সে সময় অনেকেই অভিযোগ করেছিলেন, বুশ যেন দায়িত্বজ্ঞানহীন ভোগ ব্যয়কে উৎসাহ দিচ্ছেন। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর সেই সমালোচনা আরো জোরালো হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তিনি এমন এক অর্থনৈতিক সত্যকে স্বীকার করেছিলেন, যা বহুদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি ভোক্তাদের ব্যয়।

গত দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির গড়ে প্রায় ৫৬ শতাংশ এসেছে পারিবারিক বা গৃহস্থালি ভোগ ব্যয় থেকে। এটি এমন একটি ব্যতিক্রমী অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রতিফলন, যা একদিকে ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্যের অনিচ্ছাকৃত ফল। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে অনুসৃত একটি সচেতন প্রবৃদ্ধি কৌশলেরও পরিণতি।

বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ডলারের অবস্থান অনিচ্ছাকৃতভাবেই মার্কিন ভোক্তাদের অতিরিক্ত ব্যয়ের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করেছে। বিশ্বকে ডলার সরবরাহ করার ফলে যুক্তরাষ্ট্র অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত চলতি হিসাবের ঘাটতি বহন করতে পারে। একই সঙ্গে ডলারভিত্তিক সম্পদের উচ্চ চাহিদা ডলারের বিনিময় হারকে শক্তিশালী করে। ফলে মার্কিন রফতানি তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে, আমদানি বাড়ে এবং দেশটির উৎপাদন শিল্পের ক্রম অবনতিতে ভূমিকা রাখে। তবে শুধু ডলারের আধিপত্যই নয়, কয়েক দশক ধরে মার্কিন নীতিনির্ধারকরাও নানামুখী নীতির মাধ্যমে পারিবারিক ভোগ ব্যয়কে উৎসাহিত করেছেন।

উদাহরণ হিসেবে আবাসন খাতের কথা বলা যায়। দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র সরকার গৃহঋণের সুদে করছাড়, কর প্রণোদনা এবং বিভিন্ন ভর্তুকি দিয়ে আসছে। ফলে বাড়ির মালিকরা নিজেদের সম্পত্তিকে জামানত হিসেবে ব্যবহার করে আরো বেশি ঋণ নিতে পেরেছেন। একইভাবে আর্থিক খাতকে ঋণের নিশ্চয়তা ও তারল্য সহায়তা দিয়ে সরকার ঋণদানের ঝুঁকি কমিয়েছে। ফলে এমন একধরনের ‘আর্থিক সংস্কৃতি’ গড়ে উঠেছে, যেখানে সামর্থ্যের চেয়ে বেশি ব্যয় করাও স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

আরো গুরুত্বপূর্ণ, অথচ তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত বিষয় হলো জ্বালানি নীতির মাধ্যমেও যুক্তরাষ্ট্র সরকার পারিবারিক ভোগ ব্যয়কে টিকিয়ে রেখেছে। উচ্চমাত্রার জ্বালানি ব্যবহার আমেরিকান জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ। দেশটিতে বাড়িঘর তুলনামূলকভাবে বড়, ফলে সেগুলো নির্মাণ, গরম রাখা ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণে বেশি জ্বালানি প্রয়োজন হয়। বিশ্বের অধিকাংশ দেশের তুলনায় মার্কিনরা বেশি সংখ্যায় এবং আকারে বড় গাড়ি কেনেন, দীর্ঘ দূরত্বে গাড়ি চালান এবং বেশি পরিমাণে মাংস ও অন্যান্য উচ্চ কার্বননির্ভর পণ্য ভোগ করেন।

এছাড়া এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র সরকার কর আইনে ‘অদৃশ্য ড্রিলিং ব্যয়’-এর (intangible drilling costs) বিশেষ সুবিধার মাধ্যমে তেল ও গ্যাস শিল্পকে ভর্তুকি দিয়ে আসছে। বিশাল হাইড্রোকার্বন মজুদের কারণে এসব নীতি উৎপাদনকে চাহিদার চেয়েও বেশি হতে উৎসাহিত করেছে, যার ফলে জীবাশ্ম জ্বালানির দাম দীর্ঘদিন ধরে কৃত্রিমভাবে কম রাখা সম্ভব হয়েছে।

কিন্তু বর্তমানে জ্বালানি খাতের বাস্তবতা বদলে যাচ্ছে। একদিকে মার্কিন পরিবারগুলোর জ্বালানি ব্যয় দ্রুত বাড়ছে, অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির খরচ ধারাবাহিকভাবে কমছে। সমস্যা হলো, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সস্তা ও পর্যাপ্ত জ্বালানি যে যুক্তরাষ্ট্রের ভোগনির্ভর প্রবৃদ্ধি মডেলের ভিত্তি—এটি ঠিকই উপলব্ধি করেন; কিন্তু তিনি সেটিকে জীবাশ্ম জ্বালানির সঙ্গে এক করে দেখেন। অর্থাৎ ইতিহাসে যে সম্পর্ক ছিল, তাকেই তিনি কারণ-ফল সম্পর্ক হিসেবে ধরে নিচ্ছেন।

ট্রাম্পের ‘ড্রিল, বেবি, ড্রিল’ কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল তেল ও গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো, এমন এক সময়ে যখন বিশ্বের অন্য দেশগুলো ধীরে ধীরে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে যাচ্ছে। তার প্রশাসনের ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট (ওবিবিবিএ)’ তেল ও গ্যাস শিল্পের জন্য ভর্তুকি বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে বাইডেন প্রশাসনের ইনফ্লেশন রিডাকশন অ্যাক্টের অধীনে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির প্রসার ত্বরান্বিত করতে দেয়া প্রায় সব কর প্রণোদনাই বাতিল করেছে।

প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো ল্যাবের গবেষণা থেকে পূর্বাভাস দিয়েছিল, ২০৩০ সালের মধ্যে ওবিবিবিএর কারণে যুক্তরাষ্ট্রে পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জ্বালানি ব্যয় ২৮ বিলিয়ন ডলার বেড়ে যাবে। বিলটি পাস হওয়ার এক বছর পর দেখা যাচ্ছে, সেই পূর্বাভাস বাস্তবায়নের পথেই রয়েছে। এমনকি তা আশাবাদী হিসাবও হয়ে যেতে পারে। কারণ ইরান যুদ্ধজনিত সরবরাহ সংকট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ডেটা সেন্টারের বিস্ফোরণধর্মী সম্প্রসারণ জ্বালানির দাম আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে নতুন বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় অর্ধেকই এসেছে ডেটা সেন্টার থেকে। এ দ্রুত প্রবৃদ্ধির ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে কিছু অঞ্চলে ভোক্তাদের বিদ্যুৎ বিল ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দাম ক্রমেই নিম্নমুখী হচ্ছে। ২০২৪ সালে বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ যথাক্রমে জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় ৫৩ শতাংশ এবং ৪১ শতাংশ ব্যয়সাশ্রয়ী ছিল। হরমুজ প্রণালি কয়েক মাসব্যাপী বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল। এরপর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ চীনে উৎপাদিত সবুজ প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকেছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) প্রতি ভোক্তাদের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

মার্কিন ভোক্তানির্ভর অর্থনীতি আর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভর করে চলতে পারবে না। প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে অন্য দেশগুলোর পথ অনুসরণ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়াতে হবে। মূলত পর্যাপ্ত জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে প্রণীত ইনফ্লেশন রিডাকশন অ্যাক্ট পুনরুজ্জীবিত করা হতে পারে এ পথে প্রথম এবং সবচেয়ে স্বাভাবিক পদক্ষেপ।

অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনেক নীতিনির্ধারকই মনে করেন, চীনের সবুজ প্রযুক্তি নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এরই মধ্যে চীনা ইনভার্টারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এ উদ্বেগ মোকাবেলার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো বিদ্যমান উৎপাদন শিল্পকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে ইনভার্টারের মতো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান নিজ দেশে উৎপাদন করা এবং একই সঙ্গে নিরাপদ ও কম খরচের উপাদান—যেমন সৌর প্যানেল আমদানি অব্যাহত রাখা। এর জন্য শিল্পনীতি গ্রহণ করতে হবে, তবে সেটি কোনো অস্বাভাবিক পদক্ষেপ হবে না।

ট্রাম্প প্রশাসনের পরিচ্ছন্ন জ্বালানিকে উপেক্ষা করার দৃঢ় অবস্থান শুধু ব্যয়বহুলই নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেও হুমকির মুখে ফেলছে। জীবাশ্ম জ্বালানির দাম যখন ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, তখন পরিকল্পিতভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে দমিয়ে রাখা শেষ পর্যন্ত সেই প্রবৃদ্ধি মডেলেরই মৃত্যুঘণ্টা বাজাবে, যার ভিত্তি ছিল সস্তা জ্বালানির প্রতিশ্রুতি।

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]

ড্যানিয়েল ড্রিসকল: ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং রুজভেল্ট ইনস্টিটিউটের নন-রেসিডেন্ট ফেলো