ফ্লাইওভার নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ একটি আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যানজট নিরসন ও যাতায়াতকে সহজ, নিরাপদ ও সময়সাশ্রয়ী করতে ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়। ঢাকা মহানগরীতে বর্তমানে আটটি ফ্লাইওভার ও ওভারপাসের পাশাপাশি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ইউলুপসহ বেশ কয়েকটি অবকাঠামো রয়েছে। রাজধানীর বাইরে টঙ্গী, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শহরে ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়েছে। ফার্মগেটে মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড দুর্ঘটনার পর ফ্লাইওভারের রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এসেছে। দেশের ফ্লাইওভারগুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। ফলে পানি নিষ্কাশনের পাইপ কোথাও ময়লা-আবর্জনা জমে বন্ধ হয়েছে, কোথাও ফেটেছে, আবার কোথাও চুরি হয়ে গেছে। তাই সামান্য বৃষ্টিতে ফ্লাইওভারের বিভিন্ন অংশে পানি জমছে। জমে থাকা পানির সহায়তায় বেড়ে উঠছে বট-অশ্বত্থসহ বিভিন্ন গাছ। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নির্মিত এসব অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি জননিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলেছে। তাই দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে নির্দিষ্ট সময় পরপর এসব অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ করা উচিত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

দেশে ফ্লাইওভারসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। নির্মাণের সময় এসব অবকাঠামোয় থাকে নানাবিধ ত্রুটি। নির্মাণের পর এসব অবকাঠামো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। অবকাঠামোয় কোনো দুর্ঘটনা না ঘটলে বা গণমাধ্যমে সংবাদ না হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব বিষয়ে সতর্ক হয় না। অথচ ফ্লাইওভার নির্মাণের পর নির্দিষ্ট সময় পরপর এসব অবকাঠামোর অবস্থা মূল্যায়ন করা, জয়েন্ট ও বিয়ারিং প্যাডের সক্ষমতা যাচাই করা, লাইটিং সিস্টেম যাচাই, ড্রেনেজ পরিষ্কার করা—এসব নিয়মিত কাজের মধ্যেই পড়া উচিত। তাছাড়া তাপমাত্রার পরিবর্তন বা ভারী যানবাহনের চাপের কারণে ফ্লাইওভারের জয়েন্টে সম্প্রসারণ ও সংকোচন ঘটে। এতে সূক্ষ্ম ফাটল তৈরি হতে পারে, যা সময়মতো মেরামত না করলে বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাই এসব অবকাঠামো নির্মাণের পর রক্ষণাবেক্ষণে কর্তৃপক্ষের নজর দেয়া উচিত। উন্নত দেশগুলোয় এসব অবকাঠামো নির্মাণের পর নির্দিষ্ট সময় পরপর রক্ষণাবেক্ষণের নিয়মটি কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়।

রাজধানীসহ দেশের ফ্লাইওভারগুলোয় অনিয়ম, নিরাপত্তা ও বিশৃঙ্খলার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ অবকাঠামোগুলোর যে যথাযথ যত্ন ও সুব্যবস্থাপনা করা প্রয়োজন, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উপেক্ষা করে যাচ্ছে। বিষয়টি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, তৈরি করা হয়েছে, এখন যেভাবে খুশি সেভাবে চলবে। এতে নানা ধরনের অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। দুর্ঘটনা যেমন ঘটছে, তেমনি এগুলোর ওপর যানজট এমনকি পানিবদ্ধতারও সৃষ্টি হচ্ছে। কোনো কোনো ফ্লাইওভারে স্ট্রিট লাইটও থাকে না। রাতে অন্ধকারে ঢাকা পড়ে। এগুলোর নিচে যেসব খালি জায়গা রয়েছে, সেগুলোও অবৈধ দখলে চলে গেছে। গাড়ি পার্কিং, দোকানপাট থেকে শুরু করে ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। রাজধানীর হানিফ ফ্লাইওভার, মগবাজার, খিলগাঁও, কুড়িল, মহাখালী, বিজয় সরণি ফ্লাইওভারের প্রায় প্রত্যেকটির নিচের অংশ অবৈধ দখলে রয়েছে। যেসব ফ্লাইওভার নতুন করে চালু হচ্ছে, সেগুলোর নিচের খালি জায়গা এখন পরিষ্কার থাকলেও তা কতদিন এভাবে থাকবে বলা মুশকিল। যানজট এড়াতে যেসব ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়েছে, বিশেষজ্ঞদের মতে, সেগুলোয় নির্বিঘ্নে ওঠা-নামার ক্ষেত্রে যথাযথ পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। এতে ফ্লাইওভারে ওঠা-নামার মুখে প্রচণ্ড যানজটের সৃষ্টি হয়। এ যানজট ফ্লাইওভারের ওপরে উঠে যায়। নিচেও যানজট থাকে, ওপরেও যানজট থাকে। এটা হয়েছে সুচিন্তিত পরিকল্পনা না থাকায়। ফ্লাইওভারের পুরোপুরি সুফল যানবাহনগুলো পাচ্ছে না। ফ্লাইওভারগুলোয় যাতায়াত মসৃণ করার তাগিদ বহুভাবে দেয়া হয়েছে। তাতে কোনো লাভ হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফ্লাইওভারে যাতায়াত নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল করতে এগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্তদের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি সমন্বিত ব্যবস্থাপনা জরুরি।

ঢাকার মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার চালু হয় ২০১৭ সালে। নির্মাণের মাত্র আট বছরের মাথায় বিভিন্ন জায়গায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে ফ্লাইওভারটির ড্রেনেজ ব্যবস্থা। শুধু মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার নয়, ড্রেনেজ সমস্যা রয়েছে রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামের একাধিক ফ্লাইওভারে। খিলগাঁও এবং গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের বিভিন্ন জয়েন্ট সরে গিয়ে অস্বাভাবিক ফাঁকা হয়ে আছে। অনেক ফ্লাইওভারে রেলিং, সড়ক বিভাজক ভেঙে পড়েছে। কোথাও পিচ কিংবা কংক্রিটও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে থাকছে দিনের পর দিন। নাট-বল্টুসহ বিভিন্ন কাঠামো চুরি হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি লাইট নষ্ট থাকার কারণে রাতে ফ্লাইওভারগুলোয় ছিনতাইসহ নানা অপরাধমূলক ঘটনাও ঘটছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর দায়িত্ব অবহেলার কারণেই এসব ঘটনা ঘটেছে।

ফার্মগেটে বিয়ারিং প্যাড দুর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মেট্রোরেল ও দেশের সব ফ্লাইওভারের বিয়ারিং প্যাডের গুণগত মান নির্ণয়ে কমিটি গঠনের নির্দেশ চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়েছে। গত সোমবার দায়ের করা এ রিটে মেট্রোরেল ও সব ফ্লাইওভারে ব্যবহার করা বিয়ারিং প্যাডের গুণগত মান ঠিক আছে কিনা, তা যাচাই করতে একটি কমিটিও গঠন করতে বলা হয়েছে। এদিকে মেট্রোরেল, ফ্লাইওভারসহ এ-জাতীয় সব অবকাঠামো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখার উদ্যোগ নেবে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা উপদেষ্টা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রতিবার দুর্ঘটনা ঘটার পরই কেন উদ্যোগ নিতে হয়? কেন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা আগে থেকে গড়ে তোলা হয় না? ফ্লাইওভার বা মেট্রোরেল কেবল নির্মাণ করলেই দায়িত্ব শেষ নয়; বরং নির্মাণের পর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও সক্ষমতা যাচাই করা উচিত। কিন্তু আমাদের দেশে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটলে কোনো সংস্থা সক্রিয় হয় না। আবার দুর্ঘটনার আলোচনা থেমে গেলেই প্রশাসনের গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগও থেমে যায়। এমন ঘটনা কেবল অবহেলা নয়, বরং প্রশাসনিক ব্যর্থতারও প্রতিফলন। নিয়মিত পরিদর্শন, রক্ষণাবেক্ষণ বাজেট ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা গেলে এমন দুর্ঘটনা আগেই প্রতিরোধ করা সম্ভব হতো।

ফ্লাইওভার বা মেট্রোরেল নির্মাণের পর এর নিরাপত্তা, টেকসই ব্যবহার ও কার্যকারিতা বজায় রাখতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ অপরিহার্য। উন্নত বিশ্বে অবকাঠামো ব্যবস্থাপনায় ‘রক্ষণাবেক্ষণ’ একটি বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া, যেখানে ঝুঁকি চিহ্নিত ও সমাধান করা হয় দুর্ঘটনার আগেই। বাংলাদেশেও একই মানদণ্ডে পৌঁছাতে হলে রক্ষণাবেক্ষণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, দায়সারা মনোভাব ত্যাগ করতে হবে এবং জবাবদিহির কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সময়মতো রক্ষণাবেক্ষণ করলে বড় দুর্ঘটনা, প্রাণহানি বা বিপুল আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। তাই উন্নয়ন টেকসই করতে হলে নির্মাণের পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। দুর্ঘটনার পর নয়, দুর্ঘটনা ঘটার আগেই ব্যবস্থা নিতে হবে।