তবে শিক্ষা অবকাঠামো তৈরি হলেও তা এক গভীর কাঠামোগত সংকটে ভুগছে। স্থানিক অনুপাতে পর্যাপ্ত সরকারি বিদ্যালয় না থাকা এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে অনেক অভিভাবক সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবর্তে সন্তানদের মাদরাসায় পাঠাচ্ছেন। বিষয়টিকে নেতিবাচক আঙ্গিকে দেখার সুযোগ নেই। তবে শিক্ষা খাতসংশ্লিষ্টদের এটি অনুধাবন করতে হবে যে মাদরাসায় অভিভাবকদের ঝোঁক বাড়ার পেছনে ধর্মীয় আবেগের বদলে কঠোর অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের ঘাটতিই বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। এ কারণ অনুধাবন না করলে সমস্যার সমাধানও সম্ভব নয়।

বণিক বার্তার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা জেলায় দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে মাত্র ১৭ শতাংশ শিক্ষার্থী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। বাকি ৮৩ শতাংশকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। রাজধানীর ৮২ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এজন্যই বেসরকারি মালিকানাধীন। এদিকে দেশের সরকারি বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ৯৩ শতাংশই রাজধানীতে। ফলে সারা দেশেই শিক্ষার্থীদের বেসরকারি কিংবা এনপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়তে হচ্ছে। এদিকে বর্তমান মূল্যস্ফীতির সময় সব পরিবারকেই নানা দিকে ব্যয় সংকোচন করতে হচ্ছে। খাদ্য, চিকিৎসা এবং শিক্ষা ব্যয় কমানোর মাধ্যমে অনেকাংশে পরিবার সামলাতে হচ্ছে অনেককে। অর্থনৈতিক এ বাস্তবতা মাদরাসায় অভিভাবকদের ঝোঁক বাড়ার অন্যতম কারণ হতে পারে। এক্ষেত্রে সরকারি বিকল্প না থাকাও একটি বড় কারণ। রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হাতেগোনা। আর প্রতিটি এলাকায় যে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তার অধিকাংশই মাদরাসা। ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয়গুলোর প্রসার সম্প্রতি বেড়েছে। কিন্তু নিম্ন আয়ের মানুষের পক্ষে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা ব্যয় নির্বাহ সম্ভব নয়। মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় নিম্নবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত—সব শ্রেণীর জন্য উপযুক্ত বিকল্প আছে। ২০২৩ সালে ব্যানবেইসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মাদরাসায় ধনী দাতাদের অনুদানের কারণে খরচ নামমাত্র। বিশেষত অনেক মাদরাসায় বোর্ডিং ব্যবস্থা রয়েছে; এমনকি খাবার ও শিক্ষা উপকরণের খরচও নামমাত্র। এসব সুবিধা বিবেচনা করে এ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি অভিভাবকদের আগ্রহ বাড়ছে। এদিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোকে সাধারণ শিক্ষার পাঠ্যক্রমে বারবার রদবদল ঘটছে। এ ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন অভিভাবকদের বিভ্রান্ত ও বিক্ষুব্ধ করছে। অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি পেতেই ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় থাকা মাদরাসার দিকে অভিভাবকদের আগ্রহ বেড়ে চলেছে। মাদরাসাগুলোও এ চাহিদাকে কৌশলগতভাবে কাজে লাগাচ্ছে।

দেশে বাংলা, ইংরেজি, কারিগরি ও মাদরাসা—এ চার শিক্ষা ধারা রয়েছে। চতুর্মুখী এ বিভাজন প্রশাসনিক জটিলতাই নয়, সমাজে একধরনের শ্রেণীবিভক্তিও তৈরি করছে। বাস্তবে ইংরেজি মাধ্যম উচ্চ আয়ের পরিবারের জন্য, বাংলা মাধ্যম মধ্যবিত্তের জন্য, মাদরাসা নিম্নবিত্ত ও ধার্মিক পরিবারের জন্য, এবং কারিগরি শিক্ষা প্রায়ই ‘ঝরে পড়া’ শিক্ষার্থীদের গন্তব্য হিসেবে দেখা হয়। এর মানে হলো দেশে মেধার ভিত্তিতে নয়—অর্থনৈতিক ও সামাজিক শ্রেণীর ভিত্তিতে শিশুর শিক্ষাজীবন নির্ধারিত হচ্ছে। এ বিভাজনের সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হলো, একই দেশে বেড়ে ওঠা দুটি শিশু সম্পূর্ণ ভিন্ন মান ও ধরনের শিক্ষা পাচ্ছে। ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে, মাদরাসার শিক্ষার্থী প্রায়ই মূলধারার কর্মবাজারে পিছিয়ে। কারিগরি শিক্ষার্থীরা দক্ষতা পেলেও উচ্চশিক্ষার পথ সংকীর্ণ। এটি এক অর্থে রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। আবার সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধিকাংশই ঢাকাকেন্দ্রিক। উচ্চতর শিক্ষার এ ভৌগোলিক পক্ষপাত এবং শিক্ষা ধারার বিভাজন একসঙ্গে মিলে মেধাবী কিন্তু সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য এক দুষ্টচক্র তৈরি করছে, যেখান থেকে বের হওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।

এ সমস্যা থেকে বের হওয়ার জন্য সরকারকে সরকারি বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়াতে হবে। শুধু অবকাঠামো তৈরি করলেই হবে না। ঢাকাসহ সারা দেশে এলাকাভিত্তিক জনসংখ্যার অনুপাতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করতে হবে। এলাকাভিত্তিক পরিস্থিতি বিবেচনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ও বাজেট বাড়ানো জরুরি। প্রতিটি ঘনবসতিপূর্ণ ওয়ার্ডে ন্যূনতম একটি কার্যকর সরকারি বিদ্যালয় থাকা দরকার। বিদ্যমান সরকারি বিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামো, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষণ উপকরণে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শুধু ঘোষণা নয়, বাজেটে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ ও বাস্তবায়নের কঠোর পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। অভিভাবকরা যাতে সরকারি বিদ্যালয়মুখী হন, সেজন্য মানের প্রকৃত উন্নতি অপরিহার্য।

এদিকে বর্তমানে কোনো অনুমোদন ছাড়াই কিন্ডারগার্টেন ও মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা যাচ্ছে। এ শিথিলতা দূর করে সব বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য বাধ্যতামূলক নিবন্ধন, ন্যূনতম পাঠ্যক্রম মান এবং নিয়মিত পরিদর্শন ব্যবস্থা চালু করা অপরিহার্য। মানহীন প্রতিষ্ঠানের বিস্তার ঠেকাতে এর কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষা ধারার বিভাজন কমাতে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতীয় পাঠ্যক্রম কাঠামো প্রয়োজন, যেখানে চারটি ধারার সাধারণ ভিত্তি অভিন্ন থাকবে, কিন্তু বিশেষায়িত অংশে বৈচিত্র্য বজায় থাকবে। ফলে মাদরাসার শিক্ষার্থীরাও উচ্চশিক্ষার মূলধারায় সমান সুযোগ পাবেন। মাদরাসা শিক্ষায় যে দাতাগোষ্ঠীর অর্থ ব্যয় হচ্ছে, সেই ধারার একটি অংশকে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে মানসম্মত সাধারণ শিক্ষায় পরিচালিত করা সম্ভব। জনহিতকর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় করছাড় ও নীতিগত প্রণোদনা দেয়া যেতে পারে, তবে অবশ্যই নির্ধারিত মান মেনে।

রাষ্ট্র যখন নাগরিকদের সাশ্রয়ী, মানসম্মত ও সহজলভ্য শিক্ষার নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন সুবিধাবঞ্চিত মানুষ যা পায়, তাতেই সন্তুষ্ট থাকতে বাধ্য হয়—সেটি মানসম্মত হোক বা না হোক। মাদরাসামুখিতা কোনো বিচ্ছিন্ন ধর্মীয় আবেগের ফসল নয়, এটি একটি বাস্তব অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত। এ সিদ্ধান্তকে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার পরিণতি হিসেবে চিহ্নিত করে সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নেয়াই এখন সরকারের প্রধান দায়িত্ব।