মানব পাচার ও অনিয়মিত অভিবাসন বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে চলেছে। ফলে বাংলাদেশী পাসপোর্টের গ্রহণযোগ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মানবপাচারের মতো সংকটের কারণে বিদেশে বাংলাদেশীদের বৈধ কর্মসংস্থানের পথ সংকুচিত হচ্ছে এবং অনেক উচ্চ শিক্ষাপ্রত্যাশী শিক্ষার্থীদেরও ভিসা জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন। পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইন রয়েছে। কিন্তু এর প্রয়োগ কম হওয়ায় মানবপাচারের দৌরাত্ম্য বাড়ছে। এজন্য আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে এ সমস্যার আশু সমাধান জরুরী। তাছাড়া দেশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার, বৈদেশিক কর্মসংস্থানের বাজার সম্প্রসারণ, পাসপোর্টের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো এবং ভিসা জটিলতা নিরসনের স্বার্থেও মানব পাচার রোধে শক্ত পদক্ষেপ জরুরি।
প্রতি বছরই অসংখ্য তরুণ প্রচুর অর্থ ব্যয় করেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করছেন। গ্লোবাল অর্গানাইজড ক্রাইম ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী, মানব পাচারই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আন্তঃসীমান্ত অপরাধ। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে অবৈধ উপায়ে ইতালিতে প্রবেশ করেছেন ৪ হাজার ২৪৯ বাংলাদেশী। একই সময়ে লিবিয়া হয়ে গ্রিসে পৌঁছেছেন আরো ৩ হাজার ৬০৮ জন। ফ্রন্টেক্সের হিসাবে ২০০৯ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সেন্ট্রাল মেডিটেরেনিয়ান রুট দিয়ে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশী অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। আইওএমের তথ্যমতে, ২০২০ সালে অনিয়মিত পথে ইউরোপে যাওয়া বাংলাদেশীর সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৫১০, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ৩১৮ জনে। চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত এ সংখ্যা ৭ হাজার ৯৬৯। এ পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয়, সমস্যাটি কমছে না; বরং প্রতি বছরই বাড়ছে।
২০১২ সালে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন প্রণয়নের পর থেকে নিয়মিত মামলা হলেও সাজার হার নগণ্য থেকে গেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের হিসাবে ২০১৯ থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত মানব পাচার মামলায় ২৫ হাজার ৫৫৪ জনকে আসামি করা হলেও সাজা হয়েছে মাত্র ২০০ জনের, যাদের মধ্যে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পেয়েছেন কেবল ৩০ জন। ২০২১ ও ২০২২ সালে হাজার হাজার আসামির একজনেরও সাজা হয়নি। বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৫ হাজার ২৮৪, যার মধ্যে ১ হাজার ৯৭৮ তদন্তকাজই এখনো শেষ হয়নি। এ পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, আইন থাকলেও তার প্রয়োগ ও বাস্তবায়নে বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে। ২০২৬ সালে প্রণীত নতুন আইনে অভিবাসী চোরাচালানকেও অপরাধের আওতায় আনা হয়েছে এবং যাবজ্জীবন ও মৃত্যুদণ্ডের বিধান বহাল রাখা হয়েছে, তবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত না হলে এ আইনও কার্যকারিতা হারাবে।
মানব পাচারের প্রভাব শুধু ব্যক্তি বা পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না, এর প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশী পাসপোর্টের গ্রহণযোগ্যতায়ও। হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের সাম্প্রতিক সূচক অনুযায়ী, বাংলাদেশী পাসপোর্টধারীরা এখন ভিসামুক্ত বা অন-অ্যারাইভাল সুবিধায় বিশ্বের ৩৫টি দেশে ভ্রমণ করতে পারেন, যা গত বছর ছিল ৩৭টি। ভিয়েতনামের মতো দেশ এরই মধ্যে বাংলাদেশীদের জন্য ভিসা ইস্যু বন্ধ করে দিয়েছে। বিভিন্ন দেশে শ্রমবাজার সংকুচিত হচ্ছে, স্টুডেন্ট ও ভ্রমণ ভিসায়ও কড়াকড়ি বাড়ছে। মানব পাচার তাই কেবল অপরাধ নয়, এটি দেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থের জন্যও ক্ষতিকর হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়, এর কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। মূল পাচারকারীদের বিচারের আওতায় আনা, তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা এবং পাচারপ্রবণ জেলাগুলোতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। মাদারীপুর, শরীয়তপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জসহ যেসব জেলা থেকে সবচেয়ে বেশি মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ পথে বিদেশযাত্রা করছেন, সেসব এলাকায় সুনির্দিষ্ট সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাতে হবে। সাক্ষী সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে অভিবাসন ও পাচার-সংক্রান্ত আইন অন্তর্ভুক্ত করাও জরুরি, যাতে আইনজীবীরা যথাযথভাবে মামলা পরিচালনা করতে পারেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বৈধ ও নিরাপদ অভিবাসনের সুযোগ সম্প্রসারণ, যাতে মানুষ দালাল ও প্রতারক চক্রের প্রলোভনে পা না দেয়। এমনকি প্রযুক্তির অপব্যবহারে অর্থাৎ ভুয়া বিজ্ঞাপনে মানুষকে বিভ্রান্ত করে ফাঁদে ফেলার বিষয়টিকে বড় অপরাধ বলে গণ্য করতে হবে। এজন্য আলাদা সাইবার সিকিউরিটি মনিটরিং জরুরী।
মানব পাচারে জড়িতদের তদন্ত ও বিচারের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত না করার কারণেই এ চক্রের দৌরাত্ম্য বেড়ে চলেছে। এক্ষেত্রে অ্যান্টি ট্রাফিকিং ট্রাইব্যুনালের সক্ষমতা বাড়িয়ে যেসব এলাকায় মামলার চাপ বেশি সেসব এলাকায় সম্প্রসারণ করতে হবে। ভুক্তভোগীদের শনাক্ত ও পুনর্বাসনসেবার মান বাড়াতে হবে। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর অতিরিক্ত ফি প্রথা বন্ধ করার বিষয়েও ভাবতে হবে। এটির কারণে অনেক অভিবাসনপ্রত্যাশী ঋণগ্রস্ত হন। এজন্যই তারা অবৈধ পথে অভিবাসনের কথা চিন্তা করেন। বণিক বার্তার প্রতিবেদনে শুধু বিদেশে নয়, দেশের অভ্যন্তরে নারী ও শিশু পাচারের তথ্যও এসেছে। এ দিকটিতেও শ্যেণদৃষ্টি দেয়া জরুরি।
শ্রম পরিদর্শকদের অনানুষ্ঠানিক খাত তদারকি ও প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করার সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে, যা বাড়ানো দরকার। সম্প্রতি জাতীয় রেফারেল মেকানিজম (এনআরএম) এবং ফ্রন্টলাইন কর্মকর্তাদের জন্য ভুক্তভোগী শনাক্তকরণ ও ট্রমা-সংবেদনশীল প্রশিক্ষণ বাড়ানোর উদ্যোগ চালু হয়েছে। এগুলো আরো সম্প্রসারণ করা যায়। পাচারকারীদের অর্থপ্রবাহ চিহ্নিত করতে ব্যাংকিং ও মানি লন্ডারিং তদন্ত সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোও জরুরী। গন্তব্য দেশ ও ট্রানজিট দেশগুলোর (লিবিয়া, মিসর, দুবাই, তুরস্ক) সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও তথ্য বিনিময় জোরদার করতে পারলেও অবৈধ অভিবাসনের তোড়জোড় অনেকাংশে কমানো যাবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, বিচার বিভাগ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ছাড়া এ সংকট নিরসন সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করেছে, যা এক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আইনটির কঠোর ও দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ।










