১৯৫০-এর দশকে কয়েকজন দূরদর্শী ব্যক্তির উদ্যোগে এফপিএবির জন্ম। ১৯৪৭-এর দেশভাগের পর ১৯৫০-এর দশকের শুরুর দিকে পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকরা ওই সময়ের জনসংখ্যা (বিশ্বে বাংলাদেশ তখন ১২তম ও পাকিস্তান ১৫তম) এবং দ্রুত বর্ধমান জনসংখ্যার নেতিবাচক প্রভাবকে স্বীকার করেছিলেন এবং তারা বুঝেছিলেন, যদি জনসংখ্যা বৃদ্ধি এভাবে অব্যাহত থাকে তবে উন্নত জীবনযাত্রার আশাগুলো ব্যর্থ হবে। তাই ১৯৫৩ সালে করাচি, লাহোর ও ঢাকায় পরিবার পরিকল্পনা সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশে এফপিএবির প্রতিষ্ঠাকাল ২ মার্চ, ১৯৫৩। সেই হিসাবে এখন এফপিএবির ৭৩তম জন্মবার্ষিকী। দিবসটি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নয়; এটি বাংলাদেশের জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা, প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার এবং মানবকেন্দ্রিক উন্নয়ন দর্শনের একটি ঐতিহাসিক প্রতিফলন। এফপিএবি দেশের পরিবার পরিকল্পনা আন্দোলনের পথপ্রদর্শক; যুগপৎ যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার (এসআরএইচআর) সংক্রান্ত প্রচারণা ও সেবার মাধ্যমে ব্যক্তিজীবনের মান উন্নয়নের লক্ষ রাখে, বিশেষ করে দরিদ্র, ঝুঁকিপূর্ণ ও সংবেদনশীল জনগোষ্ঠীর জন্য। এফপিএবি সব তরুণের যৌনজীবনকে অসুস্থতা, অপ্রয়োজনীয় গর্ভধারণ, সহিংসতা ও বৈষম্যমুক্তভাবে উপভোগ করার অধিকার রক্ষা করে।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের জনমিতিক চ্যালেঞ্জ ছিল বহুধাবিভক্ত; উচ্চ জন্মহার, নিম্ন সাক্ষরতা, দারিদ্র্য, সীমিত স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো এবং দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি ইত্যাদি সরাসরি উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ জানায়। ১৯৭০-এর দশকে মোট প্রজনন হার (টিএফআর) ছিল প্রায় ৭, যা এখন ২-এ নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। এ রূপান্তর কোনো একক প্রতিষ্ঠানের অর্জন নয়, এটি রাষ্ট্রীয় নীতি, সামাজিক সচেতনতা, নারী শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং বেসরকারি সংস্থার সক্রিয় সম্পৃক্ততার সম্মিলিত ফলাফল। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ১৮ কোটির মতো। ছোট্ট একটি দেশে এত মানুষ, যা বিশ্বের সর্বোচ্চ ঘনবসতিপূর্ণ দেশের মধ্যে অন্যতম। এ প্রেক্ষাপটে জনসংখ্যা কেবল একটি পরিসংখ্যানগত বিষয় নয়; এটি উন্নয়ন, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ এবং সামাজিক ন্যায়ের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। এফপিএবি দিবস তাই একটি আত্মমূল্যায়নের দিন, যেখানে অতীতের অগ্রগতি পর্যালোচনা, বর্তমান বাস্তবতা বিশ্লেষণ এবং ভবিষ্যৎ নীতিগত করণীয় নির্ধারণ করা প্রয়োজন। জনসংখ্যা বাংলাদেশের একটি জটিল ও প্রধান সমস্যা কিন্তু জাতীয় পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নে সেভাবে বিষয়টি আলোচিত ও গুরুত্ব পাচ্ছে না। বিশেষ করে বিগত ১৫-২০ বছরে এক্ষেত্রে যথেষ্ট পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। এখন সময় জনসংখ্যা এবং পরিবার পরিকল্পনা বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে সার্বিক রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, বাজেট বরাদ্দ ও প্রাসঙ্গিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার। পরিবার পরিকল্পনা দ্রব্যাদির সরবরাহ সংকট এ মুহূর্তে চরমে, সেদিকে দ্রুত দৃষ্টি দিয়ে কেনাকাটার ব্যবস্থা ও সারা দেশে সরবরাহ নিশ্চিত করা দরকার।
পরিবার পরিকল্পনার সরকারি কর্মীর সংকটও তীব্র (২৮ শতাংশ শূন্য, প্রথম আলো-১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)। এক্ষেত্রে এফপিএবির মতো এনজিওগুলোর সহায়তায় সারা দেশে কর্মীশূন্য এলাকাগুলোতে সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব; প্রয়োজন দ্রুত পরিকল্পনা, নীতিনির্ধারণ ও বাজেট প্রদান। পরিবার পরিকল্পনা কেবল জন্মনিয়ন্ত্রণ নয়; এটি মাতৃস্বাস্থ্য সুরক্ষা, নারী ক্ষমতায়ন এবং দারিদ্র্য হ্রাসের একটি কৌশলগত উপাদান। গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতির কার্যকর ব্যবহার মাতৃমৃত্যু হ্রাসে সরাসরি ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশ মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু কমাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার বৃদ্ধি এবং দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতি ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তবুও গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলে জরুরি প্রসূতিসেবা সম্প্রসারণ অপরিহার্য। অল্প বয়সে বিবাহ ও মাতৃত্ব মেয়েদের শিক্ষা ব্যাহত করে এবং অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ কমিয়ে দেয়। ফলে কিশোর-কিশোরীদের জন্য যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা, জীবনদক্ষতা উন্নয়ন এবং সামাজিক আচরণ পরিবর্তনমূলক কর্মসূচি জোরদার করা প্রয়োজন। নারী শিক্ষা ও কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ জনসংখ্যা স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। ১৫-২৪ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীর সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি। ফলে যুববান্ধব স্বাস্থ্যসেবা ও প্রজনন স্বাস্থ্য-শিক্ষা সম্প্রসারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনমিতিক সুবিধা বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ নিতে আমরা এর মধ্যেই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছি। আগামী বাজেটে এক্ষেত্রে সুস্পষ্ট চিন্তা রাখা দরকার। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বাস্তুচ্যুতি ইত্যাদি বিবিধ কারণে দ্রুত নগরায়ণের প্রভাবে নগর এলাকায় স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবার ওপর চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেবার অপ্রাপ্যতা বাড়ছে। নগর বস্তিতে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করা দরকার।
এফপিএবি সারা দেশে ২১টি জেলায় (আশির দশকের বৃহত্তর জেলাগুলো) শাখা ক্লিনিক পরিচালনার মাধ্যমে পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃস্বাস্থ্য, প্রসব-পূর্ব ও প্রসব-পরবর্তী সেবা এবং কাউন্সেলিং প্রদান করে থাকে। দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর মাধ্যমে স্বাস্থ্য কেন্দ্র পরিচালনা, স্যাটেলাইট ক্লিনিক আয়োজন, ওষুধ ও পরিবার পরিকল্পনা সরঞ্জাম সরবরাহ, অভ্যাস পরিবর্তনের বার্তা, রেফারেল সংযোগ জোরদার এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্য তথ্য ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করে। নীতিগত পর্যায়ে এফপিএবি বিভিন্ন কারিগরি কমিটি, পরামর্শ সভা এবং নীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। সরকার ও মন্ত্রণালয় চাইলে, জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণ, মাঠ পর্যায়ের তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ ও আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে, এ ব্যাপারে এফপিএবি আগ্রহী ও প্রস্তুত। বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুসরণ করে, আইপিপিএফের সদস্য হিসেবে ২০২২ সাল পর্যন্ত এফপিএবি একসঙ্গে কাজ করেছে, এ সদস্যপদ ও সহায়তা পুনঃস্থাপনে স্বাস্থ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সর্বোপরি সরকার এফপিএবিকে সহযোগিতা করতে পারে। যদি সরকার চায়, তাহলে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া বা পাকিস্তানে জনসংখ্যা সমস্যা সমাধানে এফপিএবি কারিগরি ও মাঠ পর্যায়ের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সাহায্য প্রদান করতে পারে।
বিগত বছরগুলোতে উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়ায় এফপিএবি এখন এক ক্রান্তিকাল অতিবাহিত করছে। অভ্যন্তরীণ অর্থায়ন বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি। কিন্তু বিগত ৭৩ বছরের মধ্যে ৬০ বছরের বেশি, বিদেশী ও আন্তর্জাতিক সাহায্য ও অনুদান প্রাপ্তিতে এফপিএবি টিকে থাকার জন্য নিজেকে ঠিক সেভাবে তৈরি করে উঠতে পারেনি। পুরনো দালানের সংস্কার, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপ্রাতি মেরামত ও কেনাকাটা, কর্মচারীদের বকেয়া বেতন প্রদান—এগুলো এখন বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সরকার, অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয় চাইলে এক্ষেত্রে একটি বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। অন্তত আগামী দুই-তিন বছরের জন্য বছরভিত্তিক একটি ভিত্তি তহবিল প্রদান করলে, প্রতিষ্ঠানটি আবার নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে। এফপিএবির ভেতরে সে সক্ষমতা আছে। সারা দেশে পঁচিশটি ইউনিট, প্রায় এক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রায় ৪০০ মাঠকর্মী এবং প্রায় ১০ হাজারের মতো স্বেচ্ছাসেবী; সরকার, শুভানুধ্যায়ী এবং প্রাইভেট সেক্টরের কাছে এ ধরনের সহযোগিতা প্রত্যাশা করছে। আমরা দৃঢ়ভাবে আশা করি, এ ধরনের খানিক সাহায্য ঠিক এ মুহূর্তে এফপিএবিকে আবার তার পুরনো, চিরচেনা ও গৌরবময় অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও প্রজনন স্বাস্থ্য উন্নয়নে আশির দশকে সারা পৃথিবীর কাছে একটি সফল মডেল ছিল বাংলাদেশ। সেই ধারাবাহিকতায় আবারো বিএনপি সরকারের এ সময়ে পরিবার পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু করার সুযোগ আবার এসেছে এবং এফপিএবি এ যাত্রায় আগের মতোই পাশে আছে।
বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতি তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও মানবিক অঙ্গীকার নিয়ে আগামী দিনেও দেশের জনস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজনন অধিকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এ প্রত্যাশায় ৭৩তম এফপিএবি দিবস হোক ভবিষ্যতের জন্য নতুন প্রত্যাশার ভিত্তি। এফপিএবির সব সেবাগ্রহীতা, শুভানুধ্যায়ী এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
ডা. নূরুল্লাহ আওয়াল: পরিচালক-প্রোগ্রাম এবং নির্বাহী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত), ফ্যামিলি প্ল্যানিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এফপিএবি)










