নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এতে কষ্টে আছে সাধারণ মানুষ। পরিবারের জন্য খাদ্যদ্রব্য কিনতে আয়ের বড় একটি অংশ ব্যয় করতে হচ্ছে। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের ভারসাম্য বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ জনগণ। উপার্জন না বাড়লেও ব্যয় বাড়ছে। এক্ষেত্রে স্বস্তির মাধ্যম হিসেবে গণ্য হয় সরকারের বিভিন্ন খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি। মাঝে বন্ধ থাকলেও গতকাল থেকে আবারো শুরু হয়েছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) কার্যক্রম।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, নিম্ন আয়ের এক কোটি ফ্যামিলি কার্ডধারী পরিবারের মধ্যে ভর্তুকি মূল্যে টিসিবির পাঁচ পণ্য বিক্রি শুরু হয়েছে। রাজধানীর ধানমন্ডি লেক এলাকায় স্থানীয় কাউন্সিলরের কার্যালয়ের সামনে সকালে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। সারা দেশে এ কার্যক্রম চলবে। এর আওতায় কার্ডধারীরা নির্ধারিত পরিমাণে চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ ও চিনি কিনতে পারবেন। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে টিসিবি এ তথ্য জানিয়েছে।
এ দফায় ফ্যামিলি কার্ডধারী একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ দুই লিটার সয়াবিন অথবা কুঁড়ার (রাইস ব্র্যান) তেল, পাঁচ কেজি চাল, দুই কেজি করে মসুর ডাল ও পেঁয়াজ এবং এক কেজি চিনি কিনতে পারবেন। এর মধ্যে প্রতি লিটার তেলের দাম রাখা হবে ১০০ টাকা। প্রতি কেজি চাল ৩০, মসুর ডাল ৬০, পেঁয়াজ ৩৫ ও চিনি ৭০ টাকা দরে বিক্রি করবে টিসিবি। তবে আমদানি করা পেঁয়াজের প্রাপ্যতা সাপেক্ষে শুধু ঢাকা নগরীতে বিক্রি করা হবে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। এছাড়া চিনিও প্রাপ্যতা সাপেক্ষে কয়েকটি স্থানে বিক্রি করা হবে বলে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ এ দফায় পেঁয়াজ ও চিনি সীমিত পরিসরে বিক্রি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে সংস্থাটির আশাবাদ।
টিসিবি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে, নিম্ন আয়ের এক কোটি উপকারভোগী পরিবারের মধ্যে ভর্তুকি মূল্যে এসব পণ্য এক মাস বিক্রি করা হবে। সিটি করপোরেশন ও জেলা-উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় নির্ধারিত তারিখ ও সময় অনুযায়ী পরিবেশকরা টিসিবির পণ্য বিক্রয় কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। এ সময়ে নিজ নিজ এলাকার পরিবেশকদের দোকান বা নির্ধারিত স্থান থেকে ফ্যামিলি কার্ডধারীরা পণ্য কিনতে পারবেন। ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় গত জুলাইয়ে প্রথমবারের মতো চাল বিক্রি শুরু করে টিসিবি।
বস্তুত এমন এক সময়ে টিসিবির এ কার্যক্রম শুরু হলো, যখন এটি তীব্রভাবে প্রত্যাশিত ছিল। কারণ দেশে গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি সাড়ে ১২ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা গত সাড়ে ১১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। খাদ্যপণ্য কিনতে মানুষকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিক পরিমাণে খরচ করতে হচ্ছে। এতে নিম্ন আয়ের মানুষ সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়ছে। তাই সার্বিকভাবে টিসিবির এ কার্যক্রম নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তায় ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এ ধরনের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি নিয়মিত অব্যাহত থাকবে এটিই প্রত্যাশিত। এক্ষেত্রে খোলাবাজারে পণ্য বিক্রি (ওএমএস), ভিজিএফ, ভিজিডির মতো কর্মসূচিও বজায় থাকা উচিত ছিল। কিন্তু এ কার্যক্রমগুলো সম্প্রতি বন্ধ রয়েছে। এমন সময়ে টিসিবির এ কর্মসূচি নিঃসন্দেহে স্বস্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটাবে। তবে টিসিবির কার্যক্রম আরো ঢেলে সাজানোর প্রয়োজন রয়েছে। কারণ মূল্যস্ফীতির প্রভাব নিম্নবিত্ত মানুষের পাশাপাশি মধ্যবিত্ত মানুষকেও স্পর্শ করছে। অতীতে ট্রাকে করে টিসিবির পণ্য বিক্রির সময় মধ্যবিত্তদেরও লাইনে দাঁড়াতে দেখা গেছে। এজন্য ২০২১ সালের মতো ই-কমার্স প্লাটফর্মগুলোর মাধ্যমে টিসিবির পণ্য বিক্রি করলে মধ্যবিত্ত শ্রেণীও উপকৃত হবে।
তবে টিসিবির এ কার্যক্রম নিয়মিত অব্যাহত রাখা উচিত। সাধারণত দেখা যায়, বাজারে যখন কিছু কিছু পণ্যের দাম ব্যবসায়ীরা অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেন, তখন টিসিবি স্বল্প কিংবা নিম্ন আয়ের মানুষের কষ্ট লাঘবের জন্য ন্যায্যমূল্যে ওইসব পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করে থাকে। আবার পণ্যের পরিমাণ ও কর্মসূচির মেয়াদের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ কর্মসূচি এক মাসের জন্য নেয়া হয়েছে। তাছাড়া যে পরিমাণ পণ্য দেয়া হচ্ছে, তাতে একটি পরিবারের সারা মাসের খাবারের জোগান হবে না। এটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাই পণ্যের পরিমাণ বৃদ্ধি ও বাজারে পণ্যের মূল্য স্বাভাবিক হওয়ার আগে টিসিবির কর্মসূচি অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। তাছাড়া ট্রাকে বিক্রি না করে ডিলারের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করার ক্ষেত্রে টিসিবি যেসব যুক্তি দেখিয়েছে, তা গ্রহণযোগ্যতা রাখলেও এক্ষেত্রে যেন কোনো দুর্নীতি না হয় সেটি খেয়াল রাখতে হবে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, মূলত দরিদ্র শ্রেণীর কথা বিবেচনা করেই এ কার্যক্রম নেয়া হয়। তাই দরিদ্ররা টিসিবির কর্মসূচির সুফল পাচ্ছে কিনা সেটি নিশ্চিত করা দরকার। এক্ষেত্রে টিসিবির কার্ড বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এক কোটি কার্ডকে স্মার্ট কার্ডে রূপান্তরের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এ মাসের শেষ নাগাদ বিতরণ কার্যক্রম শুরু করা হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। উদ্যোগটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। দেশে সাধারণ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তায় টিসিবি কার্যকর ভূমিকা রাখুক, আমরা এ প্রত্যাশাই করি।










