নব্বইয়ের দশকে দেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল অতি সীমিত। হাতেগোনা কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে দেশের উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর সন্তানদের উচ্চশিক্ষার চাহিদা পূরণ সম্ভব হচ্ছিল না। ফলে এ শ্রেণীর উচ্চশিক্ষাপ্রত্যাশীদের একটি বড় অংশ তখন প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতসহ ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে নিজ অর্থায়নে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্যে যেত। এর মাধ্যমে একদিকে মেধা পাচার হচ্ছিল, অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে চলে যাচ্ছিল। এ বিষয়গুলো বিবেচনা করে দেশের উচ্চশিক্ষাপ্রত্যাশীদের নিজ অর্থায়নে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ করে দিতে ১৯৯২ সালে একটি আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দেয়া হয়। সময়ের পরিক্রমায় বর্তমানে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে। দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একসময় ছিল তুলনামূলক শান্ত ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশের প্রতীক। যেখানে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা, গবেষণা ও ক্যারিয়ার গঠনে মনোযোগী থাকত। কিন্তু সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, সেই পরিবেশেও অস্থিরতা, মারামারি ও সংঘর্ষ ঢুকে পড়ছে। দেশের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সামাজিক অবক্ষয়ের কারণেই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে।
ঢাকার সাভারে অবস্থিত দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়—ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও সিটি ইউনিভার্সিটি। সম্প্রতি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় দুটির শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাটি শুধু দুঃখজনকই নয়, এটি দেশের উচ্চশিক্ষায় এক ধরনের ভয়াবহ সতর্কবার্তা। থুতু ফেলার মতো তুচ্ছ একটি ঘটনার জেরে শুরু হওয়া বিরোধ যে এক ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নেবে, তা অকল্পনীয়। ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হওয়ার ঘটনা কেবল দুই বিশ্ববিদ্যালয়েরই নয়, সমগ্র উচ্চশিক্ষায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এ ঘটনা শুধু প্রতিষ্ঠান দুটির ভাবমূর্তিকেই নষ্ট করেনি, বরং বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ও আন্তর্জাতিকভাবে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করছে। এমন সহিংসতা প্রমাণ করে যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশের অবনমন ঘটছে। পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ, সহনশীলতা ও নৈতিকতার চর্চাও দুর্বল হয়ে পড়েছে। একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এমন ধ্বংসযজ্ঞ নিঃসন্দেহে শিক্ষার্থীদের মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়কে নির্দেশ করছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সামাজিক অসন্তোষ ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বেড়ে গেছে। হত্যা, লুটপাট, সংঘর্ষ, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ক্রমে বেড়েছে।
শিক্ষার্থীদের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ব্যর্থতাও স্পষ্ট। প্রথমত, সংঘর্ষ শুরুর পর পরই প্রশাসনিক ও প্রক্টরিয়াল টিম ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছেন। দ্বিতীয়ত, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি বিলম্বিত হওয়ায় দীর্ঘক্ষণ তাণ্ডব চালানো সম্ভব হয়েছে। তৃতীয়ত, উভয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন নিজেদের দায় এড়াতে এখন পরস্পরের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করছে। দোষ চাপানোর প্রবণতা সমস্যাকে আরো জটিল করবে এবং ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। তাই দোষারোপের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে ঘটনাগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে অপরাধীরা যে বিশ্ববিদ্যালয়েরই হোক, জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া আবশ্যক। দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে অপরাধীরা এসব অপকর্ম থেকে বিরত থাকবে না। তাই এক্ষেত্রে উভয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত।
এ ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়েছে, তরুণ প্রজন্মের ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা, ক্রোধ নিয়ন্ত্রণের অভাব ও সহিংস মনোভাব। সমাজের যেসব মূল্যবোধ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসে আরো পরিশীলিত হওয়ার কথা, তা বরং এখানে ভেঙে পড়ছে। এবার যদি প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় না আনা হয়, তাহলে এর পুনরাবৃত্তি ঘটবে বারবার। বিশেষ করে যারা পরিকল্পিতভাবে আক্রমণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটে অংশ নিয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। অপরাধীরা যে বিশ্ববিদ্যালয়েরই হোক না কেন, তাদের ছাড় দেয়া উচিত হবে না। এ ঘটনার যথাযথ বিচার নিশ্চিত না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ বারবার বিঘ্নিত হবে।
বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উচ্চশিক্ষায় ভালো করছে। তারা আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষার পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা দেয়ার চেষ্টা করে। উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মান নির্ধারণ হয় আন্তর্জাতিক র্যাংকিং প্রক্রিয়ায়। গত বছর যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা সাময়িকী টাইমস হায়ার এডুকেশন র্যাংকিং তালিকায় বাংলাদেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ৬০১ থেকে ৮০০-এর মধ্যে। চলতি বছর ৮০১ থেকে এক হাজারের মধ্যে বাংলাদেশের চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম আছে। এর মধ্যে দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। এ র্যাংকিংয়ে দেশের দুটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়েও এগিয়ে ছিল একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। এ ধরনের সংঘর্ষ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রাকে পিছিয়ে দেবে।
এখন প্রয়োজন মূল সমস্যাটিকে চিহ্নিত করে পদক্ষেপ নেয়া। প্রথমত, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আচরণবিধি কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, হোস্টেলসহ শিক্ষার্থীদের আবাসন ব্যবস্থায় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা উচিত, যাতে এ ধরনের সংঘর্ষের উপাদান আগেভাগে শনাক্ত করা যায়। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে শিক্ষকদের আরো সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনকে (ইউজিসি) এ ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া উচিত। কারণ শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতাকে প্রশ্রয় দেয়া হলে বারবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে এবং শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হবে।










