জলবায়ু ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে শিশুরা খাদ্য, পুষ্টি, বস্ত্র, বাসস্থানের মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। এমনকি শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার মধ্য দিয়েও তাদের যেতে হয়। গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে এতে শিশুরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি একটি দেশের জাতি গঠন প্রক্রিয়া ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। জাতি গঠনের ভিত দুর্বল হয়; অর্থনীতিতে উৎপাদনশীলতা তুলনামূলক নিম্নমুখী থাকে। কেননা আজকের শিশুরাই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
এসব বিবেচনায় বাংলাদেশ ও এ দেশের শিশুরা উভয়ই নানামুখী ঝুঁকিতে রয়েছে। একদিকে এ দেশ ভৌগোলিকভাবে দুর্যোগপ্রবণ। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাবের বিচারেও এটি তালিকার ওপরের দিকে রয়েছে। ফলে এ থেকে শিশুদের সুরক্ষা বড় ধরনের উদ্বেগ হয়ে উঠেছে এবং ক্রমেই উদ্বেগ বাড়ছে। এক্ষেত্রে একটি উদাহরণ হলো ২০২৪ সালের বন্যা। সেসময় দেশের পূর্বাঞ্চলের ১১ জেলায় দীর্ঘমেয়াদি বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল শিশুরা। এতে দুর্গত অঞ্চলের অন্তত ২০ লাখের বেশি শিশু ঝুঁকির মধ্যে ছিল। লাখ লাখ শিশু ও তাদের পরিবার পানিবন্দি হয়েছিল। অনেক পরিবারের কাছে খাবার ও জরুরি ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানোও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
চলতি বছর চট্টগ্রামের বেশির ভাগ অঞ্চলে টানা বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢল থেকে সৃষ্ট বন্যায়ও শিশুরা বড় ঝুঁকির মধ্যে ছিল। চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বাহারচড়া ইউনিয়নে পাহাড়ি ঢলের কারণে সৃষ্ট বন্যার পানিতে ভেসে দুই শিশুর মৃত্যুর খবরও পাওয়া যায়। শুকনো খাবার ও সুপেয় পানি সংকটে পানিবন্দি অনেক মানুষের দিন কেটেছে। এমনকি বন্যা-পরবর্তী সময়েও এ সংকট তীব্র ছিল। এছাড়া বন্যার দূষিত পানিতে দীর্ঘ সময় অবস্থানের কারণে অনেকেই ডায়রিয়া, জ্বর, সর্দি-কাশি ও চর্মরোগে আক্রান্ত হয়েছে, যার মধ্যে শিশুদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। এ থেকে সহজেই অনুমান করা যায়, ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগে শিশুরা কতটা ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে কেবল অতিবৃষ্টি ও বন্যা নয়, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়, তাপপ্রবাহ, খরা, বায়ুদূষণের মতো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বহুমাত্রিক ঝুঁকিতে রয়েছে দেশের শিশুরা। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ বলে জাতিসংঘের শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) ‘চিলড্রেন’স ক্লাইমেট রিস্ক রিপোর্ট ২০২৬’ নামের প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে। এ প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দিতে হলে শিশুদের প্রশমন ও অভিযোজন পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখতে হবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় গত কয়েক দশকে দেশে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। আগাম সতর্কবার্তা, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ, কমিউনিটিভিত্তিক প্রস্তুতি এবং প্রাণহানি কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছে। কিন্তু বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মৌসুমি দুর্যোগ, দুর্যোগের ধরন ও তীব্রতায় পরিবর্তন এসেছে। এর একটি উদাহরণ হলো তাপপ্রবাহ। দেশের বড় বড় শহর ‘হিট আইল্যান্ড’ হয়ে উঠছে। বায়দূষণ বেড়েছে। তাই দেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সৃষ্ট পরিবেশত দুর্যোগ, যেমন বন্যা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদি মোকাবেলার পাশাপাশি নতুন অন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায়ও মনোযোগ দিতে হবে। দুর্যোগের আগের প্রস্তুতি, দুর্যোগকালীন ও পরবর্তী সময়ের প্রস্তুতির পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন। আর এ ব্যবস্থাপনায় মানুষের জীবন ও জীবিকার পাশাপাশি শিশুদের খাদ্য, পুষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করাকে জাতীয় অগ্রাধিকারে রাখতে হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এরই মধ্যে এদিকে অগ্রসর হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিশুদের নিরাপত্তাকে নগর পরিকল্পনার অংশ করা হয়েছে। ফিলিপাইনে ঘূর্ণিঝড় ও ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় দুর্যোগ-সহনশীল বিদ্যালয় নির্মাণ এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক দুর্যোগ প্রস্তুতি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ভারতের আসাম ও বিহারের বন্যাপ্রবণ এলাকায় ভাসমান বিদ্যালয় ও বিকল্প শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে দুর্যোগকালেও শিশুদের শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের মূলে রয়েছে শিশুদের ওপর দুর্যোগের প্রভাব কমিয়ে আনা। বাংলাদেশেরও এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হওয়া সমীচীন।
এক্ষেত্রে শিশুদের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে কোন অঞ্চলের শিশুরা কী ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে সেভাবে পরিকল্পনা করা চাই। উপকূল, হাওর, চরাঞ্চল, পার্বত্য এলাকা এবং নদীভাঙনপ্রবণ অঞ্চলের বাস্তবতা ভিন্ন। প্রতিটি অঞ্চলের ঝুঁকির ধরন অনুযায়ী শিশুদের পর্যাপ্ত আশ্রয় কেন্দ্র, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শিশুরা যেন তাদের শিক্ষাগ্রহণ চালিয়ে যেতে পারে সেটিও ভাবতে হবে। কেননা দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলে অনেক শিশুই আর বিদ্যালয়ে ফিরতে পারে না। শিশুদের একাংশ শিশুশ্রমে যুক্ত হয়। মেয়েদের ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহের ঝুঁকি বেড়ে যায়। শিক্ষার হার ঊর্ধ্বমুখী রাখতেও জলবায়ুর প্রভাব থেকে শিশুদের সুরক্ষা দেয়াটা অপরিহার্য। এ পরিস্থিতি উন্নয়নে কোথাও ভাসমান বিদ্যালয় কার্যকর হতে পারে, কোথাও আবাসিক বিদ্যালয়, কোথাও জলবায়ু-সহনশীল স্কুল অবকাঠামো, আবার কোথাও নিরাপদ শিশু আশ্রয় কেন্দ্র বেশি প্রয়োজন। এছাড়া ঢাকাসহ বড় শহরগুলোয় তাপপ্রবাহ, বায়ুদূষণ ও জলাবদ্ধতা এখন নিয়মিত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্কুল প্রাঙ্গণে পর্যাপ্ত সবুজায়ন, বিশুদ্ধ খাবার পানি, তাপপ্রবাহ মোকাবেলায় শ্রেণীকক্ষের উপযোগী নকশা এবং শিশুস্বাস্থ্যবান্ধব নগর পরিকল্পনায় জোর দিতে হবে।
জলবায়ু অর্থায়নের ক্ষেত্রেও শিশুদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল এবং জাতীয় বাজেট—উভয় ক্ষেত্রেই শিশুস্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা, নিরাপদ পানি ও সামাজিক সুরক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা, স্থানীয় সরকার পর্যায়ের উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচিতে শিশুদের প্রয়োজনকে সুস্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। নয়তো মানবসম্পদ সূচকে বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকবে।










