কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে গত মাসে অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে দেশের পরিস্থিতি। আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে কারফিউ জারি করে সব ধরনের পরিবহনসেবা ও ইন্টারনেট বন্ধ করার ঘটনাও ঘটে। এতে দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব পড়ে। এক পর্যায়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। সে সময়কার অস্থিরতা ও চলমান বন্যা পরিস্থিতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের (এসএমই) ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়েছে। আবার বন্যার পানিতে তলিয়ে অনেকের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশীয় এ সংকটে বিক্রিও কমেছে অস্বাভাবিক। ব্যবসা বন্ধ ও বিক্রি কম হওয়ায় বিভিন্ন আর্থিক ও ব্যাংক খাত থেকে নেয়া ঋণের চলতি মাসের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না উদ্যোক্তারা। এমনকি কারখানা ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করতেও তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান উদ্যোক্তাদের পরবর্তী সময়ে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দিয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের ঋণ পরিশোধে জোরজবরদস্তি করার ঘটনা ঘটছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ এবং দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও এখনো ব্যবসা-বাণিজ্যে পূর্ণ গতিশীলতা ফিরে আসেনি। বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। শিগগিরই ব্যবসায় গতিশীলতা ফিরে না এলে অনেকের উদ্যোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে। 

সার্বিক দিক বিবেচনায় বলা যায়, এ মুহূর্তে এ খাতের ব্যবসায়ীরা অত্যন্ত কঠিন সময় পার করছেন। বর্তমান নাজুক পরিস্থিতি উত্তরণে এ খাতে দরকার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ। যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কিংবা ঝুঁকিতে রয়েছেন তাদের ক্ষতি ও ঝুঁকি নিরূপণ করে সরকারের উচিত আর্থিক প্রণোদনা দেয়া। এক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি কিংবা দলীয় পরিচয়কে বিবেচনায় না নিয়ে ব্যবসাকে প্রাধান্য দিতে হবে। এছাড়া ব্যবসা স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ঋণের কিস্তি পরিশোধে কোনো জোরজবরদস্তি করা ঠিক হবে না। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকগুলোকে এ বিষয়ে একটি নির্দেশনা দেয়া যেতে পারে। 

অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ। বিশ্বজুড়েই ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে খাতটি। জাতিসংঘের তথ্যানুসারে, বৈশ্বিক ব্যবসার ৯০ শতাংশ, কর্মসংস্থানের ৭০ এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫০ শতাংশই এ খাতের অবদান। 

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জিডিপিতে এসএমই খাত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সেসব দেশের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। এসএমই খাতের ওপর কভিডের প্রভাব নিয়ে করা এক প্রতিবেদনে সেটি উঠে আসে। সেই প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে, ইন্দোনেশিয়ার জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান ৫৯ শতাংশ। একইভাবে কম্বোডিয়ার ক্ষেত্রে ৫৮, শ্রীলংকায় ৫২, ভিয়েতনামে ৪০ ও ভারতের জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান ২৯ শতাংশ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর পরিমাণ ২৫-২৭ শতাংশ। এ বছরের মধ্যে এটি ৩২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের। 

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে এসএমই খাতের অবদান আরো অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। কারণ এ খাতের উৎপাদন প্রক্রিয়া ও পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে বড় আকারের শিল্পের তুলনায় অনেক কম বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব, উদ্ভাবন ও বাণিজ্যসহ বিভিন্নভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখছে এসএমই খাত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গবেষণা প্রতিবেদনে ১৯৭৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দেশের এসএমই খাতের উৎপাদনের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ১৯৭৮ সালে দেশের এসএমই খাতের উৎপাদন ছিল ৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। এর পর থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত এ খাতের উৎপাদন ৫-৬ হাজার কোটি টাকার মধ্যেই স্থিতিশীল ছিল। ১৯৯২ সালের পর এ খাতের উৎপাদন বাড়তে শুরু করে। ১৯৯৪ সালে এসএমই খাতের উৎপাদন দাঁড়ায় ৬ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকায়। ২০০০ সালে এটি আরো বেড়ে ৯ হাজার ৪৩৩ কোটি হয়। পরবর্তী পাঁচ বছরে এটি ১০০ শতাংশের বেশি বেড়ে ২০০৫ সালে দাঁড়ায় ১৯ হাজার ৪৮৫ কোটি টাকায়। এর ১০ বছর পর ২০১৫ সালে এসএমই খাতের উৎপাদন দাঁড়ায় ২০ হাজার ৪০ কোটি টাকায়। ২০২০ সাল নাগাদ এটি বেড়ে ৪৩ হাজার ৭৮০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। 

দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। তবে বর্তমানে কৃষিভিত্তিক পণ্যসহ ছোট আকারের নানা ধরনের উৎপাদন ও সেবামুখী এসএমই উদ্যোগগুলো গ্রামীণ অর্থনীতির রূপান্তরে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে। এতে গ্রামাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। দেশের এসএমই উদ্যোগের বড় একটি অংশ কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়ন ছাড়াই নিজেদের চেষ্টায় গড়ে উঠেছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকা ও ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির জন্য সহজ অর্থায়ন সুবিধা প্রয়োজন। সরকারের দিক থেকে এসএমইদের জন্য অর্থায়ন বাড়ানো ও সহজ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যদিও এখনো অনেক এসএমই উদ্যোগ অর্থায়ন সুবিধার বাইরে রয়েছে। বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তারা। ডিজিটাল মাধ্যমের প্রসারের সুবাদে অনেক নারী উদ্যোক্তা অনলাইনভিত্তিক ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। যদিও এসএমই খাতের অর্থায়নের ৫-৬ শতাংশ পাচ্ছেন নারী উদ্যোক্তারা।

দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৮০ শতাংশই হচ্ছে এসএমই খাতের মাধ্যমে। ছোট আকারের কৃষি উদ্যোগ কিংবা পশুপালন খামার, ছোট আকারের উৎপাদনমুখী শিল্প কিংবা সেবা খাতের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশের অসংখ্য উদ্যোক্তা নিজেদের স্বাবলম্বী করার পাশাপাশি আরো অনেকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন। এসব উদ্যোক্তার কেউ কেউ ব্যবসায়িক সাফল্যের মাধ্যমে নিজেদের আরো বড় পরিসরে বিস্তৃত করতে সক্ষম হয়েছেন। বর্তমানে প্রচলিত এসএমই উদ্যোগের পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠছে। এসব প্রতিষ্ঠান স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখছে।

দেশের অর্থনীতিতে এ খাতের গুরুত্ব অনেক। অর্থনৈতিক উন্নয়নে খাতটির পুরো সম্ভাবনা কাজে লাগানো প্রয়োজন। এজন্য খাতটির উন্নয়নে দরকার পর্যাপ্ত অর্থায়ন সুবিধা নিশ্চিত, রফতানির সুযোগ বৃদ্ধি ও তরুণ জনগোষ্ঠীকে এসএমই উদ্যোক্তা হতে উৎসাহিতকরণ। তাছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে নীতিসহায়তা এ খাতের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।