ফলে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের প্রভাব দেশে জ্বালানি পণ্যের পাশাপাশি সার সরবরাহ শৃঙ্খলেও পড়বে সেটা অনুমেয় ছিল। যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে দেশে সার সংকট তীব্র হওয়ার আশঙ্কাও ছিল, যেটি বর্তমানে বাস্তব রূপ নিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে বিকল্প উৎস থেকে সার আমদানি বাড়িয়ে চাহিদা পূরণ করা যেতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে চিন্তা করলে এ উদ্যোগ কোনো টেকসই সমাধান নয়। সাময়িক সময়ের জন্য সার আমদানি করে চাহিদা মেটানো গেলেও এটি ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকি বয়ে আনতে পারে। সে ঝুঁকি ভূরাজনৈতিক সংকট থেকেও উদ্ভূত হতে পারে কিংবা দেশের আমদানি সক্ষমতার দিক থেকেও তৈরি হতে পারে। এরই মধ্যে আমদানিনির্ভর জ্বালানি কাঠামো নিয়ে দেশের অর্থনীতি বহুমুখী চাপে রয়েছে। সেটি বিবেচনায় নিয়ে হলেও কৃষি উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ সারের স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধিতে সরকারের মনোযোগ দেয়া সমীচীন হবে।
দেশের একাধিক সার কারখানা মূলত গ্যাসের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। যার মধ্যে দেশের একমাত্র ডাইঅ্যামোনিয়াম ফসফেট বা ডিএপি সারের কারখানাও রয়েছে। অথচ গ্যাসের সংকট দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। এর ফলে নানা খাতেই সংকট তৈরি হয়েছে। সীমিত অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিয়ে সব সমস্যার আশু সমাধান সম্ভব নয় তা সবাই জানে। তবে সরকারের উচিত সেক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা। আর সে তালিকায় অবশ্যই কৃষি খাতকে রাখতে হবে। কেননা এটি কৃষি উৎপাদন তথা সরাসরি খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর অংশ হিসেবে দেশের একমাত্র ডিএপিসহ অন্যান্য সার কারখানা সচলের উদ্যোগ নিতে হবে।
সার কারখানা চালু রাখার জন্য আপাতত প্রধানতম প্রয়োজনীয় উপাদান হলো গ্যাস। বন্ধ সার কারখানাগুলোয় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। সুতরাং স্বল্পমেয়াদে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস আমদানির জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো প্রয়োজন। তবে সেই গ্যাস যেন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সার কারখানায় দেয়া হয় তা নিশ্চিত করতে হবে, যেন অন্তত সীমিত মাত্রায় হলেও কারখানাগুলো সার উৎপাদনে ফিরতে পারে। অন্যদিকে বিকল্প উৎস থেকে সার আমদানির জন্য তৎপরতাও চলমান রাখতে হবে। কেননা সারের মজুদ বৃদ্ধিতে স্বল্পমেয়াদি সমাধান হিসেবে এটি গুরুত্বপূর্ণ।
সম্প্রতি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রতি মাসে চারটি করে লট ডিএপি আমদানি প্রয়োজন বলে জানিয়েছে সার আমদানি ও বিতরণের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। সংস্থাটির আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া না হলে আগামী শীতকালীন ও বোরো মৌসুমে দেশে ডিএপি সারের বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সংস্থাটি আসন্ন সংকট তীব্র হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে কৃষি মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে বলে জানা গেছে। বিএডিসির আশঙ্কা আমলে নিয়ে মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে সেই প্রত্যাশা রয়েছে। এক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে সারসহ সার উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানির উৎস বহুমুখী করা, যাতে ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট আর তৈরি না হয়। পাশাপাশি ক্রমেই সারের স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কার্যক্রম জোরদার করবে।
বন্ধ সার কারখানাগুলো পুরোদমে চালু করা গেলেও দেশের কৃষি খাতের ক্রমবর্ধমান চাহিদার অনুপাতে সারের জোগান দেয়া কঠিন হবে। কেননা কারখানাগুলোর সক্ষমতা সীমিত। সুতরাং সহসাই সার আমদানি কমিয়ে আনার সুযোগ নেই। তবে স্থানীয় পরিসরে সীমিত সার উৎপাদনও সংকটকালে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যখন সৌদি আরব ও চীন থেকে সরবরাহ কার্যত বন্ধ, তখন দেশীয় উৎপাদনের প্রতিটি টন সরাসরি আমদানিনির্ভরতা ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমবে। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দেশীয় উৎপাদন সরকারের হাতে এমন একটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য উৎস রাখে, যা আন্তর্জাতিক জাহাজীকরণ, বন্দরজট বা ভূরাজনৈতিক জটিলতার মধ্যে পড়বে না। অক্টোবর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত পিক মৌসুমে যখন চাহিদা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যায়, তখন প্রতিটি বিকল্প উৎসই সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
সম্প্রতি কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী এক বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন যে বর্তমানে সারের কোনো ঘাটতি নেই এবং একটি মহল কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করছে। এ আশ্বাস স্বস্তিদায়ক হলেও তা বিদ্যমান আশঙ্কাগুলোকে উপেক্ষা করার মতো যথেষ্ট নয়। বর্তমানে দেশের প্রায় সব সারের মজুদ ন্যূনতম নিরাপদসীমার নিচে নেমে এসেছে। ইউরিয়া, ডিএপি ও টিএসপির মজুদ নির্ধারিত নিরাপদ স্তরের নিচে থাকায় সামনে কৃষি মৌসুমে সংকট আরো প্রকট হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তাই ডিএপির পাশাপাশি অন্য সারের মজুদ বাড়ানো নিয়েও কাজ করা প্রয়োজন। ফলে আশ্বাসের চেয়ে এখন প্রয়োজন দৃশ্যমান পদক্ষেপ—বিকল্প উৎস থেকে জরুরি আমদানি এবং নিজস্ব কারখানাকে দ্রুত উৎপাদনে ফেরানো। সর্বোপরি কোনো মহল যেন সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে সেটি নিশ্চিত করা।










