অবস্থা এমন যে দেশের অর্থনীতিকে প্রতিদিনই ‘ফায়ার ফাইটিং’ করতে হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন জ্বালানিমন্ত্রী। জ্বালানি ব্যবস্থাপনা ও সংকট মোকাবেলায় সরকার এরই মধ্যে কিছু সাহসী পদক্ষেপ নিলেও দীর্ঘমেয়াদে এসব পদক্ষেপ অর্থনৈতিকভাবে সহনশীল নয়। এমন পরিস্থিতিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সার্বভৌমত্বের দিকে কৌশলভাবে এগোনোর তাগাদা বেড়ে চলেছে। অনেক দেশ সেদিকে অনেকটা পথ এগিয়েছেও। এক্ষেত্রে অর্থনীতিতে ধুঁকতে থাকা পাকিস্তানও দেখিয়েছে উল্লেখযোগ্য সাফল্য। বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনের তথ্য, সরকারি কৌশলী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মাত্র সাড়ে তিন বছরে পাকিস্তান তাদের বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সৌরবিদ্যুতের আওতায় নিয়ে এসেছে। যুদ্ধের কারণে সারা বিশ্ব যখন জ্বালানি তেল-গ্যাসের তীব্র সংকটে ভুগছে, পাকিস্তান সেখানে সৌরবিদ্যুতের প্রসারের মাধ্যমে জ্বালানি পণ্য আমদানিতে অন্তত ১২ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ ব্যয় কমাতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে গল্পটা উল্টো। ভূরাজনৈতিক সংকটে বাংলাদেশ এখন জ্বালানি পণ্য সংগ্রহে বাড়তি ৩ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার সংস্থানের জন্য হিমশিম খাচ্ছে। এমন অবস্থাতেও মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান মাত্র ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ। বিশেষত সৌরবিদ্যুতের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত গ্রিডে সৌরবিদ্যুতের হিস্যা ২ দশমিক ৬৯ শতাংশ করা গেছে। সক্ষমতার পাকিস্তানের সাফল্যের সঙ্গে তুলনা করলে আমাদের স্থবিরতা কেবল সক্ষমতা অভাব নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত পার্থক্যেরই বহিঃপ্রকাশ।
অতীতে দেশের প্রায় সব সরকারই নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছে। কিন্তু কেউই তা পূরণ করতে পারেনি। যেমন ২০০৮ সালে প্রণীত জ্বালানি নীতিতে ২০২১ সাল নাগাদ মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হলেও বাস্তবে ৩ শতাংশের কাছাকাছি ফল পাওয়া যায়। মূলত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ভুল নীতি সিদ্ধান্তের কারণে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। এমনকি ৫০০ মেগাওয়াট সোলার প্রোগ্রাম (২০১২-১৬) এবং পাওয়ার সিস্টেম মাস্টারপ্ল্যান (পিএসএমপি) ২০১০ বিনিয়োগের অভাবে আলোর মুখ দেখেনি। আমদানিনির্ভর হওয়ায় সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের সময় সরকারকে বাধ্য হয়ে কিছু কৃচ্ছ্রমূলক সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। বাড়তি ব্যয়ে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এগুলো দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বৈদেশিক ঋণ এমনকি জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি করবে। এরই মধ্যে দেশের সরকারি অর্থনীতিতেও এর কিছু চাপ দেখা যাচ্ছে। এমন সময়ে কৃচ্ছ্রমূলক নীতি সিদ্ধান্তের পাশাপাশি সাশ্রয়ী অর্থনৈতিক কর্মসূচিকে গুরুত্ব দেয়ার বিকল্প নেই। আর এক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ একটি আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবকাঠামো স্থাপন করতে পারলে প্রায় শূন্য প্রান্তিক খরচে শক্তি উৎপাদন সম্ভব। এ ধরনের জ্বালানির উৎসগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ, অবরোধ কিংবা বিদেশী মুদ্রায় এগুলোর মূল্য নির্ধারণ করা যায় না। তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে বিনিময় হারের অস্থিতিশীলতা, আমদানি সরবরাহ ঘাটতি কিংবা ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির প্রভাব উল্লেখযোগ্য হারে কমানো যায়। শুধু নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎসের শুল্ক নির্ধারণ করতে পারলেই স্থিতিশীল পরিস্থিতি নির্ধারণ সম্ভব। নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎস বিশেষত সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে দেশের পিছিয়ে পড়ার কারণগুলোর অধিকাংশই অবকাঠামোগত ও রাজনৈতিক। এজন্য বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট চরমে। অন্তর্বর্তী সরকার বিশেষ আইনের আওতায় নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে অনুমোদিত ৩৭টি প্রকল্পের লেটার অব ইনটেন্ড বাতিল করে। পরে নতুন দরপত্র আহ্বান করা হলেও বিদেশী কোনো কোম্পানি অংশ নিতে রাজি হয়নি। ফলে নতুন ইউটিলিটি-স্কেল নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প পাইপলাইনে আসেনি। অন্যদিকে পেমেন্ট গ্যারান্টির অনুপস্থিতির ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের নতুন প্রকল্পগুলো ব্যাংক ঋণযোগ্য করা যাচ্ছে না। বাজেটেও নেই বিশেষ বরাদ্দ কিংবা আমদানি শুল্কে ছাড়।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎস বিশেষত সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য সরকারকে দ্রুত উদ্ভাবনী ও কৌশলগত কিছু নীতিসিদ্ধান্ত নিতে হবে। যেমন অন্তর্বর্তী সরকার যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে ১২টি সৌর প্রকল্পকে (মোট ৯১৮ মেগাওয়াট) আর্থিকভাবে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করেছে। নতুন সরকার এগুলোকে দ্রুত বাস্তবায়নের ব্যবস্থা নিতে পারে। পাশাপাশি ‘ইমপ্লিমেন্টেশন এগ্রিমেন্ট’ বা পেমেন্ট গ্যারান্টির সুরাহা করতেও উদ্যোগ নিতে পারে। সৌর প্যানেল ও ইনভার্টার আমদানিতে এখনো প্রায় ২৮ শতাংশের ওপর শুল্ক বিদ্যমান। এজন্য সাধারণ উদ্যোক্তা বা শিল্প মালিকরা সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনে আগ্রহ পাচ্ছেন না। তার পরও শিল্প খাতে ৫০০ মেগাওয়াটের বেশি ছাদভিত্তিক সৌর প্রকল্প স্থাপিত হয়েছে এবং পাইপলাইনে আরো ২০০-৩০০ মেগাওয়াট অপেক্ষমাণ। নীতিগত সহায়তা পেলে এ সংখ্যা দ্রুতই কয়েক গুণ বাড়তে পারে। সৌর প্যানেল, ইনভার্টার এবং সংশ্লিষ্ট সরঞ্জামে আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট কমালে বা প্রত্যাহার করলে বেসরকারি বিনিয়োগ দ্রুত বাড়বে।
সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে দেশের ভূমি সংকটকে একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখানো হয়। তবে চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের হিসাব বলছে, কৃষিজমির সঙ্গে প্রতিযোগিতা না করেও শিল্প-কারখানার ছাদ এবং উন্মুক্ত জলাশয়ে সৌর অবকাঠামো গড়লে ১০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন সম্ভব। আইইইএফএর প্রস্তাব, জামালপুরের চর এলাকায় ৬ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার সৌর পার্ক স্থাপনের সম্ভাবনা আছে। জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের ফাঁকা জমিতেও ৩৫০ মেগাওয়াটের সুযোগ চিহ্নিত করা হয়েছে। জমির সংকট কাটাতে ‘এগ্রো-ভোল্টাইক’ (একই জমিতে চাষ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন) এবং ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাড়ানো যেতে পারে। এজন্য পেশাদার বিশেষজ্ঞদের নেতৃত্বে সামগ্রিক ও বাস্তবসম্মত জ্বালানি মাস্টারপ্ল্যান করাও আবশ্যক।
দেশের বার্ষিক জ্বালানি চাহিদা প্রায় ৭ শতাংশ হারে বাড়ছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে পিক ডিমান্ড ২৫ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাবে বলে অনুমান। এ বাড়তি চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে মেটানো না গেলে আরো বেশি জ্বালানি পণ্য আমদানি করতে হবে। সেটি সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য সুখকর হবে না। দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে কার্যকর মডেল হতে পারে একটি ত্রিস্তরীয় কৌশল: শিল্প ও বাণিজ্যিক ছাদে বড় আকারের রুফটপ সোলার, জলাশয় ও পতিত জমিতে ইউটিলিটি-স্কেল সৌর পার্ক এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজলভ্য ঋণ কাঠামো। বাংলাদেশ ব্যাংক যদি ছাদ-সৌরবিদ্যুতের জন্য একটি একক অনুমোদন প্রক্রিয়াসম্পন্ন বিশেষ তহবিল চালু করে, তাহলে ছোট ও মাঝারি শিল্পও এ সুযোগ নিতে পারবে। এক্ষেত্রে চীনের সৌর প্যানেল উৎপাদনকারীদের বাংলাদেশে কারখানা স্থানান্তরে উৎসাহিত করা যেতে পারে। এতে জ্বালানি পণ্যের আমদানিনির্ভরতা কমবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং দেশীয়ভাবে সস্তায় প্যানেল পাওয়া যাবে।
বর্তমান সরকার তাদের প্রথম ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে একটি স্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরতে চায়। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সরকার ২০৩০ সাল নাগাদ মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্য সফল করার জন্য গ্রিন ফাইন্যান্সিং বা সবুজ অর্থায়নে বাড়তি মনোযোগ জরুরি। লক্ষ্যমাত্রাকে বাস্তবায়ন পর্যায়ে আনতে প্রয়োজন দক্ষ ব্যবস্থাপনাগত সদিচ্ছা। এক্ষেত্রে আমাদের সামনে পাকিস্তান ইতিবাচক উদাহরণ। তারা যদি কৌশলী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সার্বভৌমত্বের পথে এগোতে পারে, আমাদের পক্ষেও তা কঠিন হওয়ার কথা নয়।










