ড. মাহবুব উল্লাহ্, অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির আহ্বায়ক। বর্ণাঢ্য ছাত্রজীবন শেষে ১৯৭৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতা দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু। সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ছিলেন রাজস্ব সংস্কার কমিশনের সদস্য ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপ-উপাচার্য। ২০০৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগে অধ্যাপনা দিয়ে পেশাজীবন শেষ করেন। বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় রচিত তার ১৩টি গ্রন্থ প্রকাশ হয়েছে। এছাড়া দেশ-বিদেশে তার গবেষণা প্রবন্ধগুলো প্রকাশ হয়েছে। সম্প্রতি দেশের অর্থনীতি, রাজনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম

দক্ষিণ এশিয়ার দেশ নেপাল ও শ্রীলংকা থেকে বাংলাদেশ সুষম খাবার গ্রহণে পিছিয়ে আছে। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অতি দারিদ্রের হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এর মধ্যে ট্রাক সেল ছিল একটি স্বস্তির জায়গা, কিন্তু সেটিও সম্প্রতি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কর্মসংস্থান সৃজন হলো না এবং অতিদারিদ্র্যের হারও বাড়ল—এসব চ্যালেঞ্জ সরকার কীভাবে মোকাবেলা করবে?

কয়েক বছর ধরে যে কর্মসংস্থান হচ্ছিল, অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কমে যাওয়ায় সেই কর্মসংস্থানও কমে গিয়েছে। ফলে দরিদ্র মানুষ যে সুবিধা পাচ্ছিল, সেই সুবিধা কিন্তু তাদের হাতছাড়া হয়ে গেছে। কর্মসংস্থান হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ফলে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়ে গেছে। আর জুলাই অভ্যুত্থানের পর সর্বত্র একটা অনিশ্চয়তা আছে। একটি অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে কোনো অর্থনীতি খুব প্রাণবন্ত বা খুব উৎপাদনশীল থাকতে পারে না। এটাই কিন্তু এখন বাংলাদেশে চলছে। বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করছেন না। প্রায় শূন্য বিনিয়োগ চলে এসেছে। এর আগেও বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ একেবারে শূন্যের কাছাকাছি চলে এসেছিল। তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে একমাত্র বিনিয়োগ হচ্ছিল।

একটা দেশে যখন অনিশ্চিত পরিস্থিতি বিরাজমান থাকে, কে আগামী দিনে সরকারে আসবে তা নিয়ে অস্পষ্টতা থাকে তখন স্থবিরতা স্বাভাবিক। সাধারণ মানুষ থেকে ব্যবসায়ী উদ্যোক্তাদের মনে প্রশ্ন, পরবর্তী সরকারের পলিসি কী হবে? তারা কতটা ব্যবসাবান্ধব হবে? তারা কি সত্যি দুর্নীতিমুক্ত হবে কিনা? তারা সুশাসন দিতে পারবে কিনা? তাদের অতীত অভিজ্ঞতা কী রকম? সেই সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কী দাঁড়াবে, এসব কিছু নিয়েই একটা বড় প্রশ্ন চিহ্ন সবার সামনে। বিশেষ করে বিনিয়োগকারীদের সামনে। কাজেই বিনিয়োগকারীরা সেভাবে যদি এগিয়ে না আসে ও তারা যদি কাজ না করে তাহলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। আমাদের এখানে মানুষের জন্য যদি কর্মসংস্থান তৈরি করতে হয় তাহলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে জোর দিতে হবে। দুর্ভাগ্যবশত ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের (এসএমই) বিভিন্ন খাতে বহু সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কার্যকর কোনো কিছু হচ্ছে না।

চামড়া যথেষ্ট শ্রমঘন শিল্প। চামড়া শিল্পের মূল উপাদান এ দেশে সহজলভ্য। গবাদিপশু প্রজনন ও লালন পালন হচ্ছে। দেশে গবাদিপশুর সংখ্যা বাড়ছে। তার পরেও চামড়া শিল্পটি টেকসই হচ্ছে না। ঢাকার ফুটপাতে নানা ধরনের পাদুকা পাওয়া যায়। এগুলোর দাম বিদেশী যেকোনো পাদুকার চেয়ে কম। কিন্তু এগুলোর ব্র্যান্ড ভ্যালু না থাকায়, এগুলো কতটা টেকসই হবে, কতটা ভালো হবে অর্থাৎ এগুলোর সুনাম না থাকায় বাজার সংকীর্ণ থেকে যাচ্ছে। চামড়া শিল্পের জন্য সাভারের হেমায়েতপুরে যে চামড়া শিল্প নগরী গড়ে তোলা হয়েছে সেখানে বলা হয়েছিল, কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) নির্মাণ করা হবে। দীর্ঘদিন হয়ে গেলেও সিইটিপি নির্মাণের কোনো অগ্রগতি হয়নি। আমি মনে করি, এ ব্যাপারে সরকারের মনোযোগ দেয়া উচিত। এ শিল্পকে সত্যিকার একটা ভালো শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা উচিত। এ শিল্পের ক্ষেত্রে কোনো যৌথ অংশীদারত্ব করা যায় কিনা সেটাও দেখা দরকার। যৌথ অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা গেলে ব্র্যান্ড ভ্যালু-সংক্রান্ত সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

চামড়া শিল্পে কেন আমরা প্রত্যাশিত সম্প্রসারণ করতে পারিনি?

আমাদের দেশে দুই-তিনটা চামড়ার কারখানা ভালো কাজ করছে। কিন্তু অন্যরা সেভাবে পারছে না। অন্যরা যাতে সেভাবে পারে সেজন্য অন্যদের প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো যেতে পারে। এছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের মাধ্যমে বহুবিদ কাজ আছে, যেগুলো দেশে হচ্ছে না। চীন দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য অনেক পণ্য তৈরি করছে, যেটার প্রয়োজন আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় নেই। কিন্তু দেখার পর মনে হয় সেগুলো অনেক প্রয়োজনীয়। আমরা সেটা পারছি না। আমাদের কোথাও না কোথাও ঘাটতি বা দৈন্য আছে। আমাদের এখানে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কোনো উদ্যোগ নেই।

এখন ঢাকায় ৯০ শতাংশ রিকশাই ব্যাটারিচালিত। একজন ৭০ বছর বয়সী ব্যক্তি প্যাডেলচালিত রিকশার পরিবর্তে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালানোয় বেশ স্বস্তি পায়। এটিও এক ধরনের কল্যাণমূলক কাজ। এসব রিকশা নিয়ে পত্রিকায় হইচই দেখছি। এগুলোয় নাকি সর্বনাশের কারণ হয়ে গিয়েছে। কারিগরি বা প্রযুক্তিগত সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যা রকেট তৈরি বা চন্দ্রাভিযানের সঙ্গে তুলনীয় নয়। বুয়েট, চুয়েটসহ বিভিন্ন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ রয়েছে সেগুলো কেন কারিগরি বা প্রযুক্তিগত সমস্যা কাটিয়ে ওঠার মতো কিছু উদ্ভাবন করছে না। আমরা সবকিছু আমদানি করে আনব কিন্তু নিজেরা কিছু তৈরি করব না। এ ধরনের মানসিকতা গ্রহণযোগ্য নয়।

পরনির্ভর মানসিকতা তৈরি হওয়ার পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করবেন কী?

এ রকম মানসিকতা তৈরি হয়েছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা গঠনমূলক বা সৃজনমূলক না। এটা হচ্ছে মুখস্থনির্ভর ও পরীক্ষায় ভালো করার শিক্ষা ব্যবস্থা। পরীক্ষায় ভালো করে অনেকেই স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে চলে যায়। পরিবেশের কারণে সেখানে গিয়ে তারা ভালো করছে। কিন্তু দেশে তারা তেমন কিছু অবদান রাখতে পারছে না। এমনকি বিদেশ থেকে ডিগ্রি নিয়ে আসার পরও কিন্তু এরা দেশে সেভাবে অবদান রাখতে পারে না। অনেকেই বলেন, গবেষণার জন্য অর্থায়ন সংকট। তবে গবেষণার জন্য অর্থায়ন সংকট আছে। এ সংকটের মধ্যেও অনেকেই গবেষণায় ভালো করছেন। ভারতের চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রামন দেশে গবেষণা করেই পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। তিনি অসাধ্য সাধন করেছেন। তবে আমি মনে করি না, তার মতো সবাই অসাধ্য সাধন করতে পারবেন। তবে ‘‌সিভি রামন যদি পারেন তাহলে আমি কেন পারব না’—এ ধরনের মনোভাব ও প্রতিজ্ঞা যদি কারো মধ্যে থাকে তাহলে তার পক্ষে অনেক কিছু করা সম্ভব।

বর্তমানের পৃথিবী উদ্ভাবনের জগৎ। কিন্তু বাংলাদেশে রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আরঅ্যান্ডডি) ও উদ্ভাবনে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। বর্তমানে বিশ্বের পরাশক্তিগুলো একে অন্যের সঙ্গে নতুনত্ব উদ্ভাবনের প্রতিযোগিতা করছে। অন্য কিছু না। যারা নীতি ও শিক্ষানীতি প্রণয়নকারী তারা উদ্ভাবনের দিকে মনোযোগ দিতে পারছে না। এটি আমাকে ভাবিয়ে তুলছে।

আমরা দেখছি গত এক বছরে দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগের অনেক প্রতিশ্রুতি পেয়েছিলাম। কিন্তু সেই অনুসারে দেশে তেমন বৈদেশিক বিনিয়োগ আসেনি। এর কারণ কী?

বাংলাদেশে বিনিয়োগযোগ্য উদ্বৃত্ত অর্থ আছে। হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হলো তার মানে কী? তার মানে হচ্ছে এখানে যথেষ্ট উদ্বৃত্ত অর্থ আছে। যেটাকে আমরা হ্যারোড ডোমার মডেলে সেভিংস, সেভিংস থেকে ইনভেস্টমেন্ট, ইনভেস্টমেন্ট থেকে আউটপুট বাড়ার কথা বলি। তাই না? তাছাড়া আমাদের দেশীয় সম্পদেরও অভাব নেই। কিন্তু চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এ উদ্বৃত্ত অর্থ বহুলাংশে উৎপাদনশীল কাজে ব্যয় হচ্ছে না বা বিনিয়োগ হচ্ছে না। এ উদ্বৃত্ত অর্থ এমন কিছুতে বিনিয়োগ হচ্ছে বা এমন কিছুতে ব্যবহার হচ্ছে, যা অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে না, বরং অর্থনীতিতে ক্ষত তৈরি হচ্ছে।

আর এ বহুপক্ষীয় বা দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি দেশীয় বিনিয়োগ থাকতে হবে। দেশীয়রা যদি বিনিয়োগ না করে তাহলে বিদেশীরা বিনিয়োগ আগ্রহ দেখাবেন না। বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে দেশীয় বিনিয়োগের মাধ্যমে কিছু দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। এর জন্য সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে কার্যকর আলোচনা হতে হবে। দক্ষিণ কোরিয়ায় সামরিক সরকার সে দেশের দুর্নীতিবাজদের গ্রেফতার করে কঠোর চাপ প্রয়োগ করে দেশে বিনিয়োগে বাধ্য করেছে। ফলে দেশটির দেশীয় কোম্পানিগুলো ইলেকট্রিনকস ও অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু আমরা গণতন্ত্রের কথা বলছি, শুধু গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ দিয়ে পৃথিবীর অনেক কিছু অর্জন করা যায় না। গণতন্ত্রের পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে কঠোর হস্তক্ষেপের প্রয়োজন পড়ে।

ব্যাংক খাতে ব্যাংক একীভূতকরণ ও খেলাপি ঋণ কমাতে বেশকিছু বিষয়ে পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। তবে অনেকগুলো ব্যাংক গ্রাহকের আমানতের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না। ব্যাংক খাতের সার্বিক অবস্থা নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

ব্যাংক খাতের সার্বিক অবস্থা নিয়ে আমি আশাবাদী নই। যারা ৫-১০ লাখ টাকা বা এ রকম ক্ষুদ্র সঞ্চয় জমা করেছেন, তারা উদ্বিগ্ন বেশি। কারণ তারা ব্যাংকে টাকা রেখেছেন ভবিষ্যতের নিরাপত্তা হিসেবে। আবার অনেকেই এফডিআর করেছেন। যখন আমানতকারী সঞ্চয়কৃত অর্থ ব্যাংক থেকে তুলতে যান তখন ব্যাংক বলছে, একসঙ্গে সব টাকা দেয়া যাবে না। ব্যাংক কিস্তিতে টাকা দিতে চায়। কিন্তু কিস্তিতে টাকা নিয়ে আমানতকারীর উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছে না। এ সমস্যা এখনো রয়েই গেছে। ব্যাংকের এ তারল্য সংকট তৈরি করেছে সামগ্রিকভাবে অব্যবস্থাপনা ও লুটতরাজ। প্রকৃতপক্ষে ব্যাংক ব্যাংকিং সিস্টেম ও নর্মসের মধ্যে থাকে না। শেখ হাসিনার আমলে রাষ্ট্রের সবকিছুকেই অর্থাৎ ব্যাংক, পুলিশ বাহিনী, আমলা, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পদ ও বিচার বিভাগকে দখল করা হয়েছে। রাষ্ট্র বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানকে দখলের কারণে এক ধরনের কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাকে রাষ্ট্রের দখলমুক্ত করে রাষ্ট্রকে জনগণের হাতে নিয়ে আসা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দখল অবস্থা থেকে রাষ্ট্রকে উদ্ধার করে জনগণের রাষ্ট্র বা জনগণের মালিকানায় নিয়ে আসার জন্য দৃঢ় রাজনৈতিক শক্তি ফোর্স দৃশ্যমান নয়। জুলাই অভ্যুত্থানের পর কোনো কোনো রাজনৈতিক দল হাটবাজার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দখল করেছে। এখন আমরা কীভাবে আশা করব তারা রাষ্ট্রকে দখলমুক্ত করবে? যতক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দখলমুক্ত করতে না পারব ও জনগণের হাতে তুলে না দিতে পারব, গণতন্ত্র বা নির্বাচন কোনোটিই সার্থক বা টেকসই হবে না।

গত এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। ঋণ নিতে জমি কিংবা স্থাবর সম্পত্তি জামানত হিসেবে রাখতে হয়। আমরা এখনো কেন পুরনো পদ্ধতি অনুসরণ করছি?

দেশে জমির মালিকানা নিয়েই ব্যাপক জটিলতা ও অভিযোগ আছে। দেখা যায় যিনি ঋণ নেয়ার জন্য জমি বন্ধক দিচ্ছেন, তিনি আসলে কোনো ব্যক্তিগত জমি বন্ধক দিচ্ছেন না। বরং ভুয়া দলিল তৈরি করে সরকারের খাসজমি বন্ধক রাখছেন। এক্ষেত্রে আরেকটি সমস্যা হলো জমি বা স্থাবর সম্পত্তি অতিমূল্যায়ন করে দেখানো হয়। যে কারণে পরবর্তী সময়ে ঋণের টাকা আদায় না হলে বন্ধকি সম্পত্তি বেচে ঋণ পুনরুদ্ধার করা যায় না। আবার ব্যাংক বন্ধকি সম্পত্তি বেচার জন্য নিলাম পদ্ধতি অনুসরণ করে। কিন্তু ব্যাংকিং ব্যুরোক্রেসির জন্য সেটিও যথাযথভাবে সম্ভব হয় না। উদাহরণ হিসেবে যদি বলি, ঢাকার মতো একটি কেন্দ্রীয় শহরের জমি বিক্রির জন্য গ্রাহক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। সেই জমি বিক্রির জন্য টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন দেয়া হয়। সেই বিজ্ঞাপন রাত ১০টা বা ১১টার পরে প্রচার হতে দেখা যায়। বাস্তবতা হলো সেসময় এ বিজ্ঞাপন কেউ দেখে না। অর্থাৎ মোটাদাগে বললে, দেশের একটা বড় সমস্যা হলো পেশাদারত্বের অভাব। পেশাগত নৈতিকতা যদি কোনো সমাজ না মানে, তাহলে সেই সমাজে ধ্বংস অনিবার্য। যেমন যিনি জেলে তার পেশার নৈতিকতা হলো সে জাটকা মাছ ধরবে না। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে এটি কেউ মানছেন না।

এ কথা বলার কারণ হলো রাজনৈতিক অর্থনীতি বা সামাজিক অর্থনীতির দিক থেকে আমরা এখনো ‘প্রিমিটিভ একিউমুলেশন’ স্তরে আছি। কার্ল মার্ক্স ‘দাস ক্যাপিটাল’ গ্রন্থে এ নিয়ে প্রচুর আলোচনা করেছেন এবং তিনি বিভিন্ন দেশের দৃষ্টান্ত দিয়েছেন যে সত্যিকারের পুঁজিবাদ গড়ে ওঠার আগে একটা অবস্থা আসে যেটা হচ্ছে প্রিমিটিভ একিউমুলেশন। সেটা লুটতরাজের মধ্য দিয়ে হতে পারে, জবর দখলের মধ্য দিয়ে হতে পারে, আবার আইন অমান্য করাসহ নান কায়দায় হতে পারে। বাংলাদেশ এখন সেই স্তরে আছে—সবকিছু লুট করে নাও, দখল করে নাও এটাই হচ্ছে এখন দেশের অর্থনীতির বড় সংকট। এমন পরিস্থিতিতে যে অর্থনৈতিক নীতিই নেয়া হোক না কেন, সেটা কতটা সার্থক করা যাবে সেটা হচ্ছে প্রশ্ন। যে দেশে সহজ উপায়ে টাকা পাওয়া যায়, সেখানে কেন মানুষ বিনিয়োগের ঝুঁকি নেবে, পরিশ্রম ও একাগ্রতা দিয়ে কাজ করবে? এ পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে প্রয়োজন ‘প্রডাক্টিভ একিউমুলেশন’। আমাদের উৎপাদন বাড়াতে হবে। জোড়াতালির অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এজন্য বড় আকারে চিন্তা করতে হবে। সমস্যাটা হলো বড়ভাবে চিন্তা যে হচ্ছে না, তা নয়। বড় লুট কীভাবে করা যায়, বড় দখল কীভাবে করা যায়, বড় পদে বসে বড় ধরনের দুর্নীতি কীভাবে করা যায়—এগুলো বড় চিন্তা হচ্ছে। এ ধরনের বড় চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে আসতে হবে। এবং সেটার জন্য দরকার একটা ক্যারিসমেটিক নেতৃত্ব। সংস্কারমুখী, পরিবর্তনমুখী দৃঢ় নেতৃত্ব না থাকলে এমন পরিবর্তন সম্ভব না।

দুর্বল ব্যাংকগুলোর মার্জারের উদ্যোগ নেয়া হলো। ব্যাংক খাতের সমস্যা সমাধানে এটি কাজে লাগবে কি?

আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারি না দুর্বল ব্যাংকগুলো একীভূত করে কী সমস্যার সমাধান হবে। কারণ প্রত্যেকেই দুর্বল। প্রত্যেকেরই হাত-পা ভাঙা এমন ব্যক্তিদের একত্র করলে শক্তি তো বাড়ে না। এটা কাজে দিতে পারে ইলিউশন তৈরিতে যে এতগুলো ব্যাংক একত্র হওয়ার ফলে ভালো কিছু ঘটতে পারে। ব্যাংকিং সিস্টেমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনগণের বিশ্বাস অর্জন। যারা ডিপোজিটার, যারা ঋণ নেবে তাদের বিশ্বাস অর্জন। সেই অর্থে যদি ব্যাংক মার্জারের মাধ্যমে মানুষের আস্থা বাড়ানো যায় তাহলে ভালো ফল দিতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক মার্জার পলিসিটাকে ভালো করে ব্যাখ্যা করে, এটার বেনিফিট কী কী হতে পারে—জনসম্মুখে তুলে ধরে তাহলে জনগণের আস্থা বাড়ানো সম্ভব। তা না হলে শুধু ব্যাংক একীভূত করে কোনো সুফল আসবে না। বিশ্বাস পুনরুদ্ধার করতে পারলে আবার হয়তো জোড়াতালি দিয়েও শেষ পর্যন্ত সিস্টেমটা দাঁড়িয়ে যেতে পারে।

গণ-অভ্যুত্থানের পর পর আর্থিক খাতের সংস্কার নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংস্কার নিয়ে প্রায় সব পক্ষ থেকেই কথা উঠেছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির সংস্কার বর্তমানে স্থবির পর্যায়ে রয়ে গেছে। এক্ষেত্রে কেন এগোনো যাচ্ছে না?

এনবিআর আমলাতন্ত্র চায় না। আমাদের বুঝতে হবে যে যাদের সংস্কার করব, তারা যদি আগ্রহী না হয় বা তারা যেই পথে এতদিন হেঁটেছে, সেই পথেই চলতে চায় তাহলে সংস্কার সম্ভব না। অনেকেই ব্যক্তিস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে জাতীয় স্বার্থকে গৌণ মনে করে। আমি যখন রাজস্ব সংস্কার কমিশনে ছিলাম তখন বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিনিধি উগান্ডার রাজস্ব আহরণকারী প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে উগান্ডায় মুসেভেনি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ট্যাক্সেশন ডিপার্টমেন্টের পুরনো কর্মীদের একেবারে বাদ দিয়ে নতুন কর্মী নিয়োগ করেছিল। এতে দেখা গেছে যে তাদের কর ব্যবস্থার যথেষ্ট উন্নয়ন ঘটে। আমি এটাকে ভালো প্রস্তাব মনে করি। কিন্তু সমস্যা হলো বাংলাদেশে কোনো কিছু করা যায় না। আপনি একটা কিছু করবেন, দেখা যাবে যে ওটাকে কেন্দ্র করে এত বড় আন্দোলন হবে যে তখন সরকারের পক্ষেই টিকে থাকা খুব কঠিন হয়ে উঠবে। সাম্প্রতিক সময়ে এনবিআরে তেমন পরিস্থিতি আমরা দেখেছি। এখন সর্ষের মধ্যে যদি ভূত থাকে, ভূত কীভাবে তাড়াবেন? এটা তো সমস্যা। এসব ক্ষেত্রে সামাজিক কাঠামো পরিবর্তনের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সরকার ছাড়া বেশি দূর এগোনো সম্ভব না। বিপ্লবী সরকার বা অন্তর্বর্তী সরকার কিছু পরিবর্তন হয়তো করতে পারবে, কিন্তু সেটি উপরি কাঠামোগত হবে। নির্বাচনের পর এ ধরনের পরিস্থিতি পরিবর্তন হবে বলে আমরা আশা করছি। কিন্তু বাস্তবতা হলো যারা আগামীতে নির্বাচন করতে যাচ্ছেন, তাদেরও আমরা চিনি। তাদের অতীত কর্মকাণ্ডও আমরা দেখেছি। তবু হতাশার কথা না বলাই ভালো। মানুষ আশাবাদী কথা শুনতে চায়। আমি আশা করব যে এত কিছুর পর, এত রক্তপাতের পর, এত নির্যাতনের পর যারাই দায়িত্বে আসেন তারা অন্তত মনে রাখবেন যে কী দুঃসময় আমরা পার হয়ে এসেছি এবং সামনের দিনগুলোয় যাতে একটু সুসময় আসে। মানুষ যাতে একটু সুবাতাসে নিশ্বাস নিতে পারে। সেজন্য আগামীতে নির্বাচিত সরকার কাজ করবে, এটা আমি আশা করব। তবে আমার মিশ্র প্রতিক্রিয়া হলো, আগামীতে আশার সম্ভাবনা যেমন আছে, তেমনি হতাশা তৈরিরও জায়গা থাকবে।