গ্রামীণ অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি কৃষি। দেশের কর্মসংস্থান ও জিডিপিতেও এ খাত উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। কৃষিকে অগ্রাধিকার দিয়ে অর্থনৈতিক নীতিমালা প্রণয়ন যেকোনো রাষ্ট্রের জন্য সুফল বয়ে আনে। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে কৃষির কোনো বিকল্প নেই, এমন দৃষ্টিভঙ্গি লালন অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। দেশের অর্থনীতিতে এ খাতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও আর্থিক খাতে কৃষিকে অবহেলা করা হয়, এমন অভিযোগ বেশ পুরনো। তবে বর্তমানে কৃষি ঋণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা দেশের জন্য উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন বয়ে আনবে, সে আশা করাই যায়। ব্যাংক খাতে কৃষককে ঋণসহায়তা দেয়া সরকারের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ। ফলে কৃষক সহজ শর্তে ঋণ পেয়ে কৃষিকাজে অধিক মনোযোগী হয়ে দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় ভূমিকা রাখতে পারছেন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের বাণিজ্যিক, বিশেষায়িত ও বিদেশী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে কৃষককে যে ঋণ বিতরণ করছে তা কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন ঋণ নীতিমালা প্রকাশ করেছে। এ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের বাণিজ্যিক, বিশেষায়িত ও বিদেশী ব্যাংকগুলোকে কৃষি খাতে ৩৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দিয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো ১২ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা এবং বাকি ২৫ হাজার ৩৮৫ কোটি টাকার ঋণ বেসরকারি ও বিদেশী ব্যাংকগুলো বিতরণ করবে। এবার মোট লক্ষ্যমাত্রার ৬০ শতাংশ শস্য ও ফসল খাতে, ১৩ শতাংশ মৎস্য খাতে এবং ১৫ শতাংশ প্রাণিসম্পদ খাতে ঋণ বিতরণ করতে হবে।
কৃষি ও গ্রামীণ ঋণের সুযোগ বাড়াতে শজিনা, মুর্তা, পেরিলার মতো নতুন নতুন ফসল আবাদ ও উৎপাদন এবং মৎস্য খাতে শুঁটকি ও ঝিনুক প্রক্রিয়াকরণকে এবারের নীতিমালায় সংযোজন করা হয়েছে। সংযোজিত হয়েছে কৃষি উৎপাদনে ইসলামী ব্যাংকিং পদ্ধতির আওতায় শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগ পদ্ধতি। নতুন নীতিমালায় গ্রামীণ অর্থায়নের ক্ষেত্রে ‘শীতলপাটি বুনন’ শিল্পকে আয়বর্ধক খাতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পরিবর্তন আনা হয়েছে কাঁকড়া, কুঁচিয়া, কোরাল ও অন্যান্য অপ্রচলিত মৎস্য আহরণ খাতে ঋণ বিতরণসংক্রান্ত অনুচ্ছেদে। কৃষিপণ্য পরিবহন খাতে গ্রুপভিত্তিক কৃষি ঋণ বিতরণসংক্রান্ত নির্দেশনা এতে যুক্ত করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে ভুট্টা ও পেঁয়াজ উৎপাদনে ঋণ বিতরণের সময়সীমা।
ব্যাংকগুলোর কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রার অনর্জিত অংশ কৃষি খাতেই বিনিয়োগের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট কমন ফান্ড (বিবিএডিসিএফ) নামে একটি ফান্ড গঠন করেছে। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ ব্যাংকগুলোর অনর্জিত অংশ এ ফান্ডে জমা করতে হবে। এ জমাকৃত অর্থের বিপরীতে তাদের ২ শতাংশ হারে সুদ দেয়া হবে। এ কমন ফান্ডে জমাকৃত অর্থ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকারী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে কৃষি ও পল্লী ঋণ নীতিমালার আওতায় গ্রাহক পর্যায়ে বিতরণ করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক কৃষকের স্বার্থ বিবেচনা করেই এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কারণ ব্যাংকগুলো কৃষকের হাতে সরাসরি সহজ শর্তে ঋণ পৌঁছে দিলে তাতে কৃষকেরই উপকার হয়। এক্ষেত্রে ব্যাংক খাতের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ করলে কৃষকের জন্য কৃষিকাজে ঋণের টাকা ব্যয় করায় ভোগান্তি থাকে না। এমনিতেই কৃষক ফসলের ন্যায্যমূল্য পান না, এমন অভিযোগ কঠিনভাবেই রয়েছে। এর সঙ্গে সার ও ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি কৃষকের জন্য ফসল উৎপাদনের ব্যয় অনেক বাড়িয়ে তুলেছে। এ অবস্থায় কৃষিকাজের খরচ বেড়ে গেলে কৃষক যেন উৎপাদনবিমুখ হয়ে না পড়েন, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কৃষকের স্বার্থ রক্ষা করে কৃষিকাজে উদ্বুদ্ধ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা প্রশংসনীয়, বর্তমানে এটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রান্তিক পর্যায়ের এ ঋণ তুলনামূলক ঝুঁকিমুক্ত। এ ঋণ সাধারণত খেলাপি হয় না। অর্থাৎ সবদিক বিবেচনায় কৃষককে নিশ্চিন্তে ঋণসহায়তা দেয়া যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, কৃষককে অবহেলা করে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। এজন্য কৃষি ঋণ বিতরণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জোরালো ভূমিকা প্রয়োজন। কোনো ব্যাংক যেন ঋণ বিতরণ থেকে বিরত না থেকে সেটি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তদারক করতে হবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বড় ব্যবসায়ীদের ঋণ প্রদানের তুলনায় কৃষককে ঋণ দেয়ার ঝুঁকি অনেক কম। কৃষক সাধারণত ঋণখেলাপি হন না। ফসলের ন্যায্যমূল্য না পেলেও তারা ঠিকই সময়মতো ঋণ পরিশোধ করেন। যে কারণে দেশব্যাপী এনজিওগুলো তাদের ঋণ কার্যক্রমের বিস্তার ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। অথচ সরল বিশ্বাসের মেহনতি কৃষকের পাশে দাঁড়ানোর প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর। সেটি প্রত্যাশিতভাবে না হওয়ায় এনজিওগুলোর সুযোগ প্রসারিত হয়েছে। যা হোক অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ক্ষেত্রে যেকোনো সিদ্ধান্তই পুনর্বিবেচনা করা সম্ভব।
মনে রাখতে হবে, দেশে আবাদি জমির পরিমাণ ক্রমে হ্রাস পাচ্ছে। দেশের জনসংখ্যা বাড়ছে এবং খাদ্য চাহিদা বাড়ছে। চাহিদা অনুপাতে খাদ্য উৎপাদন না করতে পারলে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে। আমদানিনির্ভরতায় খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন। সেক্ষেত্রে কৃষিকে বর্তমান সময়ে অবহেলার কোনো সুযোগই নেই। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফও কৃষি খাতে ঋণ প্রদানের প্রতি গুরুত্ব দেয়ার কথা বলেছে। সব মিলিয়ে উদ্দেশ্য যেহেতু কৃষককে ঋণসহায়তা দেয়া, তাই এটি যতটা সহজলভ্য হিসেবে কৃষকের কাছে পৌঁছে দেয়া যায়, সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। কৃষক সহজ শর্তে ঋণ পাবেন এবং চড়া সুদে ঋণ পরিশোধের দুশ্চিন্তা ছাড়াই ফসল উৎপাদন করবেন, সেটিই আমাদের কাম্য।










