ঈদুল ফিতর সামনে রেখে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী শিল্প এলাকাগুলোর অসন্তোষের ঝুঁকি অন্যান্যবারের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। কারণ অভ্যুত্থানের আগে থেকেই নিয়মিত বিরতিতে দেখা মিলেছে শ্রম অসন্তোষের, যা এখনো চলমান। সামগ্রিক পরিস্থিতিতে শিল্প এলাকাগুলোয় অবস্থিত কারখানাগুলোকে নিবিড় পর্যালোচনায় রেখেছে শিল্প পুলিশ। যথাসময়ে বেতন-বোনাস পরিশোধ করা না হলে দেখা দিতে পারে শ্রম অসন্তোষ। মালিক পক্ষকে সঠিক সময়ে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধে শিল্পাঞ্চলে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

  • বকেয়া বেতন ও ঈদ বোনাসের দাবিতে গাজীপুর সদর উপজেলার হোতাপাড়া এলাকায় একটি খাদ্য উৎপাদকারী কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন। চলতি মাসের ১৭ দিন পার হলেও তাদের ফেব্রুয়ারির বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হয়নি। একই উপজেলার বানিয়ারচালা এলাকার একটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা ঈদুল ফিতরের ছুটি ১১ দিন এবং কারখানার মহাব্যবস্থাপকের (জিএম) পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করেন। বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, বেতন-বোনাসের দাবিতে শ্রমিকরা কয়েক দিন ধরে গাজীপুর ও সাভারের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে আন্দোলন করে আসছেন। কখনো কারখানা বন্ধ করে, কখনো মহাসড়ক অবরোধ করে তারা আন্দোলন করছেন।
  • শিল্প পুলিশ জানিয়েছে, ঈদের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে শ্রম পরিস্থিতি নিয়ে একাধিক সভা এরই মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ৬ মার্চ সরকার-শ্রমিক-মালিকের ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ২০ রমজানের মধ্যে ন্যায্য প্রাপ্য পরিশোধ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। অন্যান্যবারের তুলনায় এবারের শিল্প পরিস্থিতি ভিন্ন বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত তিন বছরের তথ্য ও প্রেক্ষিত বিশ্লেষণের মাধ্যমে শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকে ২০৩টি কারখানাকে সমস্যাসংকুল কারখানা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এজন্য চিহ্নিত কারখানাগুলোর প্রতি মাসে বেতন পরিশোধযোগ্যতাসহ বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করেছে শিল্প পুলিশ। এর মধ্যে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএসহ বিভিন্ন খাতের কারখানা রয়েছে। চিহ্নিত সমস্যাসংকুল কারখানার তথ্য ৬ মার্চের সভায় সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে জানানো হয়েছে। খাতভিত্তিক বিভাজনের মাধ্যমেও এ ২০৩ কারখানার পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে শিল্প পুলিশ। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সদস্য সমস্যাসংকুল কারখানা সংখ্যা ৮৭ আর বিকেএমইএর সদস্য কারখানা ১৭টি। সুতা-কাপড় উৎপাদনকারী বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর সদস্য কারখানাগুলোর মধ্যে সমস্যাসংকুল ২০টি। বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজার) আওতাধীন সমস্যাসংকুল কারখানা চিহ্নিত হয়েছে ১৮টি। কোনো সংগঠনের আওতায় নেই এমন সমস্যাসংকুল কারখানার সংখ্যা ৬১। শিল্প পুলিশের পর্যালোচনা অনুযায়ী শিল্প এলাকাগুলোয় সমস্যাসংকুল কারখানা সবচেয়ে বেশি তৈরি পোশাক খাতের।
  • ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধ না করা এবং বেতন-বোনাস পরিশোধ নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। ঈদের আগে নির্ধারিত সময়ে কিছু পোশাক কারখানায় বেতন-বোনাস পরিশোধ না হওয়ার বিষয়টি পুরনো। সরকার-মালিক-শ্রমিকদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে তারিখ নির্ধারিত হলেও কিছু কারখানা তা পরিপালন করে না। যদিও ইচ্ছাকৃত-অনিচ্ছাকৃত কারণ রয়েছে। এর জন্য অবশ্য দায়ী তদারকির দুর্বলতা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হওয়ার প্রবণতা। এক্ষেত্রে ঈদের আগেই সব পোশাক কারখানায় বকেয়া বেতন পরিশোধ এবং যথাযথ ভাতা ও বোনাসের ব্যবস্থা করতে হবে। মনে রাখা দরকার, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে শিল্পাঞ্চলে অসন্তোষ লেগেই আছে। বকেয়া-বোনাস পরিশোধ নিয়ে যেন শ্রমিক অসন্তোষের সৃষ্টি না হয় সেদিকে মালিক পক্ষকে তীক্ষ্ণ নজর রাখা দরকার। আমরা আশা করি, মালিকদের সংগঠনগুলো বকেয়া বেতন-বোনাস পরিশোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
  • আসন্ন ঈদে যেসব শিল্প-কারখানার শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, সেগুলোয় বেতন-বোনাস দ্রুত পরিশোধ করা উচিত। ত্রিপক্ষীয় সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে ২০ রমজানের মধ্যে ন্যায্য প্রাপ্য পরিশোধ করার। আজ ১৯ রমজান। কিন্তু এসময়েও খাদ্য উৎপাদনকারী একটি কারখানার শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা আদায়ে রাস্তায় নামতে হয়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। বকেয়া বেতন-বোনাস পরিশোধে মালিকদের আরো দায়িত্বশীল হওয়া উচিত। শ্রমিকরা যেন সঠিক সময়ে তাদের বেতন বুঝে নিতে পারেন সেজন্য মালিকদের সংগঠনগুলো সংশ্লিষ্ট কারখানার উদ্যোক্তাদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধে নিয়মিত তাগাদা দিতে পারে। ঈদের আগে যেন সব কারখানায় বকেয়া বেতন-বোনাস পরিশোধ হয় সেদিকে সবাইকে দৃষ্টি রাখা জরুরি। অনেক চড়াই-উতরাই অতিক্রম করে কয়েক দশকের পথপরিক্রমায় দেশের শিল্প খাত আজকের এ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। যেকোনো দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা নিঃসন্দেহে সে দেশের শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। তাই নিশ্চিত করতে হবে শ্রমিকদের চাকরির নিরাপত্তা ও বেতনের নিশ্চয়তা। বেতন-বোনাস সময়মতো পরিশোধ করতে না পারলে আবারো শ্রমিক অসন্তোষ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে শ্রমিকদের ব্যয় বাড়লেও আয় বাড়ছে না। ফলে তারা নানামুখী চাপে রয়েছেন। এ সময়ে পরিবার নিয়ে জীবনযাপনই কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই সঠিক সময়ে বেতন-বোনাস পরিশোধ করা প্রয়োজন। অন্যথায় তাদের পরিবার নিয়ে জীবনযাপন আরো দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। যথাসময়ে বেতন-বোনাস দেয়ার ব্যর্থতায় ঘটে যেতে পারে শ্রম অসন্তোষ।
  • আইন অনুযায়ী মাসের প্রথম ১০ দিনের মধ্যে আগের মাসের বেতন পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যদিও তা কখনই যথাযথভাবে পরিপালন হতে দেখা যায় না। ঈদের আগে শিল্প মালিকরা সাধারণত ছুটির আগের দিন পর্যন্ত বেতন-ভাতা ও বোনাস পরিশোধ করেন, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
  • শিল্পের প্রাণ যে শ্রমিক, তাকে বঞ্চিত রেখে আমরা কোনোভাবেই আমাদের কাঙ্ক্ষিত শিল্পের উন্নতি ঘটাতে পারব না। তাই শ্রমিকের স্বার্থ বিবেচনা করে ঈদের আগে তাদের বেতন-বোনাস সঠিক সময়ে দিতে হবে। ঈদ ও উৎসবে সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বোনাস ও উৎসব ভাতা পাচ্ছেন। সরকারির সঙ্গে বেসরকারি উদ্যোক্তারাও তাদের কর্মীদের উৎসব ভাতা দিচ্ছেন। গার্মেন্টসহ সব শিল্পে এটি চালু হয়েছে। তবে শ্রমিকদের একটা অংশ তাদের ন্যায্য পাওনা পাচ্ছেন না। শ্রমিকদের বেতন-বোনাস নিয়ে হেলাফেলা কাম্য নয়। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। সরকারকেও শ্রমিকদের পাওনা পেতে সহযোগী হওয়া উচিত।
  • কেউ যাতে শ্রমিকদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, সে ব্যাপারেও সজাগ থাকতে হবে। ঈদের আগেই শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধ করা প্রয়োজন। এজন্য সরকার ও মালিক পক্ষের সংগঠনগুলোকে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে। ঈদের আগে যাতে সব কারখানা মালিক শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধ করেন সেই নিশ্চয়তা থাকতে হবে। প্রয়োজনে সরকারকে হস্তক্ষেপ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সবাইকে মনে রাখতে হবে, শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত রেখে সার্বিক উন্নয়ন কখনই সম্ভব নয় এবং শিল্পাঞ্চলেও স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসবে না।