ক্ষুদ্রাকৃতির এ স্তন্যপায়ী প্রাণীটি মানুষের খাদ্য, সম্পদ, স্বাস্থ্যের ওপর এমন এমন নীরব আক্রমণ চালায়, যার ক্ষয়ক্ষতি অনেক সময় আমাদের চোখে ধরা পড়ে না। তবে সম্প্রতি বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকায় ইঁদুরের বংশবিস্তার স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে। মহানগরীর অলিগলি, কাঁচাবাজার, হোঁটেল-রেস্তোরাঁ, ড্রেন ও আবাসিক এলাকার আশপাশে চলছে ইঁদুরের উৎপাত। সচরাচর ইঁদুর যেকোনো পরিবেশে নিজেকে খাপ খাইয়ে দ্রুত বংশবিস্তার করতে পারে। বর্তমানে ঢাকা ও বড় নগরীগুলোতে এ প্রাণীর বংশবিস্তার ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।

একজোড়া ইঁদুর থেকে বছরে চক্রবৃদ্ধি হারে গড়ে প্রায় দুই হাজারটি পর্যন্ত ইঁদুরের জন্ম হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিবিষয়ক সংস্থার এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের অন্যতম ইঁদুর উপদ্রুত এবং বংশবিস্তারকারী এলাকা হচ্ছে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এখানকার উপকূলীয় লোনা ও মিঠাপানি মিশ্রণের এলাকাগুলো ইঁদুরের বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল। ফসলের মাঠ ছাড়াও এ অববাহিকায় অবস্থিত হাটবাজার ও শিল্পাঞ্চলগুলোতেও ইঁদুরের দাপট দেখা যায়। পৃথিবীতে প্রায় ২ হাজার ৭০০-এরও বেশি ইঁদুরজাতীয় প্রাণী শনাক্ত করা গেছে। কৃষি তথ্য সার্ভিস অনুযায়ী, দেশে ২২টিরও বেশি ইঁদুরের প্রজাতি ক্ষতিকর বলে বিবেচিত। তবে কিছু কিছু সূত্রে ১১-১২টি প্রজাতিকে কৃষকের ঘরে, মাঠে, গুদামে সর্বত্র ক্ষতি করতে দেখা যায়। বিশ্বে খাদ্যশস্য নষ্টের মূলে রয়েছে ইঁদুর। একই সঙ্গে ইঁদুরের মলমূত্র কিংবা এটির শরীরবাহিত রোগ খাবারে মিশে কিংবা পানিতে মিশে দূষণ ঘটায়। কৃষি উৎপাদনের সব পর্যায়েই এটি নানাভাবে ক্ষতি করে। ফসল বপন থেকে শুরু করে ফসল কাটা ও সংগ্রহ পর্যন্ত ইঁদুরের উৎপাতে ক্ষতি হয়। বর্তমানে ইঁদুরের কারণে ক্ষতির পরিমাণ ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা।

ইঁদুরের উপস্থিতি খাদ্য মজুদ, কৃষিজ ফসল, গৃহস্থালির সামগ্রী ও মানুষের স্বাস্থ্য সবকিছুর ওপরই মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এদের দ্বারা ক্ষতির পরিমাণ পরিসংখ্যানগতভাবে নির্ণয় করা কঠিন। তবে এক হিসাবে দেখা গেছে যে ইঁদুর যতটুকু শস্য খায় তার ১০ গুণ নষ্ট করে। এটির কারণে খাদ্যের মজুদ ও সরবরাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি ইঁদুর দৈনিক তার দেহের অনুপাতে ১০ শতাংশ খেতে পারে। তাই বড় খাদ্য মজুদে ইঁদুর থাকলে অনেক শস্য ও খাবার নষ্ট হয়। এটি মুরগির খামারে গর্ত করে ডিম ও ছোট বাচ্চা খেয়ে ফেলে। বাংলাদেশে ইঁদুরের কারণে প্রতি বছর সব ধরনের ফসল ও গুদামজাত শস্য মিলিয়ে প্রায় ৫০০-৭০০ কোটি টাকার (কিছু পুষ্টি ও খড় হিসাব করলে যা হাজার কোটি টাকাও ছাড়ায়) ক্ষতি হয়। এটি বছরে ১০-১২ টন সব ধরনের খাদ্যশস্য নষ্ট করে। কোনো ফসলই এ ক্ষতিকর প্রাণীর হাত থেকে রক্ষা পায় না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইঁদুর বছরে ৫-১০ শতাংশ ফসল ও গুদামজাত খাদ্য ধ্বংস করে, যার পরিমাণ কয়েক লাখ টনে গিয়ে দাঁড়ায়। শহরাঞ্চল বাদে হাওর অঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা এবং উপকূলীয় অঞ্চলে ইঁদুরের বংশবৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি। বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর পরই এসব এলাকায় ইঁদুরের উপদ্রব আরো বাড়ে।

শহরের প্রেক্ষাপটে সরকারি-বেসরকারি খাদ্যগুদাম, পাউরুটি ও বিস্কুট তৈরির কারখানা, হোটেল-রেস্তোরাঁ, পাইকারি ও খুচরা পণ্য বিক্রেতার দোকানে বিপুল পরিমাণ খাদ্য নষ্ট করে ইঁদুর। এ প্রাণী দোকানের খাদ্যদ্রব্যের প্যাকেট নষ্ট করে, মল-মূত্রের মাধ্যমে খাবার দূষিত করে। ইঁদুরের সংস্পর্শে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ে। এশিয়ার দেশগুলোতে বছরে ১৮ কোটি মানুষের এক বছরের খাবার নষ্ট করে ইঁদুর। বাংলাদেশেও প্রায় ৭০ লাখ মানুষের খাবার এ প্রাণীর কারণে নষ্ট হয়। ইঁদুরের উপদ্রব দেশে এমন পর্যায়ে গেছে যে দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে কৃষি ও জাতীয় অর্থনীতিতে ক্ষতি বাড়তে পারে। ইঁদুরের কারণে বছরে প্রায় ১৫ শতাংশ ধান, ৪-১২ শতাংশ গম, ৫-৭ শতাংশ গোল আলু, ৬-৯ শতাংশ আনারস নষ্ট হয়। মিষ্টিকুমড়া, করলা, তরমুজ, বাঙ্গি, লাউ, শসা ইত্যাদি কুমড়াজাতীয় সবজিখেতে এ ভয়াবহ প্রাণী প্রথমে মাটির ওপরের গাছ এমনকি ডগা কেটে দেয়। আলু ধরার সময় ইঁদুর গাছের শিকড় কেটে দেয়। আলু যখন বড় হয় তখন ইঁদুর মাটির নিচের আলু গর্ত করে খেয়ে ক্ষতি করে থাকে। দেশের বিভিন্ন সরকারি গুদাম, খাদ্য সংগ্রহ কেন্দ্র, গ্রামীণ ঘরে মজুদকৃত শস্যও ইঁদুরের হাতে ধ্বংস হয়। একদিকে কঠোর পরিশ্রম করে কৃষক খাদ্য উৎপাদন করছেন। এ ফসল যদি সংরক্ষণ করার সময়ই ইঁদুরের উৎপাতে নষ্ট হয় তাহলে খাদ্যনিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে। এমনকি অবকাঠামোর ক্ষতির জন্যও এর দায় আছে। ভবনে ইঁদুর থাকলে বৈদ্যুতিক তার কেটে ফেলে। এমনকি কাঠ, প্লাস্টিক ও কাপড় নষ্ট করে। ফলে অনেক সময় ঘরে বা অফিসে অগ্নিকাণ্ড ঘটে, ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে পড়ে। তাদের দৌরাত্ম্যে হাসপাতাল, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত কারখানা, হোটেল ও রেস্তোরাঁর পরিবেশও নষ্ট হয় এবং ব্যবসায়িক সুনাম ক্ষুণ্ন হয়। ইঁদুর ৭-১০ শতাংশ সেচ নালা নষ্ট করে থাকে। বর্ষা মৌসুমে নিম্নভূমি প্লাবিত হলে এবং ফসলের জমিতে বৃষ্টির পানি জমলে ইঁদুর গিয়ে অপেক্ষাকৃত উঁচু স্থানে আশ্রয় নেয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উঁচু গ্রামীণ সড়ক, বেড়িবাঁধ ও পুরনো স্থাপনায় ইঁদুরের দল গিয়ে আশ্রয় নেয়।

এ প্রাণী সরাসরি রোগ না ছড়ালেও বাহক হিসেবে নানা সংক্রামক রোগের উৎস হয়ে উঠতে পারে। এর মধ্যে হান্টা ভাইরাস, মিউরিনাটাইফাস, সালমোনেলোসিস, ইঁদুর কামড়ানো জ্বর এবং লেপ্টোস্পাইরোসিসসহ বিভিন্ন রোগ রয়েছে। প্লেগ রোগটি ইতিহাসে মারাত্মক মহামারী হিসেবে পরিচিত। এটি ইঁদুরের শরীরে থাকা প্লেগ ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংঘটিত হয়। ইঁদুরের মল, প্রস্রাব এবং লালা খাদ্যের সঙ্গে মিশলে তা বিষাক্ত হয়ে ওঠে এবং মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের ড্রেন, বাজার, হোটেল, বাসাবাড়ি ও হাসপাতালে ইঁদুরের বিচরণ জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি। অনেক সময় দেখা যায়, শিশু বা বৃদ্ধরা ইঁদুরের কামড়ের শিকার হচ্ছেন, যার ফলে রক্তে সংক্রমণ বা অন্য জটিলতা দেখা দিচ্ছে।

ইঁদুর নিয়ন্ত্রণে অবহেলা আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনীতি ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে। তাই এখনই সময়—একটি সমন্বিত, পরিবেশবান্ধব এবং দীর্ঘমেয়াদি ইঁদুর দমন ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার। এক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই। শহরাঞ্চলে ইঁদুরের উৎপাত বিশেষত দুশ্চিন্তার। গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে ইঁদুর নিয়ন্ত্রণের নানা কৌশল সম্পর্কে কৃষকদের সচেতন করা হয়। তবে শহরে দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি বড় সমস্যা। এখানে সব ধরনের বর্জ্য একসঙ্গে সংগ্রহ করা হয়। অথচ উন্নত বিশ্বে বর্জ্যকে সম্পদে রূপ দেয়া হচ্ছে। দেশে বর্জ্য যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। ফলে পর্যাপ্ত খাবার থাকায় ইঁদুর সহজেই বংশবিস্তার করতে পারে। আবার ইঁদুরের সংখ্যা বাড়লে সাপের উপদ্রবও শহরে বাড়তে শুরু করে। সংক্রামক অনেক রোগ ছড়াতে পারে। এজন্য ইঁদুরের উৎপাত নিয়ন্ত্রণের জন্য আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এক্ষেত্রে সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগই পারে এ ক্ষতিকর প্রাণীটির বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে।

ড. মো. শামীম হোসেন নোমান: অধ্যাপক, কীটতত্ত্ব বিভাগ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর