চব্বিশের ৫ আগস্টের পর থেকে দেড় বছরে বাংলাদেশ কার্যত এক ধরনের সংস্কারকাল অতিক্রম করেছে। এ সময়ের মধ্যে দেশে ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি, চাঁদাবাজিসহ সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি ঘটেছে। তবু জনগণ এক বুক আশা নিয়ে ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করেছে এই বিশ্বাসে যে দেশব্যাপী একটি গভীর ও কাঠামোগত সংস্কার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। সে সংস্কার বাস্তবায়ন হলে একটি ‘নতুন বাংলাদেশ’, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত এবং নিরাপত্তাহীনতা ও বৈষম্যের অবসান ঘটবে।

এমন প্রেক্ষাপটে ব্যাপক প্রত্যাশা ও আশাবাদ নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের পথে অগ্রসর হচ্ছে। জনগণের সে প্রত্যাশার কতটুকু বাস্তবে রূপ নেবে, তা হয়তো নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে স্পষ্ট হবে। তবে নির্বাচন ঘিরে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার কতটা এখন দৃশ্যমান—সে প্রশ্নটি গভীরভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে।

এ প্রেক্ষাপটে প্রধান উপদেষ্টা দাবি করেছেন, আসন্ন নির্বাচনটি হবে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে ওঠে। যে পুরনো প্রশাসনিক বন্দোবস্ত ও কাঠামো, যে একই লোকবল অতীতে পরপর তিনটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন আয়োজন করেছে, ঠিক সেই কাঠামো ও জনবল দিয়েই যদি ২০২৬ সালের নির্বাচন আয়োজন করা হয়, তবে তা আদৌ কতটা সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য হবে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

বিগত নির্বাচনের সুষ্ঠু না হওয়ার কারণসমূহ: গত তিনটি জাতীয় নির্বাচন ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ কেন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্যভাবে সম্পন্ন হয়নি, সে প্রশ্নের উত্তরে প্রধানত তিনটি মৌলিক কারণ চিহ্নিত করা যায়।

প্রথমত, সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। বিগত সময়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার কোনোভাবেই সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে গ্রহণ করেনি। এরই ধারাবাহিকতায় প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে। ক্ষমতায় থেকেই নির্বাচন আয়োজন এবং পরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখার পথকেই তারা অধিকতর নিরাপদ এবং কার্যকর বলে বিবেচনা করেছে।

দ্বিতীয়ত, প্রশাসনের নীরব ভূমিকা এবং ক্ষমতাসীন দলের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট আনুগত্য। বিগত নির্বাচনগুলোয় প্রশাসনের একটি বড় অংশ কার্যত দলীয় কর্মীর মতো আচরণ করেছে, ফলে ‘রাতের ভোট’সহ নানা অনিয়ম বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে। আমাদের দেশের বাস্তবতায় প্রশাসনের পদোন্নতি, ক্যারিয়ার অগ্রগতি ও সুযোগ-সুবিধার বড় অংশ নির্ভর করে ভবিষ্যৎ ক্ষমতাসীন সরকারের সদিচ্ছার ওপর। ফলে নির্বাচন-পূর্ব সময়ে প্রশাসনের একটি অংশ বড় রাজনৈতিক দলের প্রতি স্বাভাবিকভাবেই নমনীয় থাকে এবং যে দল ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা বেশি, তাদের প্রতি পক্ষপাত প্রদর্শনের প্রবণতা দেখা যায়। এ কাঠামোগত দুর্বলতাই প্রশাসনকে নিরপেক্ষতার জায়গা থেকে সরিয়ে দিয়েছে।

তৃতীয়ত, নির্বাচনকে প্রভাবিত করার জন্য সংগঠিত সহিংসতা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলটির সহযোগী সংগঠন—ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ অন্যান্য অঙ্গসংগঠনের মাধ্যমে ভোটারদের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। মানুষকে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্যভাবে একটি নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে এবং বিরোধী দলকে ভোট না দেয়ার জন্য ভয়ভীতি ও বলপ্রয়োগের আশ্রয় নেয়া হয়েছে। এমনকি নোয়াখালীতে আওয়ামী লীগকে ভোট না দেয়ার অভিযোগে এক নারীকে গণধর্ষণের শিকার হতে হয়েছে। কোথাও কোথাও ভোট কেন্দ্রের বাইরে মাঠে ব্যালট বাক্স রেখে দলীয় নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতেই একটি নির্দিষ্ট প্রতীকে সিল মারতে বাধ্য করার ঘটনাও ঘটেছে। সারা দেশে এ সহিংসতা ও দলীয় কর্মীদের বলপ্রয়োগই সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ছাব্বিশের নির্বাচনের চ্যালেঞ্জসমূহ: উপরোক্ত তিনটি বিষয় পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার নেতৃত্বাধীন উপদেষ্টা পরিষদ সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেই প্রতীয়মান হয়। তবে প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা এ প্রক্রিয়ায় আদৌ কতটা সহযোগিতাপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন—সে বিষয়ে সন্দেহ দিন দিন আরো গভীর হচ্ছে।

যে প্রশাসনিক কাঠামো ও জনবলের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় অতীতে ‘রাতের ভোট’সহ নানা ন্যক্কারজনক অনিয়ম বাস্তবায়ন হয়েছে, যে একই স্ট্রাকচারের মাধ্যমে ‘আমিডামি’ ধরনের সাজানো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে—বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সে একই কাঠামোকে আবারো নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্বে রাখছে। অথচ নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সুস্পষ্ট সুপারিশ ছিল, এবারের নির্বাচন যেন কেবল নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়। দুঃখজনকভাবে সরকার সে প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি।

বিগত পাতানো নির্বাচনগুলো যে জেলা প্রশাসক, বিভাগীয় কমিশনার ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদে আয়োজন করা হয়েছিল, সে বাস্তবতাকে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কার্যত গ্রহণযোগ্য বলে মেনে নিয়েছে। এ অবস্থান নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগ ও আশঙ্কার জন্ম দেয়।

এ আশঙ্কার মূল কারণ জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কিংবা বিভাগীয় কমিশনারদের প্রত্যেকের পদোন্নতি, ক্যারিয়ার অগ্রগতি ও সুযোগ-সুবিধা সরাসরি নির্ভর করে ভবিষ্যৎ ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর। নির্বাচনকালীন যদি কোনো কর্মকর্তা এমন সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ নেন, যা সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ সংসদ সদস্য বা সরকারকে অসন্তুষ্ট করে, তাহলে পরবর্তী পাঁচ বছর অর্থাৎ পুরো মেয়াদজুড়ে তার পেশাগত জীবন কার্যত এক ধরনের অদৃশ্য শাস্তির মধ্যে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

ফলত নির্বাচনকালে প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বড় একটি অংশ অত্যন্ত সতর্ক, অনেক ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় কিংবা সুবিধাবাদী অবস্থান গ্রহণ করে। কেউ ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে শঙ্কিত থাকে, কেউ আতঙ্কগ্রস্ত হয়, আবার কেউ সম্ভাব্য ক্ষমতা কেন্দ্রের দিকে নিজেকে উন্মুক্ত রাখে। এ বাস্তবতাই প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের পথে সবচেয়ে বড় কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী যদি এবারের জাতীয় নির্বাচনটি সম্পূর্ণভাবে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের তত্ত্বাবধানে আয়োজন করা যেত, তবে নির্বাচন ব্যবস্থায় একটি ভিন্ন এবং ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপিত হতে পারত। নির্বাচন কমিশনের অধীন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সরাসরি সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন নন; তারা একটি সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের অধীনে পরিচালিত হন। ফলে তাদের বদলি, পদোন্নতি ও ক্যারিয়ার উন্নয়ন নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কর্তৃত্বে নির্ধারিত হতে পারত এবং সরকারি হস্তক্ষেপের সুযোগ অনেকাংশে সীমিত থাকত। এ বাস্তবতায় তারা নির্বাচন পরিচালনা ও আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে অধিক স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হতেন।

তবে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে নির্বাচন কমিশনের কি পর্যাপ্ত লোকবল ও লজিস্টিক সক্ষমতা রয়েছে? এ বিষয়ে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, নির্বাচন কমিশনের একটি বিস্তৃত সাংগঠনিক কাঠামো এরই মধ্যে বিদ্যমান। বিভাগীয় শহরগুলোয় তাদের বিভাগীয় কার্যালয় রয়েছে, প্রতিটি জেলায় জেলা নির্বাচন অফিসার আছেন এবং প্রতিটি উপজেলায়ও নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মরত। স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ বিভিন্ন নির্বাচনী কার্যক্রমে তারা নিয়মিতভাবে মাঠ ও দপ্তর পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে থাকেন।

জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রেও মনোনয়ন যাচাই-বাছাইসহ অধিকাংশ দাপ্তরিক ও কারিগরি কাজ নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। মূলত জেলা প্রশাসক বা তাদের প্রতিনিধিরা যে ভূমিকা পালন করেন, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সমন্বয়, তদারকি কিংবা মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ। নির্বাচন কমিশনের পর্যাপ্তসংখ্যক কর্মকর্তা মাঠপর্যায়ে মোতায়েন করা গেলে, এ নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায়ই আয়োজন করা সম্ভব ছিল এবং সেটিই হতে পারত একটি বাস্তব পরীক্ষণ, যেখানে সুষ্ঠু নির্বাচন আদৌ কতটা সম্ভব, তা জনগণ প্রত্যক্ষ করতে পারত।

এ কথা স্বীকার করতেই হবে নির্বাচন কমিশনের লজিস্টিক সক্ষমতা, আন্তঃপ্রশাসনিক সমন্বয়ের অভিজ্ঞতা ও মাঠপর্যায়ের কর্তৃত্ব প্রয়োগের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। র‍্যাংক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার দিক থেকেও তারা জেলা প্রশাসন কিংবা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তুলনায় পিছিয়ে। তবে এসব সীমাবদ্ধতা পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ, আইনগত সংস্কার এবং কাঠামোগত পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব নয়।

একই সঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে নির্বাচনের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের হাতে দিলেই যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত হবে, বিষয়টি তেমন সরল নয়। নির্বাচন কমিশনাররাও শেষ পর্যন্ত সরকারের মাধ্যমেই নিয়োগপ্রাপ্ত হন। যদি তারা নিজেরাই নিরপেক্ষতা, সততা ও দৃঢ়তার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হন, তবে প্রশাসনের পরিবর্তে নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে নির্বাচন আয়োজন করলেও কাঙ্ক্ষিত সুষ্ঠুতা অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়বে।

নির্বাচনকালীন সহিংসতার আশঙ্কা: অন্যদিকে দলীয় কর্মীদের সহিংসতার প্রশ্নে একটি ভিন্ন কিন্তু সমানভাবে উদ্বেগজনক বাস্তবতা সামনে এসেছে। ৫ আগস্টের পর এ সহিংসতার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বিএনপির অভ্যন্তরেই বেশি দৃশ্যমান হয়েছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, বিএনপি, জামায়াত, বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী এবং দলীয় মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের মাত্রা ততই বাড়ছে।

নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রকাশ্য সংঘর্ষ কিছুটা কমে এলেও হুমকি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং প্রতিশোধের ভাষা আরো স্পষ্ট ও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। নারী প্রার্থীরা যখন প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন, তখন তাদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটছে।

ঝিনাইগাতীতে জামায়াতের একজন কর্মী নিহত হওয়ার ঘটনা এরই মধ্যে পরিস্থিতির ভয়াবহতার ইঙ্গিত দিয়েছে। পাশাপাশি প্রায় সর্বত্রই হুমকি-ধমকি দেয়া হচ্ছে এবং প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হচ্ছে ‘১২ তারিখের পরে দেখে নেয়া হবে’।

এ বক্তব্যের অর্থ অত্যন্ত স্পষ্ট ও ভয়ংকর। অর্থাৎ নির্বাচনে যে প্রার্থী বিজয়ী হবেন, তিনি এবং তার সমর্থকরা পরাজিত প্রার্থীদের সমর্থক ও ভোটারদের ওপর হামলা চালাবেন। এ হুমকি প্রকাশ্যেই দেয়া হচ্ছে। শুধু কর্মীরাই নয়, অনেক ক্ষেত্রে প্রার্থীরাও এবং তাদের ঘনিষ্ঠ সমর্থকরাও এ ধরনের বক্তব্য নির্দ্বিধায় প্রচার করছে।

এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা কয়েকটি আসনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং দেশের অধিকাংশ আসনেই একই ধরনের উত্তেজনা ও সহিংস মানসিকতা বিরাজ করছে। বহু জায়গায় প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা দিচ্ছে, ১২ তারিখের নির্বাচনের পর তারা প্রতিপক্ষের ভোটার ও সমর্থকদের ওপর চড়াও হবে। এ বাস্তবতা শুধু নির্বাচনকালীন সহিংসতার আশঙ্কাই নয়, বরং নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও একটি ভয়াবহ অস্থিতিশীলতার ইঙ্গিত বহন করে।

এ ধরনের প্রকাশ্য হুমকি ও প্রতিশোধের ভাষার সরাসরি ফল হিসেবে অন্তত দুটি গুরুতর পরিণতি অনিবার্য হয়ে ওঠে।

প্রথমত, নির্বাচনের দিন ভোটারদের মধ্যে গভীর ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি হবে। এ ভয়ের কারণে বহু ভোটার সঠিক সিদ্ধান্ত বা স্বাধীন মত প্রকাশের ক্ষেত্রে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়বেন। অনেকেই নিজেদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাধ্যতামূলক বা চাপের মুখে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। আবার অনেকে সম্ভাব্য সহিংসতা ও সংঘাতের আশঙ্কায় ভোট কেন্দ্রেই যেতে চাইবেন না। ফলে ভোটার উপস্থিতি কমে যাবে এবং নির্বাচন জনগণের প্রকৃত মতামত প্রতিফলনের সক্ষমতা হারাবে। এ পরিস্থিতিতে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা এবং নাগরিকদের স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার উভয়ই চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

দ্বিতীয়ত, এ হুমকি ও উসকানি নির্বাচনের দিন দলীয় কর্মী ও সমর্থকদের সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে আরো উৎসাহিত করবে। ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সহিংসতার ঘটনা ঘটার আশঙ্কা প্রবল, যার পরিণতিতে কোথাও কোথাও ভোটগ্রহণ স্থগিত অথবা ব্যাপক অনিয়ম ও সহিংসতার মধ্য দিয়ে নির্বাচন সম্পন্ন হতে পারে। উভয় ক্ষেত্রেই নির্বাচনের সার্বিক গ্রহণযোগ্যতা মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

এর দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি আরো ভয়াবহ। একটি অগ্রহণযোগ্য ও সহিংসতার মাধ্যমে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার গঠিত হবে, তার আইনগত বৈধতা, জনসমর্থন এবং বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে মোকাবেলা করার নৈতিক শক্তি সবই থাকবে অত্যন্ত দুর্বল। ফলে দেশ দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে নিমজ্জিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় এ ধরনের অস্থিতিশীল পরিবেশ চব্বিশের সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়াকে কার্যত ঝুলিয়ে দেয়ার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। যারা এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল, বিশেষত আওয়ামী লীগ এবং সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর বিচার ও তার বাস্তবায়ন অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। এমনকি এ রাজনৈতিক অরাজকতা তাদের জন্য নতুন করে সংগঠিত হওয়ার এবং রাজনৈতিকভাবে পুনরুদ্ধারের সুযোগও তৈরি করে দিতে পারে।

করণীয়: এ প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি মোকাবেলায় কয়েকটি বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

প্রথমত, সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে ভোটার সচেতনতা ও উপস্থিতি বৃদ্ধিতে। ভোটার উপস্থিতি যদি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেশি হয়, তবে ভোট কারচুপি, ফলাফল ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ কিংবা পরিকল্পিতভাবে ফল পরিবর্তন করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। সচেতন ও আত্মবিশ্বাসী ভোটাররা তখন ভয়ভীতি উপেক্ষা করে স্বাধীনভাবে নিজেদের মত প্রকাশ করতে সক্ষম হন। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব যত বেশি সম্ভব ভোটারকে ভোট কেন্দ্রে আসতে উৎসাহিত এবং প্রয়োজনে তাদের নিরাপদ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সহযোগিতা করা।

দ্বিতীয়ত, ভোট কেন্দ্রে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এবং সিসিটিভি ব্যবস্থার কার্যকর ও সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এমনভাবে মোতায়েন করতে হবে, যাতে ভোট কেন্দ্রে কোনো সহিংসতা বা সংঘাতের সুযোগ না থাকে এবং ভোটাররা পূর্ণ নিরাপত্তা অনুভব করেন। একই সঙ্গে সিসিটিভি ক্যামেরাগুলোকে সক্রিয় ও কার্যকরভাবে মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে হবে, যেন প্রিজাইডিং অফিসার ও রিটার্নিং অফিসাররা যেকোনো সময় কেন্দ্রের পরিস্থিতি সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে পারেন এবং কোনো অনিয়ম বা সমস্যা দেখা দিলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সক্ষম হন।

তৃতীয়ত, ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরও জনগণের সচেতনতা ও সজাগ ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভোট-পরবর্তী সময়ে কোনো প্রার্থী বা তার কর্মী-সমর্থকরা যেন সন্ত্রাস, ভয়ভীতি বা সংঘাতের মাধ্যমে ভোটের ফলাফল পরিবর্তন, ভোটগণনা প্রভাবিত করা বা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ না পায়, সেজন্য নাগরিকদের সতর্ক থাকতে হবে। প্রয়োজনে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট কেন্দ্রের আশপাশে উপস্থিত থাকা, নজরদারি রাখা এবং অনিয়মের চেষ্টা হলে তাৎক্ষণিক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করাই হতে পারে গণতান্ত্রিক দায়িত্ব পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

মনে রাখতে হবে এ নির্বাচন যদি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হতে ব্যর্থ হয়, কিংবা কোনোভাবে আবারো পাতানো ও নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনে পরিণত হয়, তবে দেশ অদূর ভবিষ্যতে এক গভীর ও ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি হবে। তাই যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাদের একমাত্র বৈধ ও টেকসই পথ হলো একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা।

একই সঙ্গে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন প্রয়োজন। দেশে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে নির্বাচনকে সর্বদা অগ্রহণযোগ্য বা প্রশ্নবিদ্ধ করার যে দীর্ঘদিনের প্রবণতা রয়েছে, সেখান থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে। নির্বাচন যদি সত্যিকার অর্থে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়, তবে বিরোধী দলগুলোর দায়িত্ব হবে গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার পরিচয় দিয়ে নির্বাচনের ফলাফল সম্মানের সঙ্গে মেনে নেয়া। পাশাপাশি সরকারকে গঠনমূলক সমালোচনা করা, সংসদ ও রাজপথে দায়িত্বশীল বিরোধিতার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে সঠিক পথে রাখার প্রস্তুতি গ্রহণ করাই হবে গণতন্ত্রের প্রকৃত চর্চা।

তবেই আশা করা যায়, দেড় বছর ধরে যে সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে, তার একটি বাস্তব ও কার্যকর রূপ আমরা দেখতে পাব—একটি নতুন, স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের দিকে অগ্রসর হওয়া সম্ভব হবে। অন্যথায়, যদি পুরনো পদ্ধতির পাতানো, সাজানো ও সংঘাতময় নির্বাচনই আবার ফিরে আসে, তবে দেশ শুধু স্থবির হবে না, বরং বহু বছর পিছিয়ে পড়বে, যার দায়ভার বহন করতে হবে পুরো জাতিকেই।

সৈয়দা লাসনা কবীর: অধ্যাপক ও চেয়ারপারসন, লোকপ্রশাসন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মোহাম্মাদ ঈসা ইবনে বেলাল: প্রভাষক, লোকপ্রশাসন ও সরকার পরিচালনা বিদ্যা বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়