষমতার প্রতিরোধমূলক ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। এজন্য সমাজে বাণিজ্য সংঘ, কৃষক সংগঠন ও শ্রমিক সংগঠনকে শক্তিশালী করতে হবে। বর্তমানে মালিকদের সংগঠন আছে, কিন্তু শ্রমিক ও কৃষকদের সংগঠন দুর্বল। যদি শক্তিশালী কৃষক সংগঠন দরকার, কৃষক সংগঠন থাকলে তারা বাজারে ন্যায্যমূল্যের জন্য দর-কষাকষি করতে পারত।

সর্বস্তরের মানুষকে সংগঠিত করতে হবে। শুধু নাগরিক সমাজ নিয়ে আলোচনা করলেই হবে না; সমাজের প্রতিটি শ্রেণী, পেশাজীবী এবং গোষ্ঠীকে সংঘবদ্ধ করতে হবে। অধিকারের পাশাপাশি দায়িত্বও নির্ধারণ করতে হবে। অধিকারের পাশাপাশি দায়িত্ব ও কর্তব্যের বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।

আমরা প্রায়ই দৈনন্দিন রাজনীতিতে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাই। অনেক ক্ষেত্রে আমরা অপ্রয়োজনীয় কথা বেশি বলি। কিন্তু আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষকে একটি যৌক্তিক ও ফলপ্রসূ রাজনৈতিক কর্মপন্থার দিকে পরিচালিত করা।