দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে একটি জনমুখী সরকার প্রতিষ্ঠা করা যতটা আনন্দের, সেই শাসনভার পরিচালনা করা ততটাই কঠিন। বিশেষ করে রাষ্ট্রকাঠামো যখন ভঙ্গুর অবস্থায় থাকে, তখন নতুন সরকারের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করে একটি সুশৃঙ্খল ও পেশাদার কর্মী বাহিনী বা আমলাতন্ত্রের ওপর।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে জনগণের বিপুল প্রত্যাশার বিপরীতে বিএনপির সামনে যে পর্বতসম সমস্যাগুলো দণ্ডায়মান, তা মোকাবেলা করতে প্রতিটি কাজে সতর্ক পদক্ষেপ এবং নিয়মিত পরিবীক্ষণ (মনিটরিং) অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘ সময় পর একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গণরায় নিয়ে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে। তবে এ বিজয় কেবল উদযাপনের নয়, বরং এক বিশাল দায়িত্বের। রাষ্ট্রযন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসা দলীয়করণ, দুর্নীতি এবং অদক্ষতা দূর করে একটি কার্যকর ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী’ শ্রেণী গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
১. আমলাতন্ত্রের পেশাদারত্ব ও নিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা
একটি সচল ও গতিশীল রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড হলো তার আমলাতন্ত্র। গত কয়েক দশকে প্রশাসনের যে রাজনৈতিকীকরণ হয়েছে, তা দূর করা বিএনপির প্রথম এবং প্রধান কাজ। মেধা, সততা, দক্ষতা ছাড়া দলীয় আনুগত্য বা ক্ষমতাবান ব্যক্তির স্তুতি গেয়ে পদোন্নতি পাওয়া প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছে। সময়ের সঙ্গে এ স্তাবক শ্রেণী তাদের রঙ পরিবর্তন করে; কিন্তু স্বভাব নয়। তাই রাজনৈতিক চিত্র পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের বিভিন্ন সুবিধালাভের কৌশলী প্রচেষ্টা নবোদ্যমে শুরু হবে।
- মেধা ও দক্ষতার মূল্যায়ন: দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে মেধা, জ্যেষ্ঠতা ও পেশাদারত্বের ভিত্তিতে পদায়ন নিশ্চিত করতে হবে। যারা গত ১৬-১৭ বছর জনগণের সেবার পরিবর্তে একটি দলের সেবা করেছে তাদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। যেকোনো নিয়োগের ক্ষেত্রে গত ১৭ বছরে কর্মকর্তার অবস্থান ও ভূমিকা নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি। এটা খুব কঠিন কাজ নয়।
- শাস্তি ও পুরস্কারের বিধান: দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তাদের পুরস্কৃত করা এবং দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্তদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। জবাবদিহি নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে আমলাতন্ত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা অন্যতম কৌশল। সবাইকেই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
নিরপেক্ষ প্রশাসন ও দুর্নীতিগ্রস্ত সুবিধাভোগী আমলাদের নিয়ন্ত্রণ
একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্রকাঠামো পুনর্গঠনে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় বিগত সরকারের আমলে গড়ে ওঠা দুর্নীতিগ্রস্ত ও সুবিধাভোগী আমলাদের একটি শক্তিশালী চক্র। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তারা সবাই নিজ নিজ পদে বহাল ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে যারা পেশাদারত্বের পরিবর্তে দলীয় আনুগত্যের বিনিময়ে অবৈধ সুবিধা ভোগ করেছে, তারা নতুন সরকারের কাজে অসহযোগিতা বা অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড চালাতে পারে। বিএনপির জন্য প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো এ সিন্ডিকেটকে চিহ্নিত করে দ্রুত ভেঙে দেয়া। প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সবসময় দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের ওপর জোর দিতেন এবং কাজের মাধ্যমে যোগ্যতার প্রমাণ দেয়া কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন করতেন। নতুন সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে প্রশাসনে আমলারা কোনো দলের ‘ক্যাডার’ হিসেবে কাজ না করে সংবিধানের প্রতি অনুগত থেকে জনসাধারণের সেবক হিসেবে কাজ করবেন। এর জন্য প্রয়োজন কঠোর নজরদারি, স্বচ্ছ বদলি নীতি এবং দুর্নীতিগ্রস্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা।
খাজনা অন্বেষণ (রেন্ট সিকিং) তত্ত্বের আলোকে আমলাতন্ত্র: গর্ডন টালোক ও অ্যান ক্রুয়েগার কর্তৃক প্রবর্তিত ‘রেন্ট-সিকিং’ বা খাজনা অন্বেষণ তত্ত্বটির আলোকে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় একশ্রেণীর অসৎ আমলাদের ভূমিকা সুস্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। এ তত্ত্ব অনুযায়ী, যখন আমলারা জনগণের সেবক না হয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থে প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে অবৈধ আর্থিক সুবিধা বা ‘রেন্ট’ অর্জন করতে তৎপর হন, তখনই এ চক্রের সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একদল সুযোগসন্ধানী অসাধু আমলা ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে আঁতাত করে বদলি বাণিজ্য বা ফাইল আটকে রেখে উৎকোচ নেয়ার মতো অপকর্মে জড়িয়ে পড়েন, যা রাষ্ট্রীয় উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয় এবং উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করে।
বিষয়টি আরো স্পষ্ট করে বলতে গেলে বলা যায় যে এ অসাধু শ্রেণীর সুবিধাভোগী কুশীলবরা নির্বাচনের আগ থেকেই সম্ভাব্য সংসদ সদেস্যর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে। তারা পুরনো পক্ষ পরিবর্তন করে নতুন পক্ষে ভিড়ে যায়। নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়ে আনুগত্য প্রকাশ করে। নিজের অতীত সম্পর্কে বিভিন্ন বয়ান তৈরি করে নিজেকে ভিকটিম প্রমাণে ব্যস্ত হয় এবং নিজের বাসনা চরিতার্থ করার প্রয়াস নেয়।
আরেক শ্রেণীর সুযোগসন্ধানী ও ফ্যাসিস্ট শাসনের পূর্ণ সুবিধাভোগী আমলা আছেন যারা নিজেদের সৎ, দক্ষ, মেধাবী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিয়ে সম্ভাব্য সংসদ সদস্য/মন্ত্রীদের সামনে দীর্ঘ জীবনবৃত্তান্তসহ হাজির হন। নিজের দক্ষতা ও পাণ্ডিত্য প্রমাণ করতে এবং মন্ত্রীদের মুগ্ধ করতে ভাড়াটে লেখক দিয়ে লিখিয়ে বিভিন্ন ধারণাপত্র বা কৌশলপত্র জমা দেন। অনেক সময় মন্ত্রী/সংসদ সদস্যরা এ রকম অপকৌশলের শিকার হয়ে নিয়োগও দেন। এ প্রবণতা অত্যন্ত মারাত্মক ক্ষতিকর। কারণ এতে কর্মরত দক্ষ ও সৎ কর্মীদের মনোবল ভেঙে যায়; প্রতিষ্ঠানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
পৃষ্ঠপোষকতা-মক্কেলতন্ত্র (প্যাট্রন-ক্লায়েন্ট রিলেশনস): বিশ্বব্যাপী এ ধরনের ব্যবস্থা ক্রিয়াশীল। বাংলাদেশে কাঠামোটি দুর্নীতিগ্রস্ত আমলাতন্ত্র ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এ ব্যবস্থায় রাজনৈতিক ক্ষমতাধারীরা (প্যাট্রন বা পৃষ্ঠপোষক) রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে তাদের অনুসারী বা আমলাদের (ক্লায়েন্ট বা মক্কেল) প্রশাসনিক উচ্চপদ বা অবৈধ সুযোগ-সুবিধা প্রদান করেন। বিনিময়ে এ আমলারা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের অবৈধ আদেশ পালন, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে সহায়তা করেন।
যখনই বাংলাদেশে রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটে, পুরনো দুর্নীতিগ্রস্ত আমলারা নতুন পৃষ্ঠপোষককে বিভিন্ন উপায়ে তুষ্ট করার চেষ্টা করেন, যাতে আগের রেন্ট-সিকিং বা সুবিধাভোগের চক্রটি অব্যাহত থাকে। ফলে প্রশাসনিক দক্ষতা ও মেধার পরিবর্তে কপট-আনুগত্যই যোগ্যতা হিসেবে গণ্য হয়, যা সামগ্রিক দুর্নীতিকে আরো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।
বাংলাদেশের শাসন কাঠামোতে এ প্রবণতা এড়ানো অনেক কঠিন। বাংলাদেশে এর সবচেয়ে খারাপ বন্দোবস্ত হচ্ছে মন্ত্রী/সংসদ সদস্যদের বিশ্বস্ত সহচররা অর্থের বিনিময়ে অসাধু সুবিধাভোগী আমলাদের কাছে সরকারি পদ, ব্যবসায়ীদের কাছে টেন্ডার, পারমিট বিক্রি করেন। এতে সরকার দুর্নীতির দুষ্টচক্রে নিপতিত হয়। ভবিষ্যৎ সরকারকে যেকোনো মূল্যে এ প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। চোখ-কান খোলা রাখলেই এটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
২. পর্বতসম সমস্যা মোকাবেলায় অগ্রাধিকার ক্ষেত্রগুলো
সরকার গঠনের পর পরই বিএনপিকে কয়েকটি জরুরি বিষয়ে নজর দিতে হবে:
- অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা: মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও ব্যাংক খাতের বিশৃঙ্খলা দূর করতে একটি শক্তিশালী বিশেষজ্ঞ টাস্কফোর্স গঠন করা।
- আইন-শৃঙ্খলার উন্নয়ন: পুলিশ বাহিনীকে একটি পেশাদার ও সেবামুখী বাহিনী হিসেবে পুনর্গঠন করা, যাতে তারা কোনো বিশেষ দলের নয়, বরং জনগণের জানমালের রক্ষক হয়ে ওঠে। পুলিশের মানসিক কাঠামোর পরিবর্তন জরুরি। বাংলাদেশের মতো পৃথিবীর কোথাও পুলিশ এত ক্ষমতাবান, দুর্নীতিগ্রস্ত ও লাগামহীন স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে অভিযুক্ত নয়। সীমার মধ্যে রাখার জন্য তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। কেউ যদি নিজ থেকে ব্যবহৃত হতে চায় তাহলে তাকে শৃঙ্খলার আওতায় আনতে হবে। তাদের ওপর বেসামরিক কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। আধুনিক সমাজ বা রাষ্ট্রে যারা লাঠি বহন করে তারা লাঠি ব্যবহার করতে পারে না—বেসামরিক কর্তৃপক্ষের অনুমতি লাগে।
৩. সংস্কারের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক কাঠামো
প্রশাসনিক সংস্কারের ক্ষেত্রে পাবলিক সার্ভিস মোটিভেশন (পিএসএম) তত্ত্বটি প্রয়োগ করা যেতে পারে।
গবেষকদের মতে, পাবলিক সার্ভিস মোটিভেশনের পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ কাজ করে:
(১) জনস্বার্থের প্রতি আগ্রহ: দেশের মানুষের কল্যাণ সাধন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা।
(২) নাগরিক কর্তব্যবোধ: রাষ্ট্রের প্রতি ভালোবাসা ও নাগরিক হিসেবে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা অনুভব করা।
(৩) পরার্থপরতা: কোনো প্রতিদানের আশা না করে নিঃস্বার্থভাবে অন্য মানুষকে সাহায্য করার মানসিকতা।
প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে এর গুরুত্ব: যেসব সরকারি কর্মকর্তার মধ্যে পিএসএম বা জনসেবা প্রেষণা বেশি থাকে, তারা দুর্নীতি থেকে দূরে থাকেন এবং দেশের যেকোনো সংকটে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেন। সরকারের দায়িত্ব তাদের লালনপালন করা এবং খুঁজে বের করা। তরুণ প্রজন্মের কর্মকর্তা এবং কর্মরত আমলাদের মধ্যে দেশপ্রেম এবং জনসেবার মানসিকতা জাগ্রত করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজে লাগানো যেতে পারে।
৪. জাতীয় ঐকমত্য ও অন্তর্ভুক্তি
বিপুল বিজয়ের পর বিজয়ী দলের মধ্যে প্রতিহিংসার রাজনীতি আসার ঝুঁকি থাকে। যদিও ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর বিএনপি উদারতা ও ধৈর্যশীলতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছে তথাপি সরকার গঠনের পর তাদের কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে যে তারা সবার। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত বিভিন্ন কমিশনের রিপোর্টগুলো পর্যালোচনা করে বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।
বিএনপির জন্য এবারের ক্ষমতাগ্রহণ কেবল সরকার গঠন নয়, বরং রাষ্ট্র মেরামতের এক বিশাল পরীক্ষা। প্রয়াত জিয়ার আদর্শকে ধারণ করে, খালেদা জিয়ার আপসহীনতায় অনুপ্রাণিত হয়ে এবং আধুনিক বিশ্বের প্রশাসনিক ধ্যান-ধারণাকে সঙ্গে নিয়ে একটি দক্ষ, সৎ ও নিরপেক্ষ আমলা কাঠামো গড়ে তুলতে পারলেই এ বিপুল বিজয় সার্থক হবে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে আবেগের চেয়ে বিবেকের প্রয়োগ এবং রাজনীতির চেয়ে নীতির গুরুত্ব বেশি দিতে হবে।
শামীম আল মামুন: প্রজাতন্ত্রের সাবেক কর্মচারী









