স্বৈরাচারী শাসকদের একটি স্বতন্ত্র ভাষা ও কৌশল থাকে—যার মাধ্যমে তারা রাষ্ট্রের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেন, প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য দুর্বল করেন এবং জনমতকে প্রভাবিত করে নিজেদের আধিপত্য নিশ্চিত করেন। এ প্রবণতা শুধু উন্নয়নশীল বা দুর্বল গণতন্ত্রে নয় বরং বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রেও দেখা যায়। সমকালীন মার্কিন রাজনীতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প এ কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার প্রতীক হয়ে উঠেছেন, বিশেষত তার ভাষাগত কৌশল ও বক্তৃতার মাধ্যমে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যানফোর্ড এফ শ্রাম তার ২০২৪ সালের গ্রন্থ ট্রাম্পবাদের গতিপথ: বর্ণবাদ, ফ্যাসিবাদ, গৃহযুদ্ধ ও তার পরবর্তী পর্যায় নিয়ে আলোচনা ‘ট্রাম্পিজম’ নামের নতুন ধারণাটি ব্যবহার করে এ রাজনৈতিক বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করেছেন। শ্রামের মতে, ট্রাম্পিজম হলো এমন এক রাজনৈতিক ভাষা ও কৌশল, যা ‘অগণতান্ত্রিক গণতন্ত্র’ তৈরি করে—যেখানে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকে কিন্তু তাদের নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকারিতা শূন্য হয়ে যায়।
স্বৈরাচারের ভাষা ও গণতন্ত্রের ভেতর থেকে ক্ষয়
লেভিটস্কি ও জিবল্যাট যুক্তি দেন যে আধুনিক যুগে গণতন্ত্রের পতন সাধারণত সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নয় বরং ভেতর থেকে ধীরে ধীরে ঘটে। নির্বাচিত নেতারা গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতর থেকেই তার ভিত্তি দুর্বল করেন—বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সীমিত করেন, সংবাদমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ‘রাষ্ট্রশত্রু’ হিসেবে চিত্রিত করেন ও নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে নিজের পক্ষে ঘুরিয়ে নেয়া এ পন্থার মূল কৌশল।
এ প্রক্রিয়ায় গণতন্ত্র ক্রমে রূপ নেয় সীমিত স্বাধীনতার এক মুখোশে, যেখানে আনুষ্ঠানিক কাঠামো টিকে থাকে কিন্তু তার ভেতরের মূল্যবোধ ও নৈতিকতা ক্ষয়ে যায়। ভ্রান্ত তথ্য, প্রচারণা ও আবেগনির্ভর বয়ান হয়ে ওঠে শাসনের নতুন অস্ত্র। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও এর প্রতিধ্বনি শোনা যায়। শেখ হাসিনার সরকার বিভিন্ন সময়ে মিথ্যা তথ্য ও প্রচারণার মাধ্যমে জনমত প্রভাবিত করেছে।
মেটাপ্র্যাগমেটিক কৌশল: ভাষার ভেতর ভাষা
স্যানফোর্ড এফ শ্রাম ‘মেটাপ্র্যাগমেটিক’ ধারণা ব্যবহার করে দেখান যে ট্রাম্প কেবল কী বলেন তা নয়, বরং কীভাবে বলেন, সেটিই তার রাজনৈতিক অস্ত্র। মেটাপ্র্যাগমেটিক বলতে বোঝায় এমন ভাষাগত স্তর, যেখানে বক্তা নিজের বক্তব্যের সামাজিক অর্থ, প্রভাব ও নিয়ম নিয়েও ভাষার মধ্যেই প্রতিফলন ঘটান।
শ্রাম ট্রাম্পের বক্তৃতার দুটি স্তর আলাদা করেন—
১. প্র্যাগমেটিক স্তর: সরাসরি বক্তব্য ও বার্তা প্রেরণ। ২. মেটাপ্র্যাগমেটিক স্তর: পরবর্তী সময়ে বক্তব্যের পুনর্গঠন ও অর্থ পরিবর্তন।
প্রথম স্তরে ট্রাম্প ও তার সহযোগীরা আবেগনির্ভর ও বিভাজনমূলক ভাষা ব্যবহার করেন, যেমন ভয়, ক্ষোভ বা সাংস্কৃতিক উৎকণ্ঠা উসকে দেয়া। দ্বিতীয় স্তরে সেই বক্তব্যকে ‘রসিকতা’, ‘বিদ্রূপ’ বা ‘মিডিয়ার বিকৃতি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করে বৈধতা দেয়া হয়। এ প্রক্রিয়ায় ঘৃণার ভাষা হয়ে ওঠে দেশপ্রেমের ভাষা, আর কর্তৃত্ববাদ পরিণত হয় আবেগপূর্ণ ‘জনতার কণ্ঠে’।
বিভ্রান্তিকর ভাষা ও রাজনৈতিক প্রভাব
২০২৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বরের প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্কে ট্রাম্প দাবি করেন যে ওহাইওর স্প্রিংফিল্ডে অভিবাসীরা স্থানীয়দের ‘কুকুর ও বিড়াল খাচ্ছে’, যা স্থানীয় প্রশাসন ও সাংবাদিকরা পরবর্তী সময়ে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে প্রমাণ করেন। কিন্তু এ বক্তব্যে জনমনে ভয়, ক্ষোভ ও ‘জাতীয় রক্ষক’ চেতনা জাগিয়ে তোলাই ছিল ট্রাম্পের মূল উদ্দেশ্য। বক্তব্যের সত্যতা নয় বরং এর আবেগীয় প্রতিক্রিয়াই ছিল রাজনৈতিক ফলাফল।
একইভাবে ২০২৩ সালের নভেম্বরে ট্রাম্প বলেন: ‘আমরা আমাদের দেশ থেকে সেই কমিউনিস্ট, মার্ক্সবাদী, ফ্যাসিস্ট ও উগ্র বামপন্থী গুণ্ডাদের উৎখাত করব, যারা আমাদের সমাজে পরজীবীর মতো বাস করছে।’ এ বক্তব্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ‘দেশের অভ্যন্তরীণ শত্রু’ হিসেবে চিত্রিত করে, যা কর্তৃত্ববাদী জনতন্ত্রের মূল বৈশিষ্ট্য। বিরোধিতাকে ‘জাতীয় মুক্তির শত্রু’ হিসেবে দেখিয়ে গণতান্ত্রিক বিতর্কের জায়গা সংকুচিত করা হয়।
এ ধরনের মেটাপ্র্যাগমেটিক ভাষার প্রয়োগ শুধু যুক্তরাষ্ট্রে নয়, বাংলাদেশের রাজনীতিতেও দৃশ্যমান। জুলাই বিপ্লবের সময় শেখ হাসিনা ছাত্র আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ আখ্যা দেন, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে অত্যন্ত অবমাননাকর শব্দ। এ বক্তব্যের পরই সরকারের কঠোর দমননীতি এবং সহিংসতার ফলে প্রায় দুই হাজার মানুষ নিহত হয় এবং জনঅসন্তোষ তীব্রতর হয়। পরবর্তী সময়ে তার সহযোগীরা এ বক্তব্যকে ‘ভুল বোঝাবুঝি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, যা একই ধরনের ভাষাগত পুনর্গঠন প্রক্রিয়া।
ভাষার পুনর্গঠন ও সত্যের সংকট
ট্রাম্প প্রায়ই বিতর্কিত বক্তব্যের পর দাবি করেন যে তার কথা ‘বিদ্রূপাত্মক’, ‘ভুলভাবে উদ্ধৃত’ বা ‘জনগণের কণ্ঠের প্রতিফলন’। এ পুনর্গঠন প্রক্রিয়াই মেটাপ্র্যাগমেটিক ক্ষমতা—যেখানে ভাষা কেবল অর্থ প্রকাশ করে না, বরং নিজেই অর্থ ও বৈধতা পুনর্নির্মাণ করে।
এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো তার উক্তি—‘মিথ্যা ও ভুয়া সংবাদমাধ্যমই জনগণের শত্রু’। এ বাক্যটি কেবল গণমাধ্যমের সমালোচনা নয় বরং এক গভীর রাজনৈতিক কৌশল, যার মাধ্যমে ‘সত্য’ ও ‘মিথ্যা’র সংজ্ঞা ভাষার ভেতরেই বদলে দেয়া হয়। এখানে ‘মিথ্যা সংবাদ’ বলতে বোঝানো হয় যেকোনো প্রতিবেদন, যা ট্রাম্পকে সমালোচনা করে। ফলস্বরূপ, জনগণের চোখে সাংবাদিকতা, একাডেমিয়া ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা কমে যায় ও ট্রাম্প নিজেকে ‘সত্যের একমাত্র উৎস’ হিসেবে উপস্থাপন করেন।
ট্রাম্পিজম ও বৈশ্বিক কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা
শ্রাম দেখান, ট্রাম্পিজম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি বৈশ্বিক কর্তৃত্ববাদী ধারার অংশ। ট্রাম্পের বক্তৃতায় হাঙ্গেরির ভিক্টর অরবান, ব্রাজিলের জায়ার বোলসোনারো, চীনের শি জিনপিং ও রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিনের প্রশংসা—কর্তৃত্ববাদী নেতৃত্বের প্রতি তার আকর্ষণ প্রকাশ করে।
ট্রাম্পিজমের সামাজিক ভিত্তিও গভীর। এটি বিশেষভাবে প্রভাব ফেলে সেই শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান জনগোষ্ঠীর মধ্যে, যারা জাতিগত পরিবর্তন ও বহুত্ববাদকে নিজেদের সামাজিক প্রাধান্যের জন্য হুমকি মনে করে। ফলে ট্রাম্পিজম এক ধরনের সাংস্কৃতিক যুদ্ধের ভাষা—যেখানে বহুত্ববাদ ও সমতার দাবি ‘বাস্তব আমেরিকার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র’ হিসেবে উপস্থাপিত হয়।
ট্রাম্পিজম দেখায় যে স্বৈরাচার কেবল দুর্বল গণতন্ত্রের নয়, বরং প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রের ভেতরেও জন্ম নিতে পারে। এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করে গণতন্ত্রের নৈতিক ভিত্তি ধ্বংস করে। ‘জনগণের নামে’ কথা বললেও এটি বহুত্ববাদকে অস্বীকার করে এবং ‘দেশপ্রেমের ভাষা’ ব্যবহার করে ভিন্নমত দমন করে।
যখন অমানবিক ভাষা, ভ্রান্ত তথ্য ও দমনমূলক বক্তৃতা সমাজে স্বাভাবিক হয়ে যায়, তখন গণতন্ত্রের নৈতিক সীমানা ক্ষয়ে যায়—আর সেই শূন্যস্থানেই স্বৈরাচারবাদ শিকড় গাঁথে। ট্রাম্পিজম তাই কেবল একজন নেতার ভাষাগত কৌশল নয়; এটি আধুনিক গণতন্ত্রের অন্তর্নিহিত ভঙ্গুরতার প্রতিচ্ছবি।
সানজিদা বারী: ডক্টরাল ফেলো, ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় শিকাগো










