কারণ ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার সম্ভাব্য পরিণতি কেমন হতে পারে, তা নিয়ে অনেক কথা আলোচনা করা যায়। দুঃখজনক বিষয়, এসব আলোচনার অধিকাংশই অস্বস্তিকর। যেমনটি বলেছি, প্রাথমিকভাবে এটি আসলে ট্রাম্পের খামখেয়ালিপনার এক যুদ্ধ।

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাতকে প্রতিরোধমূলক বলা যেতে পারে। কিন্তু এ যুদ্ধকে আমরা কোনোভাবেই পূর্বপ্রতিরোধমূলক বলে অভিহিত করতে পারি না। কেন? যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থের বিরুদ্ধে ইরান তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হুমকির কারণ ছিল না। দেশটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্রে পরিণত হবে বা এমন কোনো উদ্যোগ নেয়ার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে, এটিও বলা যাবে না। তাদের কাছে যা অস্ত্র ছিল বা আছে সেগুলো যে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ব্যবহার করবে, এমন কোনো প্রস্তুতির আলামতও নেই। সর্বোচ্চ এমনটি অনুমান করা যেত, ধীরে ধীরে ইরান হুমকির কারণ হতে পারে। এখানে প্রতিরোধমূলক যুদ্ধ আর পূর্বপ্রতিরোধমূলক যুদ্ধের ফারাক বোঝা জরুরি। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ যদি তার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক নেই এমন একটি দেশকে হুমকি ভাবে এবং প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ হিসেবে হামলা চালায় তাহলে ঘন ঘন সংঘাত বাধা অসম্ভব নয়। এজন্য আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এ ধরনের পদক্ষেপ কোনোভাবেই বৈধ হতে পারে না।

ইরানে হামলার পেছনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অভিসন্ধি রয়েছে। তিনি আসলে মধ্যপ্রাচ্যের শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন চান। অর্থাৎ তার অভিসন্ধির লক্ষ্য সামরিক নয়, রাজনৈতিক। এজন্য তিনি সামরিক সক্ষমতা ব্যবহার করছেন। সামরিক শক্তি ব্যবহার করে তিনি ধ্বংসযজ্ঞ ও হত্যা করতে পারবেন। কিন্তু এককভাবে কোনো অঞ্চলের শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন করে ফেলতে পারবেন না। এখানে গোটা শাসন ব্যবস্থারই পতন ঘটাতে হবে। শুধু শাসকের পতন ঘটালে হবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সশস্ত্র বাহিনীর ভেতর ভাঙন দেখা দিতে পারে। তবে এ ধারণাকে নিশ্চিত ধরে নেয়া যায় না। ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় হামাসের উদাহরণই দেখা যাক। হামাসকে দেখলেই বোঝা যায়, প্রবল আঘাতের মুখেও অনেক সময় রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতাবলয় ধরে রাখতে পারে। ইরানে ধর্মীয় নেতৃত্ব দুর্বল হয়ে উঠেছে। দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর নতুন নেতৃত্ব এসেছে। তবে এ নেতৃত্বে নিরাপত্তা বাহিনীর কেউ খামেনির স্থলাভিষিক্ত হলে দেশটির অবস্থান ভালো হতো।

যখন কোনো একটি অঞ্চলের নেতৃস্থানীয় কাউকে হত্যা করে শাসন ব্যবস্থার বদল আনার কৌশল প্রয়োগ করা হয়, তখন তাকে আমরা ‘ডিক্যাপিটেশন’ বলতে পারি। এ কৌশল ইরানে সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে ক্ষমতায় আসার পর থেকে ইরানের নেতৃত্ব নিজেকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দৃঢ় করেছে। তাছাড়া সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের সম্ভাবনা বাড়ায় দেশটির নেতৃস্থানীয়রা পরবর্তী রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিষয়ে পরিকল্পনা নিতে শুরু করেছেন। এ ব্যাপারে তারা আরো সুসংগঠিতও হচ্ছেন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

চলতি বছর জানুয়ারিতে ট্রাম্প ভেনিজুয়েলায় অভিযান চালান। এ অভিযানের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন শুধু একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা নেতাকে অপসারণ বা প্রতিস্থাপন করতে চেয়েছিল। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সমালোচনাকে তিনি আমলে নেননি। এসব খামখেয়ালিপনার কারণেই ট্রাম্প বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চাপ দেয়ার সক্ষমতা হারিয়েছেন। ইরানের শাসন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন ট্রাম্প। কিন্তু যে পরিবর্তনের কথা তিনি বলছেন সেটা নিশ্চিত করার পর্যাপ্ত প্রস্তুতিই তার ছিল না। ইরানে বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষ ঐক্যবদ্ধ নয়। তাই বর্তমান শাসকদের পতনের পর বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার মতো সংগঠিত তারা নয়। বিরোধী পক্ষের এ দুর্বলতার কারণেই তারা যে বিকল্প হিসেবে সমর্থন তো পাবেই না, ইরানের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও ব্যর্থ হবে।

ইতিহাস বলছে, কোনো ভূখণ্ডের শাসন কাঠামো পাল্টানোর জন্য সামরিক বাহিনীর স্থল উপস্থিতি জরুরি। এ শিক্ষা আমরা পাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি ও জাপানে যা ঘটেছে তা দেখে। পরবর্তী সময়ে পানামা, ইরাক ও আফগানিস্তানের মতো ভূখণ্ডের বাস্তবতাও একই অভিজ্ঞতা দেয়। কিন্তু স্থল উপস্থিতি রাখার পরও কিন্তু অনেক সময় বিদেশী কোনো ভূখণ্ডকে প্রতিরোধের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ইরানের মতো বৃহদায়তন ও প্রবলভাবে আত্মসচেতন এক রাষ্ট্রকে তাই দমিয়ে ফেলা সহজ নয়। সব মিলিয়ে বলা যায়, ট্রাম্প প্রশাসন সীমিত উপায়ে পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করেছে। তারা তুলনামূলকভাবে সীমিত লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। যেমন পরিচিত ইরানি পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দুর্বল করার চেষ্টা করেছে। এভাবে তারা আসলে খামখেয়ালিপনাই দেখিয়েছে। এসব লক্ষ্য বিশ্বাসযোগ্য উপায়েও অর্জন করা যেত। সে পথে ট্রাম্প হাঁটেননি।

ইরানের পরিস্থিতির সঙ্গে সাম্প্রতিক কোনো ঘটনার তুলনা কী হয়? সেটা হবে লিবিয়া। এক দশকেরও কিছু আগে পশ্চিমা বিশ্বের সামরিক বাহিনী সেখানে হামলা চালায়। হামলা চালিয়ে ওখানকার নেতৃত্বকে উৎখাত করা হয়। হামলা শেষে তারা দায় না নিয়ে সেখান থেকে সরে আসে। এরপর দেশটিতে চরম অরাজকতা দেখা দেয়। ইরানের ক্ষেত্রেও আমরা এমন সামরিক উপস্থিতির কথা বিবেচনা করতে পারি। এটিকে ট্রাম্প ‘আরমাডা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। আরমাডা গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি প্রশাসনিক পর্যায়ে পদক্ষেপ নিয়ে ইরানের ওপর চাপ তৈরি করতে চেয়েছেন। কারণ ইরানের ভৌগোলিক যে অবস্থান সেখানে সতর্কতার ঘাটতি উঁচু। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকে অনেকদিন সেখানে রাখা সম্ভব না। তাই ট্রাম্পের আক্রমণের সিদ্ধান্তটি সাময়িক কিছু লক্ষ্য অর্জন করেছে।

বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখলে, যুক্তরাষ্ট্র আবারো মধ্যপ্রাচ্যে বিশাল কৌশলগত অঙ্গীকার করেছে। এটি ট্রাম্প প্রশাসনের নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। ট্রাম্পের অঙ্গীকারে বলা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান চ্যালেঞ্জ ইউরোপ ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে। তাহলে তিনি ইরানে হামলা করলেন কেন? সেটি প্রশ্ন বটে। এটি অনেকটা ২০০৩ সালে সংঘটিত ইরাক যুদ্ধের সঙ্গে মিলে যায়। এটিও এক ধরনের প্রতিরোধমূলক যুদ্ধ। সেটাও তৎকালীন প্রেসিডেন্টের খামখেয়ালিপনার কারণে হয়েছিল। আর এজন্য যুক্তরাষ্ট্রকে চড়া মূল্য দিতে হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ এ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত নয়। ট্রাম্পের রাজনৈতিক সমর্থকরাও নন। কারণ এ যুদ্ধ বাজারকে অস্থির করে তুলবে। জ্বালানির দাম বাড়বে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে সংকটও দীর্ঘস্থায়ী হবে। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররাও যে খুশি তা নয়। এরই মধ্যে ইরান কয়েকটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রে পালটা হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। স্টেট অব দ্য ইউনিয়নে ভাষণ দেয়ার সময় ট্রাম্প একবারো ইরানের ওপর হামলার পক্ষে যুক্তি দেননি। বরং ইরান অতীতে কত খারাপ কাজ করেছে, তারা কত বড় হুমকি এসব নিয়েই কথা বলেছেন। বর্তমানে কোনো সমস্যা আছে বা উদীয়মান হুমকি নিয়ে তার বক্তব্যে কোনো ইঙ্গিত ছিল না। সম্ভবত গত বছর ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা এবং চলতি বছর ভেনিজুয়েলায় হামলা থেকে যুক্তরাষ্ট্র নতুন কৌশল ভাবছে। তারা ধরেই নিয়েছে, সীমিত লক্ষ্য থেকে দীর্ঘমেয়াদি লাভ আদায় সম্ভব। ইরানের ওপর হামলা করে তিনি সম্ভবত ঐতিহাসিক গৌরবোজ্জ্বল অর্জন চাচ্ছিলেন। ইরানে শাসন পালটে ফেলার প্রলোভনেও হয়তো পড়েছেন। প্রলোভনটা বোঝা কঠিন না। তার পূর্বসূরিরা এ অর্জনে ব্যর্থ। কিন্তু তার সামনে সুযোগ আছে। তিনি চাইলে সফল হতে পারেন। কিন্তু মুখে শাসন কাঠামো উপড়ে ফেলার কথা বলা গেলেও বাস্তব রূপ দেয়া এত সহজ নয়। যুদ্ধ শুরু করতে শুধু একটি পক্ষের উসকানিই যথেষ্ট। কিন্তু শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য পক্ষ-বিপক্ষ দুই গোষ্ঠীর সম্মতি প্রয়োজন। বিদ্যমান বাস্তবতা বিবেচনায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং কতদিন চলবে সে বিষয়ে শুধু ট্রাম্পের ভাবনাই পর্যাপ্ত না। ইরান কী অবস্থান নেয় সেটিও দেখার বিষয়।

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]

রিচার্ড হাস: নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির ডিস্টিংগুইশড স্কলার হিসেবে অধ্যাপনা করছেন। এছাড়া সেন্টারভিউ পার্টনার্সের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করছেন। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশন্সের অবসরপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।