বাংলাদেশে নগরায়ণ একটি অভূতপূর্ব অংশের সাক্ষী হয়েছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় তা তীব্রভাবে ফুটে ওঠে। এ বিস্তৃত, দ্রুত বিকশিত শহরে বেড়ে উঠছে লাখ লাখ শিশু। শহুরে জীবন কীভাবে আমাদের শিশুদের মানসিক বিকাশকে প্রভাবিত করছে তা গভীরভাবে অনুসন্ধান করা তাই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে অটিজমের প্রকোপ সম্পর্কে একটি ক্রমবর্ধমান ধারণাও সামনে আসছে। এ উদ্বেগ আরো বেড়ে যায় যখন আমরা কর্মরত পিতামাতার সঙ্গে শিশুদের পর্যাপ্ত সময় পাওয়ার বিষয়গুলো বিবেচনা করি। জটিল এ সমস্যা সমাধান করার জন্য, অটিজমের বৈশিষ্ট্যগুলো বোঝা তাই অপরিহার্য।

অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার হলো নিউরোডেভেলপমেন্টাল অবস্থার একটি জটিল পরিসর, যা বিভিন্ন মূল বৈশিষ্ট্য দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। এটি শিশুর জন্মগতভাবে অথবা জন্মের পর বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে হতে পারে। যার কারণে একটি শিশু সামাজিক আচরণে দুর্বল হয়, পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে কম সক্ষম হয়। এছাড়া তাকে কথা বলার প্রতিবন্ধকতা, পুনরাবৃত্তিমূলক এবং একই ধরনের আচরণ দ্বারা চেনা যায়। এটা একটি মস্তিষ্কের রোগ, যা সাধারণত একজন ব্যক্তির অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। এএসডি ধরনের রোগ মূলত শৈশবে শুরু হয় এবং বড় হওয়া পর্যন্ত থাকে। প্রতিটি আক্রান্ত শিশুর মধ্যে এ বৈশিষ্ট্যগুলো ভিন্নভাবে প্রকাশ পায়, যা হতে পারে মৃদু থেকে গুরুতর।

এএসডি আক্রান্ত শিশুদের আচরণ সাধারণ শিশুদের থেকে আলাদা হয়ে থাকে। এ ধরনের শিশুদের মধ্যে মানসিক সীমাবদ্ধতা দেখা যায়। তারা সবসময় নিজের জগতে থাকে, কারো সঙ্গে কথা বলে না, খেলা করে না এবং তাদের মধ্যে একই কাজ বারবার করার প্রবণতা দেখা যায়। তারা অন্যদের সঙ্গে ঠিকমতো মিশতেও পারে না। এছাড়া তাদের ভাষাগত মাইলস্টোন বা বয়স অনুযায়ী কথা বলার স্তরগুলো পার করতে সমস্যা হয়। যাদের এ সমস্যা প্রখর হয় তাদের ক্ষেত্রে দেখা যায় একেবারেই কথা বলতে পারে না, কিংবা অ্যাটেনশন লেভেল খুবই কম থাকে।৷ অনেক বাচ্চা এত বেশি হাইপারঅ্যাকটিভ হয় যে বাবা-মা তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না৷। তারা কারো চোখে চোখ রেখে কথা বলে না বা শোনে না। এমনকি নিজের বাবা বা মায়ের চোখের দিকেও এরা চোখ রাখতে পারে না। অনেকে আবার নিজেকে আঘাত করে বা হাতের কাছের জিনিসপত্র ভেঙে নষ্ট করে।

বাংলাদেশের নগর জীবনের প্রেক্ষাপটে এ বৈশিষ্ট্যগুলো একটি উচ্চতর তাৎপর্য বহন করে। দ্রুতগতির, ঘনবসতিপূর্ণ এবং প্রায়ই অতিরিক্ত উদ্দীপক শহুরে পরিবেশ শিশুদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার প্রতিবন্ধকতাকে আরো তীব্র করতে পারে। শব্দ ও বায়ুদূষণ এবং উজ্জ্বল আলোর ক্রমাগত বহিঃপ্রকাশ শিশুর সংবেদনশীলতা বাড়িয়ে তুলতে পারে, যা এ শিশুদের জন্য তাদের চারপাশের পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেয়া আরো বেশি চ্যালেঞ্জিং করে তোলে। বর্তমানে অটিজম আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে, যা আনুমানিক ১০০ জনে একজন।

অধিকন্তু, অধিকাংশ ক্ষেত্রে কর্মজীবী ​​পিতামাতার শিশুদের সঙ্গে পর্যাপ্ত সময় দেয়া, কথা বলা, তাদের অনুভূতিগুলো মূল্যায়ন করা, সমবয়সী বাচ্চাদের সঙ্গে মিশতে দেয়া, ডিভাইস আসক্তের মতো বিষয়গুলো থেকে বাচ্চাকে দূরে রাখার প্রবণতা কম হওয়ায় অটিজমের বৈশিষ্ট্যগুলো খুব দ্রুতই বাচ্চাদের মধ্যে বাড়ছে। তাদের চাকরির চাহিদা সন্তানের সঙ্গে সীমিত মানসম্পন্ন সময় কাটাতে দিচ্ছে, বিশেষ করে শিশুর গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক বিকাশের বছরগুলোয়। তাই শিশুরা অতি প্রয়োজনীয় পিতামাতার আনুকূল্য ও একাধিক মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা তাদের অটিজম বৈশিষ্ট্যগুলো আরো জটিল করে তুলতে পারে।

বাংলাদেশে শহুরে জীবনযাত্রার সংজ্ঞায়িত"কংক্রিটের জঙ্গল সমস্যাটিকে আরো বাড়িয়ে তোলে, যেখানে সবুজ স্থান এবং সুসংগঠিত খেলার স্থান সীমিত। গ্রামের বাচ্চাদের মতো শহরের বাচ্চাদের অনেকের সঙ্গে মেশা কিংবা প্রাকৃতিক পরিবেশে মুক্তবিহঙ্গের মতো ছুটে চলার মতো সুযোগ কম। প্রাকৃতিক পরিবেশের উপাদানগুলোয় শিশুর ওপর একটি শান্ত ও পুনরুদ্ধারকারী প্রভাব রয়েছে, তবে শহরের শিশুদের বিশেষ করে যাদের কর্মজীবী ​​পিতামাতা রয়েছে, তাদের এ প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতাগুলোর  অভাব বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়।

এ বহুমুখী উদ্বেগ মোকাবেলা করা ও বাংলাদেশের শহুরে পরিবেশ তৈরির জন্য একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন, যা শহরের জীবনের সুবিধার সঙ্গে শিশুদের, বিশেষ করে অটিজম আক্রান্তদের সামগ্রিক বিকাশের ভারসাম্য বজায় রাখে। একাধিক পার্ক এবং সবুজ স্থানের উন্নয়ন করা, শব্দদূষণ হ্রাস করা এবং বিনামূল্যে খেলাকে উৎসাহিত করে এমন সংস্থাগুলোকে প্রচার করা কার্যকরী পদক্ষেপ হতে পারে। উপরন্তু কর্মজীবী ​​পিতামাতার জন্য পেশাজীবন এবং অভিভাবকত্বের দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য খোঁজা অপরিহার্য, যাতে শিশুরা তাদের প্রয়োজনীয় সময় ও সমর্থন পায়। শিশু যখন একটি জাতির ভবিষ্যৎ, তার সার্বিক চাহিদা পূরণের দায়িত্ব যেমন পরিবারের, তেমন সমাজ ও রাষ্ট্রেরও। আসুন সবাই মিলে আমরা তাই শিশুর জন্য একটি সুস্থ বিকাশসম্পন্ন পরিবেশ গড়ে তুলি। অটিজমপ্রবণতা হ্রাস করি।

তোরসা জহুর: শিক্ষার্থী, যোগাযোগ বৈকল্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়