সময়ের পরিক্রমায় দেশে সরকারি-বেসরকারি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে। স্নাতক-স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীর সংখ্যাও বেড়েছে। কিন্তু মানসম্পন্ন শিক্ষা যে নিশ্চিত করা যায়নি সেটি উচ্চ শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ও বৈশ্বিক মানদণ্ডে নিজস্ব অবস্থানের দিকে লক্ষ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শিক্ষার পরিবেশও ক্রমাগতভাবে অধঃপতিত হয়েছে। বিশেষত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষা-সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষক-ছাত্রদের লেজুড়বৃত্তিক দলীয় রাজনীতি শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের ধস নামিয়েছে। এমনকি সেসময় রাজনৈতিক বিবেচনায় বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পেয়েছে। আবার প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য ও শিক্ষক নিয়োগে প্রচণ্ড অনিয়ম হয়েছে। সব মিলিয়ে এসব উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষার মানোন্নয়ন ঘটেনি। অথচ মানসম্মত উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণা ছাড়া দেশের টেকসই উন্নয়ন কখনই নিশ্চিত করা যায় না। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারত।

এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে নতুন সরকার গঠন হলে উচ্চ শিক্ষা ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংস্কার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। বিশেষত শিক্ষার পরিবেশ পুনরুদ্ধার হবে ও রাজনৈতিক দলীয়করণ বন্ধ হবে বলে প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তেমন কোনো সংস্কার এখনো পরিলক্ষিত হচ্ছে না। আগে থেকে বিদ্যমান সংকটগুলো রয়েই গেছে। বরং কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতির আরো অবনমন ঘটেছে। কিছুদিন আগে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের বিভিন্ন অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আবাসন সুবিধার দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এখনো উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে বিদ্যমান অস্থিরতার প্রতিফলন। এছাড়া এরই মধ্যে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) নির্দেশনা অমান্য করে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়ার অভিযোগও উঠেছে। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে একাধিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ নিয়েও নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অথচ শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল দল-মত নিরপেক্ষ, একাডেমিক ও প্রশাসনিক যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে প্রশাসনিক বা শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়ার যে নীতি তা আজও উপেক্ষিত। বিগত সরকারের সময় থেকে উপাচার্য নিয়োগে সার্চ কমিটি গঠনের দাবি থাকলেও এক্ষেত্রে গরিমসি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। কুয়েট ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা অনিয়ম ও পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণের অভিযোগে আন্দোলন করেন। আন্দোলনের জেরেই সরকার তাদের অপসারণের সিদ্ধান্ত নেয় এবং এসব ঘটনার পর সরকারের পক্ষ থেকে উপাচার্য নিয়োগে সুপারিশ প্রণয়নে সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ নিয়েও অনিয়ম-দুর্নীতি এখনো অব্যাহত রয়েছে, যা শুরুতেও উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ২০১৬ সালের এক প্রকাশনায় প্রভাষক নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয়করণ, বিজ্ঞপ্তির বাইরে মাত্রাতিরিক্ত নিয়োগ, পরীক্ষার ফল প্রভাবিত করাসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হয়। এমনকি আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ পদে নিয়োগে ৩-২০ লাখ টাকা পর্যন্ত আর্থিক লেনদেনের তথ্যও উঠে আসে ওই প্রকাশনায়। এছাড়া ২০২৪ সালে ইউজিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তত ৩০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নিয়োগের ক্ষেত্রে ইউজিসির নিয়ম অমান্য করছে। দুঃখজনকভাবে গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে এসব ক্ষেত্রে কোনো সংস্কার হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা যায়নি। শিক্ষা-গবেষণার অনুকূল পরিবেশও তৈরি করা সম্ভব হয়নি।

পাশাপাশি পাঠ্যক্রম ও শ্রমবাজারের অসংগতিও একই অবস্থায় রয়ে গেছে, যা কার্যকর শিক্ষার অন্যতম অন্তরায়। মানসম্মত উচ্চ শিক্ষা মানুষের জ্ঞানের বিকাশ ঘটানোর পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তি তার প্রায়োগিক জ্ঞানের মাধ্যমে দেশ ও অর্থনীতির সমৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক হন। সেজন্য আবার প্রয়োজন শিক্ষার সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদার সংগতি থাকা। তা না হলে কর্মক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অর্জিত জ্ঞানের প্রয়োগের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে এ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বেশ পিছিয়ে রয়েছে। কেবল পিছিয়ে রয়েছে তা নয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে তেমন সংযোগ না থাকাটা বর্তমানে বড় ধরনের সংকটে পরিণত হয়েছে। যে কারণে উচ্চ শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৩-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে উচ্চ শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ৯ লাখ ৬ হাজার, যা ২০২২ সালে ছিল ৭ লাখ ৯৯ হাজার। শিক্ষিত বেকারের হার ২০২২ সালের ১২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে হয়েছে ১৩ দশমিক ১১ শতাংশ।

এর পরও উচ্চশিক্ষায় নতুন পাঠ্যক্রম যোগ করা ও বিভাগ চালু করা হয়েছে। শ্রমবাজারের চাহিদা বিবেচনায় না নিয়ে ব্যক্তিস্বার্থে এগুলো চালু করা হয়েছে বলে অভিযোগও রয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব নতুন বিভাগ খোলা হয়েছে, সেগুলোর একটি বড় অংশই প্রায় অভিন্ন পাঠ্যসূচির ভিত্তিতে গঠিত। এতে যেমন শিক্ষার মান প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তেমনি শিক্ষার্থীদের চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতাও বাড়েনি। এ ধরনের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা দিনশেষে রাষ্ট্রের বোঝায় পরিণত হচ্ছে। তাছাড়া গবেষণার ক্ষেত্রেও অবস্থা উদ্বেগজনক। গবেষণায় বরাদ্দ অপ্রতুল ও অবকাঠামোগত ঘাটতিও ব্যাপক। ৫৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ২০২৩-২৪ অর্থবছরে গবেষণায় বরাদ্দ ছিল মাত্র ১৮৮ কোটি টাকা, যা এ খাতের বাস্তব প্রয়োজনের তুলনায় যৎসামান্য। আবার বেশির ভাগ সময় শিক্ষাঙ্গনের সার্বিক পরিচালন ব্যয়েরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয় না। অবকাঠামোগত দিক থেকেও দেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পিছিয়ে আছে। আবাসন, ল্যাব, ক্লাসরুম, গ্রন্থাগার— প্রতিটি ক্ষেত্রেই সংকট প্রকট।

এ বাস্তবতায় প্রয়োজন সুসংগঠিত ও অংশীজনভিত্তিক কার্যকর সংস্কার উদ্যোগ এবং এটি হতে হবে কাঠামোগত সংস্কার। পুরো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে, যেখানে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থ, দলীয় আনুগত্য, প্রশাসনিক কর্তৃত্ব এসবের বাইরে গিয়ে একাডেমিক জ্ঞান ও দক্ষতা অগ্রাধিকার পাবে, যা পরবর্তী সময়ে দেশের সার্বিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরাও অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী হবেন। এতে দেশে বেকারের সংখ্যাও কমে আসবে।