এ বছর এমন এক সময়ে এটি পালন হচ্ছে যখন দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ১৫ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল, এ ২০ দিনে ৯৮ শিশু সন্দেহজনক হাম রোগে মারা গেছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে উল্লেখ পাওয়া গেছে। সংস্থাটির তথ্যে আরো বলা হচ্ছে, হামে নিশ্চিত মৃত্যুর সংখ্যা ১৬। এছাড়া একই সময়ে ৮২৬ জন নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে। আর সন্দেহজনক হামে আক্রান্তের সংখ্যা ৪ হাজার ৬২৮। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দেয়া তথ্য অনুযায়ী, এর আগে ২০২০ সালে দেশে হামে আক্রান্ত হয়েছিল ২ হাজার ৪১০ জন। পরের বছরগুলোয় আক্রান্তের সংখ্যা ৪০০-এর কম ছিল। অর্থাৎ গত পাঁচ বছরে এ বছরই হামে আক্রান্তের সংখ্যা সর্বোচ্চ। এ প্রেক্ষাপট বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে আলোচনাকে আরো প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। বিশেষ করে, সরকার ও নীতিনির্ধারকদের পুনর্মূল্যায়ন করা উচিত জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় দেশ কতটা এগিয়েছে।
হামের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে উপরোক্ত প্রশ্নটির সহজ উত্তর হলো স্বাস্থ্য খাতে খুব বেশি অগ্রসর হওয়া যায়নি। স্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে প্রধান একটি বিষয় হলো ‘প্রতিরোধ’। প্রচলিত ভাষায় বলে, রোগ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। এ কথার তাৎপর্য সবচেয়ে বোঝা যায় যখন হামের মতো কোনো ছোঁয়াচে এবং প্রতিরোধযোগ্য রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। কেননা হাম এমন একটি রোগ যা টিকা দিয়ে প্রতিরোধ করা সম্ভব। যথা সময়ে হামের টিকা নিলে সহজেই রোগটি আক্রান্ত থেকে স্বাস্থ্য সুরক্ষা দেয়া যায়। এক্ষেত্রে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের দুবার ‘এমআর’ (মিজলস রুবেলা) টিকা দেয়া হয়। একবার নয় মাস বয়সে আর দ্বিতীয়টি ১৫ মাস বয়সে। এর পরও কেন হাম পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলো তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
বর্তমান সরকার ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে, দীর্ঘদিন ধরে শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়েছে। ডব্লিউএইচওর তথ্য বলছে, গত দুই বছরে টিকা না দেয়ায় শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে হামের সংক্রমণের হার বাড়ছে। আর নিয়মিত টিকা না দেয়াই হামে আক্রান্ত হওয়ার প্রাথমিক কারণ। সংস্থাটির তথ্য বলছে, দেশের ৫৬ জেলায় হাম ছড়িয়েছে।
অন্যদিকে হামে আক্রান্তদের শনাক্তেও ধীরগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে এবং চিকিৎসাসেবা দেয়ার ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত ঘাটতি রয়ে গেছে। হাসপাতালগুলোয় হামের জন্য আলাদাভাবে চিকিৎসার ব্যবস্থা ও অক্সিজেনের নিশ্চয়তা না থাকায় পরিস্থিতি আরো নাজুক হয়ে উঠছে। অর্থাৎ দেশে কেবল রোগ প্রতিরোধ কর্মসূচিতে ঘাটতি রয়েছে তা নয়। একই সঙ্গে চিকিৎসাসেবা দেয়ার ক্ষেত্রে অদক্ষ ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত ঘাটতি স্পষ্ট।
এ পরিস্থিতি নতুন কিছু নয়। যখনই কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে তখনই হাসপাতালে জায়গা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদির অভাব এবং অদক্ষ ব্যবস্থাপনার নজির মেলে। এক্ষেত্রে ডেঙ্গু রোগের পরিস্থিতির কথাই বলা যায়। বছর বছর একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। প্রায় প্রতি বছরই ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। কারণ এক্ষেত্রেও কার্যকর প্রতিরোধ কার্যক্রম নেয়া হয় না। অর্থাৎ ঘুরেফিরে একটা চক্রে আটকে থাকছে স্বাস্থ্য খাত। এখানে রোগ প্রতিরোধের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। অন্যদিকে স্বাস্থ্য খাতের রোগ প্রতিকারের সক্ষমতাও তুলনামূলক কম। স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ ও পরিকল্পনার বড় অংশ চিকিৎসাসেবাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠলেও বাস্তবতা দেখাচ্ছে, প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল থাকায় সেই চিকিৎসা কাঠামোও কার্যকর ভূমিকা রাখছে না। এ পরিস্থিতিই মূলত জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় রোগ প্রতিরোধের বিষয়টিকে আরো জোরালো করে তুলেছে।
রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ভবিষ্যতে হামসহ টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধযোগ্য সব রোগের টিকাদান কর্মসূচি যেন কখনই ব্যাহত না হয় সেটি নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে এ কর্মসূচির তদারকিও। কারণ বর্তমানে হামের টিকা দেয়া অনেক শিশুও এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বলে জানা গেছে। এক্ষেত্রে টিকার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক না। সুতরাং টিকাদান ও টিকার মান দুটোই নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যেকোনো টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুদের চিহ্নিত করে দ্রুত তাদের অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। এক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্ষমতা বাড়ানো এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে টিকা নিয়ে বিদ্যমান যেকোনো ভ্রান্ত ধারণা দূর করতে গণসচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি রোগ নির্ণয় ব্যবস্থা আধুনিক ও দ্রুততর করতে হবে।
প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা গেলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ অনেক সহজ হয়। হামের বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে শনাক্তকরণে বিলম্ব সংক্রমণকে আরো বিস্তৃত করছে। এক্ষেত্রে আবার প্রয়োজন চিকিৎসা অবকাঠামোর ঘাটতি দ্রুত পূরণ করা। সংক্রামক রোগ মোকাবেলায় বিশেষায়িত ইউনিট, পর্যাপ্ত শয্যা, প্রশিক্ষিত জনবল এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিশ্চিত করা অপরিহার্য। একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে আরো কার্যকর করে তুলতে হবে, যাতে প্রাথমিক পর্যায়েই রোগীরা যথাযথ সেবা পায়।
তবে কেবল টিকা দেয়া বা অবকাঠামোগত ঘাটতি পূরণের মাধ্যমে সব রোগ প্রতিরোধ সম্ভব না। তাই অন্যান্য কাজেও মনোযোগ দিতে হবে। স্বাস্থ্যকর পরিবেশ, গুণগত মানসম্পন্ন খাবার গ্রহণ ইত্যাদিও
রোগ প্রতিরোধে জরুরি। কিন্তু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বায়ুর মান অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর। মাটির জৈবগুণ ক্রমেই কমছে। সবুজ পরিসর ও জলাধার কমছে। ফলে ভূপৃষ্ঠের তাপ বাড়ছে। অন্যদিকে ভেজাল খাদ্যের পরিসর বাড়ছে। এসব যা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে, বিশেষত অসংক্রামক রোগে আক্রান্তের হার বাড়ছে। বিপরীতে বাড়ছে না এসব রোগ প্রতিকারে স্থানীয় সক্ষমতা। সুতরাং রোগ প্রতিরোধে দেশের সামগ্রিকভাবে পরিবেশে উন্নত করা অপরিহার্য। এবার বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের অঙ্গীকার হোক এটি।










