সম্প্রতি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ভারতে তাদের শাখার সংখ্যা ১০০ থেকে কমিয়ে ৮০-তে এনেছে। অনেকের কাছে ব্যবসা সংকোচনের লক্ষণ মনে হলেও বাস্তবে এটি একটি সুপরিকল্পিত ও কৌশলগত ব্যাংক রূপান্তর। ব্যাংকটি এখন ডিজিটাল ব্যাংকিং, ওয়েলথ ম্যানেজমেন্ট এবং উচ্চ সম্পদশালী গ্রাহকদের জন্য পরামর্শভিত্তিক আর্থিক সেবার ওপর অধিক গুরুত্ব দিচ্ছে।
বর্তমান ও ভবিষ্যতে এমন এক নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে, যেখানে একজন ব্যক্তির সম্পদ বা অর্থ বিভিন্ন ‘পকেট’ থেকে আসে বা আসবে। যেমন দাদা-দাদি, নানা-নানি, বাবা-মায়ের উত্তরাধিকার এবং নিজের উপার্জন মিলিয়ে অনেক অর্থ। অর্থ প্রাপ্তির এ প্রবণতাকে বলা হয় সিক্স পকেট সিনড্রোম। এমন গ্রাহকের সংখ্যা বিশ্বজুড়ে দ্রুত বাড়ছে। ফলে ব্যাংকগুলোকেও শুধু আমানত ও ঋণসেবা নয়, বরং গ্রাহকের সমগ্র সম্পদকে পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা ও সর্বোচ্চ মূল্যায়নের জন্য ব্যক্তিকেন্দ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা বা ওয়েলথ ম্যানেজমেন্ট সেবা চালু করতে হবে।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের এ সিদ্ধান্তকে ব্যবসা সংকোচন হিসেবে না দেখে, বরং মূলধন, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদকে অধিক লাভজনক ও ভবিষ্যৎমুখী ব্যাংক খাতে পুনর্বিন্যাস হিসেবে দেখা উচিত। এটি কেবল একটি পুনর্গঠন নয়; বরং আগামী এক দশকের ব্যাংকিং কাঠামোর একটি বাস্তব পথনকশা। ব্যাংকিং এখন লেনদেনভিত্তিক ব্যবসা থেকে সম্পর্কভিত্তিক ব্যবসায়, সুদনির্ভর আয় থেকে ফি-ভিত্তিক আয়ে এবং শাখাকেন্দ্রিক অবকাঠামো থেকে ডিজিটাল আর্থিক ইকোসিস্টেমের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের পথচলা: স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের ইতিহাস ঊনবিংশ শতাব্দীতে প্রোথিত। ১৮৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত দ্য চার্টার্ড ব্যাংক অব ইন্ডিয়া, অস্ট্রেলিয়া অ্যান্ড চায়না এবং ১৮৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক অব সাউথ আফ্রিকা একীভূত হয়ে বর্তমান স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড গঠিত হয়। ইউরোপের অধিকাংশ ব্যাংকের বিপরীতে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের উদীয়মান অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে তাদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করেছে। বর্তমানে ব্যাংকটির আয়ের একটি বড় অংশ এসব উদীয়মান বাজার থেকেই আসে। ১৬৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের কাছে ভারত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বাজার।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের কাছে ভারত বর্তমানে আরো গুরুত্বপূর্ণ কেন?
ভারত বর্তমানে শুধু একটি খুচরা ব্যাংকিংয়ের বাজার নয়; এটি বিশ্বের দ্রুততম সম্পদ সৃষ্টিকারী অর্থনীতিগুলোর মধ্যে একটি। ভারতে উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তি, অতি উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তি, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা, স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠাতা, পারিবারিক শিল্পগোষ্ঠী, বৈশ্বিক পেশাজীবী, ভারতীয় প্রবাসী (এনআরআই), ব্যয়যোগ্য আয় দ্রুত বাড়ছে। এছাড়া পুঁজিবাজারের সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগ সংস্কৃতির বিকাশ ঘটছে। এসব কারণে উন্নত আর্থিক পরামর্শের চাহিদা ঋণসেবার তুলনায় অনেক দ্রুত বাড়ছে।
কেন শাখা কমাল স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড?
প্রথমত, ব্যাংকিং কার্যক্রমে ডিজিটাল সেবা রূপান্তরের কারণে গ্রাহকের আচরণ বদলে গেছে। বর্তমানে অধিকাংশ ব্যাংকিং কার্যক্রম গ্রাহক তার মোবাইল ফোনেই সম্পন্ন করে। যেমন অর্থ প্রদান, বিনিয়োগ, ঋণের আবেদন, কার্ড ব্যবস্থাপনা, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন, বিনিয়োগ পোর্টফোলিও পর্যবেক্ষণ, ফলে শাখার ভূমিকা এখন মূলত পরামর্শ প্রদানেই সীমাবদ্ধ।
একটি শাখা পরিচালনার জন্য অনেক কিছু প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ভবন ভাড়া বা রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, বিদ্যুৎ ও ইউটিলিটি, নিরাপত্তা, নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনা ও জনবল। অন্যদিকে ডিজিটাল ব্যাংকিং প্রতিটি লেনদেন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমায় এবং গ্রাহকের সুবিধা বাড়ায়।
দ্বিতীয়ত, মূলধনের সর্বোত্তম ব্যবহার। নতুন শাখা স্থাপন ও বিদ্যমান শাখা ব্যবস্থাপনা ব্যয় না করে সেই অর্থ অন্য জায়গায় বিনিয়োগ করা যায়, যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড অবকাঠামো, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল অনবোর্ডিং, ওয়েলথ প্লাটফর্ম এবং উন্নত ডেটা অ্যানালিটিকস। এগুলোর মাধ্যমে ব্যাংকগুলো দীর্ঘমেয়াদে অধিক মুনাফা অর্জন করতে পারবে।
তৃতীয়ত, গ্রাহকের সংখ্যা মূখ্য নয়, লাভজনকতাই এখন গুরুত্বপূর্ণ। একজন সম্পদশালী গ্রাহক অনেক সময় শত শত সাধারণ লেনদেনকারী গ্রাহকের চেয়েও বেশি আয় এনে দেন। অতীতে এমনকি বর্তমান সময়েও ব্যাংকের প্রধান আয় নেট ইন্টারেস্ট মার্জিন (এনআইএম)। আজ নিম্নোক্ত কারণে এই মার্জিন বেশ চাপের মধ্যে রয়েছে: ফিনটেক প্রতিযোগিতা, ডিজিটাল পেমেন্ট, নিয়ন্ত্রক সংস্কার, মূল্য স্বচ্ছতা, কম লেনদেন ব্যয় এবং খেলাপি ঋণের আধিক্য। ফলে ব্যাংকগুলো এখন কমিশন ও ফি-ভিত্তিক আয়ের দিকে ঝুঁকছে।
ব্যাংকের আয়ের অন্যতম উৎস হতে পারে ওয়েলথ ম্যানেজমেন্ট বা সম্পদ ব্যবস্থাপনা। ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের অন্তর্ভুক্ত পরিষেবার মধ্যে রয়েছে বিনিয়োগ পরামর্শ, পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনা, মিউচুয়াল ফান্ড, বন্ড, অবসর পরিকল্পনা, করসাশ্রয়ী বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, ফ্যামিলি-ভিত্তিক সেবা ইত্যাদি। এগুলো তুলনামূলকভাবে কম মূলধননির্ভর হলেও দীর্ঘমেয়াদে নিয়মিত কমিশন ও ফি আয় সৃষ্টি করে। ব্যাংকিং ধীরে ধীরে সম্পর্ক ও পরামর্শভিত্তিক ব্যবসায় রূপান্তর হচ্ছে।
প্রথাগত ব্যাংকিং মডেলটি ছিল আমানত সংগ্রহ, ঋণ বিতরণ ও সুদ আয়ভিত্তিক। আগামী দিনের বা ভবিষ্যৎ ব্যাংকিং মডেল হবে আর্থিক পরামর্শ, বিনিয়োগ সমাধান, সম্পদ সংরক্ষণ, এস্টেট পরিকল্পনা ও প্রজন্মান্তরে সম্পদ হস্তান্তর বা নিরাপদ বিনিয়োগের মতো সেবা। ব্যাংকগুলো আর শুধু অর্থের মধ্যস্থতাকারী নয়; তারা ধীরে ধীরে বিশ্বস্ত আর্থিক উপদেষ্টায় পরিণত হচ্ছে। প্রচলিত ব্যবসায়িক মডেল, যেমন শাখা সম্প্রসারণ, আমানত সংগ্রহ, খুচরা ঋণ, ক্রেডিট কার্ড, ট্রানজেকশন ব্যাংকিং কার্যক্রম থেকে ভবিষ্যতের ব্যাংকিং মডেলে রূপান্তর হচ্ছে। যেমন ডিজিটাল-ফার্স্ট ব্যাংকিং, এআই-নির্ভর আর্থিক সেবা, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, অন্তর্নিহিত আর্থিক সেবা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই) ইকোসিস্টেমভিত্তিক অর্থায়ন, সীমান্ত-পার ব্যাংকিং, পরামর্শনির্ভর ও সম্পর্কভিত্তিক ব্যাংকিং এবং প্লাটফর্মভিত্তিক ব্যাংকিং।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যাংক খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে। এরই মধ্যে তার প্রতিফলন আমরা দেখতে শুরু করেছি। বর্তমান ও ভবিষ্যতের ব্যাংকগুলো এআই ব্যবহার করে নিম্নোক্ত সেবা দিচ্ছে বা দেবে: ব্যক্তিকেন্দ্রিক আর্থিক পরামর্শ, ঝুঁকি পূর্বাভাস, ঋণ মূল্যায়ন, জালিয়াতি শনাক্তকরণ, গ্রাহক আচরণ বিশ্লেষণ, স্বয়ংক্রিয় কমপ্লায়েন্স, গ্রাহক বিভাজন এবং সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা। ভয় নেই, এআই ব্যাংকারদের প্রতিস্থাপন করবে না; বরং তাদেরকে অধিক কার্যকর আর্থিক উপদেষ্টায় রূপান্তর করবে।
বাংলাদেশের জন্য এআইয়ের প্রভাব কী হতে পারে তা নিয়ে নীতিনির্ধারকরা অবশ্যই ভাবছেন। বাংলাদেশের ব্যাংক খাত একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। কারণ এতদিন প্রতিযোগিতা ছিল: বেশি শাখা খোলা বা নেটওয়ার্ক বৃদ্ধি, বেশি বেশি আমানত সংগ্রহ এবং বেশি বেশি ঋণ বিতরণ। কিন্তু আগামী দশকে ব্যাংকিং প্রতিযোগিতা হবে: ডিজিটাল রূপান্তর, ওয়েলথ ম্যানেজমেন্ট, এআই-নির্ভর ব্যাংকিং, উন্নত গ্রাহক অভিজ্ঞতা, ডেটা অ্যানালিটিকস, সীমান্তপারের আর্থিক সেবা, ফি-ভিত্তিক টেকসই আয় এবং সম্পর্কভিত্তিক ব্যাংকিং।
বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণী ও ব্যক্তিগত সম্পদ দ্রুত বাড়ছে। ফলে বিনিয়োগ পরামর্শ, সম্পদ সংরক্ষণ এবং আন্তঃপ্রজন্ম সম্পদ পরিকল্পনার চাহিদাও দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। যে ব্যাংকগুলো এখন থেকেই এসব সক্ষমতা গড়ে তুলবে, তারাই আগামী দশকের বাজারনেতা (মার্কেট লিডার) হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
পরিশেষে, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের ২০টি শাখা বন্ধ করার বিষয়টি বিশ্বব্যাপী ব্যাংকিং শিল্পের পরিবর্তিত বাস্তবতার প্রতিফলন। ভবিষ্যতের ব্যাংকিং আর শাখার সংখ্যার ওপর নির্ভর করবে না; বরং নির্ভর করবে ডিজিটাল সক্ষমতা, গ্রাহকের সঙ্গে ব্যাংকের গভীর সম্পর্ক, উচ্চমানের আর্থিক পরামর্শ এবং একাধিক প্রজন্মের সম্পদ দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনার ওপর।
আগামী দিনের সফল ব্যাংকগুলো সবচেয়ে বেশি ভবন বা শাখার মালিক হবে না; বরং তারা হবে সবচেয়ে বেশি গ্রাহক আস্থার, সবচেয়ে শক্তিশালী প্রযুক্তি প্লাটফর্মের, সবচেয়ে উন্নত ডেটা ব্যবস্থাপনার এবং সবচেয়ে মূল্যবান আর্থিক সম্পর্কের অধিকারী। অর্থাৎ ব্রাঞ্চ নেটওয়ার্ক সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের উপস্থিতি সৃষ্টি করে, কিন্তু সম্পর্ক বা রিলেশনশিপ ব্যাংকিং সৃষ্টি করে প্রকৃত প্রতিষ্ঠানগত মূল্য (এন্টারপ্রাইজ ভ্যালু)।
বিপ্লব চন্দ্র ঘোষ: প্রিন্সিপাল ও ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার, ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, বিডিবিএল









