দেশটিতে ৬০ শতাংশের বেশি বাংলাদেশী প্রবাসী রয়েছেন। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো ধরনের অস্থিরতা স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশী প্রবাসী ও দেশে থাকা তাদের স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করে। ইরানের ওপর সাম্প্রতিক হামলার পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া চলমান সংঘাত ও অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে সেই চিত্রই প্রতিফলিত হচ্ছে। বণিক বার্তার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে প্রবাসী ও তাদের স্বজনদের উদ্বেগ। জানা গেছে, ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং বিভিন্ন দেশে তেহরানের পাল্টা হামলার ঘটনায় অনেকে কর্মস্থল থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছেন। চলমান সংঘাত পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়লে তাদের জীবন, কাজ ও বাসস্থানের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে অনেকেই আশঙ্কা করছেন। এছাড়া এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে একাধিক বাংলাদেশীর হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। সব মিলিয়ে প্রবাসীদের দেশে থাকা স্বজনরাও দুশ্চিন্তা ও এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে দিনাতিপাত করছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে প্রবাসীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এজন্য বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোকে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। মনে রাখা প্রয়োজন, বাংলাদেশী নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল কূটনৈতিক বিষয় নয়, এটি এ দেশের সরকারের দায়িত্বের অংশও বটে। যুদ্ধ, সংঘাত বা আঞ্চলিক অস্থিরতা শুরু হলেই প্রবাসী শ্রমিকরা সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে পড়েন। যদিও দেশের অর্থনীতিতে ডলার প্রবাহ অব্যাহত রাখতে তাদের অবদানই বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, টানা তিন মাস ধরে দেশে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি প্রবাসী আয় এসেছে।
সংঘাত চলছে এমন অঞ্চলে অবস্থানরত বাংলাদেশী নাগরিকদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে আনতে হবে। এ দায়িত্ব বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোরই করতে হবে। যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা যেকোনো নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকিতে প্রবাসীরা সবার আগে দূতাবাসের সাহায্যই প্রত্যাশা করেন। দূতাবাসকে অবশ্যই সেই প্রত্যাশা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ দূতাবাস সতর্কবার্তা জারি, হটলাইন চালু এবং প্রবাসীদের নিরাপদ স্থানে থাকার পরামর্শ দিয়েছে। এগুলো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। তবে প্রশ্ন হলো, সংকট দীর্ঘায়িত হলে এ সহায়তা কতটা কার্যকর হবে। বাস্তবতা হলো, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় অধিকাংশ বাংলাদেশী শ্রমিক নিম্ন আয় ও স্বল্প দক্ষ কাজে নিযুক্ত। অনেকের আবাসন নিরাপদ নয়, কর্মস্থল সামরিক স্থাপনার কাছাকাছি কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে স্থানান্তরের সুযোগ সীমিত। তাই সতর্কবার্তার বাইরেও কীভাবে প্রবাসীদের নিরাপদে বের করে আনা যাবে তা নিয়ে প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন এবং সেই প্রস্তুতি হতে হবে টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট নতুন কোনো ঘটনা নয়। গত বছরও স্বল্প সময়ের জন্য হলেও যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছিল। অর্থাৎ এটি দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা একপ্রকার ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত। আগামীকাল মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলেও কোনো নিশ্চয়তা নেই যে ভবিষ্যতে আর এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না। অন্তত অতীত অভিজ্ঞতা সেটাই বলে। এ প্রেক্ষাপটে প্রবাসীদের সুরক্ষার বিষয়টি দূতাবাসগুলোকে নতুনভাবে ভাবতে হবে। বাংলাদেশী নাগরিকের আধিক্য রয়েছে এমন দেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোকে ‘ক্রাইসিস রেসপন্স সেন্টার’ হিসেবে কাজ করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এজন্য জরুরি পরিস্থিতিতে যোগাযোগের বহুমাত্রিক ব্যবস্থা, নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্রে তাদের নিয়ে আসা, আহত বা বিপদগ্রস্ত কর্মীদের দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসা সহায়তা, প্রয়োজনে সংগঠিতভাবে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা সর্বাগ্রে নিশ্চিত করতে হবে।
সংঘাতময় পরিস্থিতিতে আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো কর্মসংস্থান হারানো। যুদ্ধ বা নিরাপত্তা সংকটে কোম্পানিগুলো অভিবাসী শ্রমিকদের ছাঁটাই করে দেয় অথবা বেতন-ভাতা পরিশোধ ছাড়াই দেশে ফেরত পাঠায়। দূতাবাসগুলোর দায়িত্ব হওয়া উচিত শ্রমিকদের আইনি অধিকার নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিকভাবে বিষয়টি উত্থাপন করা। প্রবাসীদের সুরক্ষা দেয়ার বিষয়টি কেবল জীবন বাঁচানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাদের শ্রমের ন্যায্যমূল্য ও আর্থিক সুরক্ষাও নিশ্চিত করা জরুরি। তাছাড়া তাদের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিতের ওপর দেশের অর্থনীতির গতিপ্রকৃতিও নির্ভর করে। তারা কর্মসংস্থান হারানো বা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অর্থ হলো রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়া, রিজার্ভের ওপর চাপ বৃদ্ধি এবং দেশে বেকার সংখ্যা বেড়ে যাওয়া। তাই প্রবাসীদের সব ধরনের সুরক্ষা দেয়া যে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত তা বিবেচনায় রেখে দূতাবাসগুলোকে কাজ করতে হবে।
এছাড়া ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট মোকাবেলায় কিছু দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ প্রয়োজন। অনেক সময় দেখা যায়, সংকট তৈরি হওয়ার পর প্রবাসীদের অবস্থান নির্ধারণ করতেই সময় লেগে যায়। এ প্রশাসনিক দুর্বলতা কমাতে আগাম তথ্যভিত্তিক প্রস্তুতি অপরিহার্য। প্রতিবার সংকট দেখা দিলে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেয়া হলেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি থেকেই যায়। অভিবাসন ব্যবস্থাপনাকে জাতীয় নিরাপত্তা নীতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। পাশাপাশি অভিবাসন গন্তব্যেও বৈচিত্র্য তৈরিতে কাজ করতে হবে। মূলত একক দেশ বা অঞ্চলনির্ভর অভিবাসন হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করে। গন্তব্যের বৈচিত্র্যায়ণ, দক্ষ কর্মী তৈরি এবং বিদেশে প্রবাসী কল্যাণসেবা সম্প্রসারণ এ তিন বিষয়কে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেয়া গেলে অনেক ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
তবে বর্তমানে সবচেয়ে জরুরি হলো শান্তভাবে পরিস্থিতি সামাল দেয়া। প্রবাসীদেরও নিজের নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতন হতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব দূতাবাসের সহযোগিতা নিয়ে নিরাপদ স্থানে যেতে হবে। আর স্বজনদেরও উদ্বিগ্ন হওয়ার চেয়ে ধৈর্যশীল আচরণ প্রদর্শন করতে হবে। নয়তো বিদেশী বসবাসরতরা আরো ঘাবড়ে যাবেন। এছাড়া বর্তমানে অনেক ধরনের ভুয়া তথ্য বা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে অবশ্যই যেকোনো কনটেন্ট দেখে বিশ্বাস করার আগে তার সত্য-মিথ্যা যাচাই করে নিতে হবে।










