কিন্তু এ সুবিধা ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান গড়ার সুযোগ কাজে লাগানো যায়নি। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্প সাভারে স্থানান্তর করে প্রক্রিয়াকরণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা হয়নি। ফলে কমেছে রফতানি। এমনকি উচ্চ মূল্য সংযোজনকারী শিল্প হিসেবেও ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।
ট্যানারি শিল্পকে সবুজায়নে রূপান্তরের ক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। কারণ ট্যানারি স্থানান্তরের পরও অনেক প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন সমস্যা রয়েছে। সরকারের স্টিমুলাস ফান্ড ও গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ডের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে এ খাতে অর্থায়ন একটি বড় সুযোগ। সমস্যা হলো, পরিবেশ অধিদপ্তরের লাল তালিকাভুক্ত শিল্প হওয়ায় চামড়া শিল্পে এ ধরনের অর্থায়ন দেয়া হয় না। লাল তালিকাভুক্ত শিল্প খাতকে অর্থায়ন দেয়া যাবে না, এমন কোনো শর্ত নেই, বরং সবুজ অর্থায়নের মাধ্যমে উচ্চ দূষণকারী শিল্পগুলোরই রূপান্তরের চেষ্টা করা হয়। যেমন চীন তাদের গ্রিন ক্রেডিট পলিসির আওতায় ইস্পাত, সিমেন্ট, রাসায়নিক এমনকি ট্যানারির মতো উচ্চ দূষণকারী শিল্প খাতকে কম সুদে ঋণ দেয়। এজন্য দূষণ নিয়ন্ত্রণকারী উদ্যোগের শর্ত তারা বেঁধে দিয়েছিল। ভারতের ট্যানারি ক্লাস্টারগুলোয় কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার আধুনিকীকরণে সরকার ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে অর্থায়ন করেছে। বিশেষ করে তামিলনাড়ুর ট্যানারি শিল্পে পরিবেশ উন্নয়ন প্রকল্পে স্বল্পসুদে ঋণ ও সরকারি সহায়তা দেয়া হয়েছে। ইউরোপে ব্রাউন টু গ্রিন ট্রানজিশন ফাইন্যান্সের আওতায় দূষণকারী শিল্পকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে রূপান্তরে অর্থায়ন করা হয়। এটিকে ট্রানজিশন ফাইন্যান্স বা স্থানান্তরকামী অর্থায়ন বলা হয়। এজন্য লাল তালিকাভুক্ত শিল্প খাতকে আর্থিক সুবিধা না দেয়ার ভাবনা থেকে সরকারকে সরে আসতে হবে।
চামড়া শিল্পের সংকট বহুমুখী। সাভারের ট্যানারি শিল্পাঞ্চলে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) এখনো আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী কার্যকর নয়। অধিকাংশ ট্যানারি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) সার্টিফিকেশন অর্জন করতে না পারায় বড় ব্র্যান্ডের সরাসরি অর্ডার পাচ্ছে না। চামড়া খাতের এ অবস্থা কেন হলো? এ খাতে অনেক সরকারি সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং অসংখ্য প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। আবার এ খাতের উন্নয়নে অসংখ্য এনজিও, সরকারি-বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।
কিছু উদ্যোক্তার মতে নানা উদ্যোগ নেয়ার পরও এ শিল্প খাত কোনো উন্নয়ন করতে পারেনি, বরং সামান্য অবনতি হয়েছে। তাদের মতে ৩০০-৪০০ মিলিয়ন ডলারের যে চামড়া রফতানি হতো তা কমে ১০০-১৫০ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। রফতানিকারকদের মতে, সঠিক পরিচালনার অভাবে অনেক প্রতিষ্ঠান রুগ্ণ হয়ে পড়েছে। এক উদ্যোক্তা জানান, এ খাতে প্রায় ৪৪ দশমিক ২৫ শতাংশ শুধু ডিফল্ট লোন রয়েছে, যা নতুন অর্থায়নের পথে বড় বাধা। একটি অন্যতম কারণ, শিল্পগুলো হাজারীবাগ থেকে হেমায়েতপুরে স্থানান্তরে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছিল না। তরল বর্জ্য শোধনের জন্য স্থাপিত সিইটিপিও পরিকল্পনামাফিক নির্মাণ করা যায়নি। বিসিক জানিয়েছিল সব ধরনের অবকাঠামোগত প্রস্তুতি তারা সম্পন্ন করেছে। এ তথ্য সঠিক নয়।
হাজারীবাগেও বিভিন্ন উপজাত পণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানান্তর করা হয়নি। ট্যানারি শিল্প এলাকার ক্রোমযুক্ত কঠিন বর্জ্য বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ বলে এ শিল্পগুলোও ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়। অনেক উদ্যোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ট্যানারি মালিক অ্যাসোসিয়েশনের মতে মোট ১৬২টি শিল্প স্থানান্তর হয়েছিল। এর মধ্যে ১৪২টি চালু রয়েছে। অনেকেই চুক্তির ব্যত্যয় ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠানের জায়গা ভাড়া দিয়ে রেখেছেন। এটির সঠিক পরিসংখ্যান কারো জানা নেই। এ ব্যাপারে একটি সঠিক সার্ভে দরকার। তা না হলে শিল্প মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে শৃঙ্খলা আনয়নের চেষ্টা করলেও তা বাস্তবায়ন দুষ্কর হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে আইএমইডি পরিচালিত একটি সার্ভেতে বলা হয়েছে যে হাজারীবাগ থেকে চামড়া শিল্প সাভারে স্থানান্তরের ফলে ঢাকার দূষণ কিছুটা কমলেও সাভারের ধলেশ্বরী নদীর দূষণ বরং বেড়ে গেছে। আইসিডিডিআর,বিও একটি সার্ভে করেছে। সেটিতে দেখা যায়, সাভার ট্যানারি এস্টেটে সিইটিপি যে পরিমাণ লোড গ্রহণ করতে পারে তার থেকে অনেক বেশি লোড তাকে নিতে হচ্ছে, কেমিক্যালের যে পরিমাণ মাত্রা সহনীয় তার চেয়ে অনেক বেশি মাত্রার অবস্থান পরীক্ষায় পাওয়া গেছে, যার ফলে এটি ঠিকমতো চলছে না এবং যে তরল বর্জ্য নদীতে যাচ্ছে, তা দূষণ বাড়াচ্ছে। এ বছরের মার্চে পরিবেশ অধিদপ্তরের আর একটি সার্ভে পরিচালিত হয়েছে সেখানেও দূষণের মাত্রা অনেক বেশি পাওয়া গেছে। সার্ভেতে অংশগ্রহণকারী উদ্যোক্তা ও শ্রমিকরাও জানিয়েছে যে চামড়া শিল্পনগরীর স্থানান্তরের যে প্রথম ও প্রধান উদ্দেশ্য ছিল তা এ-যাবৎ সম্পূর্ণভাবে পূরণ করা যায়নি যা চামড়া শিল্পের রফতানি ও মূল্য সংযোজিত পণ্য তৈরির অন্যতম বাধা।
২০০৩ সালে শিল্প স্থানান্তরের এ প্রকল্প গৃহীত হয়। পরে বিভিন্ন সময় পরিবর্তন আনায় প্রকল্পের খরচ বহুগুণে বাড়ে। ২০১৭ সালে স্থানান্তর শেষ হয়। স্থানান্তরের সঙ্গে সঙ্গেই সব ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে এ কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। সিইটিপি সঠিকভাবে না চলায় ইটিপি স্থাপনের অনুমতি মেলে। ততদিনে শিল্পগুলো ঋণখেলাপি হয়ে গেছে। আর বরাদ্দকৃত স্থানে নতুন স্থাপনা তৈরি সম্ভব ছিল না। যেসব প্রতিষ্ঠান পাঁচ হাজার বর্গফুট থেকে এক লাখ বা তার বেশি প্লট পেয়েছে তারা দরকারি নতুন স্থাপনা তৈরির সুযোগ পায়। কিন্তু স্বল্প জায়গা পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে তা সম্ভব হয়নি।
চামড়া শিল্পকে নিয়ে ক্রমাগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। কিন্তু এখনো কাঙ্ক্ষিত সমাধান মেলেনি। উল্টো নতুন সমস্যা পুঞ্জীভূত হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারতের চামড়া, চামড়াজাত পণ্য ও জুতা রফতানির পরিমাণ ৪৭৬ কোটি ডলার। সেখানে ভিয়েতনাম রফতানি করেছে প্রায় ২ হাজার ৯০০ কোটি ডলার। অন্যদিকে বাংলাদেশ প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের বাজার পেলেও বিশ্বে অবস্থান ২৭তম। বাংলাদেশের চামড়ার কাঁচামালের গুণগত মান ফুল-গ্রেইন চামড়া উৎপাদনকারীদের মধ্যে অন্যতম হলেও নেতৃস্থানীয় চামড়া প্রস্তুতকারীদের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান নেই। এর অনেক কারণের অন্যতম আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সার্টিফিকেটধারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সীমিত। ফিনিশড চামড়া উৎপাদনকারীদের মধ্যে মানের ভিন্নতা, পরিবেশ-সংক্রান্ত কমপ্লায়েন্স মেনে চলতে না পাড়া, সীমিত ব্রান্ডিং এবং আন্তর্জাতিক বাজারে স্বল্প উপস্থিতি।
বর্তমানে কমপ্লায়েন্স শব্দটি ব্যাপক ব্যবহৃত হয়। এর জন্য প্রচুর বিনিয়োগের দরকার। ইপিজেডে অনেক বড় শিল্প রয়েছে যারা চামড়াজাত পণ্য তৈরি ও রফতানি করে। তাদের মানসম্পন্ন ফিনিশড চামড়ার চাহিদা থাকলেও এগুলো তারা আমদানি করে। ফিনিশড চামড়া রফতানির জন্য দরকার হয় কোটিং, পলিশিং, এম্বসিং, গ্লেসিং ইত্যাদি। এতে বিনিয়োগ ও কমপ্লায়েন্স ব্যয় বেশি। তাই অধিক মূল্য সংযোজিত ফিনিশড চামড়া কিছুটা বেশি মূল্য পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও তা অর্জন করা যাচ্ছে না।
কোরবানির আগে কাঁচা চামড়া নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়। অনেক চামড়া নষ্ট হয়। বিশেষ করে ছাগলের চামড়ার দাম পাওয়া যায় না সংগ্রহ ও পরিবহনে বিলম্ব হওয়ার কারণে। কোরবানির সময় এক বা দুইদিনের মধ্যে লাখ লাখ চামড়া সংগ্রহ হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত সংগ্রহ কেন্দ্র, দ্রুত পরিবহনের ব্যবস্থা সীমিত থাকায় ট্যানারিতে পৌঁছাতে অনেক সময় লাগে। এ বিলম্বে চামড়া নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। অনেক চামড়া মাঠে বা সংগ্রহ কেন্দ্রে পড়ে থাকে। বিপুল পরিমাণ চামড়া প্রক্রিয়াকরণের অভাবে দীর্ঘদিন গুদামে পড়ে থাকে। এ বছর বিনামূল্যে লবণ সরবরাহের ব্যবস্থা হলেও ট্যানারির সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতা এবং কোল্ড স্টোরেজ বা সংরক্ষণ অবকাঠামো বাড়ানো হয়নি। অনেকের ধারণা, কোরবানির সময় অতিরিক্ত কাঁচা চামড়ার একটি অংশ অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে চলে যায়। অবশ্য এ সম্পর্কে কোনো সঠিক পরিসংখ্যানও নেই।
কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধন প্রকল্প বা সিইটিপিকে সঠিকভাবে কাজ করতে হলে শোধন-পূর্ববর্তী কার্যক্রমের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে মনোযোগ বাড়াতে হবে। সিইটিপির নকশা সঠিক ছিল না। অনেক ট্যানারি নিজস্ব প্রি-ট্রিটমেন্ট প্লান্ট কার্যকরভাবে পরিচালনা করে না। এজন্য মাত্রাতিরিক্ত ক্রোম, সালফায়েড, চর্বি, কঠিন বর্জ্য এবং অন্য রাসায়নিক সিইটিপিতে চলে আসে। এভাবে গোটা শোধন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। প্রাথমিকভাবে প্রি-ট্রিটমেন্টের জন্য যান্ত্রিক বার স্ক্রিন লাগানো বেশি জরুরি। এ বিষয়ে দুই ধরনের বক্তব্য পাওয়া যায়। উদ্যোক্তাদের মতে অধিকাংশ ট্যানারিতেই সহজে পরিষ্কার করা যায় এমন বার স্ক্রিন লাগানো হয়েছে। প্রকৃত তথ্য জানার জন্য একটি জরিপ করা যেতে পারে। কমপ্লায়েন্সের জন্য যেসব প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে বিনিয়োগ করেছে ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) সার্টিফিকেশন অর্জনের কাছাকাছি পর্যায়ে চলে এসেছে, সেগুলোকে পর্যাপ্ত সহায়তা দিয়ে প্রস্তুত করতে হবে। এভাবে সেগুলো অধিক মূল্য সংযোজিত পণ্য রফতানি করে আরো বৈদেশিক মুদ্রা আয় করার সুযোগ পাবে।
সংযুক্ত শিল্প খাত হিসেবে ট্যানারির সঙ্গে চামড়াজাত পণ্যকে একত্র করার নীতিমালা জরুরি। পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণের মান ধরে রেখে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় করা সম্ভব। চামড়া খাতের অতীত সাফল্য ফিরিয়ে আনতে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। এগিয়ে আসতে হবে খাতসংশ্লিষ্টদের।
ফেরদাউস আরা বেগম: সিইও, বিল্ড









