‘মার্কেন্টিলিজম’কে বলা হয় একটি যুগান্তকারী দর্শন, যা ১৫০০-১৮০০ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপে রাজনীতি ও বাণিজ্যনীতির মূল ভিত্তি ছিল। এর মূলমন্ত্র ছিল—জাতীয় শক্তি ও সম্পদ বৃদ্ধির জন্য আমদানি কমিয়ে রফতানি বাড়ানো। বৈদেশিক মুদ্রা বিশেষ করে স্বর্ণ ও রূপার মজুদ বৃদ্ধি করা। বলা হয়ে থাকে ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্য বিস্তারের ধারা শুরু হয় এ নীতির ফলেই। বিংশ শতকের শুরুতে বিশ্ব অর্থনীতি যখন ধীরে ধীরে মুক্তবাজার ব্যবস্থার দিকে এগোয় তখন মার্কেন্টিলিজমকে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে ক্রমেই। ২১০০ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসে এ দর্শনই নতুন আঙ্গিকে ফিরে এসেছে—‘নব্য মার্কেন্টিলিজম’ নামে। তবে ‘নব্য মার্কেন্টিলিজম’ সরাসরি স্বর্ণ বা উপনিবেশ নয় বরং বাণিজ্য ঘাটতি, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা, কৌশলগত শিল্প সংরক্ষণ ও কর্মসংস্থানের দোহাই দিয়ে এক ধরনের আধুনিক সুরক্ষাবাদী বাণিজ্যনীতির জন্ম দিয়েছে। অর্থনীতিবিদ ড্যানি রডরিকের মতে, ‘বাস্তবতা হলো, আজকের বাণিজ্যনীতি আর শুধু লাভ-ক্ষতির হিসাব নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতির অংশ।’ বলা যায় এর অংশ হিসেবেই মার্কেন্টিলিজম আর মুক্তবাজার অর্থনীতির পর্ব পেরিয়ে বিশ্ব ঢুকে পড়ছে ‘নিও মার্কেন্টিলিজম’-এর যুগে।
২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যে রূপান্তর ঘটেছে, তা একটি স্পষ্ট প্যাটার্ন তুলে ধরে। সেই প্যাটার্নকে নির্ধিদ্বায় ‘নব্য-মার্কেন্টিলিজম’ বলা যায়। যার শুরুটা ছিল ২০১৮ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীনা পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ। ট্রাম্পের পর জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হলেও তিনি এ শুল্ক বাতিল করেননি; বরং কিছু ক্ষেত্রে তা বাড়িয়ে ১০০ শতাংশে নিয়ে গেছেন।
দ্বিতীয়ত, বাইডেন প্রশাসন ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র অজুহাতে অত্যাধুনিক চিপসসহ সংবেদনশীল প্রযুক্তি রফতানিতে কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় চীন দুর্লভ খনিজ পদার্থ রফতানিতে সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। তৃতীয়ত, ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি বাইডেনের আমলে হয়ে যায় ‘কর্মী-বন্ধুসুলভ বাণিজ্য নীতি’। তবে মূলনীতি একই থাকে: দেশকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিদেশী পণ্যের প্রবেশ সীমিত করা। ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প আরো চরম অবস্থানে যান। নির্বাচিত হওয়ার পর শেষ পেরেকটা ঠুকলেন বিশ্বব্যাপী আমদানি পণ্যের ওপর শুল্ক তথা ইউনিভার্সাল ট্যারিফ আরোপের ঘোষণায়।
এ পুরো দৃশ্যপটের মূল ভিত্তি হলো বাণিজ্য মানেই এখন নিরাপত্তা। বাণিজ্য কেবল পণ্য আদান-প্রদান নয়, বরং ভূরাজনীতি, ইতিহাস, প্রযুক্তি ও প্রতিযোগিতার কৌশল। যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী নিজের শ্রেষ্ঠত্ব রক্ষা করতে চাইছে, আর চীন ঔপনিবেশিক অতীতের ক্ষত ভুলে আত্মনির্ভর হতে চাইছে।
জায়ান্টদের এ লড়াইয়ে মধ্যম ও ছোট দেশগুলোর সামনে কঠিন বাস্তবতা। একসময় যেসব দেশ বহুপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা পেত, আজ তারা চাপে পড়ে সুরক্ষাবাদী নীতির পথে হাঁটছে।
এতদিন ধরে তাত্ত্বিক অর্থনীতিবিদরা নব্য-মার্কেন্টিলিজমের যে তত্ত্ব দিয়ে আসছিলেন তা ঠিক এখন আর তত্ত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ট্রাম্পের ইউনিভার্সাল ট্যারিফের পর এটি একটি বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে, যা পৃথিবীকে বাণিজ্য মানচিত্রে রূপান্তর করবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, ভবিষ্যতের জন্য নতুন ভারসাম্যের প্রয়োজন হবে। যেখানে জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে বৈশ্বিক সহযোগিতা ও ন্যায়সংগত বাণিজ্যের সমন্বয় থাকবে। না হলে ছোট দেশগুলোর জন্য এ উত্তাল স্রোতে টিকে থাকা হবে প্রায় অসম্ভব। কারণ এ আগ্রাসী নব্য-মার্কেন্টিলিজমে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়তে যাচ্ছে ছোট ও মাঝারি শক্তির দেশগুলো।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, কৃষিপণ্য এবং লঘু শিল্প খাতে উৎপাদিত পণ্যগুলো মূলত আমেরিকা, ইউরোপের বাজারে পৌঁছে থাকে। ট্রাম্পের এ শুল্কনীতির ফলে যদি যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য প্রধান বাজারগুলোও শুল্ক আরোপের পথে হাঁটে তাহলে বাংলাদেশের রফতানি খাতে ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসন একটি নির্দিষ্ট সূত্র ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশের ওপর শুল্ক আরোপ করেছে। এ সূত্র অনুযায়ী, প্রথমে একটি দেশের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য উদ্বৃত্তকে সেই দেশের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মোট রফতানির পরিমাণ দিয়ে ভাগ করা হয়। এরপর প্রাপ্ত সংখ্যাটিকে অর্ধেক করে সেই শতাংশ হারে শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। সূত্র অনুযায়ী বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ পাল্টা শুল্কহার হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য আমদানি করে, যার মধ্যে গম, ভুট্টা, সয়াবিন, ডেইরি পণ্য এবং অন্যান্য শস্য উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে এসব পণ্যের আমদানি ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দেশ থেকে হলেও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ালে বাণিজ্যিক সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের পক্ষে রয়েছে। কারণ বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে বেশি রফতানি করে আর তুলনামূলক কম আমদানি করে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বৃদ্ধি পেলে এ বাণিজ্য ঘাটতি কিছুটা কমে আসবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কাছে ইতিবাচক বার্তা দেবে এবং শুল্ক কমানোর আলোচনা সহজতর করতে পারে। বাংলাদেশ যদি আমদানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে বেশি অগ্রাধিকার দেয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশাধিকারের সুযোগ আরো বিস্তৃত হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য চুক্তি ও কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের শুল্ক ছাড়ের পথ সহজ হতে পারে।
বাংলাদেশ ছাড়াও ভিয়েতনাম, ইথিওপিয়া, ফিলিপাইন বা চিলির মতো দেশগুলো বহু বছর ধরে মুক্ত বাণিজ্যের সুবিধা নিয়ে নিজেদের উৎপাদন ও রফতানিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলেছে। কিন্তু আজ সেই আন্তর্জাতিক বাজার অনিশ্চয়তার মুখে। কারণ ট্রাম্পের নীতির পর বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তিগুলো এখন আর স্বচ্ছ ও উদার বাণিজ্যনীতির পেছনে হয়তো থাকবে না—বিষয়টি স্পষ্ট। তারা নিজেরাই বাণিজ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে চাইবে। অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিটজের ভাষ্যমতে, ‘বাণিজ্যযুদ্ধ সহজে শুরু হলেও এদের শেষ করা কঠিন। বর্তমান পরিস্থিতি তো আরো জটিল। এর প্রকৃত শিকার হয় ছোট ও দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলো।’ তার মতে, ‘ট্রাম্পের ঘোষণার ফলে সৃষ্ট শুল্ক বিধি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নয়, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে এক নতুন দ্বন্দ্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।’
এরই মধ্যে চীন ৩৪ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। ১০ এপ্রিল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হবে। এ পাল্টা শুল্কের ফলে বাণিজ্যযুদ্ধের আশঙ্কা আরো প্রবল হয়ে উঠেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ট্রাম্পের শুল্ককে ‘অবৈধ’ ও ‘অপ্রয়োজনীয়’ বলে অভিহিত করেছে। ইইউর প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডের লিয়েন বলেছেন, ইইউ এ ধরনের শুল্কের বিরুদ্ধে তৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়া জানাবে। অস্ট্রেলিয়া ট্রাম্পের শুল্কের ফলে অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা করছে। দেশটির স্টক মার্কেটের উল্লেখযোগ্য পতন ঘটেছে। যদিও দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজছে। ভিয়েতনাম এবং ভারতসহ এশিয়ার অন্য দেশগুলোও তাদের কৌশল পুনর্বিবেচনা করছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ ইউরোপের বৃহৎ কোম্পানিগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ স্থগিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এটাই নতুন বিশ্ব বাণিজ্যের যুগ—যেখানে মুক্ত বাণিজ্য নয়, বরং রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও আগ্রাসী প্রতিযোগিতাই মূল চালিকাশক্তি। এতকিছুর মধ্যেও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা একেবারে নিষ্ক্রিয়। সংস্থার সর্বোচ্চ আদালত আপিলেত বডি বিচারপতি সংকটে অচল। বলা যায় এ বডি কার্যত বিলুপ্তপ্রায়। ফলে বিশ্ব বাণিজ্যের ন্যায্যতা রক্ষার জন্য কোনো কার্যকর প্লাটফর্মও আর অবশিষ্ট নেই।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ট্রাম্পের মতো এমন দৃঢ়নীতি বিরল। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে যেখানে বৈশ্বিক বাণিজ্য, প্রযুক্তি এবং সাপ্লাই চেইন একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে, সেখানে এ ধরনের একতরফা সিদ্ধান্তের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে কতটা মারাত্মক হতে পারে তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকরা। যদিও তারা বলছেন, যেসব দেশ ‘নব্য মার্কেন্টিলিজমের’ রীতিতে মানিয়ে নিতে পারবে, তারা ভবিষ্যতে নিজেদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থান সুদৃঢ় করতে পারবে। অন্যদিকে, যারা এ পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ হবে, তারা এক দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পড়তে পারে। কারণ যখন বাণিজ্যই অস্ত্র হয়ে ওঠে, তখন ছোট দেশের জন্য নিরাপদ স্থান খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। এমন প্রেক্ষাপটে নীতিগত সমন্বয় ও কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে সময়মতো পদক্ষেপ না নিতে পারলে ছোট দেশগুলো আটকে যেতে পারে ‘নিও মার্কেন্টিলিজম’- এর জালে।
মাহফুজ রাহমান: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, বণিক বার্তা










