দেশজুড়ে বিভিন্ন অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমে নিচে নামছে। এর পেছনে শিল্প-কারখানার পানি উত্তোলন ও প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত ব্যবহার বিশেষভাবে দায়ী। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় এরই মধ্যে সুপেয় পানির সংকটে পড়েছে ওই অঞ্চলের বাসিন্দারা। তেমনই এক সংকটে রয়েছে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের মানুষ। বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, উপজেলার বিভিন্ন স্থানে নলকূপে পানি উঠছে না। ৪০০-৫০০ ফুট গভীরে স্থাপন করা নলকূপেও পানি উঠছে না। জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্প-কারখানায় গভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি সরবরাহ করায় এখানে পানির স্তর আরো নিচে নেমে যাচ্ছে। জানা যায়, জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে আটটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদনে রয়েছে। এছাড়া নির্মাণাধীন রয়েছে আরো কমপক্ষে ২০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পানির চাহিদা মেটাতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে ৩৮টি গভীর নলকূপ স্থাপন করেছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। এসব নলকূপের মধ্যে বর্তমানে ১৫টির পানি দিয়ে মেটানো হচ্ছে ২৬টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাহিদা। প্রতি মাসে এসব প্রতিষ্ঠান ৪১ হাজার ৯৪০ কিউবিক মিটার ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করছে।
শিল্প উৎপাদন দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেটি মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে হুমকি হয়ে উঠবে তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এমনিতেও বিশ্বের চার ভাগের তিন ভাগ পানি হলেও মিঠা পানির পরিমাণ খুবই কম। তাই পানিসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব দেয়া আবশ্যক। যে হারে শিল্পে ভূগর্ভের পানি ব্যবহার হচ্ছে তা বন্ধ হওয়া উচিত। বিকল্প পানির উৎস বের করতে হবে এবং যতটা সম্ভব পানির ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে। শিল্প খাতে প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ব্যবস্থা নিশ্চিতে এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে যে পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানির প্রয়োজন হবে, সেই পরিমাণ পানি ভূগর্ভ থেকে পাওয়া যাবে না। কাজেই ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন সীমিত করে বৃষ্টির পানি ও নদীর পানি ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষত বৃষ্টির পানি সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং তা ব্যবহারে জোর দেয়া দরকার। পাশাপাশি নদী ও শাখা নদী সংস্কার করে তাতে স্রোতধারা ফিরিয়ে এনে এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণ করে সেই পানি ব্যবহারে জোর দিতে হবে। দেশের সব নদীর মধ্যে স্থাপনা উচ্ছেদ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর প্রবাহ ঠিক রাখার জন্য কার্যকর উদ্যোগ ও কৌশল নির্ধারণ করা প্রয়োজন। দেশ ক্রমে শিল্পায়নের দিকে এগোচ্ছে। দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য এর বিকল্পও নেই। কারণ যে হারে জনসংখ্যা বাড়ছে, বেসরকারি খাত কর্মসংস্থান তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা না রাখলে বড় ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হবে। ভবিষ্যতে জনসংখ্যা আরো বাড়বে এবং সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়বে শিল্পায়নও। প্রতিটি শিল্পের জন্যই কিছু প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার অপরিহার্য। এতে গ্যাস, পানিসহ নানা প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। পানি প্রায় প্রতিটি শিল্পেই কমবেশি দরকার। একটা সময় বাংলাদেশ বেপরোয়াভাবে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করেছে, অপচয়ও করা হয়েছে সস্তা বলে। এর প্রভাব পড়েছে গ্যাসের জোগানে। তীব্র গ্যাস সংকটে পড়েছে দেশের শিল্প ও আবাসন খাত। আমদানি করে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। ভূগর্ভস্থ পানিরও এমন যথেচ্ছ ব্যবহার চলতে থাকলে আগামীতে সুপেয় পানিও আমদানি করে সরবরাহ করা ছাড়া উপায় থাকবে না। ভবিষ্যতে ভূগর্ভস্থ পানির অভাবে বাংলাদেশকে বড় ধরনের সংকটে পড়তে হবে—এমন আশঙ্কা অমূলক নয়। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া, বিভিন্ন অঞ্চলে প্রত্যাশামতো পানি না পাওয়া সে বার্তাই দিচ্ছে। সুতরাং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের শিল্পপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় পানির বিকল্প ব্যবস্থা করে ভূগর্ভের পানির ওপর চাপ কমাতে হবে। নয়তো পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য উভয়ই বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে।
জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের আটটি উৎপাদনশীল ও ১৮টি নির্মাণাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে এখন মাসে প্রায় ৪২ হাজার কিউবিক মিটার ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার হচ্ছে। অথচ এ অঞ্চল আগে থেকেই আর্সেনিক দূষণসহ বিশুদ্ধ পানির সংকটে ছিল। খিলমুরারী, ঘেরামারা কিংবা আদিবাসী পাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় নলকূপে পানি উঠছে না; বর্ষা বাদে দীর্ঘ সময় ধরে মানুষকে দূরদূরান্ত থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এ বাস্তবতায় গভীর নলকূপের মাধ্যমে শিল্পে পানি সরবরাহ টেকসই উন্নয়নের মূলনীতিরও পরিপন্থী হয়ে উঠেছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) জানিয়েছে, ফেনী নদীর পানি পরিশোধন করে সরবরাহের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে অনেকটা চাপ কমবে ঠিকই, তবে প্রশ্ন থেকে যায়—ততদিনে পরিস্থিতি কতটা নাজুক হয়ে উঠবে? তাছাড়া ভবিষ্যতে আরো ২০টি নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান যুক্ত হলে পানির চাহিদা বহুগুণ বাড়বে। সেই ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে কী উদ্যোগ নেয়া হবে?
একটি কার্যকর ও দূরদর্শী পানি ব্যবস্থাপনা নীতি ছাড়া এ সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে প্রতীয়মান হয় না। প্রথমত, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার সীমিত করা, এমনকি পর্যায়ক্রমে তা বন্ধ করা উচিত। দ্বিতীয়ত, বিকল্প পানির উৎস যেমন নদী বা বৃষ্টির পানি ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা দরকার। তৃতীয়ত, শিল্পে ব্যবহৃত পানির মূল্য নির্ধারণে পরিবেশগত খরচ অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, যাতে ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো পানি ব্যবহারে সচেতন হয়। কারণ বর্তমানে নামেমাত্র মূল্য দিয়ে শিল্প মালিকরা তা ব্যবহার করছেন।
মিরসরাইয়ের জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলকে পরিবেশ ও জনবান্ধব করতে হলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতেই হবে। দেশের শিল্পনীতিতে জনজীবন ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় আনা জরুরি। বিগত শাসনামলেও দেখা গেছে, জনগণের প্রকৃত প্রয়োজনকে উপেক্ষা করে নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে। ফলে উন্নয়নের সুফল ন্যায্যভাবে পাননি তারা। বর্তমানে এ ধরনের উন্নয়ন নীতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যেকোনো উৎপাদন ও উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে প্রাণ-প্রকৃতিকে প্রাধান্য দেয়া হোক।










