বাংলাদেশের নাগরিকদের একটি বড় অংশ নিরাপদ পানি সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এক হিসাবে দেখা গেছে বাংলাদেশের প্রায় সাত কোটি মানুষ এখনো নিরাপদ পানি সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এছাড়া ভূগর্ভস্থ পানি অতিব্যবহারের ফলে পানির স্তর ক্রমে নিচে নেমে যাচ্ছে, সংকট দেখা দিচ্ছে সুপেয় পানির। দুই বছর আগে পানি উন্নয়ন বোর্ড এক গবেষণায় উল্লেখ করেছিল, দেশের দুই-তৃতীয়াংশ এলাকায় পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নামছে ঢাকা নগর, গাজীপুর ও বরেন্দ্র অঞ্চলে। পানি কমলেও যে হারে পানি উঠছে, তার পুনর্ভরণ বা রিচার্জ হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, পুনর্ভরণ কমতে থাকলে উত্তরের জনপদের দশা দেশের অন্যত্রও হতে পারে। নিরাপদ পানির সংকট এবং ভূগর্ভস্থ পানি নিয়ে এ শঙ্কার মধ্যে গতকাল শনিবার পালিত হয়েছে বিশ্ব পানি দিবস। চলতি বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘হিমবাহের সুরক্ষা’। পানি সংকট মোকাবেলা এবং পানিদূষণের হুমকি রোধে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। ভূগর্ভস্থ পানির পরিকল্পিত ব্যবহার, ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগের যেমন পুকুর-দিঘি, খাল-বিল, নদ-নদীর পানির ব্যবহার বাড়ানো এবং শিল্প-কারখানায় পানি পুনর্ব্যবহারে জোর দিতে হবে। সবার জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে হবে।
দিনের পর দিন উত্তপ্ত হচ্ছে পৃথিবী, গলছে হিমবাহ। বৃদ্ধি পাচ্ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। প্রচণ্ড উষ্ণতায় অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের বরফ গলছে, আর এর ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের বঙ্গোপসাগর উপকূলে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে এসব অঞ্চলে প্রতিদিন ২ শতাংশ ভূমি লবণাক্ত হচ্ছে। আবাদি জমির পরিমাণ কমছে। এ অবস্থায় ২০৫০ সাল নাগাদ দেশের উপকূল ছাড়বে প্রায় ৩ কোটি মানুষ। আমেরিকান জিওফিজিক্যাল ইউনিয়নে প্রকাশিত নতুন এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। অতিরিক্ত উষ্ণতায় ফসল ও জনজীবন বিপর্যস্ত হচ্ছে। অনেকেই বাস্তুচ্যুত হচ্ছেন।
পৃথিবীতে দুই-তৃতীয়াংশ পানি থাকলেও মানুষের ব্যবহারের জন্য শুধু একটি ক্ষুদ্র অংশ পানির উৎস হিসেবে উপযোগী। এ সীমিত ও মূল্যবান সম্পদটি মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। অথচ প্রায় প্রতিদিনই আমরা একে অবহেলা করছি, অপচয় করছি। পৃথিবীজুড়ে পানির সংকট এমন এক বাস্তবতা, যা দিন দিন আরো ভয়াবহ হয়ে উঠছে। বিশ্ব পানি দিবসের লক্ষ্য হলো পানির সংকট এবং তার সুরক্ষা সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধি করা। দিনটি স্মরণ করিয়ে দেয়, প্রতিটি ফোঁটার মূল্য কীভাবে আমাদের জীবনকে প্রভাবিত করে এবং পানির উপযুক্ত ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা কতটা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে উপকৃত করতে পারি। যদিও পৃথিবীজুড়ে পানি প্রচুর পরিমাণে আছে, তবে সেই পানি অধিকাংশই লবণাক্ত বা দূষিত। সুপেয় পানির মাত্রা খুবই সীমিত, যা বিশ্বের জনগণের সুস্থতার জন্য যথেষ্ট নয়। বিশ্বের অনেক দেশ, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলো পানির সংকটে ভুগছে। বাংলাদেশেও গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন অঞ্চলে এ সমস্যা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। মাটির নিচের পানি স্তর দিন দিন নিচে নেমে যাচ্ছে এবং গ্রামাঞ্চলের মানুষের জন্য পানি সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে মানুষের জীবনযাত্রার মান কমে যাচ্ছে। আর এভাবে পানিসংকট শুধু একটি প্রাকৃতিক সমস্যা নয়, এটি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জও হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশে ফসল উৎপাদন, সেচ ও গৃহস্থালি কাজে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার ক্রমে বাড়ছে। মাটির নিচে পানির আধার সুরক্ষা ও গুণাগুণ বজায় রাখতে ভূ-উপরিস্থ ও ভূগর্ভস্থ পানির সমন্বিত ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ। অপরিকল্পিতভাবে পানি উত্তোলনে প্রতি বছরই এর স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ খাবার পানির সঙ্গে নলকূপে উঠে আসছে ক্ষতিকর ভারী ধাতু ও দূষিত পদার্থ, যা পান করায় মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে সাধারণত অগভীর নলকূপের মাধ্যমে পানি উত্তোলন করা হয়। অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে এখন বছরের একটা সময়ে, বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে পানি পাওয়া যায় না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভূগর্ভস্থ পানিদূষণ। ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগের দূষক পদার্থ চুইয়ে মাটির নিচে চলে গিয়ে পানিতে মিশছে। তা নলকূপের মাধ্যমে উঠে আসে। সে পানি মানবশরীরে প্রবেশ করে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা হ্রাস করে। ফলে নতুন রোগ সৃষ্টি হচ্ছে। আর্সেনিক ভূগর্ভস্থ পানিতে ব্যাপক হারে দূষণ ঘটাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানি উন্নয়নে এটি সবচেয়ে বড় বাধা। আর্সেনিক দূষণের আগে গ্রামের মানুষ অনেকাংশে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল ছিল। মাটির নিচে বিশেষ স্তরে আর্সেনিক সঞ্চিত থাকে। নলকূপের পানির মাধ্যমে তা উত্তোলিত হয়। কয়েক দশক ধরে কৃষি উৎপাদনে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানিতে এসব মিশে দূষিত করছে নদী-নালা, খাল-বিল, সমুদ্রের পানি; এমনকি ভূগর্ভস্থ পানিও। জমিতে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার আর্সেনিক দূষণের অন্যতম কারণ।
সবচেয়ে ভালো উপায়গুলোর মধ্যে রয়েছে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ, পানির চক্রাকার ব্যবহার, সেচের বিকল্প ভেজা ও শুকনো পদ্ধতি, ওয়াটার স্মার্ট নগর উন্নয়ন ও সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা। বাংলাদেশ যে বিশ্বের শীর্ষ ১০ বৃষ্টিবহুল দেশের একটি, বৃষ্টির পানির ব্যাপারে আমাদের সাংস্কৃতিক ও কারিগরি প্রবণতা দেখে তা বোঝার অবকাশ নেই। অথচ এত পরিষ্কার ও সুপেয় পানি আর কোনো উৎস থেকে পাওয়া যায় না বলে বিশ্বজুড়েই বৃষ্টির পানির কদর সবচেয়ে বেশি। খাল, বিল, পুকুর ও শহরে ভবনে ভবনে সংরক্ষণাগার বাধ্যতামূলক করে বৃষ্টির পানি কীভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবহার করা যায়, তার উপায় সন্ধান করতে হবে। রোধ করতে হবে পানির অপচয়ও। নিত্যব্যবহার্য পানি আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশুদ্ধ করে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করতে হবে। পানির অপচয় রোধ ও পুনর্ব্যবহারে এ ধরনের প্রযুক্তি বিনিময় করা যেতে পারে।
২০২২ সালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৪৬৫টি অগভীর ভূগর্ভস্থ পানির পর্যবেক্ষণ কূপের ৪০ বছরের উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় শুষ্ক মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার ও অবস্থান বিশ্লেষণে দেখা যায়, পানির ব্যাপক ব্যবহারের ফলে দেশের দুই-তৃতীয়াংশ এলাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। গবেষণায় দেখা যায়, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে এক থেকে তিন মিটার পর্যন্ত পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে দেশ ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। তাছাড়া পানি দূষিত হওয়ার কারণে দেশ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা এদিকে বিশেষ দৃষ্টি দেবেন। জলাধার রক্ষায় পানি আইনের কঠোর বাস্তবায়ন, ভূপৃষ্ঠের পানি ব্যবহারের বিষয়টি নগর পরিকল্পনা, বসতবাড়ি পরিকল্পনায় বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত, প্রকৃতি ও পরিবেশবান্ধব পানি ব্যবস্থাপনায় চাষাবাদ পদ্ধতির প্রতি গুরুত্বারোপ, ড্রেজিং করে নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি করা এবং অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা প্রাপ্তির লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। নদীর পাশ থেকে সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে নদীর জায়গা নদীকে ফিরিয়ে দেয়ার পদক্ষেপ নিতে হবে। ঢাকার আশপাশের নদীসহ অন্য সব নদী ও জলাশয় দখল, ভরাট ও দূষণ রোধকল্পে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি নদীর পানি কৃষি ও শিল্পে এবং পরিশোধন করে ব্যবহার করতে হবে।










