কয়েক বছর ধরে চলা করোনা মহামারী এবং চলতি বছরের ডেঙ্গু মহামারীতে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে আমাদের স্বাস্থ্য খাত বড় আকারের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষম নয়। রাজধানী ঢাকায় যে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে তা নগরের বাসিন্দাদের চিকিৎসাসেবায় যথেষ্ট নয়। তার ওপর এ হাসপাতালগুলোয় নিবিড় পরিচর্যা সেবাও অপর্যাপ্ত। দেখা গেছে, নিবিড় পরিচর্যার অভাবে অনেক রোগী প্রাণ হারাচ্ছে। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতলে দৌড়াতে দৌড়াতে রাস্তায় প্রাণ যায় অনেকের। উন্নয়নশীল থেকে মধ্যম আয়ের দেশ হতে চাওয়া একটি দেশের স্বাস্থ্যসেবা এ রকম ভঙ্গুর হতে পারে না। সুস্থ ও সবল মানুষই পারে কোনো দেশকে সুন্দর করে গড়ে তুলতে।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, সংকটাপন্ন রোগীদের জন্য দেশের হাসপাতালগুলোয় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) শয্যা অপর্যাপ্ত। কখনো আইসিইউর অভাবে রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। সরকারের সর্বোচ্চ বিশেষায়িত (টারশিয়ারি) হাসপাতালগুলোয় এ সংকট প্রকট। সময়ে সময়ে বিভিন্ন হাসপাতালে আইসিইউ স্থাপন ও শয্যা বাড়ানো হলেও চাহিদা অনুযায়ী এখনো তা অপ্রতুল। রাজধানীতে সরকারি ১১টি ইনস্টিটিউট হাসপাতালে আইসিইউ শয্যার অপর্যাপ্ততার কারণে সংকটাপন্ন রোগীরা বঞ্চিত হচ্ছে নিবিড় পরিচর্যা থেকে। একই সঙ্গে থামানো যাচ্ছে না চিকিৎসার জন্য রোগীদের নিজস্ব ব্যয় বৃদ্ধি।
যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস) বলেছে, সংকটাপন্ন রোগীদের চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণে বিশেষায়িত হাসপাতালে বিশেষ ওয়ার্ড হচ্ছে আইসিইউ। এতে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যসেবায় পেশাদারদের পাশাপাশি অত্যাধুনিক সরঞ্জামও থাকতে হবে। আইসিইউকে কখনো কখনো ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ), ইনটেনসিভ থেরাপি ইউনিট (আইটিইউ), নিওনেটাল কেয়ার ইউনিট (এনআইসিইউ), পেডিয়াট্রিক কেয়ার ইউনিট (পিআইসিইউ), রেসপিরেটরি কেয়ার ইউনিট (আরআইসিইউ), নিউরো ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (নিউরোআইসিইউ), করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) ও বিভিন্ন নামে ভাগ করা হয়। কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে যেমন শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত, আগুনে দগ্ধ, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, গুরুতর সংক্রমণে (সেপসিস বা গুরুতর নিউমোনিয়া) রোগীকে সংকটাপন্ন অবস্থা থেকে ফেরাতে আইসিইউতে চিকিৎসা জরুরি হয়ে পড়ে। এসব রোগীর সিংহভাগই এক বা একাধিক অঙ্গের সমস্যায় ভোগেন।
দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় প্রতি বছরই বিভিন্ন পরিসরে বৃদ্ধি করা হচ্ছে আইসিইউ সেবা। তিন পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে আইসিইউ সেবার দরকার পড়ে না। মাধ্যমিক পর্যায়ের হাসপাতালের (জেলা/জেনারেল হাসপাতাল) কয়েকটিতে আইসিইউ সুবিধা রয়েছে। আর বিশেষায়িত সর্বোচ্চ পর্যায়ের (টারশিয়ারি) ইনস্টিটিউট এবং মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয়। এ পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোনোটিতে আবার নেই আইসিইউ সুবিধা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, চিকিৎসকের পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিগ্রির জন্য রাজধানীতে সরকারের পোস্টগ্র্যাজুয়েট (পিজি) ইনস্টিটিউট রয়েছে ১১টি। ডিগ্রি প্রদানের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট চিকিৎসার সর্বোচ্চ সেবার জন্য রয়েছে হাসপাতালও। এসব প্রতিষ্ঠানের আইসিইউ শয্যা রয়েছে প্রায় ২০০। আর সাধারণ শয্যার সংখ্যা ৬ হাজার। সাধারণ শয্যার অনুপাতে আইসিইউ শয্যা রয়েছে ৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। গত বছর এসব হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল প্রায় দুই লাখ রোগী। বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছে ২০ লাখের কাছাকাছি এবং জরুরি বিভাগে আসে তিন লাখ রোগী। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ছাড়াও সংশ্লিষ্ট ১১ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এ তথ্য পাওয়া যায়।
বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোয় আইসিইউর শয্যা কত হবে—এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সোসাইটি অব ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বলছে, শিশু হাসপাতাল, অন্যান্য হাসপাতালে সেবার পর্যায় ও হাসপাতাল এলাকার ভিন্নতা অনুযায়ী আইসিইউ শয্যা রাখতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রে হাসপাতালগুলোর সাধারণ শয্যার অনুপাতে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ আইসিইউ শয্যা রয়েছে। একটি হাসপাতালে বিদ্যমান আইসিইউ শয্যার ৬৬ শতাংশের বেশি রোগী থাকলে আইসিইউ শয্যা বাড়াতে হবে।
জনবহুল এ দেশের হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ঘাটতি অনেক প্রাণহানির কারণ হচ্ছে। অথচ সাম্প্রতিক বছরগুলোয় স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় ফুলেফেঁপে উঠেছে। কিন্তু সেবার মানে আহামরি উন্নতি হয়নি। করোনা মহামারী ও সাম্প্রতিক ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাব তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। রাজধানীতে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় অনেক মধ্যবিত্ত রীতিমতো পথে বসেছে। সাধারণের জন্য সরকারি হাসপাতালে যে চিকিৎসা পাওয়া যায় তা কষ্টসাধ্য। বেশির ভাগেরই জায়গা হয় ফ্লোরে। করোনা ও ডেঙ্গুর সময়টায় অনেক হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধার অনুপস্থিতি কিংবা অপ্রতুলতার কারণে অনেকের প্রাণহানি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্য কাঠামোয় কোথায় কীভাবে অর্থ ব্যয় করা উচিত তা নিয়ে আদর্শিক পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। সঠিকভাবে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা হচ্ছে না। বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোয় সরকার আরো কিছু আইসিইউ ও বিশেষায়িত চিকিৎসার সুবিধা বৃদ্ধি করছে। তবে জেলা পর্যায়েও এসব সুবিধা থাকতে হবে। তাহলে মানুষ রাজধানীতে ভিড় করবে না। রাজধানীর ইনস্টিটিউট হাসপাতালগুলোয় আইসিইউ সুবিধা কম থাকা বা কোথাও কোথাও আইসিইউ না থাকার বিষয়টি বিস্ময়ের। বিশেষায়িত সেবার ক্ষেত্রে নিবিড় পরিচর্যার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে না। সর্বোচ্চ হাসপাতালে যেসব সুবিধা থাকতেই হবে তা অনেক ক্ষেত্রে পাওয়া যাচ্ছে না। সুবিধা বাড়াতে খুব বেশি ব্যয় না হলেও সংশ্লিষ্টদের দূরদৃষ্টি ও সদিচ্ছার অভাব রয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতের আধুনিকায়ন ও সেবা বিস্তারের আর্থিক লাভও আছে। দেশের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ চিকিৎসার জন্য প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশে যাচ্ছে। আমরা যদি ভালো স্বাস্থ্যসেবা দিতে পারতাম তাহলে দেশেই থাকত ওই বৈদেশিক মুদ্রাগুলো। এছাড়া নেপাল, ভুটান, মিয়ানমারসহ প্রতিবেশী অনেক দেশের মানুষই বাংলাদেশে চিকিৎসাসেবা নিতে আসত। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের আরেকটি বড় খাত হতে পারে স্বাস্থ্যসেবা। এজন্য দেশের প্রধান হাসপাতালগুলো আধুনিকায়ন করতে হবে এবং কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। রাজধানীতে যে ১১টি বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট আছে সেখানে আইসিইউ সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন। দুই কোটিরও বেশি বাসিন্দার এ শহরে সরকারি ১১টি ইনস্টিটিউটে মাত্র ২০০ আইসিইউ সুবিধা রাখা স্বাস্থ্যসেবার নামে রীতিমতো প্রহসন!
রাজধানীর বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোয় চাহিদার বিপরীতে আইসিইউ সুবিধা একেবারেই অপ্রতুল। বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত এ নগরে রোগবালাইয়ের পরিমাণও বেশি এবং নানা প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগ যেন নিত্যসঙ্গী। টেকসই অর্থনীতি হিসেবে দাঁড়াতে চাইলে আমাদের স্বাস্থ্য খাতকেও সক্ষম করে গড়ে তুলতে হবে। কারণ সুস্থ ও সক্ষম মানুষই সক্ষম দেশ গড়ায় ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষায়িত ইনস্টিটিউটগুলোকে ধীরে ধীরে বিস্তৃত ও সক্ষম করে গড়ে তোলার পদক্ষেপ নিতে হবে। স্রেফ দেখানোর জন্য বাজেট বরাদ্দ কিংবা যন্ত্রপাতি ক্রয় নয়। নাগরিকদের পরিপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের জন্যই আইসিইউসহ সার্বিক স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন জরুরি।










