বাংলাদেশ বারবার রাজনৈতিক অস্থিরতার চক্রের মধ্য দিয়ে গেছে। নির্বাচনোত্তর অস্থিতিশীলতা ও সংঘাত বাংলাদেশে একটি সাধারণ ঘটনা। ১২ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্বের আগে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, দেশজুড়ে নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সহিংসতা আরো বাড়বে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুসারে, ১-২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত ৬৫টি সংঘর্ষে কমপক্ষে ১০ জন নিহত এবং ৫৫৫ জন আহত হয়েছেন। বেশির ভাগ সংঘর্ষ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপি ও এনসিপির নেতাকর্মীদের মধ্যে। আবার বিএনপির দুই পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘটিত হয়েছে। দুটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের সদস্যদের মধ্যে অসহনীয় আচরণ চলতে থাকলে নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা সহিংসতা আরো মারাত্মক হয়ে উঠবে।
নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা বলতে বিতর্কিত নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণার তীব্র উত্তেজনা, অসহযোগ আন্দোলন, আইন অমান্য, বিক্ষোভ, সহিংসতা বা প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের সময়কালকে বোঝায়। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে, নির্বাচন-পরবর্তী অস্থিরতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্র এবং উদীয়মান রাজনৈতিক ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করছে। বিশেষ করে যেসব দেশে নির্বাচনকে ত্রুটিপূর্ণ, বর্জনমূলক অথবা কারচুপিপূর্ণ বলে মনে করা হয়, সেখানে নির্বাচনোত্তর অস্থিরতা একটি সমস্যায় পরিণত হয়েছে। যদিও অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্য হলো শান্তিপূর্ণভাবে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সমাধান করা, কিন্তু অনেক সময় নির্বাচন শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ ও আইনি চ্যালেঞ্জ থেকে শুরু করে সহিংসতা, শাসন ব্যবস্থার ভাঙন এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য হুমকি সৃষ্টি হয়।
২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কার্নেগি গ্লোবাল প্রোটেস্ট ট্র্যাকারের তথ্যমতে, এ বছর ১৬০টিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ সরকারবিরোধী বিক্ষোভ সংঘটিত হয়েছে, যার অনেকগুলোর পেছনে ভোটসংশ্লিষ্ট অসন্তোষ কাজ করেছে। নির্বাচনোত্তর অস্থিরতা সাধারণত বিভিন্ন রূপে প্রকাশ পায়, যার মধ্যে রয়েছে যেমন গণবিক্ষোভ, ধর্মঘট, সড়ক অবরোধ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহিংস সংঘর্ষ, দমনপীড়ন এবং সাম্প্রদায়িক বা জাতিগত দাঙ্গা।
নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার দেশগুলোর উদাহরণ: যদিও ১৯৯০ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে বহুদলীয় নির্বাচনের প্রসার ঘটেছে, কিন্তু নির্বাচনের পরবর্তী সময়টি এখনো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সবচেয়ে অস্থির পর্যায়গুলোর একটি। উদাহরণস্বরূপ, গত এক দশকে আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকায় বারবার নির্বাচনোত্তর রাজনৈতিক অস্থিরতার ঘটনা ঘটেছে। এটি বিশেষত উন্নয়নশীল দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বেশি দেখা যায়, যেখানে নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা এখনো নাজুক। সাম্প্রতিক সময়ে পেরু, ব্রাজিল, বলিভিয়া, ভেনিজুয়েলা, মোজাম্বিক, তানজানিয়া, কেনিয়া, নাইজেরিয়া, জিম্বাবুয়ে, আইভরি কোস্ট এবং উগান্ডার অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে বিতর্কিত নির্বাচনী ফলাফল ও দুর্বল প্রতিষ্ঠান কীভাবে নির্বাচনোত্তর অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
যেমনটি ভেনিজুয়েলা (২০২৪), মোজাম্বিক (২০২৪) ও তানজানিয়ায় (২০২৫) নির্বাচন-পরবর্তী অস্থিরতা ও প্রাণহানির দিকে পরিচালিত করে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে মোজাম্বিকে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর বিরোধী দলগুলোর জালিয়াতির অভিযোগের পর সহিংস বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, যার জবাবে নিরাপত্তা বাহিনী বেআইনি শক্তি প্রয়োগ ও গণগ্রেফতার চালায়।
তানজানিয়ার ২০২৫ সালের সাধারণ নির্বাচন দেশটির ইতিহাসের অন্যতম সহিংস নির্বাচনোত্তর সময় পার করেছে, যেখানে শত শত মানুষের মৃত্যু, গণগ্রেফতার এবং ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনা ঘটে।
দক্ষিণ আমেরিকায় ভেনিজুয়েলা নির্বাচনোত্তর অস্থিরতার অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর দেশব্যাপী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, যখন জনগণ নিকোলাস মাদুরোর বিজয়কে চ্যালেঞ্জ করে। এমনকি ইউরোপের দেশ জর্জিয়াতেও ২০২৪ সালে কথিত নির্বাচনী জালিয়াতির অভিযোগের পর বিক্ষোভ শুরু হয়, যার ফলে সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা দেখা দেয়।
নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণ: নির্বাচন-পরবর্তী অস্থিরতা সাধারণত কোনো একক কারণে ঘটে না; বরং এটি রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক নানা উপাদানের সম্মিলিত প্রভাবে নির্বাচনোত্তর সংকট তৈরি হয়।
বিতর্কিত নির্বাচনী ফলাফল: নির্বাচনোত্তর অস্থিরতার সবচেয়ে তাৎক্ষণিক কারণ হলো নির্বাচনী ফলাফলকে জালিয়াতি বা প্রভাবিত বলে জনমনে বিশ্বাস জন্মানো। ভোট কারচুপি, পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচন কমিশন, অথবা ভোট গণনায় স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ জনসাধারণের আস্থা নষ্ট করতে পারে এবং ব্যাপক বিক্ষোভের জন্ম দিতে পারে।
দুর্বল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান: দুর্বল বিচার ব্যবস্থা, দুর্বল সংসদ, দলীয়করণে আক্রান্ত সেনাবাহিনী বা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত নিরাপত্তা বাহিনী থাকা দেশগুলোতে অস্থিরতার ঝুঁকি বেশি। নাগরিকরা যখন ন্যায়সংগতভাবে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা হারায়, তখন তারা সড়ক আন্দোলন বা সহিংসতার দিকে ঝুঁকে পড়ে।
রাজনৈতিক মেরুকরণ: তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ নির্বাচনোত্তর অস্থিরতা বাড়িয়ে তোলে। যখন বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর নির্বাচনে হেরে যাওয়াকে অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে দেখা হয়, যা রাজনৈতিক উত্তেজনার সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে। তাছাড়া রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য এবং কর্মকাণ্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যখন প্রার্থীরা পরাজয় স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানান এবং প্রমাণ ছাড়াই ফলাফলের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন অস্থিরতা আরো বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
গণমাধ্যম ও তথ্যযুদ্ধ: প্রচলিত ও ডিজিটাল গণমাধ্যম নির্বাচনোত্তর অস্থিরতা ত্বরান্বিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ভুয়া তথ্য, উসকানিমূলক বক্তব্য এবং নির্বাচন জালিয়াতি-সংক্রান্ত গুজব জনমনে উদ্বেগ ও উত্তেজনা সৃষ্টি করে।
সামাজিক-অর্থনৈতিক অসন্তোষ: বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্য, বেকারত্ব বা মুদ্রাস্ফীতি নির্বাচনোত্তর অস্থিরতাকে বাড়িয়ে তোলে। বেকার যুবসমাজ, যারা ক্রমে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন, অনেক দেশেই নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে।
বাংলাদেশে ২০২৬ সালের নির্বাচনের পরবর্তী পরিস্থিতি: যদিও দেশে নিয়মিত বহুদলীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তবে বিতর্কিত নির্বাচনের পর প্রায়ই গণবিক্ষোভ, প্রাতিষ্ঠানিক সংকট এবং কখনো কখনো সহিংস দমননীতি দেখা যায়। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়। তবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ প্রধান বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বর্জনের মাধ্যমে এ দাবি করে যে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়ার মতো পরিবেশ ছিল না। ফলস্বরূপ, নির্বাচন-পরবর্তী সময় রাজনৈতিক বিতর্ক, বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন, কম জনসাধারণের অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দ্বারা চিহ্নিত হয়েছে। ফলে বৈধতার সংকট এবং পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের আগস্টে একটি ছাত্র নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের আওয়ামী শাসনামলের অবসান ঘটে।
অন্তর্বর্তী সরকার ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে এ নির্বাচনও দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ ছাড়াই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। কারণ সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় অন্তর্বর্তী সরকার দলটির সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে।
নির্বাচনোত্তর অস্থিরতা বাংলাদেশের জন্য সুদূরপ্রসারী পরিণতি ডেকে আনে। নির্বাচন-পরবর্তী অস্থিরতা অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা দুর্বল করতে পারে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করতে পারে। বিক্ষোভকারী এবং নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষের ফলে হতাহতের ঘটনা, গ্রেফতার এবং নাগরিক স্বাধীনতা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটতে পারে। অধিকন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে, বাজার ব্যাহত করে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ধীর করে দেয়। দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার সময়ে পর্যটন, বাণিজ্য ও জনসেবা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ক্ষুণ্ণ করে, ভোটার অংশগ্রহণ নিরুৎসাহিত করে এবং কর্তৃত্ববাদী হস্তক্ষেপকে ন্যায্যতা দেয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে।
নির্বাচনোত্তর অস্থিরতা প্রতিরোধের কৌশল: বাংলাদেশে নির্বাচন-পরবর্তী শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য একটি সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। যদিও নির্বাচনের পরিণতি প্রায়ই অমীমাংসিত উত্তেজনা প্রকাশ করে যা শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ।
নির্বাচন-পরবর্তী অস্থিরতা মোকাবেলায় বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি এবং সময়োপযোগী প্রতিরোধমূলক কূটনীতি প্রয়োজন। কার্যকর প্রতিরোধের জন্য নির্বাচন-পর্বের আগে, চলাকালে এবং পরেও নির্বাচনী সততা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সংঘাত-সমাধান ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। নির্বাচন-পরবর্তী অস্থিরতার ঝুঁকি ও প্রভাব কমাতে অন্তর্বর্তী সরকারের সামগ্রিক কৌশল থাকা আবশ্যক।
নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালীকরণ: নির্বাচন ফলাফলের প্রতি আস্থা তৈরির জন্য স্বচ্ছ ভোটার নিবন্ধন, পোস্টাল ভোট-সম্পর্কিত কার্যক্রমে স্বচ্ছতা (বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবার), বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থাপনা সংস্থা, স্বাধীন পর্যবেক্ষক এবং স্পষ্ট ভোট গণনা পদ্ধতি অপরিহার্য।
কার্যকর আইনি বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা: নিরপেক্ষ আদালত বা নির্বাচন ট্রাইব্যুনাল রাস্তায় নেমে আন্দোলনের পরিবর্তে আইনি পথে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ দেয়। অভিযোগের বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য শক্তিশালী আইনি কাঠামো সংঘাতের ঝুঁকি কমায়।
সংলাপ ও সমঝোতার সংস্কৃতি: প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে মধ্যস্থতা করার জন্য একটি সংস্কৃতি গড়ে তোলা উচিত যেখানে সুশীল সমাজ বা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যাতে উত্তেজনা বৃদ্ধি রোধে সহায়তাকারী হিসেবে কাজ করতে পারে।
মিডিয়া সচেতনতা: বিভ্রান্তিমূলক তথ্য রোধ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা নির্বাচনোত্তর সংবেদনশীল সময়ে জনআস্থা বজায় রাখতে সাহায্য করে। নির্বাচনী প্রক্রিয়া সম্পর্কে নাগরিককে সচেতন করা ও তথ্যগ্রহণে সমালোচনামূলক মনোভাব গড়ে তোলা উত্তেজনা কমাতে ভূমিকা রাখে।
নিরাপত্তা বাহিনীর পেশাদারত্ব: বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীকে নিরপেক্ষ ও সংযত আচরণ করতে হবে। নিরাপত্তা বাহিনীর পেশাদারত্ব বিক্ষোভের সময় নাগরিকদের অধিকার রক্ষা করে এবং বিক্ষোভের তীব্রতা রোধ করতে সহায়তা করে। নাগরিক অধিকার রক্ষা এবং সহিংসতা প্রতিরোধের জন্য নির্দলীয় পুলিশিং এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য।
যদিও নির্বাচন গণতান্ত্রিক বৈধতার কেন্দ্রে থাকলেও এর পরবর্তী সময় পরিণতি প্রায়ই অমীমাংসিত উত্তেজনা প্রকাশ করে, যা বাংলাদেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ। পরাজিত রাজনৈতিক দলগুলোকে পরাজয় মেনে নেয়া ও পরিমিত আচরণের মাধ্যমে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের জনগণ প্রত্যাশা করে যে রাজনৈতিক নেতারা সহিংসতা পরিহার করবেন এবং অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে অসন্তোষ প্রকাশ করবেন। এসব বিক্ষোভের মধ্যে মিছিল, অবস্থান কর্মসূচি ও জনসমাবেশ থাকতে পারে, যেখানে ভোট পুনর্গণনা, সংস্কার বা পুনর্নির্বাচনের দাবি উত্থাপন করা হয়। নির্বাচন হারাকে অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে দেখা উচিত নয়।
রাজনৈতিক নেতারা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সম্মান জানিয়ে, যাচাই করা ফলাফল মেনে নিয়ে এবং সমর্থকদের সহিংসতা থেকে বিরত রেখে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। রাজনৈতিক ও সুশীল সমাজ নেতাদের অবশ্যই স্পষ্টভাবে সহিংসতার নিন্দা করতে হবে, এমনকি ফলাফল প্রতিকূল হলেও। রাজনৈতিক সহিংসতা যে সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তির ধ্বংস, সেবা ব্যাহত করবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা হ্রাস করবে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে—এ উপলব্ধি সমাজে গড়ে তুলতে হবে। যে রাজনৈতিক দল বা জোট সরকার গঠনের সুযোগ পাবে, তাদের অন্তত কিছু সময় দেশ পরিচালনার সুযোগ দিতে হবে। নির্বাচনোত্তর দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা ও সহিংসতা জনসাধারণের মধ্যে অসন্তুষ্টি তৈরি করবে। ফলস্বরূপ কর্তৃত্ববাদী হস্তক্ষেপ অপরিহার্য হয়ে উঠবে। কারণ বাংলাদেশে এ মুহূর্তে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও অনিশ্চয়তামুক্ত একটি পরিবেশের অত্যন্ত প্রয়োজন।
ড. সাজ্জাদ মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন: প্রফেসর (প্রফেসর সিনিয়র), কেজ বিজনেস স্কুল, প্রধান, জিওপলিটিকস স্ট্র্যাটেজি ল্যাব (ফ্রান্স)










