পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যের আধার হিসেবেও এ ম্যানগ্রোভ বন অনন্য। এটি প্রাণিজ ও বনজ সম্পদেও পরিপূর্ণ। কিন্তু বর্তমানে বহুমুখী সংকটের মুখে ক্রমেই এসব ঐতিহ্য ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ছে। বনটি খোদ অস্তিত্ব সংকটে পড়ে গেছে। বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক অভিঘাত ও অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা সুন্দরবনকে ক্রমেই ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সুন্দরবনকে বাঁচাতে হলে টেকসই সংরক্ষণ ব্যবস্থায় মনোযোগ দিতে হবে। আর এটি সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া সম্ভব নয়।

সুন্দরবনের অস্তিত্বকে যে সংকটগুলো ঝুঁকিপূর্ণ করেছে, সেগুলো বিশ্লেষণে অন্তত এটা স্পষ্ট হয় যে তার কোনোটাই একদিনে সৃষ্ট না। ক্রমেই সংকটের সংখ্যা ও তীব্রতা বেড়েছে। সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষাকে যে কখনই কার্যকরভাবে প্রাধান্য দেয়া হয়নি সেটিও নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই কোনো একক সিদ্ধান্ত বা উদ্যোগের মাধ্যমে ম্যানগ্রোভ বনটি বাঁচানো কঠিন হবে।

সম্প্রতি ‘টেকসই উন্নয়নের জন্য সুন্দরবন ও উপকূলীয় জীবিকার সুরক্ষা’ শীর্ষক এক সংলাপে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুন্দরবনকে বাংলাদেশের ফুসফুস হিসেবে উল্লেখ করে জানিয়েছেন যে আমাদের স্বার্থে এবং আগামী প্রজন্মের স্বার্থে সুন্দরবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি সুন্দরবন সংরক্ষণে বিশ্বব্যাংকের ৬০ মিলিয়ন ডলারের নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তুতির কথাও উল্লেখ করেছেন, যেখানে ব্যয়ের খাত হিসেবে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি, বননির্ভর মানুষের বিকল্প জীবিকা, বন বিভাগের সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ অন্যান্য উদ্যোগ তুলে ধরা হয়েছে। এ উদ্যোগগুলোও সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনকে নির্দেশ করছে। প্রত্যাশা রয়েছে, এ মন্ত্রণালয় সুন্দরবন রক্ষায় আগামীতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে। অতীতে সুন্দরবন সংরক্ষণে বিভিন্ন প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও তার সুফল প্রত্যাশিত মাত্রায় পাওয়া যায়নি। তাই নতুন প্রকল্পটিকে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন বা অর্থ ব্যয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বন ধ্বংসের মূল সংকটগুলোর সমাধানে জোর দেয়া হবে।

সুন্দরবনের অস্তিত্ব হুমকিতে পড়ার পেছনে দুই ধরনের কারণ রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ও মানবসৃষ্ট। দীর্ঘদিন ধরে উজান থেকে স্বাদুপানির প্রবাহ কমে যাওয়া, সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত ও সংলগ্ন নদীর নাব্য সংকট, জলাধার ও ভূমিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে যাওয়া, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং তাপমাত্রার পরিবর্তন বনটির প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে নষ্ট করছে। ফলে লবণাক্ততাসহিষ্ণু উদ্ভিদের বিস্তার ঘটলেও বহু দেশীয় প্রজাতি বিলুপ্তির মুখে। এর প্রভাব মাছ, সরীসৃপ, পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণীর আবাসস্থল এবং খাদ্যশৃঙ্খলেও পড়ছে।

তবে সুন্দরবনের ওপর সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে আছে মানুষ ও নীতিনির্ধারকদের অবিবেচক কর্মকাণ্ড। সংরক্ষিত বনাঞ্চলের আশপাশে ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, গুদাম, এলপিজি প্লান্ট ও অন্যান্য স্থাপনা গড়ে ওঠা সুন্দরবনের পরিবেশগত ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়েছে। অপরিশোধিত শিল্প বর্জ্য নদীতে ফেলা, বনের ভেতর ও আশপাশে জাহাজ চলাচল, তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা, প্লাস্টিক দূষণ, নিয়ন্ত্রণহীন পর্যটন, অবৈধভাবে সম্পদ আহরণ, বিষ দিয়ে মাছ ধরা, বনভূমিতে আগুন লাগানো এবং বন্যপ্রাণী শিকার—এসব মিলিয়ে সুন্দরবন বহুমাত্রিক আগ্রাসনের মুখোমুখি। অর্থাৎ বনটি এখন একই সঙ্গে জলবায়ু ও মানবসৃষ্ট সংকটের দ্বৈত চাপ বহন করছে। এ চাপ মোকাবেলায় সুন্দরবনে প্রবেশাধিকার সীমিত করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

২০২১ সাল থেকে প্রজনন মৌসুমে সুন্দরবনকে মানুষের সব ধরনের হস্তক্ষেপমুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত নেয় বন বিভাগ। এর অংশ হিসেবে গত ১ জুন থেকে টানা তিন মাস সব ধরনের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে বন বিভাগ। আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে। এ সময় জেলে, বাওয়াল, মৌয়াল, গোলপাতা সংগ্রহকারী থেকে শুরু করে পর্যটক সবার প্রবেশ নিষিদ্ধ। কিন্তু এর পরও প্রতি বছর এ সময় অবৈধভাবে অনেকের প্রবেশের অভিযোগ পাওয়া যায়। বন বিভাগের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জে পরিচালিত অভিযানে ৫ হাজার ৭১২ মিটার হরিণ ধরার ফাঁদ, ৪৮৭ কেজি হরিণের মাংস, ২ হাজার ৬১২ কেজি মাছ, ১ হাজার ৯৮১ কেজি কাঁকড়া, ৮৭ বোতল বিষাক্ত কীটনাশক এবং ২০৩ কেজি মধু জব্দ করা হয়েছে। একই সময়ে ২২টি ট্রলার, ৩৪৯টি নৌকা এবং হাজার হাজার অবৈধ কাঁকড়া ধরার ফাঁদ উদ্ধার করা হয়। এসব পরিসংখ্যান এটিই তুলে ধরছে যে সুন্দরবনে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা দেয়াই সমাধান নয়। এমনকি অপরাধ নিয়ন্ত্রণের চেয়ে দমনকে গুরুত্ব দেয়া জরুরি। আর এজন্য সর্বক্ষণিক কঠোর নজরদারি রাখা আবশ্যক। সেটি যেমন প্রযুক্তিনির্ভর হতে হবে, সশরীরেও তদারকি জারি রাখতে হবে। তবে এক্ষেত্রে বননির্ভর জনগোষ্ঠীর জীবিকার সুরক্ষায় বিকল্প কর্মসংস্থানের কথাও সরকারকে চিন্তা করতে হবে। নয়তো অবৈধভাবে সুন্দরবনের সম্পদ আহরণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হতে পারে।

এর বাইরে উদ্বেগের বিষয় হলো, সরকার সুন্দরবনের চারপাশের ১০ কিলোমিটার এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করলেও বাস্তবে সেখানে শিল্পায়ন থামানো যায়নি। ভবিষ্যতে আর কোনো শিল্পায়ন থেকে সুন্দরবন অঞ্চলকে বাঁচাতে হবে। আর বিদ্যমান কারখানার বর্জ্য যেন সুন্দরবনসংলগ্ন জলাধারে না যায়, সেটি কঠোরভাবে নিশ্চিত করতে হবে। তরল বর্জ্য পরিশোধিত আকারে নদীতে যাচ্ছে কিনা সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। অর্থাৎ বিদ্যমান শিল্প-কারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করে নিয়মিত পরিবেশগত নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। পাশাপাশি নদীগুলোর নাব্যতা ফেরানোর উদ্যোগ নিতে হবে। এছাড়া সুন্দরবনের নদীপথে ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য পরিবহনে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং দুর্ঘটনা মোকাবেলায় দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রিত পর্যটন, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণভিত্তিক বন ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু অভিযোজনভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।