বছর যায়, নতুন বছর আসে। কিন্তু কিছু কিছু বছর ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেয়। যেমনটি ঘটেছিল ১৯৭১ সালে। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী একটি যুদ্ধ শেষে অভ্যুদয় হয় বাংলাদেশের। আর ইতিহাসের পাতায় নতুন সংযোজন রেখে বিদায় নিয়েছে ২০২৪। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে সংগঠিত হয়েছে অভূতপূর্ব এক গণ-অভ্যুত্থান। এতে ক্ষমতার মসনদ তছনছ হয়েছে টানা দেড় দশকের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের। আন্দোলন-গণ-অভ্যুত্থানের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকা বছরটি শুরু হয়েছিল একতরফা একটি জাতীয় নির্বাচন দিয়ে। সঙ্গে ছিল অর্থনৈতিক নানা সংকট ও অনিশ্চয়তা। যেসব অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে বছর শেষেও। কয়েক বছর ধরেই স্মরণকালের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যহীনতা, ডলার সংকট, রিজার্ভের ক্ষয়, বিনিয়োগ খরা, রাজস্ব ঘাটতি, ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি ও অনিয়ম-দুর্নীতি, বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের লুটপাট, অব্যবস্থাপনাসহ অর্থনীতি বিভিন্ন সংকটে নিমজ্জমান ছিল। একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাও শূন্যের কোটায় নেমে এসেছিল। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর গত ৮ আগস্ট গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা অর্থনীতিকে টেনে তুলতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়। বিগত সরকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে নাজুক অবস্থায় রেখে গেছে। ফলে বর্তমান সরকারের গত পাঁচ মাসের বিভিন্ন উদ্যোগ সত্ত্বেও অর্থনীতিতে তেমন গতি ফিরে আসেনি, যা অভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা অর্থাৎ বৈষম্যবিরোধী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাকে কঠিনতর করে তুলছে। ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থাহীনতা বাড়ছে। আমরা আশা করছি, এ সরকার অর্থনীতি ও রাজনীতিতে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষম হবে এবং ক্ষত নিরাময় করে অর্থনীতিতে গতিশীলতা ও জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যাংক ঋণের সুদহার ও নীতি সুদহার (রেপো রেট) প্রায় দ্বিগুণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যদিও এখনো মূল্যস্ফীতি না কমে উল্টো ঊধ্বর্মুখী রয়েছে। সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণ নেয়া কমেছে। এতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গত অক্টোবরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ, যা গত ৪১ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিদ্যমান পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে নতুন করে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ছে না। বিনিয়োগের ওপর এমন নেতিবাচক প্রভাবের কারণে নতুন কর্মসংস্থান সেভাবে সৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে বেকারত্বের হার। বর্তমানে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখের বেশি। এর মধ্যে শিক্ষিত ও উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যাই বেশি। বিনিয়োগ শ্লথ হওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে বেশকিছু প্রতিষ্ঠানও বন্ধ হয়েছে। তাতেও নতুন বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্দিষ্ট চাকরির প্রতি ঝোঁক এবং কৃষি বা শিল্প খাতে কিংবা স্ব-উদ্যোগে কাজ করার অনীহা, ঋণ গ্রহণে নানা প্রতিবন্ধকতা ও দক্ষতাহীনতা শিক্ষিত বেকার তৈরি করছে।
বিদেশে শ্রমবাজারও আশানুরূপ প্রসারিত হচ্ছে না। এছাড়া সিন্ডিকেটের প্রভাব ও নানা অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে এ বছরের ৩০ মের পর থেকে আবার বন্ধ হয়ে যায় মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের শ্রমবাজার। নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান করে দক্ষ শ্রমিক প্রেরণে কাঙ্ক্ষিত তৎপরতা দৃশ্যমান হয়নি। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন বেশ ভুগিয়েছে আমদানিকারকদের। ডলার সংকটের কারণে সময়মতো ঋণপত্র (এলসি) খুলতে পারছিলেন না ব্যবসায়ীরা। বিনিময় হারের অস্থিরতার কারণে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স কমে এসেছিল। বিদেশে অর্থ পাচার বেড়েছিল। বেড়েছিল হুন্ডি-হাওলার তৎপরতা। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিনিময় হার স্থিতিশীল হয়ে এসেছিল। ফলে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়তে থাকে। যদিও আশানুরূপ বাড়েনি।
বিগত সরকার শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রক্রিয়াটি ধ্বংস করে ফেলেছে। রাজনৈতিক জবাবদিহিতা না থাকায় দেশের সব প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে আর্থিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অস্থিরতা বিরাজমান থাকলেও আশা হারিয়ে ফেলার মতো অবস্থায় আমরা এখনো উপনীত হইনি। তাই অর্থনীতিতে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে তা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে নতুন বছর শুরু হোক—সেটিই আমরা প্রত্যাশা করি।
আমাদের রফতানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক খাত। সরকারের পটপরিবর্তনে এ খাত বেশ অস্থিরতার মুখোমুখি হয়েছিল গত বছর। নতুন বছরে তৈরি পোশাক শিল্পে যেন অস্থিতিশীলতা তৈরি না হয়, সেদিকে মনোযোগ রাখতে হবে। পাশাপাশি রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্যায়ণ ঘটাতে হবে। এছাড়া নতুন নতুন শ্রমবাজার অন্বেষণে কূটনৈতিক তৎপরতা বজায় রাখা দরকার। সেই সঙ্গে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) উৎসাহিত করতে হবে। বাজার নিয়ন্ত্রণে ভারসাম্যহীনতার উদাহরণ তৈরি হয়েছে বিদায়ী বছরে। পেঁয়াজ, চাল, ভোজ্যতেল, আলু ও ডিমের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। সরকার পরিবর্তনের পর অনেকেই প্রত্যাশা করেছিলেন সিন্ডিকেট ভেঙে নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি ফিরবে। বরং পুরনো সিন্ডিকেট ভেঙে নতুন সিন্ডিকেটের আবির্ভাব ঘটেছে। নিত্যপণ্যের দাম আরো বেড়েছে। মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেট ভাঙার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান তৎপরতা লক্ষ করা যায়নি। নতুন বছরে অন্তত বাজার ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার চিন্তা করতে হবে।
নতুন বছরে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত। যে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি যত উন্নত সে দেশে অর্থনীতি তত ভালো। মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে আনা দরকার। দেশে যে হারে বেকারত্ব বাড়ছে তাতে সামাজিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। সুদের হার সহনীয় পর্যায়ে এনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে কর্মসংস্থান বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে ডলারের বিনিময় হারকে স্থিতিশীল রাখা জরুরি। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে ঋণ ও বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে উদ্যোগ নেয়া দরকার। বাংলাদেশ-ভারত ঘিরে যে অস্থিরতা রয়েছে তা কমিয়ে এনে দুদেশের সম্পর্কোন্নয়নে কাজ করা উচিত। যারা অর্থ পাচার করেছিল তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে অর্থ পাচার বন্ধ হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশের ঋণমানের অবনমন যে ঘটিয়েছিল তা উন্নত করতে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সহায়তায় সামাজিক সুরক্ষা ব্যয় বাড়াতে হবে, যাতে এটি উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে শিক্ষায় গুরুত্ব দেয়া উচিত। ব্যাংক খাতের রাজনৈতিকীকরণ বন্ধ করতে হবে। নতুন বছরে এর পুনরাবৃত্তি রোধে ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। বিশেষ করে খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরতে হবে।
বস্তুত নতুন বছরের আগমন পঞ্জিকার পাতায় নতুন আরেকটি মাসের সূচনা ছাড়া কিছু নয়। কিন্তু তার পরও মানুষ স্বপ্ন দেখে নতুনত্বের। পুরনো জরাজীর্ণ চিন্তা ফেলে নতুনের আমেজে চেনা জীবনকেই আবার নতুনভাবে সাজানোর স্বপ্ন দেখে। যে কারণে বিশ্বের সব দেশেই নতুন বছরকে বরণ করে নেয়া হয়। আর এ নতুনের আবাহনে যদি বদলায় কিছু হিসাব বা যোগ হয় কিছু নতুনত্ব, তাহলেই তা নতুন বছরের প্রাপ্তি রূপে পরিগণিত হয়। সে আলোকে আমরা নতুন বছরকে নতুন রূপে পেতে চাই। সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা।










