যাত্রা সময়ও যতটা সম্ভব কম রাখা যায়। এ লক্ষ্যে ২০১৬ সালে সড়কটি চার লেনে উন্নীত করা হয়েছিল। যদিও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে মাত্র ১০ বছরের মাথায় এসে সড়কটির ধারণক্ষমতা কমে গেছে। বণিক বার্তার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বর্তমানে এ মহাসড়কে তিন গুণ বেশি যানবাহনের চাপ পড়ছে। এতে যানজট ও যাত্রা সময় বেড়েছে। বেড়েছে দুর্ঘটনার সংখ্যাও। এ পরিস্থিতি সড়ক পরিকল্পনার অদূরদর্শিতাকে সামনে এনেছে। একই সঙ্গে প্রয়োজনের তুলনায় এ মহাসড়কে বিনিয়োগের পরিমাণও যে কম, সেটি আবারো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সম্প্রসারণের সময় মোটা দাগে বিনিয়োগ হয়েছিল প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার। যদিও ঢাকা-খুলনা, ঢাকা-রংপুর, ঢাকা-সিলেটের মতো তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ করিডোরগুলোয় এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বিনিয়োগ করেছে সরকার। আবার বর্তমানে সরকার মহাসড়কটিকে ১০ লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা করছে বলে জানা গেছে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সূত্র মতে, এখনো এ মহাসড়ক উন্নয়ন পরিকল্পনায় অর্থায়নের উৎস নির্ধারণ হয়নি।
দেশের ইতিহাসে বড় প্রকল্প ঘোষণার পর বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা বা অর্থ সংকট নতুন নয়। কিন্তু মহাসড়কে উন্নয়নকাজে নেয়া প্রকল্পের অতীতের প্রবণতা বিদ্যমান ঝুঁকিগুলো আরো বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে যানজট ও দুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়িয়ে তুলতে পারে। বিশেষ করে দেশের প্রধান অর্থনৈতিক ও পর্যটন করিডোরের প্রেক্ষাপটে এ মহাসড়কের বেহাল দশা অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এসব বিবেচনায় সরকারের উচিত দ্রুততম সময়ের মধ্যে এ মহাসড়ক উন্নয়নে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ নিশ্চিত করা এবং এটিকে সর্বদা অগ্রাধিকারে রাখা।
বিনিয়োগ অপ্রতুলতার বাইরে অদূরদর্শী পরিকল্পনার কারণে বর্তমানে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ধারণক্ষমতার বেশি যান চলাচল করছে। চট্টগ্রাম হলো দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী। সেখানে রয়েছে দেশের সমুদ্রবন্দর, যা বাণিজ্যের প্রধানতম কেন্দ্র। একই সঙ্গে এটি পর্যটন শিল্পের আধার। অন্যদিকে ঢাকা প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। ফলে এ দুই শহরের মধ্যে প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ পণ্য ও যাত্রী চলাচল করে, তা সময়ের সঙ্গে আরো বাড়বে এটা সহজেই অনুধাবন করা যায়। কিন্তু ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে পরিকল্পনায় তুলনামূলকভাবে কম যানবাহনের হিসাব করা হয়েছিল। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) তথ্যমতে, ২০১৬ সালে দৈনিক গড়ে ১৬ হাজার ৪৮৫টি যানবাহনের প্রাক্কলন ধরে মহাসড়কটির নকশা করা হয়েছিল। যদিও বর্তমানে এ সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে।
মূলত বাস্তবতার সঙ্গে পরিকল্পনার এ ব্যবধানই আজ মহাসড়কটিকে একপ্রকার অকার্যকর করে তুলছে। যখন চার লেনে উন্নীত করা হয়, তখন দীর্ঘমেয়াদের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে সড়কটি নির্মাণ করা প্রয়োজন ছিল।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কটির নকশায় আরো একটি ঘাটতি রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন। এখানে সার্ভিস লেনের অভাব রয়েছে। সাধারণত জাতীয় বা আন্তর্জাতিক মহাসড়কে বাড়তি লেন বা ধীরগতির যানবাহনের জন্য আলাদা লেন অপরিহার্য। কিন্তু এখানে ট্রাক, বাস, কাভার্ড ভ্যানের পাশাপাশি একই লেনে চলছে রিকশা, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল। বিভিন্ন গতির যান চলাচলের কারণে মহাসড়কটি আরো বেশি দুর্ঘটনাপ্রবণ হয়ে উঠেছে। পেছন থেকে ধাক্কা, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং ও মুখোমুখি সংঘর্ষ এখন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অনিয়ন্ত্রিত সংযোগ সড়ক, বাজার এলাকা ও উল্টোপথে গাড়ি চালানোর প্রবণতা।
সড়ক অবকাঠামো ও অর্থনীতি একে অন্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক আমদানি-রফতানি কার্যক্রম, শিল্প-কারখানার সরবরাহ ব্যবস্থা এবং অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের বড় অংশ এ মহাসড়কের ওপর নির্ভরশীল। সড়ক অকার্যকর হয়ে ওঠার অর্থ হলো পরিবহনের সময় বাড়বে এবং পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমতে পারে। একই সঙ্গে পর্যটন খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা সামনে আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে; বিশেষ করে কক্সবাজারমুখী যাত্রীরা দীর্ঘ ভোগান্তির মধ্যে পড়বে।
এর চেয়েও বড় বিষয় হলো জানমালের নিরাপত্তা। প্রতিটি দুর্ঘটনা মানবিক ক্ষতি ও অর্থনৈতিকও। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী সংখ্যা কমলে উৎপাদনশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সরকার বর্তমানে মহাসড়কটি সম্প্রসারণে যে উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানা গেছে, সেটি আরো গভীর পর্যালোচনা করা সমীচীন হবে। সম্প্রসারণের ১০ বছরের মধ্যে যদি মহাসড়কের বেহাল দশা হয়, তবে এর সম্প্রসারণ অমূলক হয়ে দাঁড়াবে। চাহিদা মোটেও স্থিতিশীল নয়। ভবিষ্যতে এটি আরো বাড়বে বৈ কমবে না। সুতরাং প্রাক্কলনের ক্ষেত্রেও ভবিষ্যৎ চাহিদাকে প্রাধান্য দিতে হবে এবং সব নিয়মনীতি মেনে পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। সওজের নির্দেশিকায় মহাসড়কে যানবাহন চলাচল (ট্রাফিক গ্রোথ) অন্তত ১০ শতাংশ ধরার নির্দেশনা থাকলেও মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত করার সময় ডিজাইন ম্যানুয়ালে ট্রাফিক গ্রোথ ধরা হয়েছিল ৮ শতাংশ। কিন্তু এটি চালু করার সঙ্গে সঙ্গেই এ গ্রোথ ১০ শতাংশেরও বেশি হয়ে যায়। সওজের কর্মকর্তারা সে সময় দাবি করেছিলেন দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতির কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। যখন চার লেনে উন্নীতের পরিকল্পনা করা হয়, তখন সে সময়ের উপযোগী হিসেবে তৈরি করা হয়। এ ধরনের অদূরদর্শী পরিকল্পনার যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। আমরা উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হচ্ছি। এতে স্বাভাবিকভাবেই আগামীতে যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর চাপ আরো বাড়বে।
সব মিলিয়ে বিবেচনায় রাখতে হবে, কেবল লেন বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; সড়ক ব্যবস্থাপনায় গুণগত পরিবর্তন আনতে হবে। সার্ভিস লেন নির্মাণ, ধীরগতির যানবাহনের পৃথক্করণ ও নিয়ন্ত্রিত প্রবেশপথ নিশ্চিত করা জরুরি। এগুলোর জন্য বিনিয়োগ ও অর্থায়নের অনিশ্চয়তা দ্রুত দূর করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব এক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
মনে রাখা প্রয়োজন, উন্নয়ন কেবল প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর কার্যকারিতা, স্থায়িত্ব ও মানুষের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব নিশ্চিত করতে না পারলে তা ব্যর্থ হিসেবে বিবেচিত হয়।










