বণিক বার্তার প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অর্থ বিভাগের ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) ৩৯২টি সরকারি প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক প্রতিবেদন জমা দিতে চিঠি দেয়। এর মধ্যে ১০৮টি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন জমা দিতে পেরেছে। বাকি ২৮৪টি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও নীরব। এমনকি ২৭টি প্রতিষ্ঠানের ঠিকানায় পাঠানো চিঠি ফেরত এসেছে। তথ্যটিই দেশের সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিষয়ে উদাসীনতা উন্মোচন করে।

প্রত্যেক সরকারি প্রতিষ্ঠান মূলত একধরনের সামাজিক চুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। জনগণের করের অর্থে এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়। এর বিনিময়ে রাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সেবা, উন্নয়ন ও ব্যয় দক্ষতা এবং সর্বোপরি স্বচ্ছতা সাধারণ মানুষের অধিকার হয়ে ওঠে। অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকার ২৭৯ প্রতিষ্ঠানে পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয় বাবদ ১ লাখ ৩ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। এ বিপুল অংকের অর্থ যেসব প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করছে, তাদের একটি বড় অংশ নিজেদের আর্থিক হিসাবই তৈরি করেনি। এটি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি করদাতাদের প্রতি সরাসরি দায়হীন থাকার মতো মনোভাবও। অথচ এজন্য আর্থিক প্রতিবেদন আইন-২০১৫ বিস্তারিত নির্দেশনা ও বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আর্থিক প্রতিবেদন তৈরির জন্য বিশেষায়িত কমিটি তৈরির নির্দেশ রয়েছে। সেখানে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট বা অডিটর জেনারেলের মাধ্যমে নিরীক্ষারও বাধ্যবাধকতা আছে। কিন্তু অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই এসব নিয়ম মানছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থ বিভাগের মনিটরিং ব্যবস্থা মূলত বাজেট-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত, নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুত এবং অডিট সম্পন্ন করার বিষয়গুলো নিয়মিত তদারক করা হয়নি। তবে বিষয়টি এখন আর প্রতিবেদন জমা কিংবা না দেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এফআরসির কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এসব প্রতিষ্ঠানের একটি বড় অংশ হয়তো আর্থিক প্রতিবেদনই প্রস্তুত করেনি। বিষয়টি গুরুতর, কারণ আর্থিক প্রতিবেদন ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়, সম্পদ, দায় ও প্রকৃত আর্থিক অবস্থার নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকে না। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান যে অর্থ পরিচালনা করছে তা থেকে যাচ্ছে অন্ধকারে। সরকার অনেক প্রতিষ্ঠানের ঋণেরও গ্যারান্টরের ভূমিকায় থাকে। তাই কোনো প্রতিষ্ঠান আচমকা ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সেই দায় সরকারকেই বহন করতে হয়। অথচ আর্থিক প্রতিবেদন না থাকায় কেন ঋণ পরিশোধে প্রতিষ্ঠানটি ব্যর্থ হলো সেটিও জানার উপায় থাকে না। এ সময় সাধারণ করদাতাদেরই এর চাপ বহন করতে হয়। শুধু দুর্নীতি বা অপচয়ের ক্ষেত্রেই নয়, দায় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও এ স্বচ্ছতার অভাব রাষ্ট্রের জন্য সরাসরি আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করে।

সমস্যাটির কাঠামোগত চরিত্রও বোঝা জরুরি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ অডিট ও প্রতিবেদন উপস্থাপন কাঠামো অভিন্ন নয়। কেউ কোম্পানি আইনের আওতায় আবার কেউ বিশেষ আইনের আওতায় পরিচালিত। এ ধরনের বিচ্ছিন্নতা তদারকি কঠিন করে তোলে। এদিকে অর্থ বিভাগের তদারকি ব্যবস্থা বাজেটভিত্তিক হওয়ায় কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার্যত কেউ নিতে চায় না। তবে এ কাঠামোগত সমস্যা অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি। সরকারি সংস্থাগুলো যদি নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুত ও যথাযথ নিরীক্ষা নিশ্চিত না করে, তবে বেসরকারি খাতেও জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার নৈতিক ভিত্তি থাকে না, বরং এসব প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন সুশাসনের ঘাটতি বড় সমস্যা হিসেবেই রয়ে গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে লোকসান হলেও নিয়মবহির্ভূতভাবে বোনাস দেয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এ অনিয়ম শনাক্ত করার একমাত্র পথ আর্থিক প্রতিবেদন হলেও সে প্রতিবেদন তৈরি না হওয়ায় দুর্নীতি বা অপচয়ের পথ আরো সহজ হয়ে ওঠে।

বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক স্বচ্ছতা যাচাইয়ের বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য আর্থিক প্রতিবেদন জমা না দেয়াকে অনুরোধ ও রিমাইন্ডারের মধ্যে রাখলে হবে না। এজন্য স্পষ্ট আইনগত বাধ্যবাধকতা ও জরিমানাসংবলিত কাঠামো রাখতে হবে। কোম্পানি আইনে এরই মধ্যে অর্থবছর শেষের ছয় মাসের মধ্যে অডিট সম্পন্নের বিধান রয়েছে; কিন্তু তার প্রয়োগ নেই। সরকারকে এ বাধ্যবাধকতার লঙ্ঘনে সক্রিয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। অর্থ বিভাগের মনিটরিং শুধু বাজেট বরাদ্দ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। অর্থ ব্যবহারের পর তার হিসাব অর্থাৎ আর্থিক বিবরণী এবং তার স্বাধীন নিরীক্ষা নিশ্চিত করাও বরাদ্দের মতোই গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হওয়া উচিত। বাজেট পাওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে পূর্ববর্তী বছরের অডিটেড প্রতিবেদন জমার বিধান আরোপ করা যেতে পারে। সিএজির কার্যালয়কে আরো শক্তিশালী ও স্বাধীন ভূমিকায় নিযুক্ত করতে হবে। অডিট কার্যক্রম শেষ হলে সে প্রতিবেদন সংসদে পাঠানো এবং তা সর্বসাধারণের কাছে প্রকাশের বিধান যেখানে আছে, সেখানে তা কঠোরভাবে পালন করতে হবে।

অর্থ বিভাগ ‘এসএবিআরই প্লাস’ ডিজিটাল প্লাটফর্মের মতো ইতিবাচক উদ্যোগ চালু করেছে। তবে এ প্লাটফর্মে প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া দ্রুততর করতে হবে এবং তথ্য ইনপুট নিশ্চিত করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক চাপ অব্যাহত রাখতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠানের ঠিকানায় চিঠি ফেরত এসেছে, সেগুলোর বিষয়ে অবিলম্বে তদন্ত প্রয়োজন। কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব যাচাইযোগ্য না হওয়া শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি সম্পদ আত্মসাতের সম্ভাবনাও ইঙ্গিত করে। বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের পথে রয়েছে। এজন্য নতুন সরকারকেও নানা চাপ সামলাতে হচ্ছে। এ মুহূর্তে সরকারি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনিক সংস্কারের বিষয় নয়, গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার অপরিহার্য শর্তও। এজন্য প্রয়োজন সমন্বিত নীতি সংস্কার, আইনগত শক্তিশালীকরণ ও মনিটরিং ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন।