বাংলাদেশের আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসে বামপন্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের এক ঐতিহ্য রয়েছে। তারা জনগণের মৌলিক, রাজনৈতিক ও সার্বভৌম অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে সবসময় সোচ্চার থাকে। তার পরও কেন বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তারা সফল হতে পারছে না?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রতিটি বড় আন্দোলন বা গণ-অভ্যুত্থানের নেপথ্যে বামপন্থীদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের সব আন্দোলনে এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকালে তারা গুরুত্বপূর্ণ ও পটপরিবর্তনকারী প্রভাব রেখেছে। ‘দ্রোহ যাত্রা’র মতো প্রভাবশালী বামপন্থী উদ্যোগ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাজপথের লড়াইয়ে তারা বরাবরই সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা পালন করে এসেছে। কিন্তু রাজপথের সক্রিয়তা সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামোতে বা বৃহত্তর জনমানসে তাদের প্রভাব কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারছে না। এর মূলে রয়েছে—তাদের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী অভ্যন্তরীণ বিভাজন, ঐতিহাসিক বিভ্রান্তি এবং তাদের দ্বিমেরুকরণে শাসকশ্রেণীর সূক্ষ্ম কৌশল।
বর্তমান রাষ্ট্র ও সরকারের ‘পদ্ধতিগত দুর্নীতি’র প্রেক্ষাপটে বামধারার রাজনৈতিক দলগুলোর মূলধারার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা একটি নিরর্থক প্রচেষ্টা। এ নির্বাচনগুলো মূলত ধনী অভিজাত শ্রেণীর অর্থ, পেশিশক্তি ও ধর্মীয় বাগাড়ম্বর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, যার ফলে তৃণমূল পর্যায়ে সমাজতন্ত্রকে ধারণকারী রাজনৈতিকদের অপমানজনক পরাজয় এবং জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার মতো পরিস্থিতির শিকার হতে হয়। অর্থ, ধর্মীয় উন্মাদনা ও সাম্প্রদায়িক প্রশ্নের প্রভাবের বিপরীতে বামপন্থীদের সফল হওয়া কঠিন।
চিরকালের মতোই এখনো আমাদের রাজনীতি মূলত দুটি বৃহৎ বুর্জোয়া শক্তির দ্বন্দ্বে আটকা পড়েছে—যেখানে একপাশে রয়েছে বিএনপি এবং অন্যপাশে তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াত; যারা বর্তমানে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। জামায়াত যদিও ধর্মের আচ্ছাদন ব্যবহার করে, কিন্তু তারাও মূলত ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে বিশ্বাসী এবং এ বিদ্যমান পুঁজিবাদী ও বুর্জোয়া ব্যবস্থাটিকেই টিকিয়ে রাখতে চায়। এ যে দ্বিমুখী লড়াই, এখানে নীতি বা আদর্শের চেয়ে অর্থের দাপটই শেষ কথা। এ ব্যবস্থায় বামপন্থীদের অংশগ্রহণ তাদের কোনো রাজনৈতিক শক্তি দেয় না, বরং তাদের ভাবমূর্তিকে সাধারণ মানুষের কাছে করুণার পাত্র হিসেবে উপস্থাপন করে।
বামধারার দলগুলোর রাজনৈতিক বিকাশের পথে মূল দুর্বলতার ক্ষেত্রগুলোকে আপনি কীভাবে দেখেন?
এ দেশের বামপন্থীদের প্রধান দুর্বলতা হলো তাদের অভ্যন্তরীণ বিভ্রান্তি এবং দীর্ঘদিনের বিভেদ। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক সময়কার রুশ-চীন বিভাজন বাংলাদেশের বাম আন্দোলনেও গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল। স্বাধীনতার পর রুশ-চীন বিভাজনের ফলে তারা বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। বামপন্থীদের একাংশ (রুশপন্থী) তৎকালীন শাসক দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিশে গিয়ে নিজেদের স্বকীয়তা হারায়, আরেক অংশ (চীনপন্থী) তথাকথিত ‘গলাকাটার মতো চরমপন্থী কর্মকাণ্ড’ বা উগ্র রাজনীতির পথে পা বাড়িয়ে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এভাবেই আদর্শিক দ্বিধা ও সাংগঠনিক বিচ্ছিন্নতায় বামপন্থীরা নিজেদের সামর্থ্য ক্ষয় করে সামগ্রিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
আমাদের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকারী শাসকগোষ্ঠী বা ‘বুর্জোয়া’রা বামপন্থীদের চিরকালই তাদের প্রধান শত্রু হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। এ শাসকশ্রেণী যারা রাষ্ট্রীয় সম্পদ পাচার, নিপীড়ন ও নির্যাতনে লিপ্ত, তারা বাম শক্তিকে দমন করতে দ্বিমুখী কৌশল গ্রহণ করে। একদিকে চলে কঠোর রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও ভীতি প্রদর্শন, আর অন্যদিকে চলে লোভ ও প্রলোভন দেখিয়ে বামদের নিজেদের দলে টেনে নেয়া। এভাবেই শাসকগোষ্ঠী যেমন বাম কর্মীদের জেল-জুলুম দিয়ে দমন করার চেষ্টা করে, আবার অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার টোপ দিয়ে তাদের নিজেদের স্বার্থভোগী বানায়। লোভ ও ভীতির এ জাঁতাকলে পড়ে অনেক সম্ভাবনাময় বাম নেতৃত্ব পথ হারিয়ে ফেলেছে।
আবার একই সঙ্গে এটাও সত্য যে বামপন্থীদের প্রতি প্রচারমাধ্যম বা মিডিয়ার অসহযোগিতা। মিডিয়া মূলত শাসকগোষ্ঠী বা বড় পুঁজিপতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। ফলে বামপন্থীরা জনস্বার্থে যতই আন্দোলন বা কাজ করুক না কেন মিডিয়াতে তাদের উপযুক্ত প্রচার ঘটে না। তাদের কার্যক্রমকে সুকৌশলে আড়াল করে রাখা হয়, যার ফলে সাধারণ মানুষের কাছে তাদের বার্তা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। আবার বামপন্থী মানেই নেতিবাচক ‘ইমেজ’-এর গড়ন দিয়ে তাদের সমাজ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে। এটাও তাদের রাজনৈতিক বিকাশের পথে একটি বড় বাধা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির সঙ্গে জোটে থেকে তিনটি বাম ঘরানার দল ৩৫ জন প্রার্থী দিয়ে মাত্র একটি আসন জিতলেও বাকিগুলোয় জামানত হারায়। এর বাইরে ১০টি বাম দলের জোট ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’ নিবন্ধিত চারটি দলের প্রতীকে ১৪৭টি আসনে নির্বাচন করে সবক’টিতেই জামানত হারিয়েছে। ফলাফলে এমন ভরাডুবি পেছনের কারণগুলো কী কী বলে আপনি মনে করেন?
রাজনীতির এ জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়, বর্তমানে বামপন্থীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ কেবল নিরর্থক বা ভুলই নয়, বরং এক ধরনের চরম নির্বুদ্ধিতা। কেন আমি ‘নির্বুদ্ধিতা’র মতো কঠোর শব্দটি ব্যবহার করছি, তা ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। বর্তমানে বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা মূলত টাকার খেলা এবং পেশিশক্তির দখলে। এখানে নীতি বা আদর্শের চেয়ে অর্থের দাপটই শেষ কথা বলে। এ অসম প্রতিযোগিতার ময়দানে বামপন্থীরা যখন নির্বাচনে অংশ নেয়, তখন তারা কেবল পরাজিতই হয় না, বরং তাদের জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার মতো করুণ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।
বর্তমান বাংলাদেশের ক্ষমতার দ্বন্দ্বে উত্তাল রাজনৈতিক দৃশ্যপট নিয়ে বামপন্থী দলগুলোর ভূমিকা এবং কৌশল নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে জনসংযোগ বৃদ্ধি বা শক্তি অর্জনের যে যুক্তি বামপন্থীরা দেয় তা বাস্তবে কাজ করছে না। তাদের কষ্টার্জিত অর্থ যা জামানত হিসেবে তারা জমা রাখছে সেসব অপচয় ও সময়ের অপব্যবহার করে বরং তারা মানুষের মধ্যে এ ধারণার জন্মই দিচ্ছে যে বামপন্থীরা কোনো কাজের নয়।
এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ভরাডুবির মুখে পড়েছে বামপন্থী দলগুলো। দুই জোটে বিভক্ত হয়ে ১৮২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও এর মধ্যে ১৮০টিতেই তাদের প্রার্থীদের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে এসব আসনে বাম দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের হার মাত্র শূন্য দশমিক ৩৬ শতাংশ। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, অনেক বড় মাপের বামপন্থী নেতা এমনকি পার্টির সাধারণ সম্পাদকও নির্বাচনে দাঁড়িয়ে ২০০ ভোটও পান না, যা এটি কেবল পরাজয়ের মাপকাঠি তো নয়-ই বরং এটি একটি পদ্ধতিগত বিপর্যয়। ভোটারদের দোষ দিয়ে লাভ নেই; এ ব্যবস্থায় বামপন্থী ভোটাররাও জানেন যে বামপন্থীরা জিততে পারবে না, তাই তারা অনেক সময় প্রতিক্রিয়াশীল বা অন্য কোনো শক্তিকে ঠেকানোর জন্য তাদের মূল্যবান ভোটটি বড় কোনো দলের প্রতীকে (যেমন ধানের শীষ) দিয়ে দেয়। ফলে বামপন্থীদের নিজস্ব যে নগণ্য সমর্থনটুকু আছে, তাও নির্বাচনের ব্যালটে অদৃশ্য হয়ে যায়। আবার এটি প্রার্থীর দোষ নয় বরং বিদ্যমান ব্যবস্থারই প্রতিফলন, যেখানে সাধারণ মানুষের কাছে তাদের বার্তা পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত শক্তি বা প্রচার মাধ্যম নেই।
অনেক সময় দেখা যায় নির্বাচনের আগে বামপন্থীরা একটি যুক্তফ্রন্ট গঠন করে। কিন্তু আমার পর্যবেক্ষণ হলো এ যুক্তফ্রন্ট গঠন করা উচিত ছিল নির্বাচনের অনেক আগে এবং তা হওয়া উচিত ছিল সামাজিক আন্দোলনের জন্য, নির্বাচনের জন্য নয়। এরপর দেখা যায় যে নির্বাচনের সময় যখন তারা আলাদা প্রতীকে প্রার্থী দেয় বা একই আসনে একাধিক প্রার্থী দাঁড় করায়, তখন তাদের রাজনৈতিক দুর্বলতাই কেবল প্রকট হয়ে ধরা দেয়। এ নির্বাচনে অংশ নিতে গিয়ে তারা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে চাঁদা তুলে যে অর্থ খরচ করে, তার বিনিময়ে তাদের জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়া এবং জনগণের উপহাস ছাড়া আর কিছুই জোটে না।
বামপন্থীরা যদি এ নির্বাচনী মোহ ত্যাগ করে বিপ্লবী পথে না ফেরে, তবে আমাদের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত অন্ধকার। বাংলাদেশে বর্তমানে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক চরিত্র দাঁড়িয়েছে, যেখানে পেশিশক্তি ও ধর্মীয় উন্মাদনার জয়জয়কার, সেখানে বামপন্থীদের অনুপস্থিতি সমাজকে আরো বেশি অস্থির করে তুলবে।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার থাকে। সেদিক দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলে আরো বেশি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার সম্ভাবনা থেকে যায় কিনা?
রাজনীতি যখন কেবল ক্ষমতার পালাবদলের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়, তখন সাধারণ মানুষের মৌলিক সমস্যাগুলো আড়ালে পড়ে যায়। বামপন্থীদের কাজ হওয়া উচিত ছিল সংসদীয় আসনের পেছনে না ছুটে এ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের কথা বলা। বামপন্থীদের মূল লক্ষ্য সামাজিক বিপ্লব আনা। ক্রমবর্ধমান বৈষম্য দূর করতে ব্যক্তিগত মালিকানার পরিবর্তে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ, সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং সংগঠিত কর্মকাণ্ডকে অগ্রাধিকার দিয়ে তাদের গণ-জাগরণের দিকে যেতে হবে।
এজন্য তাদের কাজ হলো আন্দোলন করা, নির্বাচন করা নয়। এ নির্বাচন হচ্ছে টাকার খেলা এবং এখানে দ্বিপক্ষীয়ভাবে শুধু বড় দলগুলোরই সুযোগ আছে, তৃতীয় পক্ষের কোনো সুযোগ নেই। বামপন্থীরা যদি এ বুর্জোয়া রাজনীতি পরিত্যাগ করে ব্যক্তি মালিকানার জায়গায় সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার জন্য সামাজিক বিপ্লবের আওয়াজ তোলে, তাহলেই তাদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে। তরুণ প্রজন্মকে তখনই সঙ্গে পাওয়া যাবে যখন বামপন্থীরা শুধু সরকারের পরিবর্তন নয়, বরং গোটা ব্যবস্থার পরিবর্তনের কথা বলবে। বর্তমান উন্নয়নের ফলে যে বৈষম্য বাড়ছে এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের শত্রুতার সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।
সেক্ষেত্রে বামপন্থী দলগুলো ঘুরে দাঁড়াতে চাইলে তাদের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত?
আমি মনে করি, তাদের সামনে এখন দুটি পথ খোলা আছে। প্রথমত, একটি শক্তিশালী ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্মের মাধ্যমে রাজপথে নিরবচ্ছিন্ন আন্দোলন গড়ে তোলা। দ্বিতীয়ত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে সামাজিক জাগরণ ঘটানো। কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতা দিয়ে সাধারণ মানুষকে বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও তরুণদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয়। সারা দেশে পাড়া-মহল্লায় নাটক, গান, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী এবং খেলাধুলার মতো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে দিতে হবে।
এ সাংস্কৃতিক চর্চা কোনো লক্ষ্যহীন বিনোদন হবে না; এর আদর্শ হবে বিদ্যমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে বিদায় করে একটি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। সাংস্কৃতিক পাঠশালাগুলোতে নিয়মিত আলোচনা ও বক্তৃতার ব্যবস্থা করতে হবে যাতে মানুষ বুঝতে পারে কেন এ বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা তাদের জন্য ক্ষতিকর। মনে রাখতে হবে, মানুষের মনোজগতে পরিবর্তন না এনে কোনো বিপ্লব সফল হয় না। গণমাধ্যমগুলো হয়তো বামপন্থীদের প্রচার দেয় না বা তাদের কেবল নেতিবাচক দিকগুলোই তুলে ধরে। এ প্রতিকূলতায় বিকল্প সংস্কৃতিই হতে পারে তাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
এছাড়া জনগণ যে ইস্যুগুলোতে আন্দোলন প্রত্যাশা করে, বামপন্থীরা সেখানে অনেক সময় অনুপস্থিত থাকছে। উদাহরণস্বরূপ আমেরিকার সঙ্গে সম্পাদিত ত্রিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি বা চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল নিয়ে যে বিতর্ক, তা সাধারণ মানুষের স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। সরকারের অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে এ ধরনের চুক্তির বিরুদ্ধে জনমত গঠন করা এবং রাজপথে আন্দোলন গড়ে তোলা ছিল বামপন্থীদের প্রধান দায়িত্ব। অথচ দেখা যাচ্ছে, চাঁদাবাজির মতো ইস্যুগুলো জামায়াত দখল করে নিচ্ছে, যেখানে বামপন্থীদের উচ্চকণ্ঠ হওয়া উচিত ছিল।
আগামীর রাজনীতিতে বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর ভবিষ্যৎ কী দেখছেন?
বামপন্থীরা যদি এ নির্বাচনী মোহ ত্যাগ করে বিপ্লবী পথে না ফেরে, তবে আমাদের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত অন্ধকার। বাংলাদেশে বর্তমানে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক চরিত্র দাঁড়িয়েছে, যেখানে পেশিশক্তি ও ধর্মীয় উন্মাদনার জয়জয়কার, সেখানে বামপন্থীদের অনুপস্থিতি সমাজকে আরো বেশি অস্থির করে তুলবে। ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে নির্বাচনে এগিয়ে থাকা বা বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়ে মানুষের বাহবা পাওয়া হয়তো ভালো কাজ, কিন্তু তা রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর হয় না যদি না তার পেছনে একটি বৃহত্তর আদর্শিক আন্দোলন থাকে। বামপন্থীদের হতে হবে প্রকৃত”বিপ্লবী, কেবল ক্ষমতা-সচেতন দল নয়। তারা যদি সামাজিক বিপ্লবের ডাক দেয় এবং সংস্কৃতি ও আন্দোলনের মাধ্যমে জনমানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারে, তবেই এ ধ্বংসোন্মুখ সমাজ ব্যবস্থা থেকে মুক্তি সম্ভব। না হলে তারা কেবল ইতিহাসের পাতায়”করুণার পাত্র হিসেবেই থেকে যাবে।
কেবল সরকারের পরিবর্তনের বিভ্রান্তি কাটিয়ে এবং শাসকশ্রেণীর লোভ ও ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে তারা একক প্লাটফর্মে যতক্ষণ দাঁড়াতে না পারবে, ততক্ষণ পর্যন্ত রাজপথের বিজয়কে রাষ্ট্রীয় বিজয়ে রূপান্তর করা অসম্ভব। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বামপন্থীদের প্রয়োজন নিজেদের ভুলগুলো আত্মস্থ করা এবং গণমানুষের সত্যিকারের প্রতিনিধি হিসেবে নিজেদের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।










