দীর্ঘদিন পর ভোটের আমেজে তরুণদের ভাসতে দেখে ভালো লেগেছে। তবে রিসেট বাটনের মোহ থেকে তারা বেরোতে না পারলেও ঝানু দলীয় রাজনীতিবিদদের ফিরে আসার ব্যাখ্যা জাতির কাছে এখনো অস্পষ্ট। অবশ্য জাতি, দেশ, সার্বভৌমত্ব এবং সেসবের আলোকে রাষ্ট্র বিনির্মাণের পুরনো ভাবনাগুলো দ্বৈত বশ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের চালিত ‘গণতন্ত্র’-এর জোয়ারে ম্লান হয়ে পড়েছে। তাই সংশয় জাগে আবারো কি আমরা সেই (পিচ্চি-পাচ্চা) ইন্সি-উইন্সি মাকড়সার মতো ওপরে ওঠা ও পিছলে পড়ার বিরামহীন ফাঁদে আটকে পড়লাম? একটা নল বেয়ে মাকড়সাটি যতবার ওপরে উঠতে চেষ্টা করছিল, বৃষ্টির জল তাকে ফের গোড়াতে নামিয়ে দিচ্ছিল। তার মতো আমাদেরও কি নতুন সূর্যের অপেক্ষায় থাকতে হবে যার আলোয় পিচ্ছিলতা কাটবে এবং আমরা ঝরঝরা শরীর (ও মন) নিয়ে ওপরে উঠতে আবারো উদ্যোগী হব? নাকি ইতিহাসকে ভুল প্রমাণ করে নিরঙ্কুশ বিজয়ী দল ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে হাত মিলিয়ে স্বদেশ গড়ার কাজে উদ্যোগী হবে? এ সংশয় নিয়েই কয়েকটি ভাবনা তুলে ধরলাম।

যারা দেশী-বিদেশী নানা সমীকরণ বুঝে জানা-অজানা বহুবিধ শক্তি-অপশক্তির ভারসাম্য বজায় রেখে নির্বাচিত হতে পেরেছেন, তাদের রাজনীতির বিষয়ে জ্ঞান দেয়া অর্বাচীনতার প্রকাশ হবে। তবে যে লক্ষণগুলো আমাদের সমাজ ও রাজনীতিতে বারবার ঘটতে দেখা যায়, সেগুলো স্মরণ করা প্রয়োজন এখানে মাত্র চারটি লক্ষণের উল্লেখ করে সম্ভাব্য প্রতিকারের পথ খুঁজব।

প্রথম লক্ষণ: সামরিক শাসনের বিকল্প হিসেবে পরিবারতন্ত্রের পুনরাবির্ভাব যেন চিরন্তন সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে! সেটা দুঃখজনক হলেও চালিকার ভূমিকায় বহিঃস্বার্থের প্রাধান্য থাকলে স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং যৌথ নেতৃত্ব সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হয়। এটা অনস্বীকার্য যে ভোটাধিকার প্রয়োগে সংসদ নির্বাচন এ দেশে স্বাধিকার প্রতিষ্ঠায় ১৯৭০ থেকে ২০২৬ অবধি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে সেটাকে গণতন্ত্রের বায়বীয় রূপ দিয়ে অন্ধ থাকলে আমরা ভুলতে বসব যে বাস্তবে সেই গণতান্ত্রিক চর্চা কেবল একটি মুহূর্তকে ধারণ করে। পক্ষান্তরে বাজার ও সমাজে সিন্ডিকেটসম সংগঠন দানা বাঁধাটাই স্বাভাবিক নিয়ম এবং সে কারণেই ক্ষণিকের গণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডও কলুষিত হতে পারে, যার কিছু নমুনা যত স্বল্পই হোক আমরা এবারকার নির্বাচনে দেখেছি।

সিন্ডিকেটের প্রতিস্থাপন যেখানে অনিবার্য, নাগরিক হিসেবে খারাপ সিন্ডিকেটের বিপক্ষে ভালো সিন্ডিকেটের আগমন-অপেক্ষায় থেকেছি। [২৮ জুন ২০২৪ তারিখে বণিক বার্তায় প্রকাশিত ‘‌সিন্ডিকেট শুধুই কি বিধিসংস্থা ও সরকারের ব্যর্থতা ঢাকার আবরণ’ নিবন্ধে এর ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে।) এ সমীকরণে বাইরের স্বার্থের মতের মিলন যে অভ্যন্তরের সিন্ডিকেটগুলোকে সমধর্মী করে তুলতে পারে, তা দৃষ্টির আড়ালে ছিল। মারিও পুজোর ‘গড ফাদার’ উপন্যাস থেকে বুঝি সিন্ডিকেট টিকিয়ে রাখার জন্য পরিবারতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আজ তাই নাগরিক-ভাবনাকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

দ্বিতীয় লক্ষণ: রাজনীতি, বাজার ও সম্পদের ওপর কর্তৃত্ব স্থাপনের ক্ষেত্রে পেশিশক্তির একচ্ছত্র আধিপত্য। তাই আইন, বিচার বিভাগ, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, প্রশাসন, ইত্যাদিকে স্বাধীন বা স্বায়ত্তশাসিত আখ্যা দেয়া নামসর্বস্ব। বরং সম্পদশালীরা পেশিশক্তি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সেসবকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারে উদ্যোগী হয়। এ লোভের (লাভ-এর নয়) প্রতিযোগিতায় অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আইনানুগ রূপ দিতে যেসব পেশাজীবী সহায়কের ভূমিকা পালন করে, প্রাপ্যতার নিরিখে তাদের সেবারও দাম বৃদ্ধি পেতে থাকে। এর জ্বলন্ত উদাহরণ দেখা গেছে ব্যাংক খাতে, যেখানে অর্থ লোপাটের ফলে দেউলিয়া ব্যাংকগুলোর আমানতকারীদের ভোগান্তি বেড়েছে। অথচ সেই লোপাটকালেই ব্যাংক কর্মকর্তাদের সর্বাধিক বেতন বৃদ্ধি পেয়েছিল। একই প্রবণতা দেখা যায় প্রশাসন খাতে— বিশেষত যখন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ প্রবণতা বৃদ্ধি পায়, তাদের দোসর হিসেবে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন বৃদ্ধির চাপও বাড়ে। বিশ্লেষণের ব্যাপ্তি বাড়ালে সেই তালিকায় অর্থনীতিবিদসহ নাগরিক সমাজের অনেক পেশাই অন্তর্ভুক্ত হবে।

অশুভ প্রতিযোগিতায় রাশ টানার জন্য দুটো পদক্ষেপ জরুরি—এক. বিত্তবানদের স্বল্পকালীন লাভের সুযোগ সীমিত করা এবং দুই. এ ভূখণ্ডে বর্তমানের অশুভ প্রতিযোগিতার সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি নারকীয় পরিণতি সম্পর্কে বিত্তবানদের কার্যকর সম্মিলিত উপলব্ধি, যা বৈরী বহিঃস্বার্থের বিরুদ্ধে সমাজ ও রাজনীতিকে ঐক্যবদ্ধ করবে। কিন্তু বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?

নতুন যাত্রার শুরুতে যুক্তি-তর্ক ভুলে আশা করতে চাইব যে উল্লিখিত প্রথম পাপটি ক্ষমতায় আগত রাজনৈতিক দল বরদাশত করবে না। অর্থাৎ তারা ক্ষমতাকে ব্যবহার করে চুক্তি, ক্রয় বা নিয়োগ বাণিজ্যে লিপ্ত হবে না, চাঁদাবাজিকে শূন্যে নামাবে, ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় পুরনো পাপের পুনরাবৃত্তি ঘটাবে না এবং বিদেশের সঙ্গে অসম চুক্তি করে দেশের সম্পদ পাচারে লিপ্ত হবে না। আদি পাপ থেকে সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতিকে মুক্ত করার সদিচ্ছা আছে কিনা, তা প্রকাশ পাবে সরকারের বেতন ও নাগরিক নীতিতে ও সেসবের বাস্তবায়নে।

যে জনগণের ভোটে সরকার এসেছে, তাদের অধিকাংশ মুদ্রাস্ফীতি-বেতন বৃদ্ধির চক্রাকারের সুবিধা থেকে কেবল বঞ্চিতই নয়, সেই চক্রাকারে মূল্যবৃদ্ধি তাদের আরো নিঃশেষ করে। তাই বেতন বৃদ্ধিতে রাশ টানা জরুরি। এমনকি সম্ভব হলে আনুপাতিক হারে সর্বোচ্চ বেতন বেঁধে দেয়া যেতে পারে। প্রতিযোগিতা ও দক্ষতার দোহাই দিয়ে আকাশচুম্বী বেতন নির্ধারণের যে রীতি কোন কোন খাতে চালু রয়েছে, তার নেতিবাচক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্ভবত এর দক্ষতা বর্ধনকারী ইতিবাচক ভূমিকাকেও হার মানায়। যদি দক্ষ মানবসম্পদের অপ্রতুলতার দোহাই দিয়ে অধিক বেতনের পক্ষে সাফাই গাই, সেক্ষেত্রে অনর্জিত আয়ের ওপর অধিক মাত্রায় আয়কর আরোপ যৌক্তিক। ভেবে দেখা প্রয়োজন যে অধিক বেতন দিলে তা যে মাত্রায় দেশান্তর ও অর্থ পাচারকে উদ্বুদ্ধ করে, সেই একই মাত্রায় পরিমিত বেতন কি মানবসম্পদের দেশান্তর ঘটায়? বেতনের বাইরে ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে অধিক লাভ আয়ে বৈষম্য আনতে পারে এবং সেক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় বিধির মাধ্যমে মুনাফাকে ভোগ থেকে বিনিয়োগে প্রবাহিত করা সম্ভব। শেষোক্তটির ক্ষেত্রে কর-নীতি ও কর-বহির্ভূত রাজস্ব সংগ্রহের সম্ভাবনা পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে।

নাগরিক নীতির ব্যাখ্যা দেয়া প্রয়োজন। রাষ্ট্র ও নাগরিকত্ব দুটো অবিচ্ছেদ্য ধারণা, যা মূর্ত রূপ পায় ‘নাগরিক’-এর আইনি সংজ্ঞায় ও তাদের চিহ্নিত করার বাস্তব পদক্ষেপে। শেষোক্ত ধারণার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ব্যক্তির কর দেয়ার বাধ্যবাধকতা যা তাকে রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধ রাখে। হঠাৎ উড়ে এসে জুড়ে বসা দ্বৈত নাগরিকদের দায়বদ্ধতা থাকে না এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে তারা দেশের ভৌগোলিক সীমানার সুদূরপ্রসারী ভালোমন্দ যথার্থ সুবিচার করতে ব্যর্থ হয়। একই সম্ভাবনা রয়েছে যারা নীতির বারোটা বাজিয়ে অথবা ব্যাংকের অর্থ লোপাট করে ভিনদেশের নাগরিকত্বের আশ্রয় নেয়। বিগত বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতি প্রণয়ন জরুরি। নির্বাচন কমিশনের শিথিলতার কারণে যদি সংসদে দ্বৈত নাগরিকের অনুপ্রবেশ ঘটে থাকে, তা শুরুতেই যাচাই-বাছাই করে শোধরানো প্রয়োজন। একইভাবে প্রয়োজন ঋণখেলাপিদের সংসদে অংশগ্রহণ থেকে বারিত রাখা।

তৃতীয় লক্ষণ: এ নির্বাচন অবধি দুঃখজনকভাবে অর্থ দিয়ে জনসভায় লোক আনতে দেখা গেছে। টেলিভিশনের পর্দায় বিশাল সভা দেখে যদি আমরা প্রভাবান্বিত হই, দোষটা আমাদের। তবে মনে হয়েছে যে পাড়া/মহল্লা পর্যায়ে পেশিশক্তি লালন করা, বর্তমান ‘রাজনৈতিক বন্দোবস্তে’র অন্তর্নিহিত একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অর্থাৎ এতদিন সময় ও শ্রমক্ষেপণ করে আমরা মৌলিক বন্দোবস্তে কোনো পরিবর্তন আনতে পারিনি। চলমান এ বন্দোবস্তের সঙ্গে অদক্ষ মানবসম্পদ, কর্মসংস্থানের অভাব ও চাঁদাবাজি জড়িত, ক্ষমতা-বাণিজ্যে বিনিয়োগ জড়িত এবং আত্মমর্যাদাহীন পরমুখাপেক্ষিতা ও বহিঃশক্তির ওপর নির্ভরশীলতা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে।

চতুর্থ লক্ষণ: ব্যক্তি অপরাধ করে, অথচ দলের দোহাই দিয়ে ব্যক্তি অপরাধের বিচার ও শাস্তি বিলম্ব করা হয়। এ জাতীয় চর্চা ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পরিপন্থী। দলকে অন্তর্ভুক্ত করতে ব্যক্তি অপরাধীকে নির্বিচারে প্রশ্রয় দেয়া যেমন কাম্য নয়, একইভাবে ব্যক্তি অপরাধে দুষ্ট একটি দলকে বেআইনি ঘোষণা করে একজন নিরপরাধ রাজনৈতিক কর্মীকে আমরা দোষী সাব্যস্ত করতে বা বিধিসম্মত কাজ করায় বাধা দিতে পারি না।

আমদানীকৃত রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে এক বছরের অধিককাল ব্যস্ত থাকায় তার রেশ এ নিবন্ধে রয়ে গেছে। এটা অনস্বীকার্য যে বিভাজিত বশ্যতাসম্পন্ন অনেকেই গণ-অভ্যুত্থান ও পরবর্তী ব্যবস্থাপনায় ভালোমন্দ ভূমিকা রেখেছে। তবে নতুন নেতৃত্ব সত্যিকার অর্থে স্বাধীন দেশ ও বাংলা ভাষাকেন্দ্রিক জাতিগোষ্ঠী গড়ে তুলতে সংকল্পবদ্ধ থাকলে মূল নীতি প্রণয়নে ও কর্মক্ষেত্রে কাণ্ডারির ভূমিকায় প্রবাসী নয়, অনিবাসী ও নিবাসী বাংলাদেশীদের প্রতিস্থাপনের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকতে হবে। আমরা প্রবাসীদের সবসময় পাশে চাই, কিন্তু রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতার জন্য মূল মঞ্চে অংশগ্রহণ থেকে তাদের বারিত রাখা প্রয়োজন।

ড. সাজ্জাদ জহির: অর্থনীতিবিদ ও নির্বাহী পরিচালক, ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপ (ইআরজি)