অতীতের যেকোনো তিক্ত অভিজ্ঞতা ভুলে সবাই পরিবার-পরিজন নিয়ে ঈদ উদযাপনে শরিক হন। মানুষের সঙ্গে কুশল বিনিময়, নানা আয়োজন-আপ্যায়ন, জাকাত-ফিতরা ও সাধারণ দানের মাধ্যমে সমাজের দরিদ্র-অসহায় মানুষের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি এ দিনকে তাৎপর্যময় করে তোলে। সম্প্রীতির বন্ধন সুদৃঢ় হয়।
ঈদের ছুটিতে দেশের নানা প্রান্তে পরিবার ছাড়া বসবাসকারী কর্মজীবী মানুষ বাড়ি যান। এমন মানুষের সংখ্যা তুলনামূলক অধিক। ফলে স্বাভাবিকভাবে এ সময় যাত্রাপথে বাড়তি মানুষ ও যানবাহনের চাপ থাকে। স্বাভাবিকের তুলনায় যাত্রী ও যানবাহনের চাপ থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়ে যায়। দুঃখজনক হলেও সত্য প্রতি বছর ঈদযাত্রায় হতাহতের সংখ্যা বছরের অন্য সময়ের তুলনায় বেড়ে যায়। আজও রাষ্ট্র ঈদযাত্রাকে পুরোপুরি নিরাপদ করতে পারেনি। এমনকি স্বস্তিদায়কও নয়। বিষয়টি ট্রেনযাত্রা পর্যবেক্ষণে ভালোভাবে অনুধাবন করা যায়। ট্রেনের ভেতরে আসনের অতিরিক্ত যাত্রী থাকেন। তেমনি ট্রেনের ছাদেও মানুষের ঢল দেখা যায়। তার ওপর যখন কোনো ট্রেনের একাধিক বগি লাইনচ্যুত হয়, তখন যাত্রীরা আরো বিপাকে পড়েন। অনেকে হতাহত হন। যোগাযোগ ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ে। ওই রুটের অন্য ট্রেনের সময়সূচি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। যেমনটি গতকালই ঘটেছে। গতকাল দুপুরে বগুড়ার সান্তাহারে ঢাকা থেকে চিলাহাটিগামী ‘নীলসাগর এক্সপ্রেস’ ট্রেনের নয়টি বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। এতে অনেকেই আহত হয়েছেন এবং ট্রেনের ভেতর আটকা পড়েন। মুহূর্তেই যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকার সঙ্গে উত্তরবঙ্গের রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়ে। ঈদযাত্রায় এ ধরনের দুর্ঘটনা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। দুর্ঘটনার কবলে পড়ে উৎসবের রঙ মুহূর্তেই ফিকে হয়ে পড়ে।
কেবল ট্রেনের নয়, অন্যান্য পথেও দুর্ঘটনার চিত্র আরো উদ্বেগজনক। গত বছর ঈদুল ফিতরের ১৫ দিনে দেশের সড়ক, রেল ও নৌপথে মোট ৩৪০টি দুর্ঘটনায় ৩৫২ জন নিহত হয়েছেন বলে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যে দেখা যায়। এর মধ্যে সড়ক-মহাসড়কে সর্বাধিক ৩১৫ সড়ক দুর্ঘটনায় ৩২২ জন নিহত ও ৮২৬ জন আহত হন। অর্থাৎ ঈদযাত্রায় সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনাপ্রবণ হয়ে ওঠে সড়ক। এবারের ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সড়ক যাত্রায়ও এ পর্যন্ত বেশকিছু দুর্ঘটনার খবর পাওয়া গেছে।
একইভাবে নদীপথেও দুর্ঘটনা ও ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হয় যাত্রীদের। যেমন এবারো চাঁদপুরে লঞ্চঘাটের অভাব রয়ে গেছে। এতে যাত্রীরা বিপাকে পড়ছেন। এসব ঘটনা পরিবহন ব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিফলন। দেশের যাতায়াত ব্যবস্থা কতটা অনিরাপদ তার প্রতিচ্ছবি এগুলো। রাষ্ট্রীয় সেবার পরিকল্পনায় থাকা ফাঁকফোকর জনসম্মুখে নিয়ে আসে। আর এর মাশুল গুনতে হয় আনন্দ উদযাপন করতে চাওয়া এবং ঘরের টানে ছুটে যাওয়া জনগণকে।
তবে ঈদযাত্রার ভোগান্তি কেবল দুর্ঘটনায় সীমাবদ্ধ নয়। এটি শুরু হয় ঈদে যানবাহনের টিকিট কাটা থেকেই। মূলত যান ও যাত্রীর সংখ্যার অপ্রতুলতার কারণে এটি হয়। অর্থাৎ দেশের পরিবহন খাতের সক্ষমতা একদিকে কম, অন্যদিকে ব্যবস্থাপনাও দুর্বল। হতাশাজনক হলো, প্রতি বছরই এসব সমস্যার ওপর বিভিন্ন মহল আলোকপাত করে, কিন্তু দৃশ্যমান সমাধান হয় না।
এর বাইরে আরো কিছু সুপরিচিত দৃশ্য রয়েছে ঈদ ঘিরে। যেমন শ্রমিক অসন্তোষ। ঈদের আগে যখন শ্রমজীবী মানুষের হাতে বেতন ও ঈদ বোনাস পৌঁছানোর কথা, তখনো অনেক কারখানায় মজুরি পরিশোধ করা হয়নি। বোনাসের প্রসঙ্গ সেখানে অবান্তর। যাদের শ্রমে শিল্প সচল থাকে তাদেরই উৎসবের আনন্দ অনিশ্চয়তায় আটকে থাকে। এ পরিস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক নয়, নৈতিক ব্যর্থতারও প্রতিফলন। শ্রমিকের ন্যায্য প্রাপ্য নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও মালিক পক্ষ উভয়ের দায়িত্ব। কিন্তু প্রতি বছর এর ব্যত্যয় ঘটতে দেখা যায়। এবারো এর ব্যতিক্রম হয়নি। অথচ ঈদুল ফিতরের মূল শিক্ষা হলো সংযম, সহমর্মিতা ও ন্যায়বোধ। কিন্তু বাস্তব জীবনে যদি শ্রমিক বঞ্চিত হন, যাত্রী দুর্ভোগে পড়েন, আর সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে তবে সেই শিক্ষা কার্যকর হয় না। বরং উৎসব বৈষম্য ও অদক্ষতার বহিঃপ্রকাশ হয়ে ওঠে।
এ প্রেক্ষাপটে ঈদকে কেবল অনাবিল আনন্দের করে তুলতে হলে প্রয়োজন একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি। সর্বাগ্রে পরিবহন ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও সক্ষমতা বাড়াতে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা সময়মতো পরিশোধ নিশ্চিত করতে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। তৃতীয়ত, অবকাঠামো উন্নয়নে বাস্তব প্রয়োজন ও জনগণের ভোগান্তি নিরসনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সামগ্রিকভাবে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে নাগরিকরা আস্থা ও স্বস্তিতে ঈদ উদযাপন করতে পারবে। সেই সঙ্গে এ পরিবেশ হতে হবে টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি। এজন্য রাষ্ট্রের সক্ষমতা ও দায়বদ্ধতার প্রমাণ দিতে হবে। অন্যথায় ঈদ কেবল ধর্মীয় রীতি মেনে উদযাপিত হবে, আনন্দের বাহক হবে না।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাস্তবতায় সম্প্রতি নতুন সরকার গঠন হয়েছে। বর্তমান সরকারের এগুলো বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন, যাতে দীর্ঘমেয়াদে ঈদ ভোগান্তির পুরনো চিত্র জনগণকে আর দেখতে না হয়। উৎসবের চাওয়া হলো শ্রমিকদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ দূর হোক, মালিক-শ্রমিকের মধ্যে সৌহার্দের সম্পর্ক গড়ে উঠুক। যাত্রীরা নিরাপদ ও স্বস্তি নিয়ে বাড়ি পৌঁছুক। ঈদের আনন্দ অটুট থাকুক। সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা, ঈদ মোবারক।










