বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দেখা যাচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এসব দেশের জনস্বাস্থ্য হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। পাশাপাশি অর্থনীতিতেও বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সাময়িকী দ্য ল্যানসেট সম্প্রতি একটি গবেষণা প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, বছরজুড়ে প্রতি মিনিটে গড়ে একজন মানুষ তাপজনিত বিভিন্ন কারণে মারা যাচ্ছে। অন্যদিকে গত চার বছরে একজন মানুষ বছরে গড়ে ১৯ দিন জীবন বিপন্নকারী তাপমাত্রার সম্মুখীন হয়েছে। এর মধ্যে ১৬ দিন এমন তাপমাত্রা ছিল মানবসৃষ্ট। আর উচ্চ তাপমাত্রার কারণে ২০২৪ সালে ৬৩ হাজার ৯০০ কোটি কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে। ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জিডিপির ৬ শতাংশ ক্ষতি হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করা বিভিন্ন সংস্থা এ ধরনের চিত্র বহু আগে থেকেই প্রকাশ করে আসছে। সেই সঙ্গে সতর্কও করছে। কিন্তু তার পরও এর ঝুঁকি মোকাবেলায় সেভাবে উদ্যোগ নিতে দেখা যায় না। এ কথা বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বিশেষ করে এ দেশের বড় শহরগুলোর মাস্টারপ্ল্যানে জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুটি বরাবরই উপেক্ষিত থেকে গেছে। রাজধানী ঢাকাসহ চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী কিংবা কক্সবাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ নগর এলাকার উন্নয়নে নানা সময়ে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হলেও পরিবেশ ও জলবায়ু সহনশীলতার বিষয়টি অনুপস্থিত থেকেছে। বাংলাদেশের মতো ভৌগোলিকভাবে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিতে অবস্থিত একটি দেশের জন্য এটি গভীর উদ্বেগের বিষয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণগুলোর মধ্যে প্রধানতম হলো মানবসৃষ্ট কারণ। চলতি বছরের জুন থেকে আগস্টে মানবসৃষ্ট কারণে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হয়েছে এবং এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ একটি। ক্লাইমেট সেন্ট্রালের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার ৩৪ শতাংশ তীব্র তাপপ্রবাহে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা ৩০ দিনেরও বেশি সময় ধরে মানবস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এমন তীব্র তাপমাত্রা সহ্য করেছে। এমন পরিস্থিতি আগামীর জন্য গভীর সতর্কবার্তাই দিচ্ছে। এ ধরনের বিপর্যয় এড়াতে হলে বড় শহরগুলোর পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশকে গুরুত্ব দেয়ার বিকল্প নেই। কেননা প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রশমন করা যায়নি। এমনকি অভিযোজনও কঠিন হয়ে উঠেছে। মূলত অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাধার ভরাট, বন ধ্বংস, অতিমাত্রায় কার্বন নিঃসরণ ইত্যাদি কর্মকাণ্ড দেশের প্রকৃতি, পরিবেশ নষ্ট করেছে। দেশে বনভূমি ও জলাভূমির পরিমাণ ক্রমেই কমেছে। একটি আদর্শ শহরে প্রায় ২৫ শতাংশ বনভূমির কথা বলা হলেও এ দেশের কোনো শহরেই তা নেই।
বিশ্বব্যাপী আশির দশক থেকেই শিল্পায়ন ও গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণকে কেন্দ্র করে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি আলোচনায় আসে। নব্বইয়ের দশকে বিষয়টি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন পরিকল্পনার অপরিহার্য অংশ হয়ে ওঠে। অথচ দেশের নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষগুলোর নগর পরিকল্পনায় জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলায় কোনো উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ ছিল না। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক প্রকাশনায়ও এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ আছে, দেশের উন্নয়ন কর্তৃপক্ষগুলো ১৯৯৫-২০১০ সাল পর্যন্ত নেয়া মাস্টারপ্ল্যানে জলবায়ু পরিবর্তনকে যথাযথভাবে গুরুত্ব দেয়নি। এমনকি ২০১০ সালের পর প্রণীত খুলনা ও কক্সবাজারের মাস্টারপ্ল্যানেও জলবায়ুর ইস্যুটি উপেক্ষিত থেকে গেছে। এটি এক ধরনের পরিকল্পনাগত ত্রুটি। খুলনা বা কক্সবাজারের মতো উপকূলীয় অঞ্চলে ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা ও বন্যা প্রতিনিয়ত নগরজীবনে প্রভাব ফেলছে। অন্যদিকে অন্যান্য শহরাঞ্চলে তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে, সুপেয় পানির অভাব ও অতিবৃষ্টি নতুন সংকট তৈরি করছে। এমন বাস্তবতায় এসব অঞ্চলের নগর পরিকল্পনায় জলবায়ু সহনশীলতা নীতি যোগ না হওয়া নীতিগত ব্যর্থতাই বলা যায়। আবার রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ২০২২-৩৫ মেয়াদের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) জলবায়ু পরিবর্তন অন্তর্ভুক্ত করা হলেও দেশের অন্য উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এখনো সেদিকে এগোয়নি। এতে বোঝা যায়, দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে এখনো অবকাঠামো সম্প্রসারণ রয়ে গেছে। সেখানে পরিবেশ প্রাধান্য পায়নি।
বাস্তবতা হলো, পরিবেশকে প্রাধান্য না দিয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি বাড়বে বৈ কমবে না। এজন্য পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক গ্যাসের নিঃসরণ কমিয়ে আনতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে টেকসই নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যেতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে সবুজ কারখানার সংখ্যা বৃদ্ধি, পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা আবশ্যক। এগুলোর পাশাপাশি বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে অভিযোজনের উদ্যোগও নিতে হবে। অভিযোজন উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেশব্যাপী, বিশেষত বড় শহরগুলোয়, সবুজ ও জলাধার সংরক্ষণের প্রতি মনোযোগী থাকতে হবে। একই সঙ্গে বন ও জলাধার বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনায় আনা প্রয়োজন। যে হারে শহরগুলোর দূষণ ও তাপমাত্রা বিপজ্জনক হয়ে উঠছে তাতে এগুলো জরুরি হয়ে পড়েছে। শহরে ছাদবাগান ও পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনে তাপপ্রবাহকে রাষ্ট্রীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে উপযুক্ত নীতি প্রণয়ন করতে হবে। সর্বস্তরের জনগণের সুরক্ষায় দুর্যোগ পূর্বাভাস ও আগাম সতর্ক সংকেত ব্যবস্থাকে আরো উন্নত করতে হবে। তাপপ্রবাহ কোন এলাকায় কতটা প্রভাব ফেলবে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে জনগণকে সচেতন করতে হবে। আর ভবিষ্যৎ ভবন তৈরিতে প্রাকৃতিক আলো-বাতাস চলাচল করতে পারে এমন নকশাকে প্রাধান্য দিতে হবে। যেকোনো প্রকল্প অনুমোদনের আগে পরিবেশগত বিষয়কে বিবেচনায় রাখতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেয়া সমীচীন হবে না। সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নীতিগত পরিবর্তন আনা দরকার। প্রতিটি মাস্টারপ্ল্যানে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ সংরক্ষণকে বাধ্যতামূলক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হোক।










