সহজাতভাবেই এ সফর থেকে প্রত্যাশাও বেশি। আর জনপ্রত্যাশার বড় অংশজুড়ে রয়েছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার।

বাংলাদেশের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বৃহৎ শ্রমবাজার মালয়েশিয়া। কিন্তু নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি, বিশেষত সিন্ডিকেটের কারণে মালয়েশিয়া দফায় দফায় বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেয়া বন্ধ করেছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের মে মাসে নতুন করে কর্মী নিয়োগ বন্ধ করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর এ শ্রমবাজার খোলা নিয়ে বেশ তৎপর ছিল। সে সময় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা তৎকালীন উপদেষ্টা দাবিও করেছিলেন যে বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি জনশক্তি নেবে মালয়েশিয়া। যদিও এমন কিছু ঘটেনি। উল্টো দেশটির সরকার কর্মী নিতে প্রায় ১০টি কঠিন শর্ত আরোপ করে। এখন পর্যন্ত কার্যত বন্ধ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান দেশটিতে সফরে গেলে শ্রমবাজার পরিস্থিতি নিয়ে আগ্রহ ও প্রত্যাশা জন্মানো স্বাভাবিক।

জানা গেছে, মালয়েশিয়া সফরে প্রধানমন্ত্রীও শ্রমবাজারের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেছেন। দ্রুত দেশটির শ্রমবাজার বাংলাদেশীদের জন্য উন্মুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে অনিয়মিত শ্রমিকদের বৈধকরণ, আটক বাংলাদেশীদের প্রত্যাবাসন এবং নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, ন্যায্য ও সাশ্রয়ী করার বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে। এটি ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে এখন প্রয়োজন প্রতিশ্রুতিগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন করা।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশীদের প্রবেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব। অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং অনিয়মের কারণে একদিকে শ্রমিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, অন্যদিকে মালয়েশিয়ার নিয়োগদাতাদের মধ্যেও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। তাই শুধু শ্রমবাজার উন্মুক্ত করা যথেষ্ট নয়; এমন একটি কাঠামো তৈরি করতে হবে যেখানে শ্রমিক কম খরচে, নিরাপদে এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবে যেতে পারেন। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার যেন বন্ধ না হয় সেটি নিশ্চিত করতে হবে। বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন কেন বারবার এটি বাংলাদেশীদের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ধরে রাখতে আরেকটি বিষয়েও নজর দিতে হবে। বর্তমানে দেশটি স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী জনশক্তি নিচ্ছে। দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে প্রবেশের জন্য বিদ্যমান সমস্যার সমাধানের পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতেও মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন।

শ্রমবাজারের পাশাপাশি মালয়েশিয়ার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার করাও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সফরে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ২০২৭ সালের মধ্যে একটি আধুনিক ও পারস্পরিক লাভজনক চুক্তি সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের রফতানি খাত নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হবে। তাই এখন থেকেই নতুন বাজার, বাণিজ্য সুবিধা এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে।

এর অংশ হিসেবে মালয়েশিয়ার সঙ্গে এফটিএ বাংলাদেশের রফতানি সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, ওষুধ, চামড়া ও অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাত এতে উপকৃত হতে পারে। তবে বাণিজ্য চুক্তির সুফল পেতে হলে দেশের উৎপাদন সক্ষমতা, পণ্যের মান এবং সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি।

সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হালাল শিল্পে সহযোগিতা। বৈশ্বিক ইসলামী অর্থনীতির সম্প্রসারণের সঙ্গে হালাল পণ্যের বাজারও দ্রুত বাড়ছে। মালয়েশিয়া এক্ষেত্রে একটি সফল উদাহরণ। দেশটির অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ হালাল সার্টিফিকেশন, গবেষণা, উদ্ভাবন ও রফতানি সক্ষমতা বাড়াতে পারে। খাদ্য, ওষুধ ও প্রসাধনীসহ বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশের জন্য নতুন বাজার তৈরির সুযোগ রয়েছে।

একইভাবে ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সেমিকন্ডাক্টর খাতে সহযোগিতার বিষয়টিও ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মালয়েশিয়ার প্রযুক্তি খাতের অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের তরুণ মানবসম্পদের সমন্বয় হলে নতুন শিল্প সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে এক্ষেত্রে প্রয়োজন দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

বাংলাদেশ আঞ্চলিক বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি)-এ যোগদানের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এ উদ্যোগ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির নতুন দিকনির্দেশ করে। এশিয়ার দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হতে পারলে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

মালয়েশিয়া সফরে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেশকিছু সম্ভাবনার ক্ষেত্র উঠে এসেছে। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, কেবল সমঝোতা বা যৌথ বিবৃতি যথেষ্ট নয়। শ্রমবাজার পুনরায় চালু করা, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সংস্কার আনা এবং বাণিজ্যিক সহযোগিতাকে বাস্তব ফলাফলে রূপ দেয়া হবে বড় চ্যালেঞ্জ।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্সের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। একই সঙ্গে দেশটির সঙ্গে শক্তিশালী বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। তাই এখন প্রয়োজন আস্থা, স্বচ্ছতা ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ককে আরো দৃঢ় করা। সরকারকে বাস্তব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে এটা করতে হবে। এতে সরকারের অনেক প্রতিশ্রুতি ও লক্ষ্য বাস্তবায়নও সহজ হবে। যেমন কর্মসংস্থান তৈরির যে অভিপ্রায় সরকার নির্বাচনী প্রচারকালীন সময় থেকে করে আসছে, তা পূরণ হবে।